প্রিন্স অফ গার্লস কলেজ
লেখক: তন্ময় চৌধুরী
নোলক আকন্দ তার অ্যাডমিট কার্ডে পরীক্ষার কেন্দ্র হিসেবে একটি মহিলা কলেজের নাম দেখে অবাক হয়ে গেল। তার চোখ কপালে উঠে গেল। সে দ্রুত অধ্যক্ষের কাছে গিয়ে বিষয়টি জানাল। অধ্যক্ষ শিক্ষাবোর্ডে যোগাযোগ করলেন, কিন্তু পরীক্ষার সময় খুব কম। বোর্ডের কর্মকর্তারা পরীক্ষার কার্যক্রম নিয়ে এতটাই ব্যস্ত ছিল যে নোলকের আসন পরিবর্তনের বিষয়টি কেউ গুরুত্ব দিল না।
আসলে সমস্যাটা হয়েছিল কম্পিউটারের সার্ভারে। নোলকের অ্যাডমিট কার্ডে তার লিঙ্গ (Gender) 'Male'-এর বদলে ভুল করে 'Female' লেখা হয়েছিল। 'নোলক' নামটি পুরুষ এবং মহিলা উভয়েরই হতে পারে, তাই এই ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল।
তার জন্য আরও বড় সমস্যা ছিল পারিবারিক। নোলকের বংশে কোনো মেয়ে নেই। তার পরিবারে যেমন কোনো বোন নেই, তেমনি বংশের চাচা, মামা, খালা, ফুপু—সবার ঘরেই কেবল পুত্র সন্তান।
ছোটবেলা থেকেই নোলক ভাইদের সঙ্গে বড় হয়েছে। সে বয়েজ স্কুলে পড়েছে, এমনকি তার বর্তমান কলেজটিও ছেলেদের। জন্ম থেকে মা, খালা, চাচি ছাড়া অন্য কোনো সমবয়সী মেয়ের সঙ্গে তার মেলামেশা প্রায় নেই বললেই চলে। এমন পরিবেশে নোলকের জন্য একটি মহিলা কলেজে পরীক্ষা দেওয়া এবং সেখানকার একমাত্র পুরুষ পরীক্ষার্থী হওয়া—এই ভাবনাতেই সে হতভম্ব হয়ে পড়ল।
যাই হোক, পরীক্ষা তো আর বাদ দেওয়া যায় না। সারা বছরের পরিশ্রম। যদিও রাস্তায় কোনো মেয়ে নোলকের রাস্তা আটকে কথা বলতে চাইলে সে এতটাই নার্ভাস হয়ে যায় যে তার হাত-পা কাঁপতে থাকে। অত্যন্ত ভদ্র একটা ছেলে নোলক। বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে আড্ডাও দেয় না। পড়াশোনা আর বাবার মনিহারি দোকানে সাহায্য করা ছাড়া তার আর কোনো কাজ নেই। স্কুলে যখন তার সহপাঠীরা 'চটি গল্প' নামক যৌনতাপূর্ণ গল্প পড়ত, তখন নোলক বেঞ্চের এক কোণে বসে বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস পড়ত।
এই পরিস্থিতিতে একটি মহিলা কলেজে পরীক্ষা দিতে যাওয়া তার জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। নোলক কি পারবে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে? তার সামনে এখন কী অপেক্ষা করছে?
পরীক্ষার দিন সকালে নোলক সবকিছু প্রস্তুত করে নিল। সাদা শার্টের উপরে প্যান্ট পড়ে তার নিচে শার্ট গুঁজে ইস্ত্রি করে ইং করে ফিটফাট হয়ে নিল। মা রহিমা বেগম এসে নোলকের চুল আঁচড়ে দিলেন। ছেলের কপালে ফুঁ দিয়ে দোয়া করে দিলেন।
বাসা থেকে বের হওয়ার পর প্রতিদিন যে রিকশাওয়ালা তাকে নিতে আসে, তাকে নোলক বলল, "মামা, মহিলা কলেজে চলেন।" নোলকের মুখে এ কথা শুনে রিকশাওয়ালা বেশ অবাক হলো। নোলকের মতো একটা ছেলে মহিলা কলেজের সামনে যাবে, এটা কেমন কথা! এ ছেলে তো অনেক ভদ্র, বাকিদের মতো বাজে আড্ডা দেয় না। এমনটা ভাবতে ভাবতেই রিকশাচালক প্যাডেল ঘোরাতে শুরু করল।
টং টং বেলের শব্দে রিকশাটা মহিলা কলেজের গেটের সামনে এসে থামল। নোলকের হৃদস্পন্দন বেড়ে গেল। সামনে কী অপেক্ষা করছে, তা ভেবে সে আরও নার্ভাস হয়ে পড়ল।
নোলক যখন গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকতে যাবে, ঠিক তখনই কলেজের দারোয়ান সামনে এসে দাঁড়াল। "কোথায় যাচ্ছেন?" রুক্ষ গলায় জিজ্ঞেস করল সে, "এটা মহিলা কলেজ, এখানে প্রবেশ নিষেধ।"
নোলক কাঁপতে কাঁপতে জবাব দিল, "আমার ভেতরে কাজ আছে।" লজ্জায় সে বলতে পারছিল না যে সে একজন পরীক্ষার্থী।
দারোয়ান আবার জিজ্ঞেস করল, "কার কাছে যাবেন? নাম বলেন, আমি খোঁজ নিচ্ছি। কিন্তু ভেতরে প্রবেশ নিষেধ।"
অনেক কথা কাটাকাটির পরও নোলককে ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হলো না। বাধ্য হয়ে নোলক অ্যাডমিট কার্ড দেখিয়ে সত্যিটা বলে ফেলল। এটি দেখে দারোয়ান হো হো করে হেসে উঠল। পাশের আরেকজন দারোয়ানও কথাটা শুনে হাসতে লাগল। নোলক খুব লজ্জা পেল।
এরপর দারোয়ান কলেজের অধ্যক্ষকে ফোন করে বিষয়টি জানাল। স্বয়ং অধ্যক্ষ গেটে এলেন। নোলকের অ্যাডমিট কার্ড দেখে তিনিও অবাক। একটি ছেলের আসন এই মহিলা কলেজে পড়েছে, এমন ঘটনা তাঁর চাকরিজীবনে তিনি দেখেননি। তবুও ছেলেটির ভবিষ্যতের কথা ভেবে অধ্যক্ষ নোলককে কলেজে প্রবেশ করতে দিলেন।
নোলক অ্যাডমিট কার্ড হাতে কলেজ প্রাঙ্গণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। তাকে দেখে মহিলা কলেজের শিক্ষার্থীরা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। এমন একজন সুদর্শন যুবককে তাদের কলেজের ক্যাম্পাসে দেখে সবাই যেন থমকে গেছে। শত শত ছাত্রীর কৌতূহলী দৃষ্টি তার দিকে স্থির হয়ে আছে। নোলক অস্বস্তিতে পড়ে গেল। সে দ্রুত তার কক্ষ ও আসন খুঁজে নিয়ে সেদিকে এগিয়ে গেল।
সে কক্ষে প্রবেশ করতেই সেখানকার পরীক্ষার্থীরাও অবাক হয়ে তাকাল। তাদের ফিসফাস আলোচনা শুরু হয়ে গেল। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে লেকচারার তামিমা বেগম সবাইকে থামিয়ে দিলেন। তিনি বললেন, "নোলকের আসন এই কলেজে পড়েছে, সেও তোমাদের মতোই একজন পরীক্ষার্থী।
ক্লাসের সব মেয়ে নোলকের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। লজ্জায় ও নার্ভাসনেসে তার শরীর কাঁপছে। সে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করছে। হালকা কাশি দিয়েও দেখল, কিন্তু তার পা কাঁপা বা শরীর থেকে ঘাম ঝরা বন্ধ হচ্ছে না।
জানালার দিকে তাকাতেই তার পরিস্থিতি আরও খারাপ হলো। অন্য ক্লাসের মেয়েরাও জানালা দিয়ে উঁকি মেরে তার দিকে তাকিয়ে আছে। নোলক যেন এক চিড়িয়াখানার দুর্লভ প্রাণী, আর সবাই তাকে দেখতে এসেছে।
ঠিক তখনই এক অপরূপ সুন্দরী মেয়ে তার কাছে এসে কাঁধে হাত রাখল। মায়াবী চোখ আর মুখে মিষ্টি হাসি নিয়ে মেয়েটি জিজ্ঞেস করল, "আপনি কি নার্ভাস?"
নোলক ঘাড় ঘুরিয়ে মেয়েটির দিকে তাকাল। এই প্রথম কোনো মেয়ে তাকে স্পর্শ করল। তার শরীর দিয়ে যেন বিদ্যুতের ঝলক বয়ে গেল। এই অপরূপ সৌন্দর্যের সামনে এবং এই আকস্মিক স্পর্শের প্রতিক্রিয়ায় নোলক আকন্দ সেখানেই জ্ঞান হারাল।
নোলককে সবাই ধরাধরি করে কলেজের বারান্দার সামনের বেঞ্চে বসাল। সেই সুন্দরী মেয়েটির স্পর্শে যে নোলক জ্ঞান হারিয়েছিল, সে-ই নোলকের মাথায় পরম মমতায় পানি ঢালতে লাগল। ধীরে ধীরে নোলক কিছুটা সুস্থ বোধ করল। এদিকের পরীক্ষার সময় শুরু হতে আর মাত্র পাঁচ মিনিট বাকি।
সুন্দরী মেয়েটি হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডশেকের ভঙ্গিতে বলল, "হাই, আমি মৌমিতা।" নোলক কিছুক্ষণ মেয়েটির সুন্দর, কোমল হাতের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর কাঁপতে কাঁপতে হাত মিলিয়ে কম্পিত কণ্ঠে বলল, "নোলক আকন্দ।" এইটুকু বলে নোলক দ্রুত ক্লাসের দিকে পা বাড়াল।
ক্লাসে গিয়ে দেখল মৌমিতার আসন তার পাশেই পড়েছে। এই প্রথম কোনো একটি মেয়েকে নোলকের বেশ ভালো লেগেছে। মৌমিতার চুল থেকে আসা এক স্নিগ্ধ সুবাস পুরো কক্ষে ছড়িয়ে পড়ছে, যা নোলকের মনে এক অদ্ভুত ভালো লাগার অনুভূতি জাগিয়ে তুলল।
পরীক্ষার তিরিশ মিনিট পেরিয়ে গেছে। হঠাৎ শেষ বেঞ্চ থেকে একটি মেয়ে চিৎকার করে বলে উঠল, "এই, কারো কাছে কি প্যাড আছে? আমার পিরিয়ড শুরু হবে মনে হয়।" কথাটা শেষ না করেই সে চুপ হয়ে গেল। কারণ সে ভুলে গিয়েছিল যে তাদের এই কক্ষে একজন পুরুষ শিক্ষার্থীও আছে। বাকি মেয়েগুলোও বেশ লজ্জা পেল।
এই ঘটনা দেখে নোলকের নিজের কলেজের কথা মনে পড়ে গেল। সেখানে ছেলেরা খোলামেলাভাবে সব ধরনের কথা বলত। একদিন পারভেজ ক্লাসে স্কেল দিয়ে মজা করে ছেলেদের একটি বিশেষ অঙ্গ মাপছিল। নোলকের সহপাঠীরা সবাই মিলে তাকে জোর করে ধরে স্কেল দিয়ে মাপতে শুরু করেছিল।
ঠিক সেই মুহূর্তে অধ্যক্ষের মেয়ে ক্লাসরুমে প্রবেশ করতেই যেমন সবাই লজ্জায় পড়েছিল, আজ এই মহিলা কলেজেও একই অবস্থা। আসলে লজ্জাটা নারী ও পুরুষের মধ্যে থাকে, কিন্তু সমলিঙ্গের মানুষের মধ্যে তা খুব কমই থাকে।
এক ঘন্টা শেষ হতেই নোলকের প্রচণ্ড প্রস্রাবের চাপ দিল। সে কক্ষ থেকে বেরিয়ে বাথরুমের দিকে গেল। কিন্তু ভেতরে ঢুকতেই সে লজ্জায় পড়ে গেল। বাথরুমে সাত-আটজন মেয়ে ছিল, কেউ কেউ কাপড় ঠিক করছিল। নোলককে দেখেই সবাই চিৎকার শুরু করে দিল। ভয়ে নোলক বাথরুম থেকে দ্রুত বাইরে বেরিয়ে গেল।
মেয়েদের চিৎকারে অধ্যক্ষ ছুটে এলেন। এসেই মেয়েরা নোলকের নামে অভিযোগ করতে লাগল। নোলক ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বিষয়টি জানালে অধ্যক্ষ বুঝতে পারলেন যে ছেলেটি ভুল করে সেখানে ঢুকে পড়েছে। তিনি তাকে ডেকে নিয়ে নিজের অফিসের ব্যক্তিগত বাথরুমটি ব্যবহার করতে দিলেন এবং বললেন, "এরপর বাথরুমে গেলে আমার বাথরুমে কিংবা দারোয়ানদের বাথরুমে যাবে।"
পরীক্ষা শেষ করে নোলক বাইরে বের হতেই ছাত্রীরা তাকে প্রায় ঘিরে ধরল। অনেকে তার নাম-ঠিকানা জানতে চাইল, একজন তো সরাসরি ফোন নম্বরই চেয়ে বসল। চাইবেই না বা কেন, নোলক দেখতে যেমন সুদর্শন, তেমনই ভদ্র এবং স্মার্ট। পুরো পরীক্ষা জুড়ে মৌমিতা চুপিচুপি নোলকের খাতা দেখে হুবহু নকল করেছে।
নোলক কলেজের গেটের বাইরে আসতেই মৌমিতা জিজ্ঞেস করল, "আপনার বাসা কোথায়?"
নোলক জবাব দিল, "বকুলতলা।"
মৌমিতা বলল, "আমার বাসা বিনারীতলা, বকুলতলার আগেই।"
নোলক শুধু বলল, "ও আচ্ছা।"
একটু পর তার রিকশা আসতেই নোলক তাতে উঠল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই মৌমিতা রিকশায় উঠে নোলকের পাশে চেপে বসল। নোলক কিছু বলতে যাবে, এমন সময় মৌমিতা বলল, "একই রাস্তা দিয়ে তো যাবেন, দুজনে ভাড়া ৫০/৫০ করে নেব।" এই বলে মেয়েটি রিকশাওয়ালাকে বলল, "মামা, চলেন।"
রিকশাওয়ালা মুচকি হেসে প্যাডেল মারতে শুরু করল। নোলক এই অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতিতে হতভম্ব হয়ে গেল।
রিকশায় পাশাপাশি বসে আছে একজন পুরুষ আর একজন নারী। নোলকের মনে একটাই চিন্তা, পরিচিত কারও চোখে যেন না পড়ে। কেউ দেখলে নিশ্চিত ভুল বুঝবে। কথায় আছে না, যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেই রাত হয়।
পরিচিত আর কে দেখবে! দেখল স্বয়ং তার বাবা, আজিজ আকন্দ। পিতা-পুত্রের চোখাচোখি হলো কয়েক মুহূর্তের জন্য। বাবা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে, আর ছেলে এক সুন্দরী মেয়ের সঙ্গে রিকশায়। ভয়ে নোলকের গলা শুকিয়ে গেল।
বিনারীতলা আসতেই মৌমিতা রিকশা থেকে নেমে পড়ল। পুরো ভাড়াটা সে-ই মিটিয়ে দিল। যাওয়ার আগে নোলককে বলল, "আজ আমি ভাড়াটা দিলাম, কাল আপনি দিয়েন।" এই বলে সে চলে গেল।
পরদিন কলেজে ঢুকে পরীক্ষার কক্ষে ঢুকতেই নোলক দেখল, তিন-চারজন মেয়ে একে অপরের চুল ধরে ঝগড়া করছে। একটু দূরে আরও দুজন মেয়ে হাতে সিগারেট ধরে ধীরে ধীরে টানছে। নোলককে ক্লাসে ঢুকতে দেখেই সবাই চুপ হয়ে গেল। ঝগড়া বন্ধ হলো, সিগারেট জানালা দিয়ে বাইরে ফেলে দেওয়া হলো। দেখে মনে হলো যেন তারা অধ্যক্ষকে দেখেছে, আর তাই সবাই মুহূর্তে শান্ত হয়ে গেছে।
কিছুক্ষণ পর কিছু মেয়ে এসে নোলকের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করল। তিন-চারটা প্রশ্নের জবাবে নোলক মাথা নিচু করে শান্তভাবে উত্তর দিল। এক মেয়ে হাসিমুখে নোলককে 'লজ্জাবতী' বলে ঠাট্টা করল। পুরো ক্লাস হো হো করে হেসে উঠল।
অধ্যক্ষও নোলকের চলাচলের দিকে নজর রাখা শুরু করেছেন। এত বড় মহিলা কলেজে শত শত শিক্ষার্থীর মাঝে একটি মাত্র ছেলে পরীক্ষার্থী—এই বিষয়টি তাঁকে ভাবিয়ে তুলল। তিনি খেয়াল রাখছিলেন, যেন কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে।
পরীক্ষা শুরু হতে আরও বিশ মিনিট বাকি। নোলক ক্লাস থেকে বের হয়ে বারান্দায় দাঁড়াল। তাকে বারান্দায় দেখে অন্য ক্লাসের মেয়েরা হাঁ করে তাকিয়ে রইল। ক্লাসের ভেতরে যেমন ষাটজন মেয়ে তাকিয়ে থাকে, তেমনি বাইরে শত শত মেয়ে তাকে দেখছিল। তাই সে আবারও ক্লাসরুমেই ফিরে গেল।
নিজের টেবিলে রাখা বেশ কিছু চিঠি আর গোলাপ দেখে সে অবাক হলো। নোলক কোনো চিঠি বা গোলাপ স্পর্শ করল না। সে বুঝল, কিছু মেয়ে তাকে প্রেম প্রস্তাব দিয়েছে। নোলকের এলাকার মেয়েরাও তাকে এভাবে রাস্তায় আটকে প্রপোজ করে। এই যুগে সবাই স্মার্টফোন ব্যবহার করলেও নোলক এখনো নোকিয়া ১২০০ মডেলের একটি বাটন ফোন ব্যবহার করে।
আসলে নোলকের পারিবারিক শিক্ষাটা এভাবেই গড়ে উঠেছে। তার বাবা আজিজ আকন্দ ছেলেকে এতটাই শাসনের মধ্যে রাখেন যে, নোলক কখনো স্বাধীনতা কী, তা জানতে পারেনি। সে সব সময় চুপচাপ এবং পড়াশোনা নিয়েই ব্যস্ত।
পরীক্ষা শুরু হওয়ার সময় একজন পরীক্ষক কক্ষে প্রবেশ করলেন। তিনি নোলকের টেবিলে রাখা চিঠি আর গোলাপ দেখে বিষয়টি বুঝতে পারলেন। তিনি নোলকের কাছে গিয়ে তার বেঞ্চ থেকে সেগুলো নিয়ে সরাসরি ডাস্টবিনে ফেলে দিলেন। এরপর সবাইকে সতর্ক করে বললেন, "আমাদের একজন অতিথি পরীক্ষার্থী আছেন, যিনি একজন পুরুষ। তাকে যেন কেউ বিরক্ত না করে।"
পরীক্ষা শুরু হয়ে গেল, কিন্তু মৌমিতা তখনও আসেনি। নোলকের মনটা খারাপ হয়ে গেল। প্রায় দশ মিনিট পর যখন মৌমিতা এল, নোলকের মনে আনন্দের জোয়ার বয়ে গেল। মৌমিতা হাসিমুখে নোলকের পাশে গিয়ে বসল।
পুরো পরীক্ষা জুড়েই মৌমিতা নোলকের খাতা দেখে নকল করল, কিন্তু নোলক তাকে বিন্দুমাত্র বাধা দিল না। স্কুলের সময়ে তার বন্ধুরা খাতা দেখতে চাইলে সে শিক্ষকদের কাছে অভিযোগ করত। কিন্তু মৌমিতার বেলায় নোলক মুখে কিছু না বললেও, মৌমিতার সুবিধা হয় এমনভাবে খাতাটা খুলে রাখছিল। মৌমিতার লেখা শেষ না হওয়া পর্যন্ত নোলক খাতার পাতা উল্টাত না।
পরীক্ষা শেষ হতেই নোলক যখন গেটের বাইরে এল, তখন দেখল সাংবাদিক, ইউটিউবার ও মিডিয়ার লোকেরা তাকে ঘিরে ধরেছে। একটি মহিলা কলেজে একজন মাত্র পুরুষ পরীক্ষার্থী, এমন 'হট নিউজ' পেয়ে সাংবাদিকদের ভিড় জমেছিল কলেজের বাইরে। নোলকের মুখের সামনে মাইক্রোফোন আর ক্যামেরা ধরতেই সে তাদের এড়িয়ে কোনোমতে একটি রিকশায় চেপে বসল। এমনিতেই সে লজ্জায় জর্জরিত, তার উপর মিডিয়ার এই বাড়াবাড়ি দেখে সে আরও বেশি অস্বস্তিতে পড়ল। মনে মনে ভাবল, এখন তার বন্ধু-বান্ধব, সহপাঠী ও আত্মীয়স্বজনরা তাকে নিয়ে হাসাহাসি করবে।
কিছুদূর যাওয়ার পর নোলক দেখল, মৌমিতা কলেজের থেকে একটু দূরে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। রিকশাকে হাত দিয়ে ইশারা করতেই রিকশা থেমে গেল। মৌমিতা দ্রুত নোলকের পাশে বসে বলল, "মিডিয়া কত খারাপ, দেখলেন তো! আপনার সাথে কলেজ গেটে বসলে নির্ঘাত টিভিতে দেখিয়ে দিত।"
এরপর মৌমিতা একটি কাগজে তার নম্বর লিখে নোলককে দিয়ে বলল, "সন্ধ্যায় কল দিয়েন।" এই বলে সে নিজের বাসার সামনে নেমে গেল।
সেদিন সন্ধ্যায় নোলক মৌমিতার সঙ্গে বেশ কিছুক্ষণ ফোনে কথা বলল। সেদিন তারা একে অপরের সম্পর্কে অনেক কিছু জানল। নোলকের মনে মৌমিতার প্রতি এক অদ্ভুত মায়া, ভালোবাসা ও আগ্রহ জন্মাল। তার চোখে মৌমিতাই যেন পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী নারী।
রাতে নিউজের হেডলাইনে নোলকের ভিডিও আর ছবি দেখা গেল। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে এলাকার ক্লাব—সবখানেই নোলক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হলো। একটি মহিলা কলেজের একমাত্র পুরুষ পরীক্ষার্থী, তার ওপর আবার সে সাংবাদিকদের এড়িয়ে রিকশায় চড়েছে—এসব নিয়ে সবার মুখে মুখে কেবলই তার গল্প।
পরদিন পরীক্ষা ছিল না। মৌমিতা শাড়ি পরে নোলককে ফোন করে বলল, "চলো আজ মেলায় যাই।" মৌমিতার এই অনুরোধ নোলক ফেলতে পারল না।
স্টাইল কী জিনিস, নোলক তা বোঝে না। সে সব সময় সাদামাটা থাকতে পছন্দ করে। সেদিন সে তার ভাইয়ের স্যুট-ব্লেজার পরে মৌমিতার সঙ্গে দেখা করতে গেল।
সেদিন তার জীবনে এই প্রথম নোলক প্রকৃত আনন্দ কী, তা অনুভব করল। এতদিন তার আ
নন্দের একমাত্র উৎস ছিল বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস। কিন্তু আজ যেন মৌমিতা সেই উপন্যাসের পাতা থেকে বেরিয়ে এসে তাকে আনন্দ দিতে এসেছে।
নন্দের একমাত্র উৎস ছিল বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস। কিন্তু আজ যেন মৌমিতা সেই উপন্যাসের পাতা থেকে বেরিয়ে এসে তাকে আনন্দ দিতে এসেছে।
এভাবে বেশ কিছুদিন কেটে গেল। প্রতিদিন পরীক্ষা শেষে নোলক আর মৌমিতা নদীর ধারে বসে গল্প করত, আর রাতভর মোবাইলে তাদের কথা চলত। নোলক মৌমিতার জন্য কবিতা লিখে বাটন ফোনে টেক্সট করে পাঠাত। মৌমিতার প্রতি নোলক গভীরভাবে মুগ্ধ হতে শুরু করে।
জীবনের প্রথমবার নোলকের মনে কোনো মেয়ের প্রতি ভালোবাসা জন্মায়। সে মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয়, পরীক্ষা শেষ হলেই সে মৌমিতাকে তার মনের কথা বলবে। মৌমিতা দিনে এতবার নোলককে ফোন করত যে নোলকের মনেও নিশ্চিত বিশ্বাস জন্মায়, মৌমিতাও তাকে অনেক পছন্দ করে।
পরীক্ষার হলে প্রতিদিন কোনো না কোনো মেয়ের সরাসরি প্রেম প্রস্তাব পেত নোলক। বেশিরভাগ মেয়ে ইশারা-ইংগিতেই নোলককে ভালোবাসার সংকেত দিত। কিন্তু নোলকের মনে শুধু মৌমিতার প্রতিই ভালোবাসা।
আজ পরীক্ষা শেষ। নোলক তার পকেটে একটি সুন্দর লাল গোলাপ রেখেছে, হল থেকে বের হয়ে মৌমিতাকে প্রেম নিবেদন করবে বলে। কলেজের গেটের বাইরে এসে নোলক মৌমিতার জন্য অপেক্ষা করছে। তার পাশে সেনাবাহিনীর পোশাক পরা আরও একজন লোক দাঁড়িয়ে আছে।
মৌমিতা গেট থেকে বের হতেই নোলক পকেট থেকে গোলাপ ফুল বের করতে যাবে, ঠিক তখনই মৌমিতা সেই সেনাসদস্যকে আনন্দের সাথে জড়িয়ে ধরল। নোলকের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। মৌমিতা নোলককে দেখে হাসিমুখে তার স্বামীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল। নোলক সেই সেনাসদস্যের সাথে হ্যান্ডশেক করল। তারপর সেনাসদস্য আর মৌমিতা একসঙ্গে রিকশায় চড়ে চলে গেল। আর নোলক গোলাপ হাতে কলেজের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে রইল।
এমন সময় কালো গায়ের রঙের একজন ভদ্র মেয়ে নোলকের কাছে এসে বলল, "মৌমিতা এমনই। নিজের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য মানুষের সঙ্গে নাটক করে। তুমি একাই ভুক্তভোগী নও।"
নোলক সেদিন বৃষ্টিতে ভিজে বাড়ি ফিরল। রুমে ঢুকেই দরজা বন্ধ করে দিল। কয়েকদিন পর তার মামাতো ভাই এলে তাকে বিষয়টি জানালে সে বলল, "মেয়েরা এমনই। এইসব মেয়েদের থেকে দূরে থাইকো ভাই নোলক।"
কিছুদিন পর ফলাফল বের হলো। নোলক এ+ পেয়েছে। তার খাতা কপি করে মৌমিতাও এ+ পেয়েছে। মৌমিতার পাস করার মতো জ্ঞানই ছিল না। আজ নোলকের জন্য সে এ+ পেয়েছে।
টানা কয়েক বছর নোলক মেয়েদের থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নিল। মেয়ে মানুষ এখন তার চোখে বিষ। যেখানে মেয়েরা নেই, সেখানেই সে যায়। মৌমিতার এই ছলনাকে নোলকের মনে পুরো নারীজাতির ছলনা বলে মনে হয়। তার ধারণা, নারীরা বুঝি এমনই হয়।
সে নিজের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে ক্যারিয়ারের দিকে মনোযোগ দিল। সরকারি শিক্ষক পদে চাকরির পরীক্ষা দিল। কিছুদিন পর ফল প্রকাশ হলে দেখা গেল, নোলক নির্বাচিত হয়েছে।
কোথায় জানেন?
জাহেদা সফির মহিলা কলেজে!


"As a lecturer."




Comments
Post a Comment