লাল শাড়ী

 লেখকঃ সীমান্ত সরকার


আমরা দু’জন ভালোবেসে বিয়ে করেছিলাম। সেই ভালোবাসা ছিলো সরল, কাঁচা, কিন্তু নিখাদ। আমাদের এই সিদ্ধান্তে দুই পরিবারের কেউই খুশি ছিল না। আশীর্বাদের বদলে আমরা পেয়েছিলাম দীর্ঘশ্বাস, অভিমান আর নীরব দূরত্ব। 

অল্প বয়সে সংসারের দায় কাঁধে তুলে নিয়েছিলাম। তখনও জীবনের হিসাব কষতে শিখিনি, ভবিষ্যতের অঙ্ক মিলাতে পারিনি। হাতে কোনো স্থায়ী রোজগার ছিল না, ছিল না নিশ্চিন্ত আশ্রয়ের নিশ্চয়তা। তবুও সাহস ছিল কারণ আমরা একে অপরকে পেয়েছিলাম। সংসারের শুরুর দিনগুলো ছিল টানাপোড়েনের। অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী, অনিশ্চয়তা ছিল প্রতিদিনের ছায়া। অনেক রাত কেটেছে হিসাব মিলাতে মিলাতে কিভাবে মাসটা পার হবে, কিভাবে ভাড়া দেওয়া হবে, কিভাবে চাল-ডাল জুটবে। 

কেউ এগিয়ে আসেনি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে। আর আমরা-ও কারো কাছে হাত পাতিনি। হয়তো ছিল একরাশ অহংকার, হয়তো ছিল ভালোবাসার জেদ যা-ই হোক, আমরা আমাদের কষ্ট নিজেদের মাঝেই বয়ে নিয়েছি।

ভাগ্যের চাকা একসময় ধীরে ধীরে ঘুরতে শুরু করল। বহু প্রতীক্ষার পর একটি ভালো চাকরি হলো আমার। সংসারের অভাব কিছুটা হলেও ঘুচল। ঘরে আবার স্বস্তির বাতাস ঢুকতে লাগল। মনে হলো এবার বুঝি জীবন একটু গুছিয়ে দাঁড়াবে। 

কিন্তু সুখ আমাদের জীবনে বেশিদিন একটানা থাকতে চাইল না।
তার বাবা যিনি শুরু থেকেই আমাদের সম্পর্ক মেনে নিতে পারেননি। কারণে অকারণে আমার বিরুদ্ধে নানান মিথ্যা মামলা করতে লাগলেন। কখনও  অপহরণের অভিযোগ, কখনও প্রতারণার অপবাদ, কখনও বা চুরির অভিযোগ। প্রতিটি মামলাই ছিল আমাদের মানসিক শান্তির উপর এক একটি আঘাত। তবু আশ্চর্যের বিষয় প্রতিবারই আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আমার স্ত্রীই ছিল আমার সবচেয়ে বড় সাক্ষী, সবচেয়ে দৃঢ় সমর্থন। বিচারকের সামনে সে নির্ভীক কণ্ঠে সত্য বলেছে। তার চোখে ছিল অদম্য বিশ্বাস আমার স্বামী নির্দোষ।

এই লড়াইয়ের মাঝেই আমরা আরেকটি স্বপ্ন আঁকতে শুরু করি একটি সন্তান। আমাদের ভালোবাসার একটি রূপ, একটি নতুন প্রাণ, যে আমাদের সব দুঃখকে অর্থ দেবে। গত তিন বছর ধরে আমরা চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু নিয়তি যেন নির্মম খেলায় মেতে উঠেছিল। স্ত্রীর শারীরিক জটিলতার কারণে বারবার সন্তান নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল। প্রতিবার সে নিঃশব্দে কাঁদত, আর আমি অসহায়ের মতো তার পাশে বসে থাকতাম। সেই কান্না ছিল শব্দহীন, কিন্তু ভেতরটা ভেঙে দিত।

তবু আমরা হাল ছাড়িনি। অবশেষে একদিন উপরওয়ালা সহায় হলেন। আবার গর্ভে এলো সন্তান।সেই দিনটায় তার চোখে আমি নতুন আলো দেখেছিলাম। ভয় আর আনন্দ মিলেমিশে ছিল সেখানে। আমরা খুব সাবধানে সময় পার করতে লাগলাম। ওষুধ, নিয়ম, বিশ্রাম সবকিছুতে ছিল অতিরিক্ত সতর্কতা। আমাদের চোখে তখন বিরামহীন স্বপ্ন। ছোট্ট একটি মুখ, ছোট্ট হাত, প্রথম কান্না এসব কল্পনা করে আমরা রাত জেগে কথা বলতাম।

সেদিন তার গর্ভের বয়স ছয় মাস।
ক্যালেন্ডারের পাতায় সেই তারিখটি আমাদের জীবনের আরেকটি বিশেষ দিন বিবাহবার্ষিকী। অফিস থেকে ফেরার পথে আমি চলে গিয়েছিলাম শাহবাগ। বহুদিন পর মনটা হালকা ছিল। একটি ফুলের তোড়া কিনলাম। সঙ্গে একটি নীল শাড়ি ভাবলাম, লাল তো সে বহুবার পরেছে, এবার একটু আকাশের রঙ গায়ে দিক। 

দরজা খুলতেই আমি থমকে দাঁড়ালাম। রের ভেতর নরম আলো। আর সে আমার স্ত্রী বিয়ের সেই লাল শাড়িটাই পরে আছে। কপালে টিপ, হাতে চুড়ি, মুখে লাজুক হাসি। ছয় মাসের গর্ভে তার শরীর ভারী হয়ে উঠেছে, তবুও সে যেন ঠিক সেই দিনের মতোই সুন্দর। 

আমি তার হাতে ফুল আর শাড়ির প্যাকেটটা তুলে দিলাম। সে হেসে বলল,
 “আজও কি আমাকে নতুন করে বিয়ে করবে?”

আমরা সেদিন একসাথে বসে রাতের খাবার খেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু খাবার টেবিলে বসতেই হঠাৎ তার মুখের রঙ বদলে গেল। চোখ ঝাপসা হয়ে এলো। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সে অজ্ঞান হয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল। তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে গেলাম। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর রিপোর্ট এলো ডেঙ্গু। প্লাটিলেট দ্রুত কমছে। ডাক্তারদের মুখের ভাষা ভারী হয়ে উঠল।

একজন ডাক্তার আমাকে আলাদা ডেকে বললেন,
“যে ওষুধগুলো এখন জরুরি, সেগুলো দিলে গর্ভের সন্তান বাঁচবে না। আর যদি ওষুধ না দেন… তাহলে আপনার স্ত্রীকে বাঁচানো কঠিন।”

সপাতালের সাদা বিছানায় সে তখনও লাল শাড়ি পরে শুয়ে আছে। স্যালাইনের নল হাতে। চোখ আধখোলা। সেই লাল রং যেন ধীরে ধীরে মৃত্যুর ছায়ার সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। আমি শাশুড়িকে ফোন দিলাম। বহুদিনের মান-অভিমান ভেঙে তিনি হাসপাতালে এলেন। কাঁপা কণ্ঠে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। 

আমরা দু’জনে তাকে বোঝালাম—
“বাচ্চার কথা ভুলে যাও। তোমাকে আমাদের বেশি দরকার। তুমি থাকলে আবার সন্তান হবে। কিন্তু তুমি না থাকলে…”

সে চুপ করে আমাদের কথা শুনছিল। তার চোখে অদ্ভুত এক জেদ, এক অচেনা দীপ্তি।

পরদিন থেকে চিকিৎসা চলতে লাগল। আমরা ভেবেছিলাম সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু আমরা জানতাম না সে আমাদের অজান্তেই ওষুধ সেবন বন্ধ করে দিয়েছে। সে চেয়েছিল তার সন্তান বাঁচুক। তার সমস্ত মাতৃত্ব যেন এক বিন্দু সিদ্ধান্তে গিয়ে জমাট বেঁধেছিল। প্লাটিলেট আরও কমতে লাগল। শরীর দুর্বল হয়ে পড়ল। এক রাতে তার শ্বাস ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে এলো। আমি তার হাত ধরে ছিলাম। তারপর সবকিছু থেমে গেল। 

চারদিকে ঘন কুয়াশা নেমে এসেছে। সকালের আলো এখনও পুরোপুরি ফোটেনি। গ্রামের কবরস্থানের ভেজা মাটিতে শিশির জমে আছে। তার কবরে দেওয়া নতুন বাঁশের বেড়ার রঙ এখনও তাজা সবুজ কাঁচা, নরম, অদ্ভুতভাবে জীবন্ত। যেন মৃত্যু নয়, নতুন কোনো শুরুর ইঙ্গিত বহন করছে। 

আর আমি দাঁড়িয়ে আছি তার সামনে।

হাতে তার সেই লাল শাড়ি,যে শাড়ি পরে সে একদিন সব ছেড়ে আমার ঘরে এসেছিল। পরিবার, পরিচিত পৃথিবী, নিশ্চিন্ত আশ্রয়, সবকিছুকে পেছনে ফেলে আমার হাত ধরে বলেছিল, “আমি আছি।” আজ সে-ই পুরো পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে।

আমার হাত কাঁপছে। গলা শুকিয়ে কাঠ। বুকের ভেতরটা ফাঁকা, অথচ ভারী। কুয়াশার ভেতর দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে, এই পৃথিবীতে আমি ছাড়া আর কেউ নেই।  ধীরে ধীরে শাড়িটা খুললাম। লাল রঙটা কুয়াশার সাদা আবরণ ভেদ করে জ্বলে উঠল। খুব যত্ন করে তার কবরের বাঁশের বেড়ার চারপাশে শাড়িটা জড়িয়ে দিলাম। যেন তাকে আবার বউ সাজিয়ে দিচ্ছি। যেন ঠান্ডা না লাগে। যেন সে অভিমান না করে।

আমি কাঁপা গলায় বললাম
“তুমি সব সময় আমার কাছে নতুন। নতুন বউ হিসেবেই থাকবে। সময় যতই কেটে যাক, যুগের পর যুগ, বছরের পর বছর… তুমি আমার প্রথম, তুমি আমার শেষ।”

Comments

Popular posts from this blog

শেষ দৃশ্যপট (১ম অধ্যায় )

ফারাওয়ের অভিশাপ

মৃতের নিশ্বাস