ম্যাডাম I Love You
Shimanto Sarkar
সেদিন সকালটা আর পাঁচটা সকালের মতো ছিল না। প্রকৃতি যেন জানান দিচ্ছিল, স্থবির জীবনে কোনো বড় পরিবর্তন আসছে। হঠাৎ এক গভীর ও প্রলয়ংকরী কম্পনে কেঁপে উঠল পুরো বাড়ি। জানলার কাচগুলো আর্তনাদ করে উঠল, আর ছাদের ফ্যানটা দুলতে দুলতে যেন খুলে পড়ার উপক্রম হলো। সারা পাড়া জুড়ে একযোগে শত মানুষের কণ্ঠে ধ্বনিত হলো-"লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ"।
ভূমিকম্পের সেই আতঙ্ক মুহূর্তেই পরিবেশটাকে থমথমে করে দিল। কাঁপুনী থামল ঠিকই, কিন্তু সায়লার মনের ভেতর যে কাঁপুনী শুরু হলো, তা যেন থামার নামই নিচ্ছিল না। রাতের খাবার টেবিলে মা জুলেখা বানু চুপচাপ বসে ছিলেন কিছুক্ষণ। তারপর সায়লার পাতে এক টুকরো মাছ তুলে দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
"মা সায়লা, আজ যখন মাটি কেঁপে উঠল, মনে হলো দুনিয়াটা বুঝি শেষ হয়ে যাবে। আমি তো বুড়ো হয়েছি, আমার সময় ঘনিয়ে আসছে। কিন্তু তুই? এভাবে আর কতদিন একা কাটাবি মা?"
সায়লা মাথা নিচু করে ভাতের লোকমা মুখে দিতে গিয়েও থেমে গেল। জুলেখা বানু থামলেন না, গলায় আকুতি নিয়ে বললেন,
"নিজের একটা গতি করে নে। এই বয়সে এসে আর তোকে নিয়ে দুশ্চিন্তা সইতে পারছি না। মরার আগে অন্তত এটা দেখে যেতে চাই যে, তোর পাশে কেউ একজন আছে। চোখের সামনে তোর একটা হিল্লে দেখে গেলে শান্তি পেতাম।"
সায়লার কানে কথাগুলো যেন পাথরের মতো বাজছিল। স্বামী হারানোর পর তার পৃথিবীর সব রঙ এক নিমেষে ছাই হয়ে গিয়েছিল। এক বুক শূন্যতা নিয়ে সে বাকি জীবনটা একাই কাটিয়ে দেওয়ার শপথ করেছিল মনে মনে। কিন্তু মাঝেমধ্যে নিঝুম রাতে নিজের নিঃসঙ্গতা যখন দেয়াল হয়ে তাকে চারপাশ থেকে চেপে ধরে, তখন সে টের পায় রক্ত-মাংসের শরীরটা এখনো বেঁচে আছে, আছে তার আদিম কিছু দাবিও। পরদিন সকালে একরাশ দ্বিধা আর মায়ের সেই অনুরোধের ভার বুকে নিয়ে সায়লা তৈরি হলো। কাঁধে ব্যাগটা ঝুলিয়ে যখন সে অফিসের দিকে রওনা দিল, তখন ভোরের হালকা কুয়াশায় সে খুঁজছিল এক নতুন দিগন্ত। তার এই একাকী পথে কি আজ নতুন কারো ছায়া পড়বে?
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সায়লা আজ অনেকক্ষণ নিজেকে দেখল। পঁয়ত্রিশ বছর বয়স উথাল-পাথাল যৌবনের সেই উদ্ধত রূপ এখন অনেকখানি শান্ত, কিন্তু ম্লান নয়। একসময় নিজের রূপের দাপটে সে নিজেই মুগ্ধ থাকতো, যেন এক রাজকুমারী। কিন্তু স্বামীর অকালপ্রয়াণ সায়লার জীবন থেকে শুধু মানুষটাকেই কেড়ে নেয়নি, কেড়ে নিয়েছিল তার নিজের প্রতি যত্নটুকুও। ড্রেসিং টেবিলের কোণে ধুলো জমা লিপস্টিক আর কাজলের কৌটাগুলো এখন সায়লার কাছে অর্থহীন প্রত্নবস্তু মাত্র।
প্রতিদিন সেই একই চেনা রুটিন বৃদ্ধ মা, চঞ্চল ভাতিজি আর কাজের মেয়ের আসা-যাওয়ার মাঝে সায়লার জীবনটা যেন একটা যান্ত্রিক ঘড়ি হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেই রঙহীন একঘেয়েমিতে হঠাৎ একদিন একটা দমকা হাওয়া হয়ে এলো ফেসবুকের একটি পোস্ট।
"পাত্রী চাই।"
ছোট্ট একটা পোস্ট, কিন্তু সাথে থাকা তথ্যগুলো সায়লার হৃদপিণ্ডে এক অদ্ভুত কম্পন তুলল। পাত্রের একটি ছোট সন্তান আছে। সায়লার মাতৃত্বের সুপ্ত আকাঙ্ক্ষা আর একাকীত্বের হাহাকার মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল এক মুহূর্তে। নিজের অজান্তেই সে পাঠিয়ে দিল একটি ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট। ওপারের মানুষটিও দেরি করেনি, যেন সে-ও অপেক্ষাতেই ছিল।
শুরুটা হয়েছিল সৌজন্যমূলক আলাপ দিয়ে। বিয়ের কথা উঠল, কিন্তু হোঁচট খেতে হলো বয়সের পাতায় এসে। ছেলেটির বয়স মাত্র উনত্রিশ। সায়লার চেয়ে ছয় বছরের ছোট! এই ছয় বছরের ব্যবধান সমাজের চোখে হয়তো এক দুর্লভ প্রাচীর। সায়লা ভাবল, এখানেই বোধহয় ইতি। কিন্তু সম্পর্কের সুতোগুলো তো অন্যভাবে লেখা ছিল। বিয়ে নিয়ে কথা না এগোলেও তাদের মাঝে গড়ে উঠল এক নিবিড় বন্ধুত্ব। ছেলেটার নাম আবির। আবিরের সাথে কথা বললে সায়লার একবারও মনে হয় না যে সে বয়সে ছোট। ওর প্রতিটি শব্দে এক ধরনের স্থিরতা আর দায়িত্ববোধ মিশে আছে। সবচাইতে বেশি সায়লার মন ছুঁয়ে গেল যখন সে শুনল আবিরের বাবা-মা নেই, আর সে একটি ছোট্ট মেয়েকে দত্তক নিয়েছে। মেয়ের প্রতি আবিরের এই অকৃত্রিম মমতা আর একাকী লড়াই দেখে সায়লার মনের ভেতরে এক শীতল মায়ার জন্ম নিলো। সে বুঝতে পারল, এই মায়া কেবল বন্ধুত্বের নয়; এর আড়ালে কোথাও একটা ভালোলাগা তার ডালপালা মেলছে। বয়সটা কি সত্যিই এই ভালোলাগার পথে বিশাল কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াবে?
দিনগুলো কাটছিল এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্য দিয়ে। ফোনের ওপাশে প্রতিদিন জমে উঠত অজস্র কথা—স্বপ্ন, অভিযোগ আর ভালোবাসার আলতো ছোঁয়া। মুখে কেউ কাউকেই ‘প্রেমিক-প্রেমিকা’ বলে স্বীকার করেনি, কিন্তু তাদের দুজনের সম্পর্কে সেই অধিকারবোধ আর শাসনটুকু ছিল একদম খাঁটি প্রেমিকার মতো। সায়লা মাঝেমধ্যে অবাক হয়ে ভাবত, উনত্রিশ বছরের এক যুবক কীভাবে তার পঁয়ত্রিশ বছরের হৃদয়ে এত সহজে দখল নিল!
হঠাৎই একদিন আবিরের জীবনে ঝড় এলো। চাকরিটা হারিয়ে সে যখন দিশেহারা, তখন সায়লা স্থির থাকতে পারল না। নিজের অফিসে একজন দক্ষ কম্পিউটার অপারেটরের প্রয়োজন ছিল। সায়লা প্রস্তাব দিল, "যতদিন তোমার মনমতো কোনো ভালো সুযোগ না পাচ্ছ, অন্তত বেকার থেকো না। আমার অফিসেই কাজটা শুরু করো। এতে অন্তত তোমার নিজের হাতখরচ আর ছোট মেয়েটার দেখাশোনার ব্যবস্থাটুকু হবে।" আবির রাজি হলো। আর সেই সুবাদেই এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ—তাদের প্রথম সাক্ষাৎ। ইন্টারভিউয়ের দিন সায়লার হার্টবিট যেন তার পঁয়ত্রিশ বছরের রেকর্ড ভেঙে দিচ্ছিল। সামনাসামনি আবিরকে দেখে সায়লার মনে হলো, ছেলেটা যেন তারুণ্য আর স্থিরতার এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ।
অফিসের বিন্যাসটা এমন হলো যে, সায়লার বড় কেবিনের ঠিক এক কোণায় ছোট একটা টেবিলে আবিরের জায়গা হলো। বাইরে সবাই নিজেদের ডেস্কে ব্যস্ত, আর এই কাঁচঘেরা দেয়ালের ভেতরে সায়লা আর আবির দুটি হৃদয়ের নীরব কথোপকথন। আবির যখন গভীর মনোযোগে ডেটা এন্ট্রি করে, সায়লা আড়চোখে তাকিয়ে তার তন্ময়তা দেখে। তাদের মধ্যে অফিসের কাজের চেয়েও বেশি চলে খুনসুটি আর জীবনের গভীর সব আলাপ। যখনই অফিসের কেউ কোনো ফাইল নিয়ে সায়লার কেবিনে ঢোকে, আবির মুহূর্তেই গম্ভীর হয়ে যায়। অত্যন্ত মার্জিত গলায় বলে, "ইয়েস ম্যাডাম, কাজটা প্রায় শেষ।" কিন্তু যেই না দরজার ওপাশে মানুষের ছায়া মিলিয়ে যায়, আবিরের ঠোঁটে খেলে যায় এক দুষ্টু হাসির রেখা। কম্পিউটারের পর্দা থেকে চোখ না সরিয়েই ফিসফিস করে বলে ওঠে, "ম্যাডাম, আই লাভ ইউ!" সায়লার গালে তখন লাল আভা ছড়িয়ে পড়ে। সে কৃত্রিম গাম্ভীর্য নিয়ে মুচকি হেসে জবাব দেয়, "জুনিয়র, আই হেট ইউ!"
সায়লার সেই 'হেট' শব্দটার পেছনে যে কতটা লজ্জা, মায়া আর গভীর ভালোবাসা লুকিয়ে থাকে, তা বুঝতে আবিরের এক মুহূর্তও সময় লাগে না। উনত্রিশ আর পঁয়ত্রিশের এই অসম লড়াইটা যেন প্রতিদিন হার মেনে যাচ্ছিল তাদের কেবিনের নিভৃত কোণে।
অফিস শেষে সায়লা যখন আবিরকে নিজের গাড়িতে ওঠার আমন্ত্রণ জানালো, তখন আকাশটা ছিল থমথমে। সায়লা মৃদুস্বরে বলল, "আজ আমার ভাতিজির জন্মদিন। বড় কোনো আয়োজন নেই, শুধু আমি, তুমি আর আম্মু। আবির সায়লার ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই প্রকৃতি যেন বাঁধভাঙা উল্লাসে মেতে উঠল। মুষলধারে বৃষ্টি আর বিদ্যুতের তীব্র চমকানি—মুহূর্তেই পুরো শহর অন্ধকারে ডুবে গেল। মোমবাতির কম্পমান আলোয় ছোট্ট ভাতিজির কেক কাটা হলো। ডাইনিং টেবিলে রাতের খাবার শেষ করে আবির যখন বিদায় নিতে চাইল, সায়লা জানলার বাইরের প্রলয়ংকরী বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে বাধা দিল। "রাত বারোটা বাজে আবির। এই তুফানে কোনো রিকশা পাবে না। আজ রাতটা এখানেই থেকে যাও।"
ভাতিজি দাদির ঘরে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। সায়লা ড্রয়িংরুমের সোফাতেই আবিরের শোয়ার ব্যবস্থা করে দিয়ে নিজের ঘরে চলে গেল। কিন্তু ঘুম যেন আজ সায়লার দুশমন। রাত তখন ঘড়ির কাঁটায় তিনটে। হঠাৎ একটা কাচ ভাঙার শব্দে সায়লা আঁতকে উঠল। ডাইনিং রুমের জানলাটা ঝড়ের দাপটে ভেঙে গেছে, আর সেই ফাঁক দিয়ে শোঁ শোঁ শব্দে হিমেল হাওয়া ধেয়ে আসছে ঘরের ভেতর। সায়লা দরজার আড়াল থেকে দেখল, পাতলা একটা চাদর গায়ে আবির শীতে থরথর করে কাঁপছে। মায়ায় বুকটা ফেটে গেল তার। দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে ফিসফিস করে বলল, "আবির, এখানে খুব বাতাস। চলো, আমার ঘরে চলো।"
বিছানায় দুজন পাশাপাশি। ঘর অন্ধকার, শুধু জানলার বাইরে বিদ্যুতের ক্ষণিক আলোয় মাঝেমধ্যে একে অপরের মুখটা দেখা যাচ্ছে। সায়লার শরীরের ভেতর এক অদ্ভুত কাঁপুনি শুরু হলো। এটা কেবল শীতের নয়, এ এক অজানা উত্তেজনার শিহরণ। আবির পাশে শুয়েও নিরব, কিন্তু তার নিশ্বাসের তপ্ত হাওয়া সায়লার ঘাড়ে এসে লাগছে। হঠাৎ সায়লার কাঁধে আবিরের বলিষ্ঠ হাতের স্পর্শ পড়ল। সায়লা শিউরে উঠল, যেন এক ভোল্ট বিদ্যুৎ বয়ে গেল তার শিরদাঁড়া দিয়ে। আবির জানে, মেয়েদের বুক ফাটলেও মুখ ফোটে না; সায়লার এই কাঁপুনি সম্মতির এক মৌন ভাষা। আবির খুব ধীরে সায়লাকে বিছানায় শুইয়ে দিল।
বাইরে তখন বৃষ্টির উন্মাদনা, আর ঘরের ভেতর সায়লার কম্পিত ওষ্ঠাধরে আবির যখন নিজের ঠোঁট ছোঁয়াল, তখন পৃথিবীর সব নিয়ম আর বয়সের দেয়াল ধসে পড়ল। দীর্ঘদিনের একাকীত্ব আর শরীরের জমানো তৃষ্ণা এক নিমেষে আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ল। দুটি ক্ষুধার্ত শরীর একে অপরের মাঝে খুঁজে পেল পরম আশ্রয়। সেই নিঝুম রাতে মোমবাতি না থাকলেও তাদের হৃদয়ের উত্তাপ ঘরটাকে উজ্জ্বল করে তুলেছিল। সায়লার পঁয়ত্রিশ বছরের বসন্ত যেন উনত্রিশের আবিরের বাহুবন্দি হয়ে এক পূর্ণতা পেল। বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা যেন সাক্ষী রইল—ভালোবাসার কোনো বয়স নেই, শুধু আছে দুটি আত্মার তীব্র হাহাকার আর একে অপরকে বিলিয়ে দেওয়ার পরম সুখ।

Comments
Post a Comment