শেষ দৃশ্যপট (৩য় অধ্যায় )
(পর্ব ০৫)
লেখকঃ সিমান্ত সরকার
অভাবের দংশনে
পুষ্টিহীনতায় সীমান্ত
ক্রমশ দুর্বল
হইয়া পড়ে।
শরীর শুকাইয়া
কাঠ হইয়া
যায়। জ্বরে
আক্রান্ত হইলে
প্রতিবেশীরা ডাক্তার
দেখাইতে বলিলেও,
মনু বেগমের
পক্ষে তাহা
সম্ভবপর হয়
না। চিকিৎসাহীন
অবস্থায় সীমান্ত
ঘরে শুয়ে
শুয়ে রোগ
বয়ে বেড়ায়।
জামা-কাপড়
নাই, পুষ্টিকর
আহার তো
দূরের কথা।
সকালে মা
ভাত সেদ্ধ
করিয়া কাজে
যাইয়া পড়েন।
জ্বরে কাতর
সীমান্ত আলু
কচলাইয়া ভর্তা
করিয়া খায়।
শরীর যদি
সামান্য সুস্থ
থাকে, তবে
বিলে গিয়া
ছোট মাছ
ধরিয়া আমিষের
চাহিদা পূরণ
করে। বই
থাকিলেও খাতা
নাই—বইয়ের
পিছনের মলাটেই
অঙ্ক কষে
পড়াশোনা চালাইতে
হয়। তখন
সে চতুর্থ
শ্রেণিতে পড়ে।
বার্ষিক পরীক্ষায়
অকৃতকার্য হয়।
তবে পূর্বে
সে ভালো
ছাত্র ছিল,
তাই প্রধান
শিক্ষিকা তাহার
প্রতি কিছুটা
সহানুভূতিশীল হইয়া
পঞ্চম শ্রেণিতে
উত্তীর্ণ করিয়া
দেন।
ছেঁড়া ইউনিফর্ম
পরিয়া স্কুলে
গেলে সহপাঠীরা
ঠাট্টা করে।
মাথার চুল
বেড়ে গেলে
সেলুনে গিয়া
কাটিবার সামর্থ্য
থাকে না।
মনু বেগম
কেবল দুই
টাকা দেন,
সীমান্ত ব্লেড
কিনিয়া মাথা
ন্যাড়া করে।
দশ টাকা
লাগিলেও সে
টাকাটি এই
অভাবী সংসারে
অনেক বড়
বিষয়।
নেড়া মাথা
লইয়া স্কুলে
গেলে সহপাঠীরা
মাথায় টোকা
মারিয়া বলে—
"চান্দু মাথা
বেল,
আমার সাথে
খেল।
আমার সাথে
না খেললে
বেল দিয়া
মারমু ঢেল!"
এইরূপ ছড়া
কইরা তারা
তাহাকে হাস্যরসের
পাত্রে পরিণত
করে।
গ্রামে প্রবেশ
করিয়াছে বন্যার
জল। চারিদিকে
যতদূর চোখ
যায়, শুধুই
জল আর
জল—পানিতে
থৈ থৈ
করিতেছে গোটা
জনপদ। বসতভিটা,
ক্ষেতখামার, গলি-ঘাট—সর্বত্র জলরাশি
বিস্তৃত। কিন্তু
এই দুর্যোগও
সীমান্তর মনে
আনন্দের সঞ্চার
করিল। হাতে
একখানা বড়শি
লইয়া সে
চলিল মাছ
ধরিতে।
পথে যেইখানে
থামে, সেইখানেই
জল টলমল
করিয়া ছলছল
করিতেছে। কলাগাছের
কাণ্ড কেটে
সে ও
তাহার বন্ধুরা
একখানা ভেলা
প্রস্তুত করিল।
সেই ভেলায়
চড়িয়া লেবু
তলায় লেবু
আনিবার উদ্দেশ্যে
রওনা দিল। বাশ
কেটে বৈঠা বানাইল, তাহাতে পালাক্রমে বৈঠা চালাইয়া সকলেই ভেলাকে ঠেলিয়া ঠেলিয়া অগ্রসর করিতে লাগিল।
পানির উপরে
ছোট ছোট
জলজ গাছ
ভাসিয়া ফিরিতেছে,
কখনো বা
একখানি “জোগ”
(শোল মাছ)
ভেসে বেড়ায়,
আর কখনো
তাহারা কামরিয়া
বসে যায়
ভেলার কোনো
প্রান্তে। কেউ
ব্যথায় কুঁকড়াইয়া
উঠে, আর
অন্যরা হাসিতে
ফেটে পড়ে।
পরক্ষণেই বন্ধুরা
এগাইয়া আসে,
একে অপরকে
সাহায্য করে
সেই “জোগ”
ছাড়াইয়া লইতে।
প্রকৃতির সে
এক অপূর্ব
রূপ—নীলাকাশে
সাদা মেঘের
ভেলা, ধানের
গন্ধে মাখা
হাওয়া, আর
ভেলার উপর
দোলা দিয়া
বসে থাকা
শিশুদের সরল
উল্লাস। সীমান্তর
হৃদয় জুড়াইয়া
যায় এই
অপরূপ দৃশ্য
দেখিয়া। বন্যা
যেন প্রকৃতির
রূঢ়তা নয়,
বরং এক
রহস্যময় রমণীয়
আয়োজন, যেখানে
শৈশব মেতে
উঠেছে নির্ভেজাল
আনন্দে।
হাতে ধরা
বড়শিখানি দেখিয়া
হঠাৎ করিয়াই
ভাই বাপ্পির
কথা মনে
পড়িল সীমান্তর।
স্মৃতির অন্তঃপুর
হইতে এক
দৃশ্য যেন
নিঃশব্দে ধাবিত
হইয়া এল
তাহার চক্ষুপটে।
তখন সে
আরও ছোট,
বয়সে কাঁচা,
কিন্তু হৃদয়ে
ভাইয়ের প্রতি
অকুণ্ঠ ভালোবাসা।
স্মরণে আসে,
একদিন বাপ্পি
বাঁশঝাড় হইতে
একটি সরু
কঞ্চি কাটিয়া
আনিয়াছিল। তাহা
দিয়াই সে
একখানি শিপ
তৈরি করিবার
আকাঙ্ক্ষা লইয়াছিল—মাছ ধরিবে বলে!
বাপ্পির সে
কাণ্ড দৃষ্টি
এড়ায় নাই
ছোট্ট সীমান্তর।
সে তখন
নিজের হাতে
একটি পাটখড়ি
সংগ্রহ করিল,
মাথার প্রান্তে
মায়ের পুরাতন
সেলাইয়ের সুতোর
টুকরাটি বাধিয়া
দিল, আর
সুতোর আগায়
গেঁথে দিল
একটি ছোট্ট
তারকাঁটা। তার
পরপরই, সেই
কাচা হাতের
নির্মিত ছিপখানি
লইয়া বাড়ির
পেছনের পুকুর
পাড়ে গিয়া
বসিল মাছ
ধরিবার আশায়।
তবে মাছ
ধরা তো
দূরের কথা,
হঠাৎ এক
ব্যাঙ সজোরে
টান দিয়া
তাহার সুতো
ছিঁড়িয়া লইয়া
গেল। ছোট্ট
সীমান্ত সেই
সুতো আনিবার
আশায় পাড়
বেয়ে পুকুরে
নামিল। আর
নামিয়াই, পা
পিছলাইয়া পড়িয়া
গেল গভীর
জলে। সাতার
তো জানা
ছিল না,
জলে ডুবিয়া
গেল সে।
চোখ খুলিতে
দেখে, সে
একখানি খাটে
শুইয়া আছে।
তাহার বুক
কাঁপিয়া উঠে।
তখন সে
বুঝিতে পারিল,
সে মরেনি—বাঁচিয়াছে কোন
এক অলৌকিক
করুণায়। কিন্তু
পরক্ষণেই চক্ষু
সমক্ষে উদ্ভাসিত
হইল এক
নিষ্ঠুর দৃশ্য।
তাহার পিতা,
ঘরে দাঁড়াইয়া
তাহার মাকে
অকথ্যভাবে প্রহার
করিতেছে। রক্ত,
কান্না আর
অসহায়তা ছড়াইয়া
পড়িল ঘরের
চারিধারে। সীমান্ত
চুপচাপ, নিঃশব্দে,
কিছু না
বুঝিয়া তাকাইয়া
রহিল।
পরে জানিতে
পারিল, যদি
না পাড়ার
এক প্রতিবেশী
লোক সেই
মুহূর্তে উপস্থিত
হইয়া তাহাকে
পানির মধ্য
হইতে উদ্ধার
করিত, তবে
হয়তো আজ
তাহার এই
শ্বাস, এই
জীবন থাকিত
না। অথচ,
এই ঘটনার
পেছনের কারণও
স্পষ্ট—প্রতিবার,
তাহার মা
যদি সামান্য
প্রতিবাদও করিতেন,
তাহা হইত
তাহার পাপ।
তাহার পিতার
দৃষ্টিতে মা
ছিল চিরকাল
দোষী। সীমান্ত
এই অমানবিকতা
বুঝিবার মতো
বড় হইয়াছে,
কিন্তু শৈশবের
সেই ভয়াবহ
স্মৃতি আজও
তাহার অন্তরে
কাঁটার ন্যায়
বিঁধিয়া রহিয়াছে।
(পর্ব ০৬)
পড়াশোনার খরচ
যোগাইবার নিমিত্তে
সীমান্ত তাহার
জননীর সহিত
এখন তামাক
কারখানার কাজে
অংশগ্রহণ করে।
ক্লাস ফাইভের
পাঠ শুরু
হয় দুপুর
দুইটায়—তদ্দিনে
সকালের প্রহরে
সে মায়ের
সঙ্গে অর্ধেক
বেলা শ্রম
দিয়া, বিকেল
পাঁচটায় পাঠশালার
পাঠ শেষে
পুনরায় কারখানায়
যোগ দেয়,
অতঃপর রাত
দশটায় বাড়ি
প্রত্যাবর্তন করে।
এইরূপ করিয়া
দিন চলিতে
লাগিল, কিন্তু
মাঝে মধ্যে
গভীর রাতে
সীমান্ত জাগিয়া
উঠে দেখে
তাহার মা
বোরকা পরিধান
করিয়া নিঃশব্দে
ঘর হইতে
বাহির হইয়া
যায়। কোথায়
যায় তাহার
মা? কার
সহিত দেখা
করিতে যায়?
—এইরূপ নানাবিধ
প্রশ্ন সীমান্তর
শিশুমনে দোলা
দিতে থাকে।
এক নিশীথে,
দরজা বন্ধ
করিবার ক্ষীণ
শব্দে তাহার
নিদ্রা ভঙ্গ
হইল। আজ
আর সে
চুপিচুপি ঘুমাইয়া
পড়িল না।
সে সিদ্ধান্ত
লইল, আজ
তাহার সকল
জিজ্ঞাসার উত্তর
সে খুঁজিয়া
লইবেই। মা'র পিছু লইল
সে—আলগা
পায়ে, নিঃশব্দে,
যেন বাতাসেরও
শব্দে মা
কিছু টের
না পান।
দেখিল, মা
চলিয়াছেন বাজারের
দিকে। সীমান্তও
ছায়ার ন্যায়
অনুসরণ করিল।
হঠাৎ মা
পথ বদলাইয়া
বাজারের পশ্চাতে
সেই স্থানে
পৌঁছিলেন, যেখান
হইতে লোকেরা
ময়লা ফেলে।
সীমান্ত বিস্ময়ে
বিহ্বল হইয়া
গেল—এই
কী সেই
গন্তব্য? সেখানেই
মা বোরকার
আঁচলে কুড়িয়ে
নিতে লাগিলেন
আধাপচা আলু,
বেগুন, পটল;
যাহা দিনে
বাজারে অবশিষ্ট
পড়িয়া থাকে,
বিক্রেতাগণ যাহা
আর মূল্যহীন
বলিয়া ছুড়ে
ফেলে।
এ দৃশ্য
দেখিয়া সীমান্তর
গলা শুকাইয়া
গেল। সে
স্তব্ধ, হতবাক—তাহার জননী,
এক সম্ভ্রান্ত
বংশের কন্যা,
যিনি দিনের
বেলা লোকলজ্জার
ভয়ে মুখ
দেখাইতে পারেন
না, যিনি
নিজের সম্মানের
কারণে প্রকাশ্যে
এমন কিছু
করিতে পারেন
না—তিনি
রাতের অন্ধকারে
আত্মগৌরবকে আঁচলে
মুড়িয়া এই
নিকৃষ্টতম স্থানে
আসেন, কেবল
তাহার ও
সংসারের ক্ষুধা
নিবারণের জন্য।
সীমান্ত বুঝিল—এই মাটি-মাখা
হাত, এই
পচা সবজি,
এই রাতের
অন্ধকার—সবই
তাহার মায়ের
নিঃস্বার্থ ভালোবাসার
নিঃশব্দ সাক্ষী।
সেই রাতে,
সীমান্তর হৃদয়ে
মায়ের প্রতি
যে ভালোবাসা
জন্ম লইল,
তাহা পূর্বের
সমস্ত অনুভূতিকে
ছাপাইয়া গেল।
সে বুঝিল,
বংশের সম্মান
রক্ষা করা
যায় কেবল
বংশগৌরব লইয়া
নয়, আত্মত্যাগে,
ভালোবাসায়, নিরবে
সংসার টানিতে
জানার গুণে।
সেই রাতে
সীমান্ত বড়
হইয়া গেল—বয়সে নয়,
হৃদয়ে।
সে দিনই
সীমান্ত তাহার
জননীকে বলিল,
— "মা, আর
যেও না
সেইসব ময়লার
স্তূপে। দরকার
পড়িলে এক
বেলা উপবাস
করিয়া থাকিব,
কিন্তু পচা
সবজি আর
নয়।"
জননী মনু
বেগম তাহার
সন্তানের চোখের
দিকে চাহিয়া
মৃদুস্বরে বলিলেন,
— "না রে
বাবা, না
খাইলে শরীরে
শক্তি থাকিবে
কেমনে? আর
শক্তি না
থাকিলে কাজ
করিব কি
করিয়া?"
তাহার মা'র কণ্ঠে এক
ধরণের দৃঢ়তা
ছিল, তবুও
সীমান্তর মনে
এ কথাটি
পাঁজরের গভীরে
বেঁধে বসিল।
সেদিনই মা-ছেলে এক
নূতন পরিকল্পনায়
মন স্থির
করিল।
.jpg)
.jpg)
.jpg)
Comments
Post a Comment