শেষ দৃশ্যপট (৫ম অধ্যায় )

(পর্ব ০৯)

সীমান্ত যখন ক্লাস ৬-এ উঠল, তখন তার ছোট্ট হৃদয়ে একটি নতুন আবেগের উত্থান হলো। স্কুলের পরিচিত জনকুলের মাঝে একটি মুখ তাকে আকৃষ্ট করত—উজ্জ্বল শ্যামলা গায়ের রঙ, উচ্চতায় একটু খাটো, গালের নিচে খুনসুটি-সদৃশ কালো জন্মদাগ, গভীর মায়াবী চোখ এবং ঘন, লম্বা, কালো চুল—তার নাম রঞ্জিতা। সীমান্তের চোখে সে যেন সেই স্কুলের আলোকে আরও উজ্জ্বল করে তুলেছিল। প্রতিদিন ক্লাসে তার দিকে তাকাতে তার বুকটা অজান্তেই ধুকধুক করত, আর কোনো কোনো সময়ে স্নিগ্ধ হাসি যেন তার মনকে নতুন রঙে রাঙিয়ে দিত।

দেখতে দেখতে কয়েকটি বছর কেটে যায়। সীমান্তের হৃদয়ে রঞ্জিতার জন্য যে স্নিগ্ধ স্নেহ ও আকর্ষণ জন্মেছে, তা দিনে দিনে গভীর হয়ে ওঠে। তবে সে কখনোই নিজের অনুভূতিগুলো প্রকাশ করতে পারে না; সাহসই নেই। ময়লা পোশাকে, ছেঁড়া প্যান্ট পড়ে এমন এক মেয়ের সামনে দাঁড়িয়ে সে জানে, সে তার মনকথা কখনো বলতে পারবে না।

ক্লাসের অন্যান্য ছেলেরা রঞ্জিতার সঙ্গে আড্ডা দেয়, কথা বলে, কিন্তু সীমান্ত ক্লাসের শেষ ব্যাঞ্চে চুপচাপ বসে থাকে। দশ ব্যাঞ্চের দূরে থাকা রঞ্জিতার দিকে তার নজর স্থির। মাঝে মাঝে সে রঞ্জিতার শরীরের দিকে তাকায়, কিন্তু রঞ্জিতার চোখ পেছনের দিকে ঘুরলে সীমান্ত দ্রুত তাকানো বন্ধ করে দেয়, লজ্জা ও দ্বিধায় চোখ নামিয়ে নেয়।

যৌবনের ছোঁয়া তখনও সীমান্তের বয়সে আসে নি, তবে রঞ্জিতার দেহ স্পষ্টভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে—বুকের আকৃতি ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে। ক্লাসের অন্যরা সেদিকে লক্ষ্য রেখে বোঝার চেষ্টা করে, কেউ কেউ গোপনে প্রশংসাও করে। সীমান্তের মন তখন বেশ খারাপ হয়; সে জানে, যদি কেউ জানে যে সে রঞ্জিতাকে ভালোবাসে, সবাই তার ওপর হাসি-তামাশা করবে। তাই সে চুপচাপ থাকে, নিজের অনুভূতিকে হৃদয়ে লুকিয়ে রাখে।


(পর্ব ১০)

সাল ২০১৫। সীমান্তর বড় ভাই বাপ্পি হঠাৎ গ্রামের বাড়ি থেকে পালিয়ে এসে মায়ের কাছে আসে। এতদিন তার বাবা বাপ্পিকে আসতে দেয়নি। বাপ্পি যখন জানতে পারে, তার ছোট আদরের ভাই সীমান্ত কত পরিশ্রম করছে, তামাকের কারখানায় কাজ করে, অভাবের সঙ্গে লড়াই করছে, তখন তার মন ভেঙে যায়। নিজের পড়াশোনা স্থগিত রেখে সে বলে, “তুই আজ থেকে প্রতিদিন স্কুলে যাবি, আমি কাজ করব।

মনোয়ারা বেগম মেঝো ছেলেকে অনেক বোঝান, “তুই পড়াশোনা বন্ধ করিস না, নিজের ভবিষ্যতের জন্য শিখ।কিন্তু বাপ্পি একেবারেই মায়ের কথার প্রতি কোনো মনোযোগ দেয়নি। দিনের পর দিন সে কেবল নিজের মনোবেদনা অসহায়ত্বের সঙ্গে লড়াই করতে করতে, ধীরে ধীরে নিজের বাবাপ্রতি ঘৃণা জন্মাতে শুরু করে।

সীমান্তর জীবনে নতুন এক অধ্যায় শুরু হলো। রাজমিনিস্ট্রির সহকারির কাজে প্রতিদিন ১৫০ টাকা পারিশ্রমিক পেয়ে বাপ্পি ধীরে ধীরে পরিবারে আর্থিক কিছুটা স্থিতি আনতে শুরু করে। খাবারের মান আর ঘরের পরিবেশেও সামান্য পরিবর্তন আসে। এদিকে সীমান্ত প্রতিদিন নিয়মিত স্কুলে যায়। প্রথমদিকে তিনি ক্লাসমেটদের সঙ্গে মিশতে দ্বিধা বোধ করলেও, ধীরে ধীরে সবাইর সঙ্গে তার সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

স্কুল জীবনের এই নতুন আনন্দ সীমান্তের জন্য একেবারেই ভিন্ন। পড়াশোনার প্রতি মনোযোগ, নতুন বন্ধু, নতুন আশাসব মিলিয়ে তার জীবন এক রঙিন ছোঁয়া পায়। সামনে এসএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি চলছেই। প্যারাগন কোচিংয়ে ভর্তি হয়ে সীমান্ত নিজের স্কুলের বাইরেও সহপাঠিদের সঙ্গে পরিচিত হয়।


Comments

Popular posts from this blog

শেষ দৃশ্যপট (১ম অধ্যায় )

ফারাওয়ের অভিশাপ

মৃতের নিশ্বাস