ফারাওয়ের অভিশাপ
সেই হাজার বছর আগের কথা। যখন মরুভূমির বালুঝড়ে রাজাদের পদচিহ্ন মুছে যেত, তখন মিশরের ফারাওরা বিশ্বাস করতেন মৃত্যুর পরের জীবনে। তারা মনে করতেন, মৃত্যু মানে শেষ নয়, বরং এক অনন্ত যাত্রার শুরু। আর সেই যাত্রায় নিজের দেহকে অক্ষত রাখতে তারা মমি তৈরি করতেন। লিনেন কাপড়ের ব্যান্ডেজ আর দুর্লভ সুগন্ধি মশলায় জড়িয়ে ফারাওদের রাখা হতো এক অন্ধকার প্রকোষ্ঠে, যা মাটির গভীরে লুকানো থাকত।
প্রথমে তারা শরীরের ভেতর থেকে পচনশীল অংশগুলো (নাড়িভুঁড়ি, লিভার, ফুসফুস) বের করে ফেলত। মজার ব্যাপার হলো, তারা হৃৎপিণ্ডটা শরীরের ভেতরেই রেখে দিত, কারণ তারা মনে করত এখানেই মানুষের বুদ্ধি আর আত্মা থাকে। আর মস্তিষ্ক বের করা হতো নাক দিয়ে লম্বা হুক ঢুকিয়ে! এরপর শরীরটাকে 'ন্যাট্রন' (এক ধরণের লবণ) দিয়ে ৪০ দিন ঢেকে রাখা হতো যাতে শরীরের সব পানি শুকিয়ে যায়। শরীরটা একদম শুঁটকির মতো হয়ে যেত। শুকিয়ে যাওয়ার পর শরীরটাকে দামী লিনেন কাপড় দিয়ে কয়েকশ গজ পেঁচিয়ে মমি বানানো হতো। এই ব্যান্ডেজের ভাঁজে ভাঁজে তারা বিভিন্ন মন্ত্র লেখা কবচ গুঁজে দিত।
সব মমিই কিন্তু মানুষ বানাত না। মিশরের মরুভূমির বালু এত গরম আর শুকনো ছিল যে, কোনো মৃতদেহ সেখানে পুঁতে রাখলে শরীরের সব পানি বালু শুষে নিত। ফলে প্রাকৃতিকভাবেই শরীর মমি হয়ে যেত। এটা দেখেই প্রাচীন মিশরীয়রা পরে কৃত্রিমভাবে মমি বানানো শুরু করে। প্রাচীনকালে শুরুর দিকে ফারাও মরলে তার স্ত্রী বা দাসীদের জীবন্ত কবর দেওয়ার প্রথা থাকলেও পরে তা বন্ধ হয়ে যায়। অনেক সময় ফারাওয়ের প্রিয় দাসীদের মমি করে আলাদা কামরায় রাখা হতো যাতে তারা পরকালেও সেবা করতে পারে। বুকের ওপর বিশাল সোনার অলঙ্কার থাকতো। আঙুলে এবং হাতে সোনার তৈরি সাপের মতো পেঁচানো আংটি ও বালা।
কার্টার ছিল এক একগুঁয়ে কিসিমের লোক। প্রথাগত পড়াশোনা তার ছিল না, কিন্তু হাতের কাজে ছিল জাদু। ১৭ বছর বয়সে যখন সে প্রথম মিশরে আসে, তখন সে ছিল শুধু একজন সাধারণ শিল্পী পুরানো দেয়ালের ছবি নকল করে আঁকাই ছিল তার কাজ। কিন্তু বালুর নিচে লুকিয়ে থাকা হাজার বছরের পুরনো গন্ধে তার নেশা চড়ে যায়। সে হয়ে ওঠে এক খ্যাপাটে প্রত্নতাত্ত্বিক। একবার এক ফরাসি টুরিস্টের সাথে মারামারি করে চাকরি খুইয়ে সে কায়রোর রাস্তায় রাস্তায় নিজের আঁকা ছবি বেঁচে দিন পার করেছে।
লর্ড কার্নারভন ছিলেন ইংল্যান্ডের এক বিশাল বড়লোক, যার টাকা ওড়ানোর শখ ছিল। কার্টার তাকে বুঝিয়ে রাজি করালেন যে, মিশরের 'ভ্যালি অফ দ্য কিংস এ এখনো এমন এক রাজার কবর আছে যা কেউ কোনোদিন ছুঁতে পারেনি সে হলো ফারাও তুতানখামেন। কার্নারভন বছরের পর বছর টাকা ঢাললেন, কিন্তু কার্টার কিছুই পেলেন না। সবাই বলতে লাগল, কার্টার একটা পাগল, বালুর নিচে ও সোনা খুঁজছে না, নিজের কবর খুঁড়ছে।
১৯২২ সালের অক্টোবর মাসে কার্নারভন কার্টারকে ডেকে পাঠালেন। সোজা বলে দিলেন, অনেক হয়েছে, আর এক পয়সাও পাবা না। সব প্যাক করো, লন্ডনে ফিরে আসো। কার্টার তখন জান দিয়ে লর্ডকে অনুরোধ করলেন, আর একটা মাস সময় দেন, দরকার হলে নিজের পকেট থেকে টাকা দিয়ে খনন করব। রাজি হলেন লর্ড। শুরু হলো জীবনের শেষ বাজি। ৪ নভেম্বর সকালবেলা। খননকাজে পানি সরবরাহ করে এমন একটা ছোট ছেলে এক জায়গায় পানির কলস রাখার জন্য গর্ত খুঁড়ছিল। হঠাৎ তার কোদাল ঠকাস করে একটা পাথরের গায়ে লাগল। সে চিৎকার করে কার্টারকে ডাকল। কার্টার দৌড়ে গিয়ে পাগলের মতো হাত দিয়ে বালু সরাতে লাগলেন। দেখলেন, ওটা আসলে একটা সিঁড়ি! একে একে ১৬টি সিঁড়ি নিচ দিয়ে নেমে গেছে এক বিশাল পাথরের দরজার দিকে। কার্টারের বুক তখন দপ দপ করছে। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে তিনি দেখলেন দরজায় রাজকীয় সিল মারা। তার মানে, চোর-ডাকাতরা এখনো এখানে ঢুকতে পারেনি! ৩০০০ বছর ধরে এই দরজা কেউ খোলেনি। কার্টার তখনই কার্নারভনকে কায়রো থেকে আসার জন্য টেলিগ্রাম পাঠালেন। লর্ড না আসা পর্যন্ত কার্টার সেই দরজার সামনে দিনরাত বসে পাহারা দিচ্ছিলেন।
২৫ নভেম্বর লর্ড কার্নারভন আসলেন। ২৬ নভেম্বর বিকেলের দিকে কার্টার সেই দরজার ওপরের দিকে ছোট্ট একটা ফুটো করলেন। ভেতরের হাজার বছরের পুরনো গরম হাওয়া আর গন্ধ তার নাকে ঝাপটা দিল। হাত কাঁপছিল কার্টারের, তিনি একটা মোমবাতি সেই ফুটো দিয়ে ভেতরে ঢোকালেন। বাইরে তখন লর্ড কার্নারভন উত্তেজনায় কাঁপছেন। তিনি চিৎকার করে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি কিছু দেখতে পাচ্ছো?
কার্টার কিছুক্ষণ থমকে রইলেন। মোমবাতির শিখায় ভেতর থেকে সোনার ঝিলিক তার চোখে পড়ল। তিনি শুধু ফিসফিস করে বললেন, হ্যাঁ, অপূর্ব সব জিনিস!
ভেতরে ছিল সোনার রথ, সিংহাসন, অদ্ভুত সব মূর্তি আর পাহাড় সমান ধনসম্পদ। কিন্তু তখনও কেউ জানত না, ওই সোনার স্তূপের নিচে যে মমিটা শুয়ে আছে, সে তার শান্তি ভঙ্গ করার বদলে একে একে সবার জীবনের হিসেব চুকিয়ে দেবে।
হাওয়ার্ড কার্টার যখন সেই পাথরের দরজার সামনে দাঁড়ালেন, তখন তার টর্চের আলোয় ধুলোমাখা দেয়ালে খোদাই করা কিছু অস্পষ্ট লিপি ভেসে উঠল। স্থানীয় গাইডরা ভয়ে পিছিয়ে যাচ্ছিল, কারণ সেই লিপির অর্থ ছিল ভয়াবহ। দরজার ঠিক ওপরেই অভিশাপের সেই অমোঘ বাণী খোদাই করা ছিল:
Death shall come on swift wings to him who disturbs the peace of the King. অর্থাৎ: যে ব্যক্তি রাজার এই অনন্ত শান্তিতে বিঘ্ন ঘটাবে, মৃত্যু তাকে দ্রুত ডানায় ভর করে গ্রাস করবে।
কার্টার ছিলেন জেদি মানুষ, তিনি এসব 'সেকেলে ভয়'কে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিলেন। কিন্তু ঘটনার সূত্রপাত হলো ঠিক সেই দিন থেকেই।
কার্টারের সাথে একটা ছোট্ট হলুদ ক্যানারি পাখি ছিল, যেটা তিনি খুব শখ করে খাঁচায় পুষতেন। যেদিন কবরের প্রথম ধাপটি আবিষ্কৃত হলো, সেদিন বিকেলে কার্টারের বাড়ির ভেতর একটি জ্যান্ত কোবরা সাপ ঢুকে পড়ে এবং খাঁচার ভেতরে থাকা সেই পাখিটিকে গিলে ফেলে। মিশরীয়দের কাছে কোবরা হলো ফারাওদের রক্ষক। স্থানীয় শ্রমিকরা ফিসফিস করে বলতে লাগল, রাজার অভিশাপ শুরু হয়ে গেছে, তিনি তার রক্ষককে পাঠিয়েছেন প্রথম সংকেত দিতে।
১৯২৩ সালের ৫ এপ্রিল। কায়রোর কন্টিনেন্টাল হোটেল। লর্ড কার্নারভন তখন জ্বরে প্রলাপ বকছেন। তার শরীর বিষিয়ে গেছে এক সামান্য মশার কামড়ে। মৃত্যুর ঠিক আগ মুহূর্তে তিনি চিৎকার করে বলে উঠলেন, আমি শেষ! আমি রাজার ডাক শুনতে পাচ্ছি... তিনি আমাকে ডাকছেন!
ঠিক যে সেকেন্ডে লর্ড কার্নারভন শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন, ঠিক সেই মুহূর্তে পুরো কায়রো শহর ব্ল্যাকআউট হয়ে যায়। কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি ছাড়াই পুরো শহরের বিদ্যুৎ চলে যায় কয়েক মিনিটের জন্য। ঠিক একই সময়ে হাজার মাইল দূরে ইংল্যান্ডে লর্ড কার্নারভনের প্রিয় কুকুরটি অকারণে করুণ সুরে ডেকে ওঠে এবং মারা যায়।
অভিশাপের বাণীতে লেখা ছিল ''মৃত্যু আসবে ডানায় ভর করে"। কাকতালীয়ভাবে, লর্ড কার্নারভন মারা গিয়েছিলেন এক পতঙ্গের (মশা) কামড়ে, যার ডানা আছে। এরপর একে একে আরও কয়েকজন মারা যেতে থাকেন,
অউব্রে হার্বার্ট: লর্ডের ভাই, তিনি সমাধি দেখার পর অদ্ভুত এক সংক্রমণে অন্ধ হয়ে মারা যান।
জর্জ জে গোল্ড: সমাধি দেখে ফেরার পরদিন প্রচণ্ড জ্বরে তার মৃত্যু হয়।
স্যার আর্চিবল্ড রিড: যিনি মমির এক্স-রে করেছিলেন, তিনি ইংল্যান্ডে পৌঁছানোর আগেই রহস্যজনকভাবে অসুস্থ হয়ে প্রাণ হারান।
সবচেয়ে রহস্যের বিষয় হলো, হাওয়ার্ড কার্টার যিনি নিজে কবরে ঢুকেছিলেন এবং মমিটিকে ব্যবচ্ছেদ করেছিলেন, তিনি কিন্তু তাৎক্ষণিক মারা যাননি। তবে তিনি মানসিকভাবে একা হয়ে পড়েছিলেন। তার চারপাশের সব বন্ধু আর সহকর্মী যখন একে একে মরছিল, কার্টার তখন লণ্ডনের একাকী ফ্ল্যাটে বসে থাকতেন। মানুষ তাকে ভয় পেত, তাকে "অভিশপ্ত লোক" বলে ডাকত। ১৯৩৯ সালে যখন তিনি মারা যান, তখন তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় হাতেগোনা মাত্র কয়েকজন লোক ছিল।
লোকেরা বলে, ফারাও তাকে মেরে ফেলেননি, বরং তাকে দিয়ে দুনিয়াকে দেখিয়েছেন যে তার শান্তি ভঙ্গ করলে জীবনটা কতটা বিষাদময় আর একাকী হয়ে যেতে পারে।
হাওয়ার্ড কার্টার যখন তুতানখামেনের মমি বের করেছিলেন, তখন থেকে আজ পর্যন্ত একশ বছরের বেশি সময় পার হয়ে গেছে। আমরা চাঁদে গিয়েছি, মঙ্গলে রোভার পাঠিয়েছি, কিন্তু মিশরের এই ধুলোমাখা রহস্যের জট পুরোপুরি খুলতে পারিনি।
বিজ্ঞানীরা আজও মাথা চুলকান এটা ভেবে যে, আজ থেকে সাড়ে চার হাজার বছর আগে কোনো আধুনিক ক্রেন বা চাকা ছাড়া কীভাবে কয়েক টন ওজনের পাথরগুলো নিখুঁত জ্যামিতিক হারে বসানো হয়েছিল। পিরামিডের পাথরগুলো এমনভাবে জোড়া লাগানো যে, একটি পাতলা ব্লেডও সেগুলোর মাঝখানে ঢোকানো সম্ভব নয়। আধুনিক ইঞ্জিনিয়ারিং দিয়েও হুবহু এমন কিছু বানানো আজও প্রায় অসম্ভব।
পিরামিডগুলোর অবস্থান একদম আকাশের 'ওরিয়ন' (Orion) নক্ষত্রমণ্ডলীর তিনটি তারার সাথে নিখুঁতভাবে মিলে যায়। সেই প্রাচীন মানুষরা টেলিস্কোপ ছাড়াই মহাকাশের এই মানচিত্র মাটির ওপর কীভাবে ফুটিয়ে তুলল? এর কোনো যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা বিজ্ঞানের কাছে নেই।
লর্ড কার্নারভন বা অন্যদের মৃত্যুর পেছনে বিজ্ঞান বলে প্রাচীন ছত্রাক' বা ব্যাকটেরিয়া'র কথা। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় কেন সেই ছত্রাক শুধু ওই নির্দিষ্ট লোকগুলোকেই আক্রমণ করল? কেন হাজার মাইল দূরে থাকা লর্ডের পোষা কুকুরটি ঠিক একই সময়ে মারা গেল? বিজ্ঞানের কাছে 'কাকতালীয়' শব্দটা থাকলেও, মনের কোণে খটকা থেকেই যায়।
লেজার স্ক্যানিং আর থার্মাল ইমেজিং দিয়ে পরীক্ষা করেও দেখা গেছে, পিরামিড ও রাজকীয় সমাধিগুলোর ভেতরে এখনো অনেক গোপন দরজা আর কুঠুরি রয়েছে যেগুলোর ভেতরে মানুষের পা পড়েনি। সেখানে কী আছে? কোনো নতুন অভিশাপ, নাকি মানুষের ইতিহাসের কোনো হারানো অধ্যায়?

Comments
Post a Comment