কারাগার
লেখকঃ তন্ময় চৌধুরী
আজ প্রায় ৬৩ বছর পর আমি এই অন্ধকার কারাগার থেকে মুক্ত হচ্ছি। বাইরের পরিবেশ কেমন, সে সম্পর্কে আমার কোনো ধারণাই ছিল না। এত দিন মুক্তির অপেক্ষা করতে করতে আজ আমি একেবারেই বৃদ্ধ।
গেটের বাইরে আসতেই দেখি কারাগারের সামনে অসংখ্য গাড়ি যাতায়াত করছে। আগে এই সব গাড়ি দেখার জন্য ছোটবেলায় ট্রেনে করে ঢাকাতে যেতাম। আজ কত আধুনিক গাড়ি আমার সামনে দিয়ে যাচ্ছে! পথের দু'ধারে উঁচু উঁচু দালান। মনে হচ্ছে আমি যেন ভিন্ন কোনো জগতে চলে এসেছি। কিন্তু এটা ভিন্ন জগৎ নয়, এটা আমারই জেলা, আমারই জন্মভূমি।
জেলার সাহেব আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, "মুজাম্মেল, বাইরের পরিবেশ তোমার আপন মনে নাও হতে পারে। আল্লাহর দুনিয়ায় সব সুন্দর।"
তারপর তিনি আমার পকেটে একটা খাম আর হাতে কিছু টাকা দিয়ে বললেন, "এগুলো তোমারই। জেলে যত দিন কাজ করেছো, তার একটা পারিশ্রমিক।"
১৭ বছর আগের সেই পোশাক ও হাতঘড়ি আমাকে দেওয়া হলো। এই ৬৩ বছর ধরে এগুলো জেলেই ছিল। এগুলো যে এখনো আছে, আমার ধারণাই ছিল না। শার্টটা দেখে মনে হলো হালকা টান দিলেই ছিঁড়ে যাবে। সমাজে বসবাসরত শেষ স্মৃতিগুলো হাতে নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা দিলাম।
যখন আমার বয়স সতেরো বছর ছুঁই ছুঁই, ফুটবল খেলতে গিয়ে আপন চাচাতো ভাইয়ের সাথে তর্ক বেধে যায়। এক প্রকার হাতাহাতির পর প্রচণ্ড রাগে হাতের কাছে থাকা বাঁশের এক টুকরো ফালা নিয়ে চাচাতো ভাইয়ের পেটে ঢুকিয়ে দিই। মুহূর্তেই ছটফট করতে করতে আমার চাচাতো ভাই হঠাৎ নড়াচড়া বন্ধ করে দেয়।
তারপর পুলিশ আমাকে হাতকড়া (হ্যান্ডকাফ) লাগিয়ে থানায় নিয়ে যায়।
আমার মা নেই; বাবা, মা মারা যাওয়ার পর দ্বিতীয় বিয়ে করেন। আমি জেলে যাওয়ার পর আমার বন্ধুরা মাঝে মধ্যে আমার খোঁজ নিতে এলেও, আমার বাবা কখনো দেখতে আসেননি, বা আমার মুক্তির জন্য তিনি চেষ্টাও করেননি। তিনি স্কুল মাস্টার। ছেলের এমন কাণ্ডে তিনি যে সমাজে অনেক লজ্জিত হয়েছেন, আমি তা জানি। বন্ধুরা প্রথম দুই বছর দেখতে এলেও ধীরে ধীরে তারাও আসা বন্ধ করে দিয়েছে। আজ ৬৩ বছর ধরে আমি একা।
জেলে থাকা কালীন আমি কয়েদিদের পোশাক সেলাই করেছি এবং নতুন পোশাকও বানিয়েছি। আমি স্কুলের পাশাপাশি মামার কাপড়ের দোকানে কাজ করতাম, তাই হাতের কাজ ভালো ছিল। এই কারণে জেলার আমাকে ভারি কোনো কাজ না দিয়ে এই কাজ দিয়েছিলেন।
জেলে অসংখ্য হিংস্র আসামি থাকার পরেও আমি নিজেকে সেখানে আলাদাভাবে পরিচিত করিয়েছিলাম। যখন কোনো নতুন কয়েদি জেলে আসত, পুরোনো কয়েদিরা তাদের যন্ত্রণা দিত। তাই অনেকে মার থেকে বাঁচার জন্য আমার আশ্রয়ে আসত। আমি জেলে লম্বা সময় ধরে সাজাপ্রাপ্ত আসামি হওয়ায় পুরোনো খতরনাক কয়েদিরাও আমাকে সম্মান করত। সম্মানটা ভয়ের ছিল না, তারা মন থেকেই সম্মান করত।
এই জেলের পোশাক সেলাই করে আমি ২৫ হাজার টাকা পেয়েছি।
কারাগারের বাইরে এসে একটা রিকশা নিয়ে বললাম, বিজয়পুর যেতে। রিকশাওয়ালা গ্রামটা চিনতে পারছিল না। আমি যখন আমার স্কুলের নাম বললাম, তখন সে বলল, "ও, বিজয় নগর! আচ্ছা, উঠুন।" আমি বুঝলাম না, বিজয়পুর কখন হঠাৎ করে বিজয় নগর হয়ে গেল!
গ্রামে এসে দেখি নকশা পাল্টে গেছে। পরিচিত কোনো মুখ নেই। সেই পুরোনো বটগাছটা-ই শুধু আছে, আর কিছুই নেই। পুকুর নেই, পুকুরের জায়গায় দশ তলা ভবন। ধানের জমি নেই, সেখানে অসংখ্য বাড়িঘর। ৬৩ বছর পর পরিবেশ পাল্টাবে, এটা স্বাভাবিক; তবে এতটা পাল্টেছে তা বুঝতে পারিনি।
অনেক খোঁজাখুঁজির পর নিজের বাড়ি খুঁজে পেলাম। আমাদের টিনের যে চারতলা বাড়িটা ছিল, সেটা আজ নেই। সেখানে এখন দোতলা একটা বাড়ি।
গেটে ঠক ঠক করতে ২১ বছরের একটা মেয়ে গেট খুলল। সে আমার পরিচয় জিজ্ঞেস করতে আমি আমার নাম বললাম। সে চিনল না। আমি আমার বাবার নাম বললাম, যে আমি উনার ছেলে। মেয়েটা হা করে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর আমাকে ভেতরে আসতে বলল। আমি ভেতরে গিয়ে নরম একটা চেয়ারে বসলাম।
এক জন বয়স্ক মহিলা আমার সামনে এলেন। তিনি এসে পরিচয় দিলেন, "আপনি আমার ছোট ভাইয়ের স্ত্রী।" আর এই ২১ বছরের মেয়েটি আমার ছোট ভাইয়ের নাতনি।
বাবার কথা জানতে চাইলাম। তিনি বললেন, "আপনার বাবা বহু বছর আগেই মারা গেছেন।" মারা যাওয়াটাই স্বাভাবিক। কারণ এখন আমার বয়স আশি ছুঁই ছুঁই।
ভাইয়ের কথা জিজ্ঞেস করতে মহিলার মনটা ভারী হয়ে গেল। ভাই আজ থেকে দশ বছর আগে মারা গেছেন।
ভাইয়ের পুত্রবধূ এসে বললেন, "আপনি কি জমি নিতে এসেছেন?"
আমি বললাম, "এই বুড়ো বয়সে আমি সম্পদ দিয়ে কী-ই বা করব? এত বছর জেলে ছিলাম, এখন আমার জেল থেকে মুক্তি হলো, তাই বাড়ি ফিরে এলাম। কিন্তু বাড়িতে কার কাছে ফিরলাম? এখানে তো আমার কেউ নেই।"
আমার ভাইয়ের স্ত্রী বললেন, "আপনার কথা শুনেছিলাম, যে খুনের দায়ে আপনি জেলে সাজাপ্রাপ্ত। আপনি জীবিত আছেন না মৃত, তা আমরা জানি না, কখনো জানতেও চাইনি। মাফ করবেন। আপনি সম্পর্কে আমার ভাসুর হলেও, আপনাকে আমরা পরিবারে আপন করে নিতে পারছি না।"
তারপর সেই বাসা থেকে ধীর পায়ে বের হয়ে গেলাম। পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখি নিজের বাড়িতে অপরিচিত মুখ। ২১ বছর বয়সী ভাইয়ের নাতনিটা আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। আজ নিজ বাড়ি থেকেই চলে যেতে হচ্ছে। সময়ের পরিমাপে আজ নিজের বাড়িও পর হয়ে গেছে। আমি তাদের কাছে একজন আগতুক মাত্র, এই বাড়ির উত্তরাধিকারী নই।
কিছু দূর হাঁটতেই ছোট ভাইয়ের নাতনি আমার কাছে ছুটে এসে বলল, "আপনি এখন কোথায় যাবেন?"
আমি বললাম, "যেখানে যাওয়ার জায়গা ছিল, সেখানেই আশ্রয় হলো না। আর যাবই বা কোথায়?"
নাতনি বলল, "আপনি দেখতে ঠিক আমার দাদুর মতো।"
আমি বললাম, "দাদুই তো হই। আমার তো সন্তান নেই। উত্তরাধিকার হিসেবে তোমাকেই দেখলাম।"
কেট থেকে খামে ভরা ২৫ হাজার টাকা নাতনির হাতে দিয়ে বললাম, "এই টাকাটা তোমার কাছেই রাখো। ৬০ বছর জেলে পরিশ্রম করে এই টাকা জমিয়েছি।"
নাতনিটা জানতে চাইল, "আমি কি আপনার আশ্রয়ের ব্যবস্থা করতে পারি?"
আমি বললাম, "না।"
তারপর মেয়েটার কপালে চুমু দিয়ে আমার পুরোনো বন্ধুদের খোঁজ করতে লাগলাম।
আমার পরিচিত কেউ জীবিত ছিল না। বন্ধুরাও মারা গেছে, আর যে একজন বন্ধু জীবিত ছিল, সেও বিছানায় পড়ে আছে। আমাকে চিনতে পারল না। খুনের ঘটনা বললাম, তবুও সে চিনল না। বলল, জীবনে অনেক বন্ধু তার এসেছে, সবার কথা মনে নেই।
তারপর তার বিছানা থেকে উঠে যখন দরজা দিয়ে বের হবো, সে পেছন থেকে ডাক দিয়ে বলল, "মোজাম্মেল, কিছুটা তোমার কথা মনে আছে, তবে তা ঝাপসা। বয়স হয়ে গেছে, স্মৃতিশক্তি কাজ করে না। জানতাম না তোমাকে আবারও দেখতে পাব।"
র বাসা থেকে বের হয়ে রেলস্টেশনে গেলাম। ১৭ বছর বয়সে খুনের দায়ে জেল হলো। বিয়ে, নারীর স্পর্শ, সন্তান, পরিবার—কিছুই পেলাম না। পেলাম শুধু একটা অভিশপ্ত জীবন। এত বছর ধরে চেয়েছিলাম মুক্তির আশা। মুক্তি আর স্বাধীনতা যে এমন তিক্ত হতে পারে, তা জানতাম না।
পরিবার নেই, বন্ধু নেই—কার কাছে ফিরে এসেছি জেল থেকে? এতগুলো বছর কোন মুক্তির আশায় আমি জেলে দিন গুনেছিলাম?
রেল লাইনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছি, শেষ গন্তব্যের আশায়।

Comments
Post a Comment