Lady Gangster

 

শহরের যান্ত্রিক জীবনে আমি একজন সাধারণ একাউন্ট্যান্ট। কিন্তু গত কয়েক মাস ধরে আমার জগতটা কেবল শূন্যের হিসাবে আটকে আছে। আলমারির কোণায় পড়ে থাকা সিভিগুলোয় ধুলো জমেছে, আর রান্নাঘরের চালের ড্রামটা এখন খাঁ খাঁ করছে। এমনকি বোতলে রাখা শেষ কয়েকটা মুড়ি যখন শেষ হয়ে গেল, তখন বুঝতে পারলাম ভদ্র উপায়ে বাঁচার সময়টা আমার ফুরিয়ে এসেছে। 
আমার শরীরটা কোনোকালেই কঠোর পরিশ্রমের উপযুক্ত নয়, কলম পেষাই আমার নিয়তি। কিন্তু মাথার ওপর বাবার রেখে যাওয়া ঋণের বিশাল পাহাড় আমাকে প্রতিনিয়ত পিষছে। ঠিক সেই মুহূর্তে স্কুলজীবনের এক বন্ধুর মাধ্যমে খবরটা এল। খাগড়াছড়ির গহীন অরণ্যের একচ্ছত্র অধিপতি, ড্রাগ মাফিয়া বিরমল চংয়ের জন্য একজন বিশ্বস্ত মানুষ চাই। কাজটা সহজ কিন্তু মারাত্মক তার ড্রাগ সাম্রাজ্যের কোটি কোটি টাকার হিসাব মেলাতে হবে, কালো টাকাকে করতে হবে সাদা।সাধারণ চাকরির চেয়ে বেতন চার-পাঁচ গুণ বেশি। জীবনের ঝুঁকি আছে জেনেও আমি রাজি হলাম। কারণ, না খেয়ে ধুঁকে ধুঁকে মরার চেয়ে এই রোমাঞ্চকর নরকে পা বাড়ানোই আমার কাছে তখন শ্রেয় মনে হলো। আমি জানি, একবার এই পথে পা দিলে ফেরার পথ নেই। ভ্যাট আর ট্যাক্সের মারপ্যাঁচে দক্ষ এই হাত দুটো এখন রক্তে ভেজা টাকার হিসাব রাখতে খাগড়াছড়ির দুর্গম পাহাড়ে পা রাখল।

খাগড়াছড়িতে গিয়ে রাসেলের আসল রূপ দেখে আমার রক্ত হিম হয়ে গেল। যে রাসেলকে আমি স্কুল জীবনের বন্ধু হিসেবে চিনতাম, সে এখন দামি স্যুট-টাই পরে শহরের বুকে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী সেজে ঘুরে বেড়ায়। অথচ তার এই চকচকে মুখোশের নিচে লুকিয়ে আছে একজন ভয়ংকর ড্রাগ ডিলার। রাসেলের মাধ্যমেই আমি এই অন্ধকার জগতের ‘অ্যাকাউন্টিং’ বুঝে নিলাম। আমি বিরমল চং-কে পরামর্শ দিলাম, এই পাহাড় সমান কালো টাকা সাদা করার সবচেয়ে নিরাপদ উপায় হলো ঢাকার রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় বিনিয়োগ করা। বেনামে বা বিশ্বস্ত কারও নামে ফ্ল্যাট কেনা বেচা করলে পুলিশের নজরে আসার সম্ভাবনা কম। বিরমল চং চুরুটে টান দিয়ে বললেন, "ঢাকায় আমার ছেলে আরিং চং আছে, সে ওখানকার প্রভাবশালী এমপি। আমার মেয়ে রূপসীও তার সাথেই থাকে। সব আরিং-এর নামেই হবে। 
শুনে আমি থমকে গেলাম। দেশের একজন জনপ্রিয় এমপি আরিং চং যার স্বচ্ছ ভাবমূর্তি টিভির পর্দায় দেখি, তার শেকড় যে খাগড়াছড়ির এই বিষাক্ত ড্রাগ সাম্রাজ্যে প্রোথিত, তা ঘুণাক্ষরেও কেউ জানে না। আমি বুঝে গেলাম, এখানে যেমন অঢেল টাকা, তেমনি সামান্য ভুল মানেই তপ্ত সিসার বুলেট আমার খুলি উড়িয়ে দেবে।
আমি প্রস্তাব করলাম আরিং চং এমপি এখানে নজর আরো বেশি পড়বে। বুদ্ধিমানের কাজ হলো আপনার মেয়ের নামে করুন। এখানে সরকার সরাসরি হিসাব চাইতে পারে না। এমপির নামে হলে এটা সহজে নজরে আসবে। উনি আমার কথায় রাজি হলেন। 
ঢাকায় ফেরার পর আরিং চংয়ের সাথে যোগাযোগ হলো। সে আমাকে তার বোন রূপসীর বিয়ের দাওয়াত দিল। 'Blackboard' নামক এক বিলাসবহুল কমিউনিটি সেন্টারে যখন পা রাখলাম, আমার চোখ ধাঁধিয়ে গেল। সামনেই বসে আছে কনে রূপসী অপরূপা এক নারী। মা বাঙালি আর বাবা পাহাড়ি হওয়ার কারণে তার অবয়বে এক অনন্য মিশ্রণ ঘটেছে। শাড়িতে তাকে দেখাচ্ছে পাহাড়ি ঝরনার মতো স্বচ্ছ, আবার কোনো এক রহস্যময় আঁধারে ঢাকা। 
আমি ভিড়ের মাঝে এক কোণায় টেবিল নিয়ে বসলাম। আভিজাত্যের চরম শিখরে থাকা ঢাকার নামী দামি মন্ত্রী, আমলা আর ব্যবসায়ীরা সেই বিয়েতে হাসিমুখে উপস্থিত। তারা রূপসীর সাথে ছবি তুলছে, আরিং চং-এর সাথে হাত মেলাচ্ছে। অথচ এই জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের প্রতিটি আলোকসজ্জা আর রাজকীয় খাবারের পেছনে লুকিয়ে আছে লাশের গন্ধ আর মাদকের বিষ।আমার ভেতরে এক অদ্ভুত হাসি পাচ্ছিল। এই যে এত সব শিক্ষিত এবং মার্জিত মানুষের ভিড়, তারা কেউই জানে না এই মুহূর্তে তারা এক ভয়ংকর সন্ত্রাসী আর মাফিয়া সাম্রাজ্যের মেহমান হয়ে ডিনার করছে। হয়তো আমার মতো আরও দু-একজন সত্যটা জানে, কিন্তু প্রাণভয়ে তাদের মুখও আমার মতোই তালাবদ্ধ। ভদ্রতার এই নিশ্ছিদ্র খোলসের নিচে কী ভয়ংকর এক নরক আমি দেখতে পাচ্ছি, তা কল্পনা করার ক্ষমতাও এই সাধারণ মেহমানদের নেই।
হঠাৎ কানফাটানো আওয়াজে ‘ব্ল্যাকবোর্ড’ কমিউনিটি সেন্টারের আভিজাত্য চুরমার হয়ে গেল। চারদিকে দিগ্বিদিক গোলাগুলি। ওয়েটারের ছদ্মবেশে থাকা আততায়ীগুলো স্টেজ লক্ষ্য করে বৃষ্টির মতো গুলি ছুড়ছে। দেখলাম, আরিং চং তার বোন রূপসীকে বাঁচাতে গিয়ে নিজের বুক পেতে দিল; তার সাদা পাঞ্জাবি মুহূর্তেই রক্তে লাল হয়ে উঠল। রূপসী স্টেজের পেছনে আড়াল নিল, আর আমি নিজের প্রাণ বাঁচাতে এক লাফে টেবিলের নিচে সেঁধিয়ে গেলাম। পুলিশ আর সিকিউরিটির পালটা গুলিতে পুরো হলরুম এখন কসাইখানা।
সুযোগ বুঝে আমি পেছনের ছোট একটা দরজা দিয়ে দৌড় দিলাম। মনে মনে ভাবছি, এই নরক থেকে পালাতে হবে। চাকরির শখ মিটে গেছে; একবার যদি পুলিশ জানতে পারে আমি বিরমল চং-এর একাউন্ট্যান্ট, তবে জেলের ঘানি টেনে জীবন শেষ হবে। গেট দিয়ে বের হতেই একটা খালি রিকশা পেয়ে চেপে বসলাম। রিকশাওয়ালাকে চিৎকার করে বললাম, মামা, জোরে টান দেন!
কিন্তু রিকশা কিছু দূর এগোতেই হঠাৎ ছায়ার মতো একজন চলন্ত রিকশায় চেপে বসল। তাকিয়ে দেখি রুপসী! রক্তভেজা শাড়ি আর অবিন্যস্ত চুলে তাকে কোনো রানির মতো নয়, বরং রণচণ্ডী মনে হচ্ছে। ভয়ে আমি কিছু বলতে পারলাম না। দৌড়াদৌড়ির সময় বাঁ হাতে প্রচণ্ড চোট পেয়েছিলাম, যন্ত্রণায় হাতটা নাড়াতে গিয়ে অজান্তেই রূপসীর ঘাড়ের কাছে আঙুল লেগে গেল। ব্যাস! মুহূর্তের মধ্যে রূপসীর ডান পা ছিটকে এসে আমার থুতনি বরাবর এক মারাত্মক কিক বসিয়ে দিল। তার কোমর থেকে বের হয়ে এল একটা চকচকে পিস্তল। দাঁতে দাঁত চেপে সে গর্জে উঠল, তুই কোন দলের? কার লোক তুই?
লাথির চোটে আমার দাঁতে দাঁত লেগে গেছে, কথা বের হচ্ছে না। রূপসীর পা তখনও আমার থুতনিতে চেপে ধরা। কোনোমতে অস্পষ্ট স্বরে বললাম, আমি রাসেলের বন্ধু।
সে ভ্রু কুঁচকে পা নামিয়ে নিল। আমার পরিচয় দেওয়ার পর রিকশাওয়ালাকে রাস্তার এক কোণায় থামাতে বলল। নিঝুম গ্রামের পিচঢালা রাস্তা। রিকশা থেকে নেমে আমি জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। রূপসী তার ব্লাউজের ভেতর থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে একটা সিগারেট ধরাল। ধোঁয়া ছেড়ে জিজ্ঞেস করল, কিরে, সিগারেট খাস?
আমি মাথা নিচু করে বললাম, না ম্যাম, খাই না।
সে একটা বাঁকা হাসি দিল।মাফিয়া জগতে সবাই আমাকে 'দিদি' বলে চিনে। তবে তোর মুখে 'ম্যাম' ডাকটা শুনে মন্দ লাগল না। পরক্ষণেই তার চেহারায় আগুনের আভা ফুটে উঠল। দাঁত কিড়মিড় করে বলল, শুয়োরের বাচ্চারা আমার বিয়েটা ভেস্তে দিল। ওরা জানেই না এই বিয়ের আড়ালে কত বড় একটা ডিল হচ্ছিল। সব কটাকে আমি জ্যান্ত চিবিয়ে খাব! রাগে তার চোখ দুটো তখন জ্বলন্ত কয়লার মতো লাল। আমি নির্বাক, নিস্পন্দ এক ভদ্র ছেলের মতো দাঁড়িয়ে রইলাম। পাহাড় আর সমতলের মিশেলে তৈরি এই নারী যে কতটা ভয়ংকর হতে পারে, তা আজ আমি হাড়েমাসি টের পাচ্ছি।

Comments