ঈদ মোবারক

 

সময়ের সাথে সাথে ঈদের সংজ্ঞাটা কেমন যেন বদলে গেছে। একসময় ঈদের চাঁদ দেখার জন্য যে উন্মুখ হয়ে থাকতাম, এখন সেই উত্তেজনা আর নেই। এখন ঈদ মানে স্রেফ ক্যালেন্ডারের একটা ছুটির দিন। এখন আমাদের চাঁদরাত কাটে বন্ধুদের সাথে বাইকের গর্জন আর ধুলোবালিতে। উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়ানো আর শেষ রাতের দিকে তাড়াহুড়ো করে টুকটাক শপিং এটাই এখনকার ঈদের প্রস্তুতি।

ঈদের সকালটা এখন শুরু হয় একরাশ ক্লান্তি নিয়ে। কোনোমতে ঈদের নামাজ পড়ে এসে বিছানায় গা এলিয়ে দেওয়া। খাওয়া-দাওয়ার চেয়েও তখন প্রধান আকর্ষণ হয়ে দাঁড়ায় ঘুম। যখন ঘুম ভাঙে, তখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা। ল্যাপটপ বা ফোনের স্ক্রিন খুলে দেখি ফেসবুকের নিউজফিড ভরে আছে একঘেয়ে সব স্ট্যাটাসে "সারাদিন ঘুমিয়েই ঈদ পার করলাম।" অদ্ভুত এক তৃপ্তি পাই এটা ভেবে যে, এই 'পাপী' দলে আমি একা নই; আমার মতো অনেকেই আজ ঘুমের রাজ্যে ঈদ খুঁজে ফিরছে।

সকালে যখন বাড়ির ছোট বাচ্চারা নতুন জামা পরে কলবলিয়ে ঘরে ঢোকে, তখন নিজের অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ে। সালামির আবদার করলে মানিব্যাগ থেকে একটা পাঁচশ টাকার নোট বের করে বড়টার হাতে দিয়ে বলি, "সবাই ভাগ করে নিস।" দায়িত্ব শেষ। 

ঈদের দিন এখন আর সেই আগের মতো উৎসবের জোয়ার নেই। সকালের নামাজ আর কুশল বিনিময়ের পর পুরো এলাকা যেন এক নিঝুম পুরীতে পরিণত হয়। বড়দের দেখা পাওয়া ভার, মাঝেমধ্যে শুধু ছোট ছোট বাচ্চাদের রঙিন জামায় রাস্তার ধারের নির্জনতা কাটে। এখনকার ঈদ যেন ঈদগাহের কোলাকুলি পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। বড় শহর বা দূর-দূরান্ত থেকে আসা পুরনো বন্ধুদের সাথে দেখা হওয়ার একমাত্র ভরসা ওই জায়গাটুকু। নামাজ শেষ হতে না হতেই শুরু হয় ফেরার তাড়া। অনেকের ঠিকানা এখন শ্বশুরবাড়ি, কেউবা অন্য কাজে ব্যস্ত। ফলাফল যে গ্রাম বা পাড়া একসময় মুখরিত ছিল, তা দ্রুতই হয়ে যায় বন্ধুশূন্য আর খাঁ খাঁ জনপদ।

আজকালকার ঈদ মানে ঈদের দিন নয়, বরং ঈদ শুরু হয় দ্বিতীয় বা তৃতীয় দিনে। ঈদের দিনটা যেন কেবল ঘুমের জন্য বরাদ্দ। অথচ সেই 'ঈদ' বলতেও আমরা এখন বুঝি শুধু বউ-বাচ্চা বা পরিবার নিয়ে কোনো রেস্টুরেন্টে গিয়ে বসে থাকা। ঘরোয়া আড্ডা বা পাড়া দাপিয়ে বেড়ানো আনন্দ আজ অতীত। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, আমাদের কাছে এখন পহেলা বৈশাখ বা থার্টি ফার্স্ট নাইট যতটা উত্তেজনার, ধর্মীয় উৎসব ঈদ যেন ঠিক ততটাই 'বোরিং' হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিজের ধর্মের এত বড় একটা উৎসবকে মনে হয় একটা যান্ত্রিক রুটিন, আর অন্যের উৎসবগুলোতে আমরা খুঁজে ফিরি কৃত্রিম আনন্দ।


আজ যখন দুপুরের তপ্ত রোদে বিছানায় গা এলিয়ে চোখ বন্ধ করি, স্মৃতির পাতায় ভেসে ওঠে অন্য এক পৃথিবী। সেই সময়কার ঈদের আনন্দটা ক্যালেন্ডারের পাতায় নয়, বরং আমাদের হৃদস্পন্দনে মিশে থাকত। বড়দের মুখ থেকে যখন শুনতাম ঈদের তারিখ ঠিক হয়েছে, তখন থেকেই শুরু হতো অন্তহীন অপেক্ষার প্রহর। ঈদের দু-তিন দিন পর পরই আব্বুকে গিয়ে জিজ্ঞেস করতাম, "আব্বু, ঈদের আর কয়দিন বাকি?" আব্বু মুচকি হেসে আঙুলের ভাঁজ গুনে বলতেন, "এই তো রে পাগল, আর মাত্র পাঁচ দিন!" সেই পাঁচ দিন যেন পাঁচ বছরের সমান মনে হতো। চারদিকে তখন ঈদের কেনাকাটার জন্য ছোটদের কান্নাকাটি আর উত্তেজনার রোল পড়ে যেত। ব্বা কাজ শেষ করে বাড়ি ফিরেই যখন হাঁক দিতেন, "নে, জলদি গোসল সেরে আয়, মার্কেটে যাবো," তখন খুশিতে কলিজাটা নাচত। এক দৌড়ে কুয়োপাড়ে গিয়ে গোসল সেরে বাবা-মায়ের হাত ধরে বাজারে যেতাম। অভিভাবকরা যখন মার্জিত পোশাক পছন্দ করতেন, আমাদের চোখ তখন আটকে থাকত কড়া রঙচঙে সেই সব জামায়। দাম বা মান নিয়ে আমাদের মাথাব্যথা ছিল না, আমাদের অস্ত্র ছিল কেবল কান্না আর জেদ। শেষে সেই রঙিন জামাটাই আদায় করে ছাড়তাম।

মার্কেট থেকে ফেরার পর শুরু হতো মহাযুদ্ধ। বাড়ির বড়রা বা বন্ধুরা জামা দেখতে চাইলে এক কথা "ঈদের আগে দেখালে ঈদের আনন্দ চলে যাবে!" নতুন জামাটা সন্তর্পণে বালিশের নিচে রাখতাম, যাতে ভাঁজ নষ্ট না হয়। একটু পর পর গিয়ে প্যাকেটের মুখ খুলে উঁকি দিতাম। মা বলতেন, "বারবার গায়ে দিস না খোকা, ময়লা হয়ে গেলে ঈদে কী পরবি?" সেই সতর্কবাণীতেও যেন এক গভীর মমতা মিশে থাকত।

বিকেলের সূর্যটা যখন হেলে পড়ত, আমাদের তখন আর ঘরে মন টিকত না। পাড়ার সব বন্ধুরা মিলে একছুটে চলে যেতাম খোলা মাঠে। উদ্দেশ্য একটাই আকাশের বুকে এক ফালি রুপোলি রেখা খুঁজে পাওয়া। রমজানের শেষে সেই ঈদের চাঁদ দেখা ছিল এক বিরাট পরীক্ষা। সবাই ঘাড় কাত করে আকাশের নীলচে দিগন্তে চোখ রাখতাম। কেউ একজন হুট করে বলে উঠত, "ঐ যে দেখ, চাঁদ উঠছে!" ব্যাস, শুরু হতো হুড়োহুড়ি। কিন্তু সেই চিকন চাঁদ যেন মেঘের আড়ালে লুকোচুরি খেলত। যখন হঠাৎ করে সেই সরু বাঁকা রেখাটা চোখে পড়ত, তখন মনের ভেতর যে আনন্দ হতো, তা আজকের কোনো উৎসবের সাথেই মেলাতে পারি না।

চাঁদ দেখা মাত্রই পুরো মাঠজুড়ে সমস্বরে চিৎকার শুরু হতো"ঐ চাঁদ উঠছে রে, চাঁদ উঠছে!" সেই চিৎকার নিয়ে আমরা মেঠো পথ ধরে বাড়ির দিকে দৌড় দিতাম। তখন কোনো ফেসবুক বা নিউজ পোর্টাল লাগত না; আমাদের ওই হই-হুল্লোড় শুনেই গ্রামের মানুষ বুঝে যেত কাল ঈদ। আমরাই ছিলাম পাড়ার সেই জীবন্ত পত্রিকা, যারা আনন্দের খবর বয়ে নিয়ে আসতাম। বাড়ির আঙিনায় পা রাখতেই কানে আসত সাদা-কালো সেই পুরনো টেলিভিশনের শব্দ। বিটিভির পর্দায় তখন বেজে উঠছে সেই জাদুকরী সুর "ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ..."। ওই গানটা কানে আসা মানেই ছিল অফুরন্ত আনন্দের সিলমোহর। সেই মুহূর্তেই মনে হতো, অপেক্ষার অবসান হলো, কাল সকালেই আমাদের স্বপ্নের ঈদ।

ঈদের সকালটা শুরু হতো মসজিদের মাইকের সেই চিরচেনা আওয়াজে "ঈদ মোবারক, ঈদ মোবারক! আজকের ঈদের নামাজ সকাল অমুক সময়ে অনুষ্ঠিত হবে।" সেই ডাক শুনেই ঘুম ভেঙে যেত, কিন্তু চোখে কোনো ক্লান্তি থাকত না। রাস্তার পিচ ঢালা পথে চুন দিয়ে লেখা থাকত "ঈদ মোবারক", আর বাড়ির সামনে লাল-নীল কাগজের ঝালর।  কুয়োপাড়ে গিয়ে দেখতাম মা নতুন সুগন্ধি সাবান রেখেছেন। সেই সাবান মেখে গোসল সেরে নতুন জামা পরে আতর মেখে ঈদগাহে যেতাম। নামাজ শেষে সবার সাথে কোলাকুলি করা ছিল এক অদ্ভুত তৃপ্তির। আমরা বন্ধুরা মিলে খেজুর গাছের ডাল কেটে সুন্দর করে ঘর বানাতাম, ছোট টেবিল পেতে বসতাম দোকান নিয়ে। সেখানে থাকত সেদ্ধ ডিম আর রঙিন কোমল পানীয়। চলত পাটের কাঠির সুতো দিয়ে বোতলে চুরির ফাঁস ফেলার খেলা আর ডিমের লটারি। ছোটবেলার সেই অতি সাধারণ আয়োজনগুলোই ছিল আনন্দের খনি।

নামাজ শেষে সামান্য কিছু খেয়েই শুরু হতো সেলামি সংগ্রহের মিশন। মামা, ফুফু, খালা, চাচাদের বাসায় গিয়ে কদমবুসি করে সেলামি আদায় করা ছিল এক মহা উৎসব। তাদের সন্তানরাও আবার আমাদের বাসায় আসত। বিকেলের রোদে মেলায় গিয়ে বাহারি সব খেলনা আর মাটির জিনিসে পকেট খালি করাতেই ছিল সার্থকতা। ঈদের সেই একটা দিনই ছিল আমাদের পুরো দুনিয়া।

আজকের ঈদ যেন একদমই উল্টো। এখন ঈদের দিন রাস্তাঘাট থাকে একদম ফাঁকা, বড়রা ঘরের কোণে ঘুমিয়েই দিন পার করে। ছোটরা নতুন জামা পরে বের হয় ঠিকই, কিন্তু সেই প্রাণের স্পন্দনটা কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। এখন ঈদগাহের কোলাকুলিতেই সব উৎসব সীমাবদ্ধ। বন্ধুরা এখন নিজ নিজ জীবনে ব্যস্ত, কেউ বাইরে থাকে, কেউবা ঈদের দিন শ্বশুরবাড়ি চলে যায়। গ্রামগুলো আজ বন্ধুশূন্য খাঁ খাঁ জনপদ।

আজকাল ঈদ মানে ঈদের দিন নয়, বরং ঈদ শুরু হয় দ্বিতীয় বা তৃতীয় দিনে। তাও আবার কেমন ঈদ? বউ-বাচ্চা নিয়ে কোনো রেস্টুরেন্টে গিয়ে যান্ত্রিক খাওয়াদাওয়া। অবাক লাগে এটা ভেবে যে, আজ আমাদের কাছে পহেলা বৈশাখ বা থার্টি ফার্স্ট নাইট যতটা উত্তেজনার, ধর্মীয় উৎসব ঈদ যেন ততটাই বোরিং। ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে বলি "সারাদিন ঘুমিয়ে ঈদ পার করলাম।" মানিব্যাগ থেকে ৫শ টাকার নোট বের করে ছোটদের হাতে দিয়ে দায়িত্ব শেষ করি ঠিকই, কিন্তু সেই যে এক টাকার নতুন নোটের ঘ্রাণ আর মনের ভেতরে বয়ে যাওয়া আনন্দের হিল্লোল তা আজ বড্ড দুষ্প্রাপ্য।

শৈশবের সেই ঈদগুলো সময়ের স্রোতে হারিয়ে গেছে, এখন কেবল বেঁচে আছে দীর্ঘশ্বাসে আর ঝাপসা হয়ে আসা প্রিয় কিছু স্মৃতিতে।

ঈদ মোবারক (অগ্রিম)


Comments

Popular posts from this blog

শেষ দৃশ্যপট (১ম অধ্যায় )

ফারাওয়ের অভিশাপ

মৃতের নিশ্বাস