শেষ দৃশ্যপট (২য় অধ্যায়)
(পর্ব ০৩)
লেখকঃ সিমান্ত সরকার
শীতের দুপুর। সূর্যটা যেন কুয়াশার রেশ মুছে গিয়ে আকাশের এক কোণে রূপালী পেতনের মতো জ্বলজ্বল করছিল। বিশাল নীলাকাশে একফোঁটা মেঘও নেই—স্বচ্ছ, নিঃশব্দ, এবং প্রশান্ত। খড়ের গাদার উপর শুয়ে ছিল ছোট্ট সীমান্ত। বয়স কতই বা—চার কিংবা পাঁচ।মুখটি ভাবুক, চোখ দুটি আকাশের দিকে নিবদ্ধ। তার মনে হচ্ছিল, আকাশটা বুঝি পাশের গ্রামের ঘাড়ে নেমে এসেছে। নীল সেই ছায়া কেমন কাছাকাছি দেখাচ্ছে। মনে হলো, একটু হেঁটেই যদি যাওয়া যায়, তবে কি সেই আকাশটাকে ছোঁয়া যাবে?
ছোট পা
দুটি নিয়ে
সীমান্ত হাঁটতে
লাগল—খড়ের
গাদা থেকে
নামল, উঠোন
পেরোল, গ্রামের
শেষ প্রান্তে
গিয়া পৌঁছাল।
কিন্তু আকাশ?
সে তো
এখনও সামনেই!
ঠিক যেন
পরের গ্রামে
ঠেকেছে!
এইভাবে, নিজের গ্রাম ছাড়িয়ে কতদূর যে সে চলে এসেছে, তা সীমান্ত বুঝতেই পারল না। যখন পেছন ফিরে তাকাল, তখন দূরে মাটির ঘরের চাল আর গাছপালা কেবল বিন্দুসম হয়ে দেখা যাচ্ছে। এই প্রথম সে গ্রামের বাইরে এল। পথঘাট অচেনা, মানুষ অপরিচিত। বুকের ভিতর এক অজানা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। সে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে পড়ল, দু’চোখ ভর্তি জল। পিতৃস্নেহহীন এক নিঃসঙ্গতা তাকে ভর করল—সে কি হারিয়ে গেছে?
ঠিক সেই
সময়, হাট
থেকে বাজার
নিয়ে ফিরছিল
মুক্তা। কাঁধে
মুদির থলি,
পায়ে ধুলা
মাখা, চোখে
ক্লান্তির রেখা।
হঠাৎ, রাস্তার
ধারে পরিচিত
মুখ দেখে
থমকে দাঁড়াল।
—
“সীমু!”
সীমান্ত মাথা নিচু করে থাকল, ভয়ে মুখ তুলতে সাহস পেল না। মুখে কোনো কথা নেই, শুধু চোখের কোণে চুপিচুপি অশ্রু। মুক্তা কোনো কথা না বলে শিশুটিকে কাঁধে তুলে নিল। সে ছিল না রুক্ষ, না কোমল। ছিল এক তীক্ষ্ণ অভিমান ও নীরব বেদনার মিশ্রণ। সীমান্ত নিজের ক্ষুদ্র দুই হাত দিয়ে বাবার মাথার চুল আঁকড়ে ধরল—পাছে পড়ে না যায়। পিতা-পুত্র ফিরতে লাগল বাড়ির পথ ধরে। মাথার উপর অনন্ত আকাশ, পায়ের নিচে শীতল মাটি—কিন্তু সীমান্ত জানল না, সে যেই আকাশ ছুঁতে চেয়েছিল, তা কখনো ধরা যায় না। আর তার যাত্রা ছিল এক শৈশবের সরলতা থেকে এক জীবনের বোধের দিকে। ফিরেই যেন বিস্ফোরণ ঘটল। মুক্তার চোখ রক্তিম, কণ্ঠ রুদ্ধ অথচ বিস্ফারিত, আর হাত—তীব্র রোষে কাঁপছে।
“এই সব
কি মনু?
এতোটুকু বাচ্চা
গ্রাম ছেড়ে
একা একা
বের হয়ে
গেলো, তুই
কী করছিলি?”
প্রশ্ন নয়,
যেন রায়ের
ভাষা।
মনু কিছু
বলার আগেই
তার গালে
ঝড়ের মতো
উঠে এলো
এক চড়।
তারপর একের
পর এক,
অব্যাহত প্রহার।
মনু নিরবে সহ্য করলো সব। মুখে কোনো প্রতিবাদ নেই, শুধু এক অসহায় স্তব্ধতা। মুক্তার ঘুষি, ধাক্কা আর গালিগালাজে ঘর যেন কেঁপে উঠছিল। ঘরের কোণে ছোট্ট সীমান্ত, দুটি চোখ ছলছল করছে। বুঝে গেছে—তার আজকের অভিযাত্রার ফলেই মায়ের ওপর এ যন্ত্রণার বর্ষণ। অথচ সে তো শুধু আকাশ ছুঁতে চেয়েছিল!
সে মনে মনে নিজেকে দোষারোপ করতে লাগলো, গাল টিপে কান্না আটকাতে চাইল—কিন্তু পারল না। ভ্যা ভ্যা করে কেঁদে উঠল সে, বুকফাটা কান্নায় ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠল।মুক্তা তখনো থামেনি। মনু একবার পেছন ফিরে তাকাল—সীমান্ত কাঁদছে। হয়তো সেই কান্নার শব্দে মুক্তার রোষ সামান্য প্রশমিত হলো।
ঠিক সেই
মুহূর্তে ঘরে
ঢুকল বাপ্পি—সীমান্তের মেঝ
ভাই, মুক্তার
প্রথম পুত্র।
মুখটা রুদ্ধ,
কিন্তু চোখে
কঠিন প্রতিবাদ।
“চল, আয় সীমু।”
বলে সে
সীমান্তকে কোলে
তুলে নিলো,
যেন এক
অন্তঃস্থল থেকে
রক্ষা করার
চেষ্টা।সীমান্ত বাবার
গলায় ভয়,
মায়ের চোখে
দুঃখ আর
ভাইয়ের কোলে
আশ্রয় খুঁজে
পেলো।বাপ্পি
তাকে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে
গেলো—পেছনে রইল নিঃশব্দে কাঁদতে থাকা মনু, আর এক অভিমানী
পিতা, যার রাগের মুখোশের পেছনে ছিল নিজের অপারগতা, আতঙ্ক আর এক গভীর
ব্যর্থতা।
এক কাঁধে
ছোট ভাই
সীমান্ত, আর
অন্য হাতে
ধরা একটি
বালতি ও
ভাত খাওয়ার
গামলা—বাপ্পি
হাঁটছে পাগল
বিলের দিকে।
চারদিক নিস্তব্ধ,
শুধু মাঝে
মাঝে ঝোপের
ফাঁক দিয়ে
পাখির ডাক
ভেসে আসছে।
সকালে ঘর
থেকে বেরোনোর
সময় মা-বাবার
মারামারি, ঝগড়ার
শব্দে সীমান্ত
কুঁকড়ে গিয়েছিল।
বাপ্পি জানে,
এ ঘরে
শান্তি নেই।
তাই তো
ভাইকে নিয়ে
চলে এসেছে
বিলে—এই
জলকাদার মধ্যে
অন্তত একটু
হাসি, একটু
আনন্দ খুঁজে
পাবে।
বিলে পৌঁছেই
দেখে—মোরাদ
আগে থেকেই
কাদা দিয়ে
ছোট ছোট
আইল বানিয়ে
মাছ ধরার
আয়োজন করে
রেখেছে। সে
বাপ্পিকে দেখে
মুখ ভেঙে
বললো,
—"এই শিমু
রে আনছস
কেন রে
বিলে? কাদায়
পড়ে গেলেই
এক্কেবারে মরার
মতো কান্দবি!"
বাপ্পি থেমে
বললো,
—"ঘরে গ্যালে
কান্দবই বেশি।
আব্বা-আম্মা
আবার কাইজ্জা
ধরছে। ওরে
রাখনের জায়গা
পাই না,
তাই লইয়া
আইলাম।"
মোরাদ কিছু
না বলেই
মুখ ফিরিয়ে
নেয়।
বাপ্পি সীমান্তকে
রেখে গামলা
হাতে পানি
সরাতে ব্যস্ত
হয়ে পড়ে।
সীমান্ত সেই
ফাঁকে এদিক
সেদিক ছোটাছুটি
শুরু করে
দেয়। খালি
পায়ে শিশুটির
দৌড়, কাদায়
পা হড়কায়,
আর বার
বার আইল
ভেঙে ফেলে
দেয়। যে
দিকে আইল
ভাঙে, সেদিকে
জমা পানি
আবার বানের
মতো ফিরে
আসে।
মোরাদ এবার
চিৎকার করে
উঠে,
—"তোর ভাইটারে
না থামাইলে
তো আজ
মাইর খাইতে
হইবো। সব
মাছ ছুটে
যাবে!"
শেষমেশ, মোরাদ
নিজেই গিয়ে
সীমান্তকে ধরে
কাদার মধ্যে
কোমর অবধি
গেঁথে রাখে—নড়তে
না পারে,
দৌড়াতে না
পারে, যেন
একটা বাঁশের
খুঁটির মতো
দাঁড়িয়ে থাকে
শিশুটি।
সীমান্ত কাদা লেপটে দাঁড়িয়ে আছে। সীমান্ত কাদায় গেঁথে দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু অদ্ভুতভাবে তার মধ্যে কোনো ভয় বা অস্বস্তি নেই। বরং সে খেয়াল করে, পানির স্তর ধীরে ধীরে কমছে। কচুরিপানার নিচে লুকিয়ে থাকা ছোট ছোট দাঁড়কিনা মাছ গামলা দিয়ে পানি ফেলার স্রোতে হেলে দুলে জালের দিকে সরে যাচ্ছে। মাছগুলো খুব ছোট, কিন্তু মাথায় যেন মুক্তার মতো একেকটা উজ্জ্বল বিন্দু। সূর্যের আলো যখন সেগুলোর ওপরে পড়ে, মনে হয় যেন তারা পানির রাজ্যে জন্ম নেয়া ক্ষুদ্র রত্ন। সীমান্ত বিস্ময়ভরা চোখে তাকিয়ে থাকে। ঠান্ডা পানি তার কোমর ছুঁয়ে যাচ্ছে, কাদা শরীরের চারপাশে শক্ত হয়ে আছে, কিন্তু অদ্ভুতভাবে একটুও খারাপ লাগছে না। বরং ভালোই লাগছে। যেন সে এক নতুন জগতে গেঁথে আছে—নরম কাদা, জলজ শৈশব, আর এই বুনো প্রকৃতির আলিঙ্গনে আটকে আছে তার শরীর আর মন।
সেদিন প্রচুর মাছ ধরা পড়েছিল। ছোট ছোট দাঁড়কিনা আর কিছু রুই-কাতলা ছানা মিলিয়ে পুরো বালতি ভরে উঠলো। বাপ্পি আর মোরাদের মুখে প্রশান্তির হাসি। মনে মনে ভাবলো, “আজ মা-বাবা আমাদের দেখে খুশি হবে।” কিন্তু বাড়ি ফিরে সেই প্রত্যাশার দ্যুতি মিলিয়ে গেলো এক দমকা হাওয়ায়। দেখে—মনু বেগম মাটিতে শুয়ে, মুখে কান্নার রেখা, চোখ ফুলে ওঠা। পাশে বসে আছেন মুক্তা সরকার, চৌকির উপর আধশোয়া হয়ে, ঠোঁটের কোণে তামাকের পাইপ। চুপচাপ, কোনো কথা নেই। মোরাদ আর বাপ্পি বোকার মতো দাঁড়িয়ে থাকলো কিছুক্ষণ, তারপর ধীরে ধীরে বালতিটা মায়ের পাশে রাখলো। কিছু বললো না, শুধু চোখে এক অদ্ভুত শূন্যতা। সীমান্ত তখনো বাপ্পির কাঁধে। শীতল আর কাদামাখা শরীরটা তার ভাইয়ের কাঁধে জমে আছে। এরপর তারা তিন ভাই একসাথে রওনা দিলো পুকুরপাড়ের দিকে, গোসল করতে।
কদিন দুপুরের পর হঠাৎ করেই চিঠি এলো। মোরাদের বাবা—যে বহু বছর আগে সংসার ভেঙে চলে গিয়েছিলো—সে নাকি আরেকটা বিয়ে করেছে। নতুন স্ত্রী নাকি নিজের দায়িত্বে মোরাদকে ফিরিয়ে আনতে চায়, সংসারে ফিরে এসে ছেলে যেন তার বাপের পাশে দাঁড়ায়। তখন মোরাদের বয়স ঊনিশ। একটা বয়স যেখানে স্বপ্ন থাকে, আবার বাস্তবতার বেলতলায় স্বপ্ন ভেঙেও যায়। ভবিষ্যতের আশায়, একটু ভালো থাকার আশায়, মোরাদ চলে গেলো। চোখের জলের নিচে মাকে ফেলে রেখে।
এক বছর
কেটে গেলো—না
কোনো খবর,
না কোনো
পদধ্বনি। হঠাৎ
এক বিকেলে
ঝড়ের মতো
সে ফিরে
এলো—পাশে
এক অল্পবয়সী
বউ। সবাই
অবাক। মোরাদের
নতুন মা—সেই
সৎমা—নিজ
উদ্যোগে এই
বিয়ে করিয়েছে।
কারণ খুব
পরিষ্কার: সংসারে
একজন পুরুষ
মানেই একজন
উপার্জনক্ষম মানুষ।
মনু বেগম ছেলের চোখে তাকিয়ে বুঝে গেলেন, এই বিয়ে তার স্বপ্নভঙ্গের সূচনা। এক মায়ের দীর্ঘশ্বাস চুপচাপ আকাশে মিশে গেলো। তিনি বললেন না কিছুই, শুধু ভেতরে ভেতরে বুঝে ফেললেন—এই বিয়ে আসলে তার প্রাক্তন স্বামীর কৌশলী এক আঘাত। শান্ত মাথায় দেওয়া বাঁশ, যাকে বলে! কিছুদিন মোরাদ তার নববধূকে নিয়ে নানা বাড়িতে রইলো। সেই ঘরে, যেখানে সে বড় হয়েছে, যে উঠানে কাদা দিয়ে খেলতো। নতুন বউ ছোট, লাজুক কিন্তু খ্যাপাটে স্বভাবের। সে তার ছোট দেবর সীমান্তকে টিপটিপ হাসিতে বলতো:
— “শিমু,
এই নে
দুই টাকার
নোট, পাখি
ওয়ালা। দে
তো শুনি
আমারে ডাহ!”
সীমান্ত
লজ্জায় কুঁকড়ে
যেতো, গাল
লাল হয়ে
উঠতো, অথচ
তার চোখে
একটা মিষ্টি
জেদ দেখা
যেতো। সে
ভাবতো, “বউ
মানেই এমন
বুঝি—মিষ্টি,
বুদ্ধিদীপ্ত, আবার
বিরক্তিকরও।”
এইভাবে ক’দিন
কেটে গেলো।
তারপর এক
সকালে দেখা
গেলো—মোরাদ
আর নেই।
ফিরে গেছে
বউকে নিয়ে
তার নতুন
সংসারে, সেই
সৎ মায়ের
আঁচলের নিচে।
উঠানটা আবার শুন্য, মনু বেগম আবার একা। সীমান্ত জানালার ফাঁক দিয়ে আকাশ দেখে, ভাবে—মোরাদ কি ফের আসবে? মোরাদ যাবার আগে সীমান্তর জন্য একটা স্মৃতি রেখে গেলো—একটা ছবি। পুকুরপাড়ে, ঝাউগাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে ক্যামেরায় বন্দী হলো শিমুর ছোট্ট মুখটা। আগেও কখনো ক্যামেরা দেখে নি সে। মোরাদ খুশিমনে বলেছিলো, “এইটা আসল ক্যামেরা রে শিমু! দশ টাকায় স্টুডিও থেকে ভাড়া আনছি, মনে রাখবি!”
সীমান্তের
চোখে তখন
বিস্ময়। কী
করে একটা
বাক্স এত
কিছুর স্মৃতি
ধরে রাখে!
সে ছবিতে
হেসেছিলো, হেসেছিলো
ঠিক যেমন
করে সে
ভাইয়ের কোলে
চড়ে হেসে
উঠে গ্রাম
ঘুরতো।
(পর্ব ০৪)
কিন্তু ছবির স্মৃতি স্থির, আর বাস্তব জীবন চলে যায়। মোরাদ চলে গেলো নতুন জীবনে, নতুন পরিবারের টানে। পিছে পড়ে রইলো শিমু—একটা শূন্যতা নিয়ে। বাপ্পি পাশে ছিলো বটে, কিন্তু মোরাদ যেন ছিলো এক অন্যরকম আশ্রয়। মা-বাবা যেখানে ব্যস্ত সংসারের ক্লান্তিতে, সেখানে দুই ভাই—মোরাদ আর বাপ্পি—ছিলো সীমান্তর ছোট্ট জগতের সূর্য আর চাঁদ। স্মৃতির পাতায় ভেসে ওঠে একেকটা মুহূর্ত—মেলার মাঠ থেকে মাটির হাতি, ঘোড়া, টোপোলা কিনে এনেছে মোরাদ। কখনো বরফ-নারকেল দেওয়া ঠান্ডা আইসক্রিম। বাবার কাছ থেকে টাকা না পেলে, বাপ্পি আর মোরাদ শুপারি বিক্রি করে সেই স্বাদ এনে দিয়েছে ছোট ভাইয়ের মুখে।
কিন্তু আজ, বিকেল বেলা উঠানে বসে একা চুপ করে থাকে সীমান্ত। কাঠের জানালার ফাঁক দিয়ে রোদ গড়িয়ে পড়ে তার মুখে, তবুও মনটা যেন রোদের ছায়ায়ও একা হয়ে থাকে। তখন সে ছবির কথা ভাবে—পুকুরপাড়ে, সেই ক্লিক শব্দের মুহূর্তটা। সীমান্ত বুঝে যায়, ভালোবাসা শুধু পাশে থাকার মধ্যে না, কিছু ভালোবাসা ক্যামেরার ছবির মতো—ধরে রাখে, কিন্তু ছুঁতে পারে না।
কিছুদিন জেতে না জেতেই মুক্তা সরকার ধরা পড়লো এক দুর্ভাগ্যজনক রোগে—এলার্জি। প্রথমে হালকা চুলকানির মতো লাগতো, ধীরে ধীরে সেই চুলকানি রূপ নিলো ভয়ানক ঘায়। হাতে-পায়ে চামড়া উঠে যেতে লাগলো, রক্ত-মাখা ফোসকা। কাজের লোক মুক্তা এখন কোনো ভারী জিনিস তুলতেই পারে না। ডাক্তারের ওষুধে কাজ হলো না, কবিরাজের ঝাঁড়-ফুঁকও ব্যর্থ। এই রোগ যেন তাকে শুধুই অসুস্থ করছে না—টেনে নিচ্ছে দারিদ্র্যের অতল গহ্বরে। সংসারে টান পড়লো চাল-ডালেও। এমন অবস্থায় মনু বেগম ছুটে গেলো পাশের বাড়ির এক বদমেজাজি মহিলার কাছে। ২০% সুদে টাকা নিলো, কোনো উপায় ছিলো না।
কিন্তু
সুদের টাকা যেমন দ্রুত আসে, তেমনি দ্রুত ফুরিয়ে যায়। সংসার চালানো তো দূরের কথা,
ওষুধ কেনার টাকাও থাকলো না। মুক্তা মাঝে মাঝে রোগ কমলে কাজে যেত, আবার দুইদিন না যেতেই হাতে
ঘা, পায়ে ফোসকা।
মনু
তখন বললো, “তোমার বাড়ি যাও, জমি বিক্রি করে কিছু টাকা নিয়ে আসো।”
মুক্তা কোনো জবাব না দিয়ে নাকি
মুখে বলে, “আজ কাজ আছে।”
সে বাড়ি
না গিয়ে
চলে যায়
গ্রামের পাশের
ঝোপঝাড়ঘেরা একটা
বাগানে। সেখানে
একটা পুরনো
গামছা বিছিয়ে
শুয়ে থাকে
ঘণ্টার পর
ঘণ্টা। আকাশের
দিকে তাকিয়ে
হয়তো ভাবে—এই
জীবনটা ঠিক
কোথায় বাঁক
নিয়ে গেলো?
সন্ধ্যায়
ফিরে এসে
বলে, “আজ
হাজিরা পাইনি।
কাজ দেই
নাই।”
মনু জানে,
মিথ্যে। তবুও
কিছু বলে
না।
তার বুকের
ভেতর জমে
থাকা ঝড়
একদিন যেন
অশান্ত ধ্বনিতে
ফেটে পড়ে।
— “তোমার
কারণে আজ
আমার ছেলেরা
না খেয়ে
থাকে! আমি
কি করবো?
বাবা মরে
গেছে, ভাই
আলাদা সংসার,
কোথায় যাবো?”
মুক্তা মুখ নিচু করে চুপ করে থাকে। সে জানে না, এ ব্যথার উত্তর কীভাবে দেওয়া যায়, ঘরে খাবার নেই, চাল মাত্র এক কাপ, ছেলেরা ক্ষুধায় কাঁদে।
এভাবেই মুক্তার সংসারে এক
টানা দুর্যোগ
শুরু হলো—না
গায়ের ঘা
সারে, না
ভাগ্যের ঘা।
বাপ্পি আর
সীমান্ত—দুজনেই
ছিলো বেশ
মেধাবী ছাত্র।
বাপ্পি তখন
সপ্তম শ্রেণিতে,
আর সীমান্ত
চতুর্থ শ্রেণিতে
পড়ে। তাদের
স্কুলে কখনোই
ক্লাস রোল
দশের উপরে
উঠেনি। লেখাপড়ায়
আগ্রহ আর
মনোযোগে মনু
বেগমের আশা-ভরসা
ধীরে ধীরে
স্থান করে
নেয় এই
দুই ছেলের
উপর, বিশেষ
করে মোরাদের
উপর ভরসা
উঠে যাওয়ার
পর।
একদিন মাঠে
ফুটবল খেলছিল
বাপ্পি। খেলার
উত্তেজনায় ভুল
করে সে
প্রতিবেশী মেয়ে
মুক্তির পায়ে
কিক করে
বসে। মুক্তির
পা মচকে
যায়। সে
কাঁদতে কাঁদতে
বাড়ি ফিরে
গিয়ে তার
মাকে অভিযোগ
করে। পরদিন
মুক্তির মা
এসে মুক্তার
কাছে বিচার
চায় এবং
দাবি তোলে
চিকিৎসার খরচ
হিসেবে জরিমানা।
অভাবগ্রস্ত
সংসারে এই
দাবিতে মুক্তার
রাগ চরমে
ওঠে। সে
বাঁশঝাড় থেকে
একটা কঞ্চি
কেটে আনে
আর বাপ্পিকে
ধাওয়া করে।
গোটা পাড়া
সেই দৌড়ঝাঁপের
দৃশ্য দেখে।
যেখানেই বাপ্পিকে
ধরে, সেখানেই
বেদম মারধর
করে। বাপ্পি
প্রাণভয়ে দৌড়ে
বেড়ায়।
এক পর্যায়ে
মনু বেগম
আর সহ্য
করতে না
পেরে ছেলেকে
বাঁচাতে স্বামীর
সাথে হাতাহাতিতে
জড়িয়ে পড়ে।
পরিস্থিতি তখন
সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত।
হঠাৎ মনুর
বড় ভাই,
যিনি মদ্যপ
অবস্থায় বাড়িতে
এসেছিলেন, এই
অবস্থা দেখে
ক্ষিপ্ত হয়ে
ওঠেন। তিনি
মুক্তাকে গালিগালাজ
করে বলে
ওঠেন, “লজ্জা
করে না
ঘর জামাই
থাকতে?”
এই কথা
মুক্তার আত্মসম্মানে
চোট দেয়।
নিজ বাবার
ভরা সংসার,
জমিজমা ছেড়ে
শ্বশুরবাড়িতে থাকা
মুক্তা সেই
অপমান সহ্য
করতে পারে
না। রাগে-দুঃখে
প্রিয় পুত্র
বাপ্পিকে সঙ্গে
নিয়ে নিজ
গ্রামে ফিরে
যাওয়ার সিদ্ধান্ত
নেয়। যাবার
সময় মনুকে
কেবল এতটুকুই
বলে, “তুই
লগে আইলে
আয়, না
আইলে না
আই।” এরপর
হন হন
করে বাপ্পিকে
সঙ্গে নিয়ে
বাড়ি ছেড়ে
বেরিয়ে যায়।
সেইদিন সীমান্ত
ছিলো স্কুলে।
বাড়ি ফিরে
দেখে তার
মা মনু
বেগম কান্নায়
ভেঙে পড়েছেন।
ছোট্ট মনে
দুঃশ্চিন্তা দানা
বাঁধে। ভাই
কই? বাবাই
বা কই?
জিজ্ঞেস করলে
মনু কোনো
জবাব দিতে
পারেন না।
পাশ থেকে
মামাতো বোন
জানিয়ে দেয়,
“তর ভাইরে
তোর বাবা
লইয়া গ্যাছে
দাদা বাড়ি।”
সীমান্তর
ছোট হৃদয়
তখন ভেঙে
যায়। ভাবে,
বাবা শুধু
ভাইকেই নিয়ে
গেলো, তাকে
নয়। এক
বিষণ্ন নিঃসঙ্গতা
তাকে ঘিরে
ধরে। এই
সংসারে প্রিয়
সন্তানরা একে
একে হারিয়ে
যাচ্ছে—মোরাদকে
তার বাবা
নিয়ে গেছে
আগেই, এবার
বাপ্পিকেও নিয়ে
গেলো মুক্তা।
মনু বেগমের
পাশে এখন
শুধু সীমান্ত।
একা, নিঃসঙ্গ,
উপেক্ষিত সীমান্ত।
পনেরো দিন
অতিক্রান্ত, মুক্তা
আর ফিরিয়া
আসে নাই।
বাধ্য হইয়া
মনু বেগম
বোরখা পরা
শুরু করিলেন।
একদিন তাহার
মাতা টুলি
জিজ্ঞাসা করিলেন,
— "জামাইরে আনতে
গেছিলি নাকি
রে?"
মনু বেগম
দীর্ঘশ্বাস ছাড়িয়া
কহিলেন,
— "কি করিব
মা? অভাবের
সংসারে রাগ
করিয়া গিয়াছে,
এখন যদি
সে রাগ
না ভাঙ্গে,
তবে আর
কিইবা করিবার
আছে?"
মায়ের এই
কথায় পাশে
দাঁড়াইয়া থাকা
সীমান্ত উচ্ছ্বসিত
কণ্ঠে বলিল,
— "মা, মা!
অষ্টমী হইতেছে,
মেলা বসিয়াছে।
আব্বারে আনার
সময় আমার
জন্য একটা
বন্দুক আনিস,
হ্যাঁ?"
মনু বেগম
চোখের কোণে
জল চেপে
গলায় দৃঢ়তা
আনিয়া শ্বশুরবাড়ির
দিকে রওনা
হইলেন।
সন্ধ্যার কিছু
আগে বাড়ির
পেছনের রাস্তার
ধারে লুকোচুরি
খেলিতেছিল সীমান্ত।
হঠাৎ সে
দেখিল দূর
হইতে বোরখা
পরা তার
মায়ের ছায়া
আসিতেছে। উচ্ছ্বসিত
হইয়া দৌড়াইল,
কিন্তু কাছে
যাইয়া দেখে,
মা আসিতেছেন
একা—না
আছে বাবা,
না আছে
ভাই।
ছোট্ট মন
প্রশ্ন ছুড়িয়া
দিল,
— "বাবা কোথায়
মা? ভাই
কই? আর
আমার বন্দুক?"
মনু বেগম
কিছু বলিলেন
না। সীমান্ত
লক্ষ্য করিল,
মায়ের বোরখার
নিচে কাদার
ছোপ লেগে
আছে—যেন
কেউ মাটিতে
পড়ে গিয়াছে,
সেই রকম।
ততক্ষণে মনুর
মা টুলি
ছুটিয়া আসিয়া
বলিলেন,
— "কি হইছে
মনু? তোর
এই দশা
কেন? কে
করল এইসব?"
মনু বেগম
হাউমাউ করিয়া
কাঁদিতে কাঁদিতে
বলিলেন,
— "নিতে গিয়েছিলাম।
কিন্তু ওর
বড় ভাইয়ের
বউ আর
ছোট ভাইয়ের
বউ আমাকে
মারধর করিয়া
ঘর হইতে
তাড়াইয়া দিল।
মুক্তা আর
ফিরিবে না।
আমাকেও ওখানে
লইয়া যাইবে
না।"
তারপর কণ্ঠস্বর
আরও ভাঙ্গিয়া
গেল,
— "সম্পত্তির লোভে
মুক্তার ভাই
আর চাচা
ওকে ভুল
পথে চালাইতেছে।
মুক্তা যেহেতু
সবসময় সম্পদের
প্রতি উদাসীন
ছিল, তাই
এই সুযোগে
তাহারা ওকে
একপ্রকার বন্দী
করিয়া ফেলিয়াছে।
বাপ্পিকে সেখানে
এক স্কুলে
ভর্তি করাইয়া
দিয়াছে। ওর
মা কিংবা
ভাইয়ের সঙ্গে
আর যোগাযোগ
রাখিবার উপায়
রাখে নাই।
এখন আর
বাপ্পিও ফিরিবে
না… আমার
বাপ্পিও না…"
মনুর
বুকফাটা কান্নার ধ্বনি ধীরে ধীরে মিলাইয়া গেল। পাশে দাঁড়ানো সীমান্ত যেন কিছুই বুঝিতে পারিল না—শুধু বোবা
চোখে তাকাইয়া রহিল মায়ের ভেজা মুখখানির দিকে।
মুক্তা সরকার
এখন রয়েছেন
রাজার হালে।
প্রতিদিন বাজারে
যান লুঙ্গির
এক প্রান্ত
হাতে টানিয়া
ধরিয়া, অপর
হাতে তামাক
বিড়ি টানিতে
টানিতে। সরকার
বাড়ি প্রতিদিন
রুই, কাতলা,
গরু কিংবা
খাসির মাংসের
সুবাসে মৌ
মৌ করিয়া
ওঠে। বড়
ভাইয়ের স্ত্রী
আর ছোট
ভাইয়ের স্ত্রী
যেন রাজমহলের
দাসীদের মতো
করিয়া সেবা
করে চলেছে
মুক্তার।
মুক্তা মনে
মনে হাসিয়া
বলে,
— “ধুর ছাই!
শ্বশুরবাড়ির কষ্টের
জীবনের চেয়ে
এই তো
ভালো! সুখেই
আছি নিজ
বাড়িতে।”
তার বড়
ভাই যখন
যেই কাগজে
সাক্ষর করিতে
বলে, মুক্তা
একবারও না
ভেবেই সেখানে
স্বাক্ষর করিয়া
দেয়। সুখে
রাখিবার লোভ
দেখাইয়া তাহার
দুই ভাই
গোপনে একে
একে মুক্তার
জমিজমা বিক্রি
করিতে থাকে।
কিছুদিন পরে
মুক্তার চোখে
পড়ে, কেবল
তারই সম্পত্তি
বিক্রি হইতেছে—অন্য ভাইদের
নয়।
মুক্তা তখন
প্রতিবাদ করিলে,
বাড়িতে তাহার
আর ঠাঁই
থাকে না।
নতুন যে
পাকা দালান
বাড়িটি উঠিয়াছে,
তাহা মুক্তার
জমি বিক্রির
টাকায় হলেও
নাম কেবল
বড় ভাই
আর ছোট
ভাইয়ের। অবশেষে
বাধ্য হইয়া
মুক্তা আশ্রয়
নেয় পুকুরপাড়ে
মাছ পাহারার
একটি ছোট
ঘরে।
সেই ঘরেই
এখন তাহার
দিন কেটে
যায়। প্রতিদিন
সকালে ও
দুপুরে মুক্তার
মা দুই
বেলা খাবার
দিয়া যান
পুত্রের জন্য।
নিঃসঙ্গ জীবনে
পুকুরপাড়ে, সেই
প্রাচীন বটগাছের
ছায়ায় থাকতে
থাকতে মুক্তার
মনে জন্ম
নেয় একপ্রকার
আধ্যাত্মিক অনুভব।
ক্রমে সে
কবিরাজি শুরু
করিয়া দেয়।
আশপাশের লোকেরা
রোগ সারানোর
আশায় আসিতে
থাকে তাহার
নিকট।
ধীরে ধীরে
মুক্তা মানুষজনের
দুঃখ-ব্যথার
ওষুধ দিতে
শুরু করে।
সামান্য দক্ষিণা
দেয় কেউ
কেউ। কিন্তু
সে অর্থে
তাহার আগ্রহ
থাকে না।
পরিবার, সন্তান—এ সবের প্রতি
তার আর
কোনো টান
থাকে না।
একাকিত্বেই যেন
এখন তাহার
শান্তি। বটগাছের
ছায়ায় বসিয়া
বিড়ি টানিতে
টানিতে সে
যেন অন্য
এক জগতে
বিচরণ করে।
মুক্তা সরকার
এখন আর
জমিজমা বিক্রি
করেন না।
এই কারণে
তাহার উপর
ক্ষোভ জন্মায়
দুই ভাইয়ের।
তবে সেই
রাগ তারা
প্রকাশ করে
মুক্তার নিষ্পাপ
পুত্র বাপ্পির
উপর।
বাপ্পি এখন
চাচা ও
জেঠার ঘরে
থাকিয়া পড়াশোনা
করে। কিন্তু
দিনযাপনে তাহার
অবস্থা যেন
বাড়ির এক
চাকরের মতো।
ঘরের কাজ,
বাজারসদাই, বই করতে
হয় তাহাকে। রাতের বেলায় সে আশ্রয় নেয়
দাদির কক্ষে। একমাত্র দাদিই তাহার প্রতি স্নেহ ও মমতা দেখান।
কিন্তু ভাত খেতে হয় চাচা-জেঠার
ঘরে, অবজ্ঞা ও অসম্মানের মাঝখানে।
একদিন দুপুরে,
তাহার জেঠা
বড় একটি
মাটির হাড়ি
মাথার উপর
তুলিয়া দেয়।
উচ্চ স্বরে
বলে ওঠে,
— “যা পুকুরে
গিয়া মাছদের
খাবার দে!”
এক থাপ্পড়
পিঠে সপাং
করিয়া বসে।
বাপ্পি চোখে
জল চাপিয়া
রাখে, মাথায়
ভারি হাড়ি
তুলিয়া চুপচাপ
পুকুরপাড়ে যায়।
সেখানে গিয়া
দেখে, তাহার
বাবা মুক্তা
বসে আছেন
সেই পুরাতন
বটগাছের ছায়ায়,
চুপচাপ, নিবিষ্ট।
বাপ্পি ভাঙা
গলায় বাবার
কাছে সমস্ত
অভিমান ও
কষ্ট উজাড়
করিয়া দেয়—কিভাবে তাকে
দিয়ে কাজ
করানো হয়,
কেমন করে
অপমান করা
হয়, কতটা
কষ্টে সে
দিন কাটায়।
কিন্তু মুক্তা
কিছুই বলে
না। যেন
কিছু শোনেনই
না। হয়তো
শুনেন, কিন্তু
বুঝিবার চেষ্টা
করেন না।
যেন এই
জাগতিক কোলাহল
এখন তাহার
অনুভবের বাইরে।
আধ্যাত্মিক জগতে
ডুবে থাকা
মুক্তা ছেলের
আর্তনাদেও আর
সাড়া দেন
না।
অভাবের সংসারে
দিন আর
চলিতেছিল না।
শেষমেশ মনু
বেগম বাধ্য
হইয়া ছোট
ছেলে সীমান্তকে
মুক্তার বাড়িতে
রাখিয়া আসেন।
বাপ্পিকে পাশে
পাইয়া সীমান্ত
আনন্দে আত্মহারা।
প্রতিদিনই সে
বাবার কাছে
গিয়া বলে,
— "বাবা, চলো
না, আমরা
বাড়ি যাই।"
কিন্তু মুক্তার
মন গলিত
না। সীমান্ত
ও বাপ্পির
উপস্থিতি তাহার
সহ্য হয়
না। ধুর
ধুর করিয়া
তাড়াইয়া দেয়।
কিন্তু ছোট্ট
সীমান্ত বোঝে
না যে
তাহার বাবা
আর তাহাদের
চাহেন না।
সে ভাবে,
এখনও বুঝি
পূর্বের কোনো
অপরাধের কারণে
বাবা রাগ
করিয়া আছেন।
দাদাবাড়ির পার্শ্বেই
সীমান্তর খালার
বাড়ি। মাঝে
মাঝে খালাতো
বোনদের সঙ্গে
খেলা করে
সে। এক
সপ্তাহের মত
খালার বাড়িতে
থাকিল সে।
কিন্তু ধীরে
ধীরে খালার
মনোভাবও পরিবর্তিত
হইতে থাকিল।
খাওয়ার সময়
খালার ডাক
আর আসে
না। চুপি
চুপি খালার
নিজের সন্তানদের
খাইয়ে হাড়িখালি
করে ফেলা
হয়, আর
সীমান্তকে বলা
হয়—
— "বাড়ি ফিরা
যা,
ছোট একটি
শিশু, এতটা
পথ কীভাবে
ফিরিবে? অসহায়ভাবে
সে দাদির
কাছে গিয়া
খাদ্যের আকুতি
জানায়। বৃদ্ধা
দাদি নাতির
প্রতি হৃদয়ের
টান উপেক্ষা
করিতে পারেন
না। যদিও
বাড়িতে কেবল
বাপ্পির ভাত
বরাদ্দ থাকে,
তবুও মাঝে
মাঝে হাড়ি
থেকে চুরি
করিয়া কিছু
ভাত সীমান্তকে
খাওয়ান তিনি।
কখনো কখনো
খাবার বলতে
থাকে কেবল
পান্তা, পোড়া
শুকনো মরিচ
আর লবণ।
বিশ দিন
পর একদিন
মনু আসে
ছেলেকে দেখতে।
মুক্তার মা
পুত্রবধূর পা
জড়াইয়া ধরিয়া
কাঁদিতে কাঁদিতে
বলে,
— "মা, আমার
ছেলে পাগল
হইয়া গেছে।
দয়া করিয়া
তুমার এই
ছোট পুত্রটিকে
লইয়া যাও।
কেহ তাহাকে
আপন করিতেছে
না।"
মনুর অন্তর
বিদীর্ণ হইয়া
যায়, তবুও
সে তাহার
ছোট ছেলেকে
সঙ্গে লইয়া
যায় না।
ভাবে, হয়তো
এই দুঃখ-যন্ত্রণা স্বামীর
হৃদয় গলাবে,
সে ফিরিয়া
আসিবে, সংসার
আবার গড়িয়া
উঠিবে।
কিন্তু সময়ের
সঙ্গে সঙ্গে
খালার বাড়ি
হোক কিংবা
দাদার বাড়ি—সর্বত্র সীমান্তের
ভাত উঠিয়া
যায়। একদিন
বাবার কাছে
যায় সে,
দশ টাকা
চায় বাড়ি
ফিরিবার ভাড়ার
জন্য। মুক্তা
টাকা দেয়
না। খালার
কাছেও গিয়া
হাত পাতে,
খালাও ফিরিয়ে
দেয়।
বাধ্য হইয়া,
নিরুপায় সীমান্ত
বিশ কিলোমিটার
পথ হেঁটেই
মায়ের বাড়িতে
ফিরিয়া আসে।
হাঁটার ক্লান্তিতে
তাহার পা
ফুলিয়া যায়।
গাড়িতে বসিয়া
যে সকল
গাছ, দোকান
ও মাঠ
সে চোখে
দেখিত, সেগুলিকে
স্মরণে রাখিয়া
একা একা
পথ চলে।
অবশেষে ফিরে
আসে আপন
মায়ের কোলে।
সব কথা
শুনিয়া মনু
বেগম নিঃশব্দে
নিজের ভাগ্যকেই
মেনে লয়।
.jpg)
.jpg)
.jpg)
Comments
Post a Comment