কালান্তর (Across the Eras)


মহাকালের দীর্ঘ স্রোত পেরিয়ে গল্পের শুরু প্রায় বারোশ বছর আগের বাংলায়, খ্রিস্টীয় সপ্তম শতকের সমতট রাজ্যে। তখন রাজা গোবিন্দ চন্দ্রের শাসনে বাংলা ছিল সমৃদ্ধ ও গৌরবময় এক জনপদ। ময়নামতির লাল মাটিতে সোনালি ধান ফলত, বাংলার তাঁতিদের বোনা মসলিন ও রেশমের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল দূরদেশ পর্যন্ত। নদীপথে পাল তুলে বাঙালি বণিকেরা সমুদ্র পাড়ি দিত। বৌদ্ধ বিহার, মন্দির, কৃষিজীবন আর বাণিজ্যের ঐশ্বর্যে ভরপুর ছিল সেই সময়ের বাংলা।

এই জাঁকজমকের আড়ালেই জন্ম নেয় এক অজানা গল্প।

ময়নামতির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া শান্ত নদীর ধারে কাশফুলে ঘেরা এক ছোট্ট কুঁড়েঘরে বাস করত শ্যামা ও তার বৃদ্ধ বাবা। অভাবের সংসার। বৃদ্ধ বাবা বয়সের ভারে আর নৌকা চালাতে পারেন না। দিন কাটে হুক্কায় টান দিতে দিতে আর ভবিষ্যতের চিন্তায়। এক বিকেলে তিনি শ্যামাকে জানালেন, রাজমহলের সেপাইদের সঙ্গে কথা বলেছেন। অনেক অনুরোধ আর দুইটা ইলিশ মাছের বিনিময়ে তারা রাজমহলে কাজ দেওয়ার কথা বলেছে। বৃদ্ধ বুঝতে পারছিলেন, তিনি আর বেশিদিন বাঁচবেন না। তাই মেয়েটাকে কোনোভাবে নিরাপদ জীবনে পাঠাতে চান।

শ্যামা চুপচাপ সব শুনছিল। মাটির উনুনে ভাতের হাঁড়ি বসানো, আগুনের লালচে আভা তার মুখে পড়ছিল। কিছুক্ষণ পর দূর থেকে ভেসে এলো বাঁশির পরিচিত সুর। সেই সুর শুনেই শ্যামা ছুটে গেল নদীর ধারের কাশবনের দিকে।

সেখানে এসে সে দেখল ইন্দ্রকে। মাথায় লম্বা চুল, পরনে ছোট ধুতি, কাঁধে গামছা  বাঁশি বাজাতে বাজাতে সে এগিয়ে আসছিল। ইন্দ্র শ্যামার জন্য হাট থেকে একটি লালচে চাদর এনেছিল। শ্যামা ভয় পেয়ে বলল, বাবা জিজ্ঞেস করলে কী বলবে? ইন্দ্র হাসতে হাসতে বলল, রাস্তায় পড়ে পেয়েছে বললেই হবে। কিন্তু শ্যামা জানত, তার বাবা এত সহজে বিশ্বাস করবেন না।

ইন্দ্র আলতো করে চাদরটা শ্যামার কাঁধে জড়িয়ে দিয়ে বলল, আর কিছুদিন অপেক্ষা করতে। রাজসেপাইয়ের কাজ পেলেই সে শ্যামাকে নিজের ঘরে তুলে নিয়ে যাবে। তারপর আবার বাঁশিতে সুর তুলে নদীর পাড় ধরে চলে গেল। শ্যামা চুপচাপ দাঁড়িয়ে তার চলে যাওয়া দেখতেই থাকল।

অন্যদিকে রাজপ্রাসাদে তখন অন্য এক অস্থিরতা।

গভীর রাতে অসুস্থ রাজা গোবিন্দ চন্দ্র শয্যায় শুয়ে রানী ময়নামতির সঙ্গে কথা বলছিলেন। তিনি তার পুত্র মহীপালকে নিয়ে গভীর চিন্তায় ছিলেন। চারপাশের হিন্দু রাজারা সমতটের দিকে নজর দিচ্ছে, অথচ মহীপাল রাজ্যশাসনের বদলে ভোগবিলাস আর খামখেয়ালিপনায় মত্ত। রানীও উদ্বিগ্ন ছিলেন। তিনি বললেন, মহীপালকে দ্রুত বিয়ে দেওয়া উচিত, কারণ সে রাজ্যের কুমারী মেয়েদের নিয়ে বেপরোয়া আচরণ করছে। কোনোদিন প্রজারা বিদ্রোহ করলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

রাজা রাগে বললেন, প্রজাদের এত সাহস হবে না। কিন্তু তার ভয় অন্য জায়গায়। মহীপাল ধর্মীয় দায়িত্ব থেকেও দূরে সরে যাচ্ছে। বৌদ্ধ বিহারে যায় না, বুদ্ধদেবকে মানতে চায় না। অথচ এই রাজ্যে হিন্দু ও বৌদ্ধদের ভারসাম্য রক্ষা করেই রাজত্ব টিকে আছে। দুর্বলতা দেখা দিলে শত্রুরা সুযোগ নেবে।

এরই মধ্যে মহীপালের চরিত্রের আরেকটি দিক প্রকাশ পেতে শুরু করে।

এক দুপুরে রাজপুত্র মহীপাল ঘোড়া ছুটিয়ে গ্রামের রাস্তা দিয়ে উন্মত্তের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছিল। গ্রামের সাধারণ মানুষ ভয়ে রাস্তা ছেড়ে পালাচ্ছিল, আর সে তাদের অসহায়তা দেখে আনন্দ পাচ্ছিল। শেষে সে গিয়ে থামল এক বড় দীঘির ঘাটে। সেখানে গ্রামের কয়েকজন যুবতী গোসল করছিল। মহীপালকে দেখে সবাই লজ্জায় গলা পর্যন্ত পানিতে ডুবে গেল।

মহীপাল ঘাটে বসে তাদের ভয় আর অসহায়তা উপভোগ করতে লাগল। সেপাইদের দিয়ে সুগন্ধি কলিকা সাজিয়ে ধোঁয়া টানতে টানতে সে হেসে উঠল। তারপর হঠাৎ মেয়েদের তীরে রাখা কাপড়গুলো তুলে নিয়ে ঘোড়ায় চড়ে পালিয়ে গেল। দীঘির জলে আটকে থাকা মেয়েরা অসহায়ভাবে চিৎকার করতে লাগল।

Comments