Posts

Showing posts from February, 2026

লাল শাড়ী

Image
 লেখকঃ সীমান্ত সরকার আমরা দু’জন ভালোবেসে বিয়ে করেছিলাম। সেই ভালোবাসা ছিলো সরল, কাঁচা, কিন্তু নিখাদ। আমাদের এই সিদ্ধান্তে দুই পরিবারের কেউই খুশি ছিল না। আশীর্বাদের বদলে আমরা পেয়েছিলাম দীর্ঘশ্বাস, অভিমান আর নীরব দূরত্ব।  অল্প বয়সে সংসারের দায় কাঁধে তুলে নিয়েছিলাম। তখনও জীবনের হিসাব কষতে শিখিনি, ভবিষ্যতের অঙ্ক মিলাতে পারিনি। হাতে কোনো স্থায়ী রোজগার ছিল না, ছিল না নিশ্চিন্ত আশ্রয়ের নিশ্চয়তা। তবুও সাহস ছিল কারণ আমরা একে অপরকে পেয়েছিলাম। সংসারের শুরুর দিনগুলো ছিল টানাপোড়েনের। অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী, অনিশ্চয়তা ছিল প্রতিদিনের ছায়া। অনেক রাত কেটেছে হিসাব মিলাতে মিলাতে কিভাবে মাসটা পার হবে, কিভাবে ভাড়া দেওয়া হবে, কিভাবে চাল-ডাল জুটবে।  কেউ এগিয়ে আসেনি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে। আর আমরা-ও কারো কাছে হাত পাতিনি। হয়তো ছিল একরাশ অহংকার, হয়তো ছিল ভালোবাসার জেদ যা-ই হোক, আমরা আমাদের কষ্ট নিজেদের মাঝেই বয়ে নিয়েছি। ভাগ্যের চাকা একসময় ধীরে ধীরে ঘুরতে শুরু করল। বহু প্রতীক্ষার পর একটি ভালো চাকরি হলো আমার। সংসারের অভাব কিছুটা হলেও ঘুচল। ঘরে আবার স্বস্তির বাতাস ঢুকতে লাগল। মনে হলো এবার বুঝি জীবন এক...

ব্যর্থ প্রেম

Image
সিমান্ত সরকার ক্লাস টেন-এ থাকতে মীমকে দেখে আমার হার্টবিট যেভাবে ড্রাম বাজাতো, তাতে মনে হতো বিপিএল-এর ফাইনাল চলছে। সামনে এসএসসি পরীক্ষা, মনে ভাবলাম, এখন না বললে তো পরে মীম অন্য কলেজে গিয়ে অন্য কারো 'ক্রাশ' হয়ে যাবে! বুক ধকধকানি নিয়ে একদিন সাহস করে মীমকে সামনে দাঁড়া করালাম। পকেট থেকে গোলাপটা বের করে কাঁপাকাঁপা গলায় বললাম, "মীম, আমি তোমাকে বড্ড ভালোবাসি!"  গম্ভীর মুখে মীম বলল: "দেখ সুমন, প্রেমের নাটক করার টাইম নাই। পরীক্ষার পরেই আব্বু-আম্মু আমাকে পিঁড়িতে বসাবে। তোর যদি এতই শখ হয়, তবে কালই ঘটক নিয়ে আমাদের বাসায় আয়। আমি বিয়ে করতে পারবো, কিন্তু ওই পার্কে বসে বাদাম খাওয়ার টাইম নাই!" আমি তো থ! আমার নিজের দাড়ি-গোঁফ ঠিকমতো গজায়নি, পকেটে টিফিনের ২০ টাকা, আর মীম চাচ্ছে আমি যেন ডাইরেক্ট 'বর' সেজে হাজির হই! ব্যস! ওখানেই আমার প্রথম প্রেমের 'দ্য এন্ড'। এসএসসি শেষ করে ভাবলাম -যাক, হাফ ছেড়ে বাঁচলাম! নতুন কলেজ, নতুন পরিবেশ, কলেজের প্রথম দিন গেট দিয়ে ঢুকতেই দেখি সামনে দাঁড়িয়ে স্বয়ং মীম ! ভাগ্যক্রমে দুজনের একই কলেজে চান্স হয়েছে। পুরোনো প্রেম আবার চাড়া দিয়ে উঠল। ...

ঈদ মোবারক

Image
  সময়ের সাথে সাথে ঈদের সংজ্ঞাটা কেমন যেন বদলে গেছে। একসময় ঈদের চাঁদ দেখার জন্য যে উন্মুখ হয়ে থাকতাম, এখন সেই উত্তেজনা আর নেই। এখন ঈদ মানে স্রেফ ক্যালেন্ডারের একটা ছুটির দিন। এখন আমাদের চাঁদরাত কাটে বন্ধুদের সাথে বাইকের গর্জন আর ধুলোবালিতে। উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়ানো আর শেষ রাতের দিকে তাড়াহুড়ো করে টুকটাক শপিং এটাই এখনকার ঈদের প্রস্তুতি। ঈদের সকালটা এখন শুরু হয় একরাশ ক্লান্তি নিয়ে। কোনোমতে ঈদের নামাজ পড়ে এসে বিছানায় গা এলিয়ে দেওয়া। খাওয়া-দাওয়ার চেয়েও তখন প্রধান আকর্ষণ হয়ে দাঁড়ায় ঘুম। যখন ঘুম ভাঙে, তখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা। ল্যাপটপ বা ফোনের স্ক্রিন খুলে দেখি ফেসবুকের নিউজফিড ভরে আছে একঘেয়ে সব স্ট্যাটাসে "সারাদিন ঘুমিয়েই ঈদ পার করলাম।" অদ্ভুত এক তৃপ্তি পাই এটা ভেবে যে, এই 'পাপী' দলে আমি একা নই; আমার মতো অনেকেই আজ ঘুমের রাজ্যে ঈদ খুঁজে ফিরছে। সকালে যখন বাড়ির ছোট বাচ্চারা নতুন জামা পরে কলবলিয়ে ঘরে ঢোকে, তখন নিজের অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ে। সালামির আবদার করলে মানিব্যাগ থেকে একটা পাঁচশ টাকার নোট বের করে বড়টার হাতে দিয়ে বলি, "সবাই ভাগ করে নিস।" দায়িত্ব শেষ।  ঈদের...

ম্যাডাম I Love You

Image
  Shimanto Sarkar সেদিন সকালটা  আর পাঁচটা সকালের মতো ছিল না। প্রকৃতি যেন জানান দিচ্ছিল, স্থবির জীবনে কোনো বড় পরিবর্তন আসছে। হঠাৎ এক গভীর ও প্রলয়ংকরী কম্পনে কেঁপে উঠল পুরো বাড়ি। জানলার কাচগুলো আর্তনাদ করে উঠল, আর ছাদের ফ্যানটা দুলতে দুলতে যেন খুলে পড়ার উপক্রম হলো। সারা পাড়া জুড়ে একযোগে শত মানুষের কণ্ঠে ধ্বনিত হলো- "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" । ভূমিকম্পের সেই আতঙ্ক মুহূর্তেই পরিবেশটাকে থমথমে করে দিল। কাঁপুনী থামল ঠিকই, কিন্তু সায়লার মনের ভেতর যে কাঁপুনী শুরু হলো, তা যেন থামার নামই নিচ্ছিল না। রাতের খাবার টেবিলে মা জুলেখা বানু চুপচাপ বসে ছিলেন কিছুক্ষণ। তারপর সায়লার পাতে এক টুকরো মাছ তুলে দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "মা সায়লা, আজ যখন মাটি কেঁপে উঠল, মনে হলো দুনিয়াটা বুঝি শেষ হয়ে যাবে। আমি তো বুড়ো হয়েছি, আমার সময় ঘনিয়ে আসছে। কিন্তু তুই? এভাবে আর কতদিন একা কাটাবি মা?" সায়লা মাথা নিচু করে ভাতের লোকমা মুখে দিতে গিয়েও থেমে গেল। জুলেখা বানু থামলেন না, গলায় আকুতি নিয়ে বললেন, "নিজের একটা গতি করে নে। এই বয়সে এসে আর তোকে নিয়ে দুশ্চিন্তা সইতে পারছি না। মরার আগে অন্তত এটা দেখে যেতে...

শুভ বিবাহ

Image
 লেখক ঃ তন্ময় চৌধুরী শহরের এক কোণে ছোট একটা বাসায় তরুণের সংসার। তবে এই সংসার শুধু তার একার নয়, এর সাথে জড়িয়ে আছে একরাশ দায়বদ্ধতা আর শৈশবের ঋণ। তরুণের জীবনের গল্পটা আর পাঁচটা সাধারণ যুবকের মতো মসৃণ নয়। খুব ছোটবেলায় বাবাকে হারানোর পর তার পৃথিবীটা হয়ে উঠেছিল মা আমেনা বেগমকে ঘিরে। আমেনা বেগম দিনরাত গার্মেন্টসে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে ছেলেকে বড় করেছেন। সেই কঠিন সময়ে তরুণের আশ্রয়ের আরেক নাম ছিল তার খালা জুলেখা বেগম। মা কাজে যাওয়ার সময় সকালে তরুণকে রেখে যেতেন খালার কাছে। জুলেখা বেগম নিজের সন্তানের মতোই আগলে রেখেছেন তাকে। তরুণের মা যখন কাজে থাকতেন, তখন খালার আঁচলই ছিল তার সব বিপদের ঢাল। আজ মা নেই, এক বছর হলো আমেনা বেগম পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন। এখন এই সংসারে তরুণ ছাড়া আর কেউ নেই যে এই মানুষগুলোর দেখাশোনা করবে। তরুণের খালাতো ভাই, যে কি না তার ছোটবেলার খেলার সাথী ছিল, কয়েক বছর আগে এক ভয়াবহ দুর্ঘটনায় মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। সেই ভাইয়ের বউ নিজের ছোট সন্তানটিকে বৃদ্ধ শাশুড়ি আর পাগল স্বামীর কাছে ফেলে রেখে অন্য জায়গায় বিয়ে করে চলে গেছে। জুলেখা বেগম এখন বয়সের ভারে নুইয়ে পড়েছেন, তার ওপর পাগল ছেলে ...

প্রিন্স অফ গার্লস কলেজ

Image
লেখক: তন্ময় চৌধুরী নোলক আকন্দ তার অ্যাডমিট কার্ডে পরীক্ষার কেন্দ্র হিসেবে একটি মহিলা কলেজের নাম দেখে অবাক হয়ে গেল। তার চোখ কপালে উঠে গেল। সে দ্রুত অধ্যক্ষের কাছে গিয়ে বিষয়টি জানাল। অধ্যক্ষ শিক্ষাবোর্ডে যোগাযোগ করলেন, কিন্তু পরীক্ষার সময় খুব কম। বোর্ডের কর্মকর্তারা পরীক্ষার কার্যক্রম নিয়ে এতটাই ব্যস্ত ছিল যে নোলকের আসন পরিবর্তনের বিষয়টি কেউ গুরুত্ব দিল না। আসলে সমস্যাটা হয়েছিল কম্পিউটারের সার্ভারে। নোলকের অ্যাডমিট কার্ডে তার লিঙ্গ (Gender) 'Male'-এর বদলে ভুল করে 'Female' লেখা হয়েছিল। 'নোলক' নামটি পুরুষ এবং মহিলা উভয়েরই হতে পারে, তাই এই ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল। তার জন্য আরও বড় সমস্যা ছিল পারিবারিক। নোলকের বংশে কোনো মেয়ে নেই। তার পরিবারে যেমন কোনো বোন নেই, তেমনি বংশের চাচা, মামা, খালা, ফুপু—সবার ঘরেই কেবল পুত্র সন্তান। ছোটবেলা থেকেই নোলক ভাইদের সঙ্গে বড় হয়েছে। সে বয়েজ স্কুলে পড়েছে, এমনকি তার বর্তমান কলেজটিও ছেলেদের। জন্ম থেকে মা, খালা, চাচি ছাড়া অন্য কোনো সমবয়সী মেয়ের সঙ্গে তার মেলামেশা প্রায় নেই বললেই চলে। এমন পরিবেশে নোলকের জন্য একটি মহিলা কলেজে পরীক্...

কারাগার

Image
  লেখকঃ তন্ময় চৌধুরী আজ প্রায় ৬৩ বছর পর আমি এই অন্ধকার কারাগার থেকে মুক্ত হচ্ছি। বাইরের পরিবেশ কেমন, সে সম্পর্কে আমার কোনো ধারণাই ছিল না। এত দিন মুক্তির অপেক্ষা করতে করতে আজ আমি একেবারেই বৃদ্ধ। গেটের বাইরে আসতেই দেখি কারাগারের সামনে অসংখ্য গাড়ি যাতায়াত করছে। আগে এই সব গাড়ি দেখার জন্য ছোটবেলায় ট্রেনে করে ঢাকাতে যেতাম। আজ কত আধুনিক গাড়ি আমার সামনে দিয়ে যাচ্ছে! পথের দু'ধারে উঁচু উঁচু দালান। মনে হচ্ছে আমি যেন ভিন্ন কোনো জগতে চলে এসেছি। কিন্তু এটা ভিন্ন জগৎ নয়, এটা আমারই জেলা, আমারই জন্মভূমি। জেলার সাহেব আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, "মুজাম্মেল, বাইরের পরিবেশ তোমার আপন মনে নাও হতে পারে। আল্লাহর দুনিয়ায় সব সুন্দর।" তারপর তিনি আমার পকেটে একটা খাম আর হাতে কিছু টাকা দিয়ে বললেন, "এগুলো তোমারই। জেলে যত দিন কাজ করেছো, তার একটা পারিশ্রমিক।" ১৭ বছর আগের সেই পোশাক ও হাতঘড়ি আমাকে দেওয়া হলো। এই ৬৩ বছর ধরে এগুলো জেলেই ছিল। এগুলো যে এখনো আছে, আমার ধারণাই ছিল না। শার্টটা দেখে মনে হলো হালকা টান দিলেই ছিঁড়ে যাবে। সমাজে বসবাসরত শেষ স্মৃতিগুলো হাতে নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা দিলাম...