শেষ দৃশ্যপট (৪র্থ অধ্যায় )

 (পর্ব ০৭)  

লেখকঃ সিমান্ত সরকার


শীতকাল আসন্ন। গ্রামীণ ভোরের বাতাসে ধোঁয়া ধোঁয়া কুয়াশা, আর এই সময়ে গ্রামের হাটে-পথে ভাপা পিঠার চাহিদা অত্যন্ত। তাহারা সিদ্ধান্ত করিল, ফজরের আজানের সঙ্গে সঙ্গে জাগিয়া, চুলায় পানি গরম করিবে, চালের গুঁড়ো নারকেল-গুড় মিশাইয়া তৈরী করিবে সুস্বাদু ভাপা পিঠা। একই এলাকায় আরও দুইজন নারী দীর্ঘদিন ধরিয়া পিঠা বিক্রি করিতেছেন। তাই মনু বেগমের পিঠার চাহিদা তুলনায় কম। সীমান্ত বুঝিলবাজারে টিকিতে হইলে চাই চাতুর্য।

সীমান্তর চোখ পড়িল বাজারে কলার দামের উপর।
এতটাই সস্তা টাকায় ১০টি কলা!
সেই মুহূর্তে সীমান্ত বুদ্ধি করিয়া বলিল,
— "
মা, চল, আমরা বলিএকটা পিঠা কিনিলে একটি কলা ফ্রি!"

এই অভিনব বুদ্ধি চমৎকার কাজ করিল। ক্রেতা বাড়িতে বাচ্চাদের মুখে হাসি ফুটাতে কলাসহ পিঠা কিনিতে লাগিল। ক্রমে মনু বেগমের পিঠার চাহিদা বাড়িতে লাগিল।

পরদিন হইতেই সীমান্ত একটি বড় গামলায় ভরে পাশের গ্রামে পিঠা বিক্রি করিতে যাইতে লাগিল।
অনেকে টাকা না থাকিলেও সুপারির বিনিময়ে পিঠা কিনিত।
সীমান্ত সুপারির হিসেব কষিয়া দেখিল১০টি সুপারি মানে ১টি পিঠা, আর ওই ১০টি সুপারি বিক্রয় করিলেই মিলে টাকা।
সে বুঝিল, লোকসান নয়, বরং ধীরে ধীরে লাভ আসিতে শুরু করিয়াছে। সকাল আটটার পূর্বেই পিঠা বিক্রয় শেষ করিয়া মনু বেগম চলিয়া যায় কারখানায়, আর সীমান্ত বাইসাইকেলে যায় পাশের গ্রামের সেই বাড়িতেযেখানে হাজারে হাজারে বিড়ির খোলস প্রস্তুত হয়। প্রতিদিন হাজারে পাঁচ টাকায় সীমান্ত সংগ্রহ করে বিড়ির খোলসসেই খোলসে তামাক পুরিয়া প্যাকেট বানাইলে মজুরি মেলে ১৫ টাকা।

এক দিনে মা-ছেলে মিলিয়া প্রায় ৬০০০টি বিড়ি তৈরী করিতে সক্ষম হয়। তন্মধ্যে ৩০ টাকা দিতে হয় খোলস প্রস্তুতকারিণী নারীগণকে, আর বাকি অর্থ নিজেদের। বিড়িগুলির খোলস যখন কাপড়ের বেল্টে জড়ানো হইত, তখন তাহার গঠিত চক্রগুলি মৌচাকের ন্যায় দেখাইত।

পাশের গ্রামের কিশোরেরা তাহা দেখিয়া বিস্ময়ে জিজ্ঞাসা করিত
— "
এইটা মৌচাক না কি?"

সীমান্ত মুচকি হাসি দিয়া ভাবিত,
— "
না ভাই, এই মৌচাক নহে।

তামাকের কারখানায় সীমান্তের দম ক্রমেই বন্ধ হয়ে আসত দিনে দিনে। তামাকের গন্ধ একেবারেই অসহনীয় হয়ে ওঠে তার নাকে। ধীরে ধীরে সীমান্তের মন চুপচাপ, নিঃশব্দে শান্ত হয়ে যায়। এখন আর মাঠে খেলাধুলার স্বাদ নেই তার। তার মা, মনোয়ারা বেগম, দিন দিন আরও খিটখিটে মেজাজের হয়ে ওঠেন। সংসারের অভাব, অসুখের কষ্টসব মিলিয়ে তার উপর রাগ জন্মায়। এমন সময়ে সংসার চালানোর পয়সা-টাকা নেই, তবুও মনোয়ারা বেগমের ক্রোধ যেন সীমাহীন। প্রায়শই তার নিজের রাগই সীমান্তের উপর পড়ত।

ছোট সীমান্ত চেষ্টা করত মায়ের মন শান্ত রাখার, কিন্তু সেই চেষ্টায় নিজের শৈশবের আনন্দ হারিয়ে ফেলে। সংসারের অভাব দূর করার জন্য নয়, বরং বেঁচে থাকার প্রয়োজনে মা আর ছেলেদুজনেই এক নিঃশেষ সংগ্রামের মধ্যে আবদ্ধ। চারিদিকে উঁচু দেওয়াল, মাথার উপর টিনের মস্ত বড় চাল। বাঁশের তৈরি কুলার উপর বিড়ির কাগজ পাতানো থাকে। তাতে তামাক ভরা হয়। অতঃপর কারিগর কাঠি দ্বারা বিড়ির মুখ বন্ধ করে; তারপর পঁচিশটি বিড়ি একত্রে করে পলিথিনে ঢুকানো হয়। পরে সেগুলি কাগজে মোড়ানো প্যাকেজে সাজিয়ে বাঁশের কুলায় রাখা হয়। অবশেষে মহাজনের সহকারীর নিকট জমা দিয়া শ্রমের দাম গ্রহণ করা হয়।

এই কারখানায় অধিকাংশই নারী শ্রমিক। পুরুষেরা উপরের পদে কিংবা ভারবাহী কাজেই নিযুক্ত থাকে। অনেক নারী কর্মচারীই সংসারের অভাব সত্ত্বেও কাজের সুবিধার্থে আপন সন্তানকে সঙ্গে আনিয়া থাকে। সীমান্তও তাহার মায়ের সহায়ক।

যখন সরকারি লোকজন কারখানা পরিদর্শনে আসে, তখন ক্ষুদ্র শিশুদের লুকাইয়া ফেলা হয়। একেবারে ছোটরা মায়ের আঁচলে আশ্রয় পায়, আর বড়রা কারখানার পশ্চাতে আড়ালে থাকে। সরকারি নিয়ম মোতাবেক কিশোর-কিশোরীরা তামাক কারখানায় চাকরি করিতে পারিবে না। কারণ, তামাক মানব-স্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতি করে; শিশুদের সংস্পর্শে এলে ভবিষ্যতে ক্যান্সারের সম্ভাবনাও প্রবল হইয়া উঠে।


 (পর্ব ০৮)  

মুক্তা যখন নিজ গ্রামে ফিরিল, সে যেন সম্পূর্ণ দায়িত্বজ্ঞানহীন হয়ে পড়িল। সে আর নিজের পরিবারকেই বিবেচনা করিতে চাইত না; বরং তার একমাত্র লক্ষ্য হইল ভাইদের খুশি রাখা। সে নিজের জমি অল্প অল্প করে বিক্রি করতে লাগিল, যেন তার ভাইদের সন্তানের জন্য যে কোনো সুযোগ বা সুবিধা থাকে। ভাইদেরাও মুক্তার এই অবহেলাকে কাজে লাগাইয়া, তার জমি বিক্রি করে তাঁদের নিজস্ব বাড়ি, সম্পদ এবং সন্তানদের পড়াশোনার ব্যয় পূর্ণ করিত।

অন্যদিকে মুক্তার নিজ সন্তানসীমান্তদিনরাত কঠোর পরিশ্রমে নিয়োজিত। পেটের জন্য, জীবনের জন্য, সে কারখানার ধুলো আর তামাকের গন্ধ সহ্য করতে বাধ্য। ছোট্ট শরীর, ক্ষীণ মায়া আর অল্প বয়সী মন, সবকিছুই এখন এক অচিন্ত্যশীল সংগ্রামের কাছে বন্দি।

একদিন সীমান্তর খালা, যিনি পিতার বাড়ি বেড়াতে এসেছিলেন, সীমান্তর মাকে জানালেন যে মুক্তা তার বিলের একটি খণ্ড জমি বিক্রি করে তার বড় ভাইয়ের সন্তানের জন্মদিনে মোটরসাইকেল কিনে দিয়েছেন। এই কথা সীমান্ত শুনিলস্কুলের পথে হাঁটতে হাঁটতে। সে হাঁটছিল ছেঁড়া পায়ের জুতায়, লোহার পেরেক দিয়ে বোটা আটকানো। মাঝে মাঝে পায়ে লেগে রক্ত ঝরে, আর সেই রক্ত থামানোর জন্য সে কচুপাতার ছেঁড়া অংশ থোকাইয়া রস বের করে পায়ে লাগাত।

সীমান্তর চোখে তখন এক অগণিত বেদনা জমে উঠিল। নিজ সন্তান খেতে পারে না, পড়তে পারে নাকিন্তু অন্যের সন্তানের জন্মদিনে বাবা-উপহার দেয়।  এই অন্যায়, এই অসাম্য, এই নিঃস্বত্বার ছবি তার মনকে ছিন্নভিন্ন করিত। সে চুপচাপ হেঁটে যাচ্ছিল, কিন্তু ভিতরে ভিতরে সে অজস্র কান্না আর রাগ অনুভব করিত।

সীমান্ত বুঝত, জীবনের কঠোর বাস্তবতা তার ছোট্ট কাঁধে ভার হয়ে পড়িল। সে শিশুকালীন আনন্দ, খেলাধুলাসবই হারাইয়া ফেলেছে। শুধু বাঁচা, টিকে থাকা আর মায়ের মুখে সুখের ছাপ আনাই এখন তার একমাত্র লক্ষ্য। কিন্তু সেই লক্ষ্যও কখনো পূর্ণ হয় না; কারণ সংসারের অভাব আর অন্যের লোভ সবসময় তার পথের মধ্যে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়।

একটি ছোট ছেলে, যার চোখে চোখের জল জমে উঠেছে, যার পায়ে রক্তমাখা কচুপাতা লাগানোএই সীমান্তই এখন জীবনের কঠিন বাস্তবতার এক নিঃসঙ্গ প্রতীক। সে জানে, এই দারিদ্র্য, এই অন্যায়ের পরিবেশে তার শৈশব আর অনীহিত স্বপ্ন কখনো পূর্ণ হবে না।

সাল ২০১১। সীমান্তর প্রাইমারি জীবন শেষ হলো। হাইস্কুলের দরজা খুলছে তার সামনে, কিন্তু সেই পথের জন্য প্রয়োজন যথেষ্ট টাকাভর্তি ফি, বইপত্র, ইউনিফর্ম। তার পরিবারে সেই সুযোগ নেই। সীমান্তর মনে একসাথে ভয়ের ছায়া আর আশা জাগে।

ভর্তির টাকাটা জোগানোর জন্য সীমান্ত অন্যদের বাড়িতে মাটি কাটতে লাগল। একজন কামলা, যে নতুন ঘর বানাবে, মাটি কেটে দেয়ার জন্য দুই দিনের সময় নেবে এবং ১৫০০ টাকা দেবে। কিন্তু বাড়ির মালিক চিন্তায় পড়েন—‘অল্প খরচে, কিন্তু সময় বেশি’— ভাবেই সীমান্তকে পাঁচ দিনের জন্য কাজটি দেওয়া হলো, মাত্র ৫০০ টাকায়।

দিনের আলো আর রাতের অন্ধকার মিলিয়া সীমান্তের ছোট্ট হাত মাটিকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে ঘরে পৌঁছে দেয়। ক্লান্তি, ধূলিকণা আর গায়ে লাগা ঘামের সঙ্গে তার স্বপ্ন জড়িয়ে থাকে। পাঁচ দিনের পর সে সেই ৫০০ টাকা পায়। এই টাকা দিয়েই সে স্কুলে ভর্তি হয়, বইপত্র কিনে নিজের শিক্ষার পথে পা রাখে।

কিন্তু সীমান্তের মনে অদ্ভুত ব্যথা কাজ করে। নিজ বাড়িতেই তো তিনজন সামর্থ্যবান মামা ছিল। চাইলে সামান্য সাহায্য করে তার স্বপ্নকে বাস্তব করতে পারতো, কিন্তু করলো না। এই উপলব্ধি সীমান্তকে শিখিয়ে দেয়নিজের সংগ্রাম, নিজেরি করতে হয়। মানুষের সাহায্য আসে না সবসময়, কখনও কখনও পথ চলা একা একা, নিজের পদক্ষেপে।

সীমান্ত তখন বুঝেছিলজীবনের কষ্ট, চ্যালেঞ্জ আর সংগ্রাম তারই অংশ। আর এই সংগ্রামের মধ্য দিয়েই সে বড় হবে, স্বপ্ন দেখবে, আর তার ছোট্ট শরীরকে শক্তি আর সাহস দিয়ে নিজের ভবিষ্যত গড়বে।

স্কুলে সীমান্ত একেবারেই পাত্তাহীন হয়ে পড়েছিল। সহপাঠীরা তার সঙ্গে কথা বলতে চাইত না। গায়ে ময়লা জামা আর এলোমেলো চুল তাকে আরও অবহেলিত দেখাত। টিফিনের সময় কেউ তাকে ফুচকা বা খেলার কোনো উপহার দিতে পারত না; সীমান্তের সামর্থ্য ছিল না। তাই দুপুরের সময় গেইটের বাইরে কেউ ডাকে নাসে নিজেই গোপনে চলে যায়। ক্লাসের লাস্ট বেঞ্চে চুপচাপ বসে থাকে, যেন কেউ তার দিকে তাকাতে না পারে।

যে কেউ তার দিকে খেয়াল করলেই হাসি-তামাশার শিকার হয়। আর শিক্ষক যদি নজর দেন, সীমান্তকে সামনে ডেকে এনে পোশাক চুলের জন্য ধমকানো হয়। এই ভয়ের কারণে সে ক্লাসের শেষ বেঞ্চেই বসে থাকে, যেন চোখে পড়ে না। পড়াশোনা করার মানসিক সুযোগ খুব কম, কারণ টিউশনি করতে পারার সামর্থ্য নেই। অন্যদের মতো সে কোনো প্রাইভেট শিক্ষকের কাছে সাহায্য পায় না; যা সামান্য বোঝে, নিজের ঘরে বসে সে পড়ে বুঝে নেয়।

স্কুলের নিয়ম কঠোর। স্কুল মিস করলে একদিনের জন্য ১০ টাকা জরিমানা। সীমান্ত প্রায় ১৮ দিন স্কুলে আসেনি, কারখানায় মায়ের সাথে কাজের জন্য ব্যস্ত। ১৮ দিনের জন্য তার জরিমানা দাঁড়ালো ১৮০ টাকা। অনেকে স্কুল মিসের জরিমানার টাকা দিতে পারে, কিন্তু সীমান্ত দিতে পারল না। যখন শিক্ষক চাপ দেন, সে ক্লাসে মাথা নিচু করে বসে থাকে, চোখে লজ্জা আর ঘৃণার মিশ্র অনুভূতি।

তবু, তার শিক্ষার জন্য দূরসম্পর্কের এক চাচা সীমান্তকে সামান্য সাহায্য করে। তার ছেলে একই ক্লাসে পড়েছে, আর চাচা পুলিশের চাকরি করে। নিজের ছেলের জন্য গাইড কিনে চাচা সেই একই গাইড সীমান্তর জন্যও দেয়। মাঝে মাঝে সীমান্তর মা চাচার ছেলের পুরাতন জামা-প্যান্ট এনে দেয়, যা সীমান্তকে স্কুলে পড়ার জন্য ব্যবহার করতে হয়। সেই জামা-প্যান্ট বড় এবং ঢিলা; সীমান্ত অনেক চিকন সাস্থ্যের। সে প্যান্টকে দড়ি দিয়ে কোমরে আঁকড়ে ধরে, না হলে কোমর থেকে ঢিলে হয়ে পড়ে যেত।

এইভাবে, স্কুলের প্রতিটি দিন সীমান্তের জন্য পরীক্ষা হয়ে দাঁড়ায়শারীরিক ক্লান্তি, লজ্জা, আর মানসিক চাপের এক অদৃশ্য বোঝা তার কাঁধে চাপা। তবু সে হার মানে না, কারণ তার স্বপ্ন, তার পড়াশোনা, আর নিজের ভবিষ্যতের জন্য এই সংগ্রাম অপরিহার্য।

দারিদ্রতার গল্প শুনতে শুনতে ক্লান্ত হয়ে গেছেন জানি। আমাদের গল্পের সীমান্তর জীবনে যে শুধু লবনের ছোয়া এমন নয়। চিনির সাধ এসেছিলো।


Comments

Popular posts from this blog

শেষ দৃশ্যপট (১ম অধ্যায় )

ফারাওয়ের অভিশাপ

মৃতের নিশ্বাস