শুভ বিবাহ
লেখক ঃ তন্ময় চৌধুরী
শহরের এক কোণে ছোট একটা বাসায় তরুণের সংসার। তবে এই সংসার শুধু তার একার নয়, এর সাথে জড়িয়ে আছে একরাশ দায়বদ্ধতা আর শৈশবের ঋণ। তরুণের জীবনের গল্পটা আর পাঁচটা সাধারণ যুবকের মতো মসৃণ নয়। খুব ছোটবেলায় বাবাকে হারানোর পর তার পৃথিবীটা হয়ে উঠেছিল মা আমেনা বেগমকে ঘিরে। আমেনা বেগম দিনরাত গার্মেন্টসে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে ছেলেকে বড় করেছেন।
সেই কঠিন সময়ে তরুণের আশ্রয়ের আরেক নাম ছিল তার খালা জুলেখা বেগম। মা কাজে যাওয়ার সময় সকালে তরুণকে রেখে যেতেন খালার কাছে। জুলেখা বেগম নিজের সন্তানের মতোই আগলে রেখেছেন তাকে। তরুণের মা যখন কাজে থাকতেন, তখন খালার আঁচলই ছিল তার সব বিপদের ঢাল। আজ মা নেই, এক বছর হলো আমেনা বেগম পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন। এখন এই সংসারে তরুণ ছাড়া আর কেউ নেই যে এই মানুষগুলোর দেখাশোনা করবে। তরুণের খালাতো ভাই, যে কি না তার ছোটবেলার খেলার সাথী ছিল, কয়েক বছর আগে এক ভয়াবহ দুর্ঘটনায় মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। সেই ভাইয়ের বউ নিজের ছোট সন্তানটিকে বৃদ্ধ শাশুড়ি আর পাগল স্বামীর কাছে ফেলে রেখে অন্য জায়গায় বিয়ে করে চলে গেছে। জুলেখা বেগম এখন বয়সের ভারে নুইয়ে পড়েছেন, তার ওপর পাগল ছেলে আর কোলের নাতনির দায়িত্ব। এই অসহায় পরিবারটির একমাত্র ভরসা এখন তরুণ।
তরুণ কখনো নিজেকে এই পরিবার থেকে আলাদা ভাবেনি। তার কাছে এই খালা, পাগল ভাই আর ছোট্ট ভাতিজিই হলো নিজের পৃথিবী। খালা তাকে শৈশবে যে মমতা দিয়ে বড় করেছেন, আজ সেই ঋণের প্রতিদান দেওয়ার সময় এসেছে। নিজের ব্যক্তিগত স্বপ্ন বা সুখের চেয়ে এই মানুষগুলোর মুখে দুবেলা অন্ন তুলে দেওয়া আর তাদের মুখে হাসি ফোটানোই এখন তরুণের জীবনের মূল লক্ষ্য।
তবে এই একাকী লড়াইয়ে তরুণের পাশে ছায়ার মতো আছে তার ছোটবেলার বন্ধু সাদিক। সাদিক শুধু বন্ধুই নয়, যেন তরুণের আত্মার আত্মীয়। ছোটবেলা থেকেই তারা জিগরি দোস্ত। তরুণের প্রতিটি আপদে-বিপদে সাদিক সবার আগে ছুটে আসে। তরুণের ঘরের অভাব কিংবা মনের অস্থিরতা, সবটুকুই সাদিক ভাগ করে নেয়।
তরুণ আর সাদিকের বন্ধুত্বটা যেন মুদ্রার দুই পিঠের মতো। তরুণ যেখানে দায়িত্বের চাপে পিষ্ট, সেখানে সাদিক হলো উল্টো পথের যাত্রী। সাদিকের বাবার অঢেল সম্পদ তাকে এক উশৃঙ্খল জীবনের স্বাদ ধরিয়ে দিয়েছে। বাপের টাকা উড়িয়ে মেয়েদের সাথে সময় কাটানোই তার প্রধান নেশা। সাদিকের যতসব অনিয়ম আর কুকীর্তির একমাত্র নীরব সাক্ষী হয়ে থাকে তরুণ। বন্ধুকে বহুবার বোঝানোর চেষ্টা করেছে তরুণ, কিন্তু সাদিক সেসব হেসেই উড়িয়ে দেয়। হাজার হলেও জিগরি দোস্ত, তাই শত অপছন্দ সত্ত্বেও তরুণ তাকে ছেড়ে যেতে পারে না। সাদিকের অসংখ্য বান্ধবীর মধ্যে পাশের এলাকার মিমের সাথে সম্পর্কটা একটু বেশিই গভীর। তবে এই গভীরতা ভালোবাসার নয়, বরং লালসার। মিমের সাথে যখনই সাদিক নিভৃতে সময় কাটাতে যেত, পাহারাদার হিসেবে সাথে থাকত তরুণ। বন্ধুর অনৈতিক কাজের সঙ্গী হতে ভালো না লাগলেও সাদিকের জোরাজুরিতে তরুণ কে বাধ্য হতে হতো।
একদিন এমনই এক মুহূর্তে তরুণ জিজ্ঞেস করেছিল, সাদিক, তুই তো কদিন পরেই বিদেশ চলে যাবি। মিমকে যে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিলি, তার কী হবে?
সাদিক হো হো করে হেসে উঠেছিল। সিগারেট টানতে টানতে বলেছিল, আরে ধুর! যতদিন দেশে আছি, ততদিন একটু ভোগ করে নিই। ওসব বিয়ের কথা ভুলে যা।
সাদিক তার বিদেশে যাওয়ার খবরটা কোনো বান্ধবীর কাছেই প্রকাশ করত না। কিন্তু একদিন মিমের সাথে কথা বলার সময় অসাবধানতাবশত মুখ ফসকে বিদেশের কথাটা বলেই ফেলল। মিম শান্ত স্বভাবের মেয়ে হলেও সেদিন মনে মনে ঠিকই বুঝে নিয়েছিল যে সাদিক তাকে বড় কোনো ধোঁকা দিতে যাচ্ছে। তার বিশ্বাসের ভিতটা নড়ে উঠেছিল সেই মুহূর্তেই। দেখতে দেখতে সাদিকের ফ্লাইটের সময় ঘনিয়ে এল। বিদেশে উড়াল দেওয়ার মাত্র একদিন বাকি। শেষবারের মতো মিমের সাথে দেখা করার এবং শারীরিক মিলনের নীল নকশা তৈরি করল সাদিক। যথারীতি এবারও সে তরুণকে সঙ্গে নিল পাহারাদার হিসেবে। তরুণ আপত্তি করেছিল, কিন্তু সাদিকের শেষ অনুরোধ ফেরাতে পারেনি।
চারপাশে রূপালি চাঁদের আলো ঝরে পড়ছে। ধান খেতের আইল ধরে নিঝুম রাতে দুই বন্ধু চুপি চুপি মিমদের বাড়ির দিকে এগোচ্ছে। মিমের বাবা ঢাকায় চাকরি করেন, বাড়িতে কেবল মিম আর ওর মা থাকে। মিমের মা খুব ভোরে ওঠেন বলে সন্ধ্যায় দ্রুত ঘুমিয়ে পড়েন। প্রতিদিনের মতো আজও সাদিকের পরিকল্পনা মিমের ঘরে ঢুকে ওর সাথে সময় কাটানো, আর তরুণের কাজ হলো দরজার বাইরে অতন্দ্র প্রহরীর মতো পাহারায় থাকা।
প্রাচীর ঘেরা বাড়িটির সামনে পৌঁছে অভ্যস্ত হাতে সাদিক দেয়াল টপকে ভেতরে ঢুকল, পেছনে তরুণ। কিন্তু পা রাখতেই তারা বুঝতে পারল আজ কিছু একটা ভিন্ন। অন্ধকার উঠোনে ওত পেতে ছিল একদল যুবক। তরুণ মুহূর্তেই বুঝতে পারল মিম আজ সাদিককে চরম শিক্ষা দেওয়ার জন্য এই নীল নকশা সাজিয়েছে। লোকজন দেখা মাত্রই সাদিক নিজের কথা ভেবে এক লাফে দেয়াল টপকে ওপারে চলে গেল। যাওয়ার সময় শুধু বলে গেল, তরুণ ভাগ! রুণ যখন দেয়াল টপকাতে যাবে, ঠিক তখনই পেছন থেকে চার-পাঁচজন তাকে জাপটে ধরল। শুরু হলো অমানুষিক মারধর। মিমের বাবা ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। মিমকে সামনে দাঁড় করিয়ে চিৎকার করে জিজ্ঞেস করলেন, এই ছেলের সাথেই কি তোর সম্পর্ক?
মিম কিছুক্ষণ চুপ করে তরুণের দিকে তাকিয়ে থাকল। তার চোখের সামনে তখন সাদিকের প্রতারণার কথা ভাসছে। আসল অপরাধী পালিয়ে বেঁচেছে, কিন্তু মিম জানত এখন পিছু হটার পথ নেই। সে দৃঢ় গলায় বলে উঠল, হ্যাঁ বাবা, এই ছেলেই।
তরুণ আর্তনাদ করে উঠল, আমি না! মিম, তুমি কেন মিথ্যা বলছো? আমি তো শুধু পাহারায় ছিলাম!
কিন্তু কে শোনে কার কথা? মিমের বাবার সম্মানে তখন বড় আঘাত লেগেছে। মুহূর্তের মধ্যে কাজী ডেকে আনা হলো। তরুণকে একটা চেয়ারের সাথে শক্ত করে বেঁধে ফেলা হলো। তরুণ বারবার সাদিককে ফোন করার চেষ্টা করল, কিন্তু ওপাশ থেকে ফোনটা বেজেই চলল, সাদিক এল না। তরুণের মনে পড়ল তার বাড়িতে থাকা অসহায় বৃদ্ধ খালা, পাগল ভাই আর ছোট্ট ভাতিজির কথা। সে যদি এখন বিপদে পড়ে, তবে তাদের দেখার মতো কেউ নেই। পুরো এলাকা তখন বাড়ির উঠোনে ভেঙে পড়েছে। মিমের বাবা বুঝতে পারলেন, আজ যদি বিয়ে না হয় তবে এলাকায় মুখ দেখানো যাবে না। শুরু হলো তরুণের ওপর মানসিক ও শারীরিক চাপ। মারমুখী যুবকদের হুমকির মুখে তরুণ একপর্যায়ে নিস্তেজ হয়ে পড়ল। তার চোখের সামনে ভাসছিল খালার মুখটা।
অবশেষে জোর করে তাকে কলমা পড়ানো হলো। ১০ লাখ টাকা দেনমোহর ধার্য করে মিমের সাথে তরুণের বিয়ে পড়িয়ে দেওয়া হলো। যে বিয়ে হওয়ার কথা ছিল সাদিকের সাথে, নিয়তির এক নিষ্ঠুর পরিহাসে সেই 'শুভ বিবাহ' সম্পন্ন হলো তরুণের সাথে। এক লহমায় তরুণের সাজানো জীবনটা ওলটপালট হয়ে গেল। পাহারাদার থেকে সে হয়ে গেল এক অনাকাঙ্ক্ষিত সম্পর্কের বর।
বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পর তরুণের হাতের বাঁধন খুলে দেওয়া হলো। মিমের বাবা কঠোর স্বরে বললেন, এখন যাও। তোমার মুরুব্বিদের নিয়ে এসে সম্মানের সাথে আমার মেয়েকে নিয়ে যাবে। আর যদি চালাকি করো, তবে ১০ লাখ টাকা দেনমোহর উশুল করে তোমাকে জেলের ভাত খাইয়ে ছাড়ব। তরুণ টলতে টলতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল। তার সারা শরীর মারধরের চোটে ব্যথায় নীল হয়ে আছে, কিন্তু মনের ক্ষতটা আরও গভীর। যে মেয়েটিকে তার বন্ধু পশুর মতো ভোগ করেছে, যে মেয়ের পরিবার একজন নিরপরাধ মানুষকে বলির পাঁঠা বানাল, তাকে সে কোনোদিনও স্ত্রীর মর্যাদা দিতে পারবে না। তরুণ আইনের আশ্রয় নিতে থানায় জিডি করল, কিন্তু ক্ষমতা আর অর্থের জোরে মিমের বাবা উল্টো তরুণের নামে অপহরণ, নারী নির্যাতন আর যৌতুকের মামলা ঠুকে দিলেন।
আমাদের দেশের আইনের মারপ্যাঁচে অনেক সময় সত্য ঢাকা পড়ে যায়। তরুণ বাসর করা তো দূরের কথা, মিমের ছায়াও মাড়াল না, অথচ তাকে এখন ফেরারি আসামী হয়ে ঘুরতে হচ্ছে। মিমের বাবার পরিকল্পনা ছিল তরুণকে চাপে ফেলে হয় ১০ লাখ টাকা আদায় করা, নয়তো দায়মুক্ত হওয়া। কিন্তু তরুণ অন্য ধাতুতে গড়া। সে ঠিক করল, অন্যায়ভাবে চাপিয়ে দেওয়া এই দায় সে বহন করবে না। খালার দায়িত্ব আর ছোট ভাতিজির ভবিষ্যতের কথা ভেবে সে আত্মগোপন করল ঢাকার জনসমুদ্রে। সময়ের সাথে সাথে গল্পের মোড় ঘুরতে শুরু করল। পুলিশ মাঝেমধ্যে বাড়িতে এলেও তরুণকে খুঁজে পেল না। এদিকে মিমের বাবা পড়লেন মহাবিপদে। তিনি ভেবেছিলেন বিয়ে দিয়ে দিলে তার সম্মান বাঁচবে, কিন্তু ফল হলো উল্টো। মিম এখন সমাজচ্যুত। যে মেয়েকে জোর করে একজনের সাথে বিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং যে স্বামীর ঘর করতে পারছে না, তাকে অন্য কেউ বিয়ে করতে রাজি নয়। মিমের জীবনটা একটা অচল পয়সার মতো হয়ে গেল মিমের বাবার ঘরেই।
মিমের বাবা এখন বুঝতে পারছেন, রাগের মাথায় নেওয়া জিদ আর মিথ্যার আশ্রয় কীভাবে তার নিজের মেয়ের জীবনই ছারখার করে দিয়েছে। তিনি না পাচ্ছেন দেনমোহরের টাকা, না পারছেন মেয়েকে শ্বশুরবাড়ি পাঠাতে। ওদিকে তরুণ ঢাকায় ভালো একটা চাকরি করে নিজের খালার সংসারের খরচ পাঠাতে লাগল আড়ালে থেকে। সে মনে মনে পণ করেছে, মিথ্যার কাছে সে হার মানবে না।
অপরাধী ছিল সাদিক, কিন্তু সে দিব্যি বিদেশে আয়েশ করছে। মিম আর তার বাবা মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে একজন নিরপরাধকে সাজা দিতে গিয়ে নিজেরাই এক অন্তহীন অপেক্ষায় বন্দী হয়ে পড়েছে। আর তরুণ? সে হয়তো ফেরারি, কিন্তু তার বিবেক পরিষ্কার। সে জানে, জবরদস্তি করে বিয়ে দেওয়া যায়, কিন্তু মন জয় করা যায় না। কে কাকে সাজা দিচ্ছে আর কার সাজা পাওয়া উচিত, তা হয়তো সময়ের আদালতই ঠিক করে দেবে। আপাতত মিমের বাবার সেই সাজানো 'শুভ বিবাহ' এক অভিশপ্ত দীর্ঘশ্বাস হয়ে রয়ে গেল মিমদের ঘরে। আর তরুণ রয়ে গেল এক নীরব প্রতিবাদী হয়ে, যে অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করে ভাগ্যের সাথে লড়াই করে চলেছে।

Comments
Post a Comment