শেষ দৃশ্যপট (১ম অধ্যায় )

শেষ দৃশ্যপট (পর্ব ০১)

লেখকঃ সিমান্ত সরকার

কালের প্রভাতে সরকারবাড়িতে এক অভিনব উৎসবের আমেজ। প্রত্যেকটি ঘরে ঘরে বিলি হইতেছে মিষ্টি জিলাপি। কারণ, আমজাদ সরকারের গৃহে জন্ম গ্রহণ করিয়াছে তাহার দ্বিতীয় সন্তান। এক আনন্দঘন মুহূর্তসকলেই হাস্যোজ্জ্বল মুখে অভিনন্দন জানাইতেছে। আমজাদ সরকারের প্রথম সন্তান ছিল পুত্র। সেই কারণেই তিনি হৃদয়ের গভীরে লালন করিতেছিলেন, যেন তাহার দ্বিতীয় সন্তানটি হয় কন্যা। কন্যা সন্তান জন্মাইবেএই আশায় তিনি পূর্বেই তাহার নাম রাখিয়াছিলেন "মুক্তা" নামটি ছিল মায়াবী, কোমল, আর এক দুর্লভ আকাঙ্ক্ষার প্রতীক।

তবে ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, যেই রাত্রিতে কালবৈশাখীর ঝড়ে বাতাসে কাঁপিতেছিল গৃহের কুপি বাতি, যেই রাত্রিতে দূরে শোনা যাইতেছিল মুক্তিযুদ্ধের গুলির শব্দ, সেই বিভীষিকাময় রাতে প্রসব যন্ত্রণায় কাতরাইতেছিলেন আমজাদ সরকারের স্ত্রী। একদিকে বাহিরে যুদ্ধ, অন্যদিকে অন্তঃপুরে যুদ্ধ। একাত্তরের সেই রাতে, যেই মুহূর্তে বাঙালি লড়িতেছিল স্বাধীনতার জন্য, সেই ক্ষণেই এক নারীর গর্ভে লড়িতেছিল জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে এক শিশু। অবশেষে, জন্মগ্রহণ করিল এক পুত্র সন্তান।

নিরাশ হয়েছিলেন আমজাদ সরকার। কারণ, তিনি আশাবাদী ছিলেন একটি কন্যার। কিন্তু বিধির লিখন অপরিবর্তনীয়। তিনি হৃদয় ভরিয়া শুকরিয়া আদায় করিলেন। কারণ সন্তান তো সন্তানইসে তো আল্লাহ্ দান। যেহেতু পূর্বেই নাম স্থির করিয়াছিলেন, তাই পুত্র সন্তান হইলেও তাহার নাম রাখা হইল "মুক্তা" লোকে হাসিল, কেউ কেউ ঠাট্টা করিল, কেহ কেহ কটাক্ষ করিতেও দ্বিধা করিল না। তবু আমজাদ সরকার অটল। তিনি বলিলেন,

— "নাম তো কেবল শব্দমাত্র নহে, ইহা হইল স্মৃতির বহিঃপ্রকাশ, হৃদয়ের প্রতিচ্ছবি।"

এই ভাবেই শুরু হইল মুক্তার জীবনএকটি ব্যতিক্রমী নামের অন্তরালে এক অনন্য কাহিনির সূচনা।

সময় থেমে থাকে না। চারটি বসন্তের অবিরত যাত্রাপথে আমজাদ সরকারের সংসারে আবারো নতুন প্রাণের আগমন ঘটিল। একে একে তিনটি সন্তান জন্মগ্রহণ করিলপ্রথমে দুই কন্যা, পরিশেষে আরেক পুত্র। সংসার হইল ঘনবসতি, কোলাহলপূর্ণ।

কিন্তু সুখ-দুঃখে মোড়া জীবনের এই চক্রে হঠাৎ এক বিকেলের নিস্তব্ধতা ছিন্ন করিয়া দুঃসংবাদ আসিল। অজানা এক জ্বরে ভুগিয়া, আমজাদ সরকার পরলোকগমন করিলেন। কোন ডাক্তারি চিকিৎসাই তাঁহাকে রক্ষা করিতে পারিল না। তাহার বিদায়ে সংসারখানি হইল যেন দিকহারা নৌকার মতো, নৌসুন্দরীর মাঝি চিরতরে চলে গিয়াছে।

তবুও জীবন থামে না। আমজাদ সরকারের স্ত্রীর কাঁধে পড়িল জীবনের ভার। পাঁচ সন্তান, বিশাল সংসার, গৃহস্থালির দায়িত্ব, মাঠের কাজ, গবাদি পশুর দেখভালসব কিছু সামলাইবার দায়িত্ব যেন সেই একাকিনী নারীর কাঁধেই ন্যস্ত হইল। সন্তানরা বড় হইতে লাগিল। সকলেই আপন-আপন ভূমিকায় যুক্ত হইল সংসারের কাজে। কেহ ধান কাটে, কেহ পাট শুকায়, কেহ গোয়ালঘরের দায়িত্ব নেয়।

তবে ব্যতিক্রম ছিলো একজনমুক্তা।


মুক্তা ছিলো যেন আর পাঁচজনের চেয়ে আলাদা। সেই ছোটবেলা হইতেই সে গৃহকর্ম কিংবা কৃষিকর্মে একেবারেই অনাগ্রহ প্রকাশ করিত। সে ঘর-বাহিরের কোন কাজে মন বসাইতে পারিত না। যেই সময়ে অন্য ভাই-বোনেরা মাটি ঘামের গন্ধে গড়িয়া তুলিত জীবনের সংগ্রাম, সেই সময়ে মুক্তা চলিয়া যাইত একা একা বনে-বাদারে, মাঠে-ঘাটে।

বাতাসের শব্দে, পাখির ডাকে, জলের বুকে সে যেন খুঁজিয়া ফিরিত এক অপার রহস্য। তাহার দৃষ্টিতে ছিলো অন্যমনস্কতা, তাহার আচরণে ছিলো উদাসীনতা। কেহ হাসিয়া বলিত,
— “মুক্তা তো কেবলই ফাঁকি দেয়, ওর দ্বারা কিছুই হবে না।
কেহ কটাক্ষ করিয়া বলিত,
— “ছেলে হয়ে মেয়ের নাম পেয়েছে, বোধহয় সেই কারণেই এমন নারমিজাজ হয়েছে!”

তবে মুক্তা কিছু বলিত না। সে যাহা করে, নীরবেই করে। আপন মনে গাছের ছায়ায় বসিয়া পাখির ডাক শুনে, অথবা নদীর ধারে বসিয়া জলের ঢেউ গুনে। সংসারে সে এক ব্যতিক্রমী চরিত্রযার ছায়া অন্যদের তুলনায় ছিলো একটু আলাদা, একটু রহস্যময়।

মুক্তার বয়স তখন নয়। শিশুর মন তখনো কল্পনার পাখায় উড়ে বেড়ায়। কিন্তু সংসারের বাস্তবতা বড়োই কঠিন। সেই কল্পনার ডানায় একদিন জোর করিয়া চাপাইয়া দেওয়া হইল গরুর দায়িত্ব। বলা হইল—“গরু চরাতে হইবে, বাড়ির কেউ সময় পাইবে না।” মুক্তা গরুকে লইয়া মাঠে গেল। কিন্তু কাজের প্রতি তাহার যে জন্মগত অনীহা, তাহা তো হঠাৎ করিয়া বিলীন হইবার নয়। গরুকে ছাড়িয়া দিয়া সে পুকুরপাড়ে বসিয়া পড়িল। কচুরিপানার মাঝে ঢিল ছুঁড়িয়া, জল ছলছল করিয়া উঠিলে তাহার আনন্দে মন ভরিয়া যায়। সেই স্বচ্ছ জলে ঢেউ তুলিয়া সে যেন নিজের স্বপ্নগুলি খুঁজিয়া ফিরিত।

হঠাৎ এক সময় পেছন ফিরে দেখিলগরু নেই!

ঘাবড়াইয়া গেল মুক্তা। ছুটিল চারিপাশে, খুঁজিল বাঁশবন, পাটক্ষেত, নদীর পাড়কোথাও গরুর দেখা নাই। হৃদয়ে এক অজানা আশঙ্কা। যদি গরু না মিলে? মার পড়িবে! সে জানে, বাড়ি ফিরিলে রক্ষা নাই। তাই ঘরে ফিরিল না।

সেই রাতটি সে কাটাইল গোয়ালঘরের খড়ের গাদায়। গরুর উষ্ণ নিঃশ্বাস, খড়ের গন্ধ আর অন্ধকারে লুকাইয়া থাকা নিশুতিএই ছিল তাহার আশ্রয়। এইরূপে বহুবার মুক্তা গৃহে ফিরিয়া আসেনি। কখনো রান্নাঘরের কোণে, কখনো গবাদি পশুর ছায়ায়, কখনো খড়ের গাদায়নির্জন কোনে রাত কাটাইয়া দিত সে। মা ছুটাছুটি করিয়া বাশের কঞ্চি লইয়া খুঁজিত একপ্রান্ত হইতে আরেকপ্রান্ত। সকলে বলিত—“আবার মুক্তা নিখোঁজ!”

কিন্তু এক সময় মা আবিষ্কার করিলেন মুক্তার এই গোপন আশ্রয়স্থলগুলি। বুঝিলেনমেয়েটি শাস্তি হইতে পালায়, অপরাধ লুকাইবার চেষ্টায় নয়, শাস্তির ভয়েই অন্তরাল খোঁজে। তবু মাতৃরাগের তো সীমা থাকে না। যেই রাতে মুক্তা খড়ের গাদায় ঘুমাইতেছিল, সেই ঘুমন্ত অবস্থায় মা তাহাকে টানিয়া বাহির করিলেন। কঞ্চির আঘাতে মুক্তার শরীরে জেগে উঠিল দাগ, তাহার মুখে ছিল না একটিও শব্দ, কেবল নিরব চোখে তাকাইয়া ছিল জ্যোৎস্নামাখা আকাশের দিকে। সে রাত, সেই আঘাত, সেই পলায়নতাহার শৈশবের এক অনিবার্য চিত্রকল্পে পরিণত হইল। সে শিখিতে লাগিল, এই পৃথিবীতে প্রত্যেকটি স্বাধীনতার মূল্য দিতে হয়।

এক সন্ধ্যায়, ক্ষুদ্র এক অপরাধে ঘরে তুলকালাম বেধে যায়। ছোট ভাইকে মারিবার অভিযোগে মা হাতে লাঠি লইয়া ধাইয়া আসে মুক্তার পিছু। মুক্তা প্রাণভয়ে ছুটে যায়, ছুটিতে ছুটিতে ঘর হইতে দূরে, মাঠ ছাড়াইয়া পৌঁছায় পুকুরপাড়ে। বিশাল বটগাছের ছায়ায় সে আশ্রয় লয়। নিশুতি রাত্রি, মাথার উপর থমথমে আকাশ, আর দূর হইতে ভেসে আসিতেছে শেয়ালের ডাক।

ভয়ে কুঁকড়াইয়া পড়ে মুক্তা। হঠাৎ চোখে পড়েপুকুরের জলে গোল গোল ঘূর্ণি উঠিতেছে। সেই ঘূর্ণির কেন্দ্র হইতে সরু একটি জলরেখা বাহির হইয়া মাঠের দিকে চলিয়া যায়। জলরেখাটি যেন ডাকিয়া বলিতেছে—“এসো…”

এক রহস্যময় আকর্ষণে, এক অজানা মোহে মুক্তা পুকুরে পা রাখে। ধীরে ধীরে জলে ডুবিয়া যায় তাহার দেহ। অতঃপর

চোখ মেলিল মুক্তা। দেখিল, সে শুয়িয়া আছে ঘরের ভিতর। মাথায় জল ঢালিতেছে তাহার ফুপু। চতুর্দিকে সবাই ভীড় করিয়া আছে। প্রশ্নের বন্যা বয়ে যায়
— “তুমি কোথায় ছিলে এতদিন?”
— “তিন মাস ধরে তোমাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না!”

হতবাক মুক্তা! সে তো জানে, সে তো মাত্র এইমাত্র পুকুরে নামিয়াছেঅথচ তিনটি মাস অতিক্রান্ত!তিন মাস পর তাহাকে পাওয়া গিয়াছিল ঘরের ছনের চালের উপরঅজ্ঞান, নিথর, চুপচাপ। কেউ কিছুই বুঝিতে পারিল না। মুক্তাও না। সে কেবল বলিল পুকুরের সেই গল্প। তৎক্ষণাৎ ডাকা হইল এক প্রবীণ কবিরাজকে। তিনি মুক্তার শরীরে পরাইলেন এক তাবিজ। আশ্চর্যের বিষয়, তাবিজ খোলামাত্র মুক্তা পুনরায় অদৃশ্য হইয়া যায়কখনো তিনদিন, কখনো এক মাস, কখনো আরও অধিককাল। পরে আবার কোনও এক আশ্চর্য ভোরে দেখা মিলে তাহারজ্ঞানহীন, নিঃস্পন্দ, যেন পরকালের কোন সীমা ছুঁইয়া ফিরিয়া এসেছে।

কেউ বলিল—“ওর উপর পরির আছর।
অন্যজন বলিল—“জিনের রাজ্যে চলে যায়।
কিন্তু মুক্তা নিজেও জানে নাসে কোথায় যায়, কী করে ফেরে।

তিন-চারবার এমন ঘটনার পর, মুক্তার মা সিদ্ধান্ত লইলেন

ছেলেকে কবিরাজের তত্ত্বাবধানে রাখিবেন।

এই কবিরাজ এক রহস্যময় চরিত্র। তাহার পিতা ছিলেন মিশরদেশীয় সাধক, যিনি একসময়ে বাংলার মাটিতে পদার্পণ করিয়া এখানেই মৃত্যুবরণ করেন। পিতার মৃত্যুর পর ছেলে বাংলা ভাষা শিখিয়া গ্রামের মানুষদের সঙ্গে একাকার হইয়া যায়।

কবিরাজের কাছে আশ্রয় পাইয়া মুক্তা এক নতুন জীবনসূত্র আবিষ্কার করে। সে প্রথমবারের মতো জীবনে আগ্রহ অনুভব করেএবার কবিরাজি বিদ্যার প্রতি। তার কৌতূহল ক্রমে রূপ নেয় শিক্ষায়, শিখিতে থাকে জড়িবুটি, ধ্যান, তাবিজ-মন্ত্র, নিশীথ সাধনা। এই প্রথম মুক্তার ভিতর জন্ম নেয় কোনো কাজের প্রতি আসক্তি। যাহা সে ঘরবাড়িতে, মাঠে-ঘাটে কখনো খুঁজিয়া পায়নি, তাহা যেন সে পাইতে শুরু করিল এখানেঅলৌকিকের হাত ধরে নিজেকে জানিবার এক নব যাত্রা।


রাত্রি গভীর হইয়াছে। সকলেই নিদ্রা গহ্বরে নিমগ্ন। হঠাৎ মুক্তার ঘুম ভাঙিলতাহার শরীর জড়াইয়া ধরিয়াছে এক শীতল সাপশরীর! হঠাৎ জ্ঞান ফিরিতে সে দেখিলএকটি প্রকাণ্ড, দীর্ঘ, কালচে-সবুজ সাপ তাহার গায়ে পেঁচাইয়া রহিয়াছে। ভয়ে সে আর কিছু না ভেবেই চিৎকার করিয়া ঘর হইতে বাহির হইললুঙ্গি ফেলে দৌড়। তাহার পিছু পিছু ছোটিয়া আসিল ভাইবোনেরা, কেউ ভয় পাইয়া, কেউ কৌতূহলে। কিন্তু মুক্তা তো তখন আর ছোট নয়বয়সে টগবগে যুবক। লজ্জায় ভয়ে সে সোজা গিয়া লুকাইয়া পড়িল গোয়ালঘরের কোণে। সারাটি দিন সে সেখানেই রহিল, কাহারো মুখ দেখাইল না। মাঝে মাঝে কেবল অপেক্ষা করিতকখন ছোট ভাই আসিবে, তাহাকে চুপি চুপি বলিবে—“ঘর হইতে একটি লুঙ্গি আন।

ইতিমধ্যে মুক্তার খোঁজ চলিতেছে। তাহার মা, ভাবিয়া যে মুক্তা আবার কোথাও পলাইয়া গিয়াছে, ছুটিলেন পুকুরঘাটে। স্নিগ্ধ সকালে পুকুরের কিনারায় ভেসে আছে এক বিশাল রুই মাছ। মাছটির মায়ায় পড়িয়া মা জলাভিমুখে নামিলেন। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই চমকে উঠিলেনপুকুরের অতল গভীর হইতে কে যেন তাহার পা টানিতেছে! ভয়ে কাঁপিয়া উঠিলেন। মুখে দোয়া, অন্তরে আতঙ্ক। কোনরকমে পানির ধার ত্যাগ করিয়া তিনি ছুটিলেন বাড়িমুখে। পথে চলিতে চলিতে ঘটিয়া পড়িল শরীরিক দুর্বলতায়পেটের রোগে ভোগিলেন, কাঁপিতে লাগিলেন সর্বাঙ্গ।

বাড়িতে ডাকা হইল সেই পুরাতন কবিরাজ। তিনি উপস্থিত হইয়া বলিলেন
— “
তোমার ছেলের উপর জিনের কুদৃষ্টি পড়িয়াছে। পুকুরঘাটের বটগাছের নিচে জিন্দের বসবাস। মুক্তাকে বিবাহ দিয়া দাওমানুষী স্ত্রীর সাথে বন্ধনে বাঁধিলে এই নজর দুর হইবে। আর এই গাছের দিকে কেহ যেন অকারণে যাইবার সাহস না করে।” লোকের মুখে মুখে ফিরিয়া বেড়াইতে লাগিল গল্প—“যে- বটগাছ কাটিতে গিয়াছে, সে- কোন না কোন অজানা রোগে বা দুর্ঘটনায় মারা গিয়াছে।

বৃদ্ধ মুরুব্বিরা পর্যন্ত বলিয়া উঠিলেন—“আমরা জন্মাবার পর হইতেই এই বটগাছকে তেমনি দাঁড়াইয়া থাকতে দেখিতেছি। কে জানে, কত শতাব্দী জীর্ণ করে সে দাঁড়াইয়া আছে...”

এই বটগাছের শেকড়ে যেন জমা রহিয়াছে এক গোপন ইতিহাস, এক রহস্যময় অতীত। আর মুক্তাসে যেন নিজেই ক্রমে রূপ লইতেছে এই ইতিহাসেরই এক চরিত্রে।


শেষ দৃশ্যপট (পর্ব ০২)

লেখকঃ সিমান্ত সরকার


মুক্তাগ্রামের চোখে সে এক ভবঘুরে, অলস, জীন-আক্রান্ত যুবক। তাহার কাছে কেহ কন্যা দিতে চাহে না।
লোকের মুখে মুখে ফিরিয়া বেড়ায় গুজব
মুক্তার গায়ে জিন আছে।
কাজ-কর্মে অনুরাগী নয়।
কে মেয়ে দিবে এমন ছেলের হাতে?”

মুক্তার মায়ের উদ্বেগ দিনে দিনে বাড়িয়া চলিল। অন্যদিকে কবিরাজের হুঁশিয়ারি এখনো কানে বাজে—“বিয়ে দিলে জিনের হাত হইতে মুক্তি মিলিবে।

বহু চেষ্টা-তদবিরের পর গঞ্জের এক এলাকা হইতে পাত্রি পাওয়া গেল। নামমনু বেগম। রূপে-গুণে অতুলনীয়া। তবে বিধাতা তাহার ভাগ্য লিখিয়াছেন ভিন্ন কাহিনীতে। স্বামীর নির্যাতনে অতিষ্ঠ হইয়া তালাকপ্রাপ্তা মনু বেগম এখন বাপের বাড়িতে এক পুত্র সন্তানসহ বসবাস করে। সমাজের চোখে সেছাড়াস্ত্রী, অথচ তাহার মুখের লাবণ্য, চোখের ভাষা, চিবুকে স্থিরতাসব মিলাইয়া আজও সে একজন আকর্ষণীয়া নারী। মুক্তার মা চতুরতায় তাহার ছেলের অতীত গোপন রাখিলেননা বলিলেন জিনের গল্প, না বলিলেন ঘরছাড়া জীবনের কাহিনি। বরং যাহা বলিলেন

মুক্তা মেট্রিক পাশ করা ছেলে। ভবিষ্যতে চাকরি পাইলে ভাল চলিবে।

শর্ত একটাইমুক্তা - বছর ঘরজামাই থাকিবে। কন্যার পরিবার সম্মত হইল। বিয়েটি সম্পন্ন হইল একান্ত ঘরোয়া পরিবেশে। ঢাকঢোল বাজিল না, কেবল গোপন কন্ঠে ফিসফাস চলিল পেছনে

ঘরজামাই হইতে হইল রে মুক্তারে!”

তবে মুক্তা এখন আর সেই মুক্তা নয়। ঘরজামাই হইবার পর সে ধীরে ধীরে নিজেকে পরিবর্তন করিতে লাগিল। সংসারের দায়িত্ব বুঝিতে শিখিল। দিন দুই যেতেই সে চাকরির খোঁজে পত্রপত্রিকায় চোখ রাখিতে লাগিল। তার মেট্রিক পাশের শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী সে গ্যাস কোম্পানিতে একটি ভালো পদে চাকরি পাইয়া গেল। বেতনও কম নয়গ্রামের দৃষ্টিতে সে এখন শহুরে চাকুরিজীবী! বছর না ঘুরিতেই তাহার ঘরে আগমন করিল এক ফুটফুটে পুত্রসন্তান। শশুরবাড়ির পাশে একখণ্ড জমিতে নিজের হাতে গড়িয়া তুলিল একটি মাটির ঘর। সেই ঘর হইতে শুরু হইল তাহার নতুন জীবনের অধ্যায়। এখন সে আর অলস নয়, ভবঘুরে নয়, লোকচক্ষুর বিষ নয়সে এখন এক দায়িত্বশীল পিতা, এক অনুগত স্বামী, আর এক সফল ঘরজামাই।

পুত্র সন্তানকে কোলে লইয়া মুক্তা তাহার পত্নী মনু বেগমসহ নিজ গ্রামে গমন করিল। প্রায় দুই বৎসর হইল সে নিজ গ্রামে পদার্পণ করে নাই। বাড়িতে আসিয়া মুক্তার জননী যেন পুত্রবধূ নাতিকে পাইয়া আকাশের চাঁদ লাভ করিলেন। নাতির মুখ দেখিতে দেখিতে তাহার চক্ষু আনন্দাশ্রুতে ভিজিয়া গেল।

এদিকে মনু বেগম আসিয়া জানতে পারিলেন যে, মুক্তার ভাসুর চাচা-শ্বশুর মিলিয়া অল্প অল্প করিয়া পারিবারিক সম্পত্তি বিক্রয় করিয়া চলিতেছে। এই সংবাদ তিনি মুক্তাকে জানাইলেও মুক্তা তাহাতে কর্ণপাত করিল না। সে নিশ্চুপ হইয়া বাড়ির পেছনের চাতালে দাঁড়াইয়া দূরের পুকুরপারের প্রাচীন বটবৃক্ষটির দিকে স্থিরদৃষ্টিতে চাহিয়া থাকিল।

সেই রাতেই মুক্তাকে আর কোথাও খুঁজিয়া পাওয়া গেল না।

পনেরো দিন পরে, মুক্তা হঠাৎ করিয়া তাহার শ্বশুরালয়ে উপস্থিত হইল। এই সময়ের মধ্যে মনু ধীরে ধীরে অনুধাবন করিতে লাগিলেন যে, তাহার স্বামীর উপর যেন পুনরায় অশরীরী কোনো সত্তার প্রভাব পড়িয়াছে। যেহেতু মনুর ইহা দ্বিতীয় বিবাহ এবং সমাজের নানাবিধ কটূক্তির আশঙ্কা রহিয়াছে, তাই তিনিও আর এই সম্পর্কের অবনতি ঘটাইলেন না।

মুক্তার এই আকস্মিক নিখোঁজ হইবার কারণে তাহার সম্মানজনক চাকরিটিও হাতছাড়া হইয়া গেল। ফলে, উভয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিল যে, আর শ্বশুরালয়েই অবস্থান করিবে। সংসারের হাল ধরিবার জন্য মুক্তা রাজমিস্ত্রির কাজে নিযুক্ত হইল। জীবিকার তাগিদে সে এখন দিনান্ত পরিশ্রম করিতেছে।মুক্তার রাজমিস্ত্রির কর্ম ছিল গ্রাম-গঞ্জে সেই সময় নবনির্মিত কালভাট ক্ষুদ্র সেতু নির্মাণ করিয়া দিবার। ফলে তাহার কর্মস্থল এক জেলার সীমায় আবদ্ধ ছিল না; বরং তাহাকে বিভিন্ন জেলায় জেলায় ঘুরিয়া ফিরিতে হইত। এই সুবাদে সে এক জনৈক সরকারি কন্ট্রাকটারের সহিত সুসম্পর্ক স্থাপন করিল। উক্ত কন্ট্রাকটারের সঙ্গে মুক্তার খাতির এমন এক পর্যায়ে পৌঁছিল যে, উভয়ে একত্রে বিভিন্ন জেলায় সরকারি নির্মাণ কার্য করিতে লাগিল।

এভাবেই দেশব্যাপী কাজের প্রয়োজনে মুক্তা এক জেলা হইতে আরেক জেলায় ভ্রমণ করিতে লাগিল। এই সময়ে মনু বেগম গর্ভবতী হইলেন। সংবাদ পাইয়া স্ত্রীকে নিয়মিত চিঠি মারফত খোঁজখবর লইয়া মুক্তা গর্ভধারণের মাস সম্ভাব্য প্রসবতারিখ অনুমান করিল।

নির্ধারিত সময় নিকটে আসিলে, মুক্তা তাহার সকল কাজ সাময়িকভাবে স্থগিত রাখিয়া ছুটি লইল। স্ত্রীকে সেবাশুশ্রূষা করিবার উদ্দেশ্যে সে শ্বশুরালয়ে প্রত্যাবর্তন করিল। কারণ, ইহাই ছিল তাহার পত্নীর প্রসবকাল, আর মুক্তার একান্ত আকাঙ্ক্ষা ছিল সন্তান জন্মের সময় সে নিজে উপস্থিত থাকিবে।


নিশুতি রজনী। আকাশ জুড়িয়া বিরাজমান এক মস্তবড়ো জ্যোৎস্না, যেন দিগন্ত জোড়া রূপোর থালায় ঢালিয়া দিয়েছে ঈশ্বর। সেই জ্যোৎস্নার আলোয় গ্রামের প্রতিটি প্রান্ত নিস্তব্ধ অথচ আলোকিত। মাটির ঘরের জানালার ফাঁক গলিয়া একটুকরো কুপি বাতির আলো টিপ টিপ করিয়া জ্বলিতেছে। হালকা বাতাসের দোলায় তার শিখা দুলিতেছে; কিন্তু তবুও, সেই কুপি বাতি যেন আপন অস্তিত্বের বার্তা দিবার চেষ্টা করিতেছে, বলিতেছে—"আমি আছি।"

এমন সময় হঠাৎ করিয়া ঘর অন্ধকার বিদীর্ণ করিয়া এক হৃদয়বিদারক চিৎকার ভেসে আসিল—" মা গো!"
সেই আহ্বান যেন ভোররাতের আযানের মতো সবার নিদ্রাভঙ্গ ঘটাইল। বাড়ির প্রতিটি কক্ষের দরজা একে একে খুলিল, সকলে ছুটে চলিল মাটির সেই ঘরের দিকে। মনু বেগম প্রসববেদনায় ছটফট করিতেছিলেন; ব্যথায় তাঁর আর্তনাদ বাতাসকেও ভারাক্রান্ত করিল। গহের প্রবীণ নারীগণ তাড়াতাড়ি ঘরে প্রবেশ করিয়া দরজা বন্ধ করিলেন। ঘরের বাহিরে, উঠোনে, মুক্তা তাহার বড় ছেলেটিকে কোলে লইয়া উদবিগ্ন পায়চারি করিতে লাগিল। বাকিরা বাড়ির আঙিনায় দাঁড়াইয়া আল্লাহর দরবারে হাত তুলিয়া মোনাজাতে মগ্ন হইল। বাতাসে শুধুই প্রার্থনার ধ্বনি আর দুলতে থাকা পাতার শব্দ। অবশেষে, ঘর ভেদ করিয়া একটি আকাশ ফাটানো কান্না ছড়াইয়া পড়িল চারিদিকে। জ্যোৎস্নার রূপালী আলোয় আশীর্বাদস্বরূপ জন্ম লইল এক নবজাতক পুত্রসন্তান।

মুক্তা, তাহার পিতা আমজাদ সরকারের ন্যায়, মনে মনে আকাঙ্ক্ষা করিয়াছিলেনদ্বিতীয় সন্তান যেন কন্যা হয়। সেই আশায়, সন্তানের নাম পূর্ব হতেই মনের গহীনে স্থির করিয়া রাখিয়াছিলেন—"শিমু"

কিন্তু নিয়তির লিখন কে পরিবর্তন করিতে পারে? মনু বেগম, যিনি এক সন্তানের জননী পূর্বেও ছিলেন, আবারো পুত্র সন্তানের জন্ম দিলেন। এই নিয়ে তাহার দুই ঘরেই দুই পুত্র। কন্যা সন্তানের আকাঙ্ক্ষায় তিনি বিভিন্ন দরগাহে মানত করিয়াছিলেন, আগরবাতি দিয়া সিন্নি দান করিয়াছিলেন। তবু ঈশ্বর যেন কানে তুলিলেন না তাহার আকুল আবেদন।

সন্তানের জন্ম আনন্দের হইবার কথা থাকিলেও, এই ঘরে আজ কারো মুখে হাঁসির রেখা দেখা গেল না। দৃষ্টি নামিল মাটির দিকে, মুখে ছায়া পড়িল বিষাদের। একে একে তিনটি পুত্র সন্তানপ্রত্যাশিত না হইবার কারণে সমাজ-সংসারের এক অলিখিত ভার যেন নেমে আসিল মুক্তা মনুর জীবনে।পুনরায় পুত্রসন্তানের জন্ম হইয়াছে, তবু তাহার নাম রাখা হইল "শিমু" আসল নাম "সীমান্ত সরকার" তবে আদরে, মমতায়, কিংবা অবহেলায়গ্রামের লোকেরা তাহাকে শিমু বলিয়াই ডাকিতে অভ্যস্ত হইল।সীমান্তের জন্ম ছিল যেন এক নিঃশব্দ প্রতিবাদপ্রতীক্ষিত কন্যার পরিবর্তে আরও একটি পুত্রসন্তান। সেই ক্ষীণ অভিমানের রেখা বাহ্যিক আচরণে নাও ফুটিতে পারে, কিন্তু হৃদয়ের অন্তঃস্থলে তার ছায়া ঠিকই রহিল। মনোয়ারা বেগম, মনুর প্রথম সংসারের সন্তানকে অধিক স্নেহে রাখিতেন। তাহার কোলের প্রথম আলোসেই সন্তানই যেন ছিল হৃদয়ের রাজপুত্র। অপরদিকে, মুক্তা সরকার তাহার প্রথম পুত্র বাপ্পিকে লইয়াই অধিক আশাবাদী। ছোট্ট সেই মুখখানির মধ্যেই সে তাহার নিজের শৈশবের প্রতিবিম্ব দেখিত।

সীমান্তসে ছিল সংসারের তৃতীয় সন্তান, যেন কোনো ব্যস্ত দিনে লেখা ভুলে যাওয়া একটি পঙক্তি। যাহারা তাহাকে একেবারেই অবজ্ঞা করিত, এমন কথা বলা ঠিক হইবে না। হাজার হলেও সে সন্তানমুক্তার রক্ত, মনুর ধ্যান। তবে তুলনার দাঁড়িপাল্লায় সে বরাবরই হালকা হইয়া পড়িত।

প্রতিটি পরিবারে, যেখানে একাধিক সন্তান রহিয়াছে, সেখানেই গোপন একটি সত্য লুকায়িত থাকে—"আমরা সবাইকে সমান ভালোবাসি" এই কথাটির অন্তরে এক মৃদু ব্যতিক্রম থাকে। সন্তানেরা সংখ্যায় যত বাড়ে, পিতামাতার ভালোবাসার মানচিত্র তত বিভক্ত হইয়া পড়ে। কারো প্রতি টান অধিক, কারো প্রতি নিরাসক্তি একটু বেশি।

যে ঘরে অনেক সন্তান, সেখানে একজন হয় মাতার প্রিয়, আরেকজন পিতার। বাকিরা ধীরে ধীরে গৃহের কোণায় গিয়া পড়ে, প্রাপ্ত হয় স্বীকৃতি নয়সহানুভূতি। আমজাদ সরকারের স্ত্রীর নিকট সর্বাধিক আদরের ছিল তাহার প্রথম নাতি, মুক্তার প্রথম সন্তান বাপ্পি। তাহার দোলায়, তাহার খেলার সাথী হইয়া উঠিতে উঠিতে সীমান্ত যেন এক নিঃসঙ্গ দর্শকে পরিণত হইল।

শিমু, বা সীমান্তসে হইল সেই শিশু, যাহার শৈশবে না ছিল অধিক আদর, না ছিল অধিক শাসন। ছিল কেবল এক নিঃশব্দ গ্রহণযোগ্যতা। যাহা বলে—"তুই আছিস, তাই ভালোবাসি। তবে তোকে নিয়া স্বপ্ন দেখি না।





Comments

Popular posts from this blog

ফারাওয়ের অভিশাপ

মৃতের নিশ্বাস