শেষ দৃশ্যপট ( ৬ষ্ঠ অধ্যায়)
(পর্ব ১১)
সীমান্তর আগে
কোনো
মেয়ে
বন্ধু
ছিল
না।
কিন্তু
এবার
মেঘনা
রুকসানা নুলকের
সঙ্গে
বন্ধুত্ব গড়ে
ওঠে।
মেঘনার
সুবাধে
তিনি
রুনা
নামের
আরেক
মেয়ের
সঙ্গেও
বন্ধু
হয়ে
যান।
প্রায়
সময়
তারা
একসাথে
স্কুল
ফাকি
দিয়ে
শহর
বা
গ্রামের বাইরে
ঘুরতে
যায়।
এভাবেই
সীমান্ত বুঝতে
পারে,
জীবনের
মধুরতা
শুধু
পড়াশোনায় নয়,
বন্ধু
ও
সম্পর্কেও নিহিত।
সীমান্ত ও তার বন্ধুদের এই কৈশোরের দিনগুলো একেবারে স্বর্ণযুগের মতো মনে হলো। মেঘনা, যদিও মেদে মোটা, মুখের সুশ্রী ভঙ্গিমা আর হাসি তাকে সবাইকে প্রিয় করে তোলে। অনেকে তার সঙ্গে হাস্যরসাত্মকভাবে বলতো, “বলিউডের হিরোইন সোনাক্ষি সিনহার মতো।” রুকসানা ছিলো চঞ্চল, বদমেজাজি কিন্তু মিশুক, যে কারো সঙ্গে সহজেই মিশে যেতে পারতো। নুলক ছিলো কিছু কিছু বন্ধুর পছন্দের, আবার কারো অপছন্দের। রুনা সুন্দরী, মন ভালো, তবে ঘুরাঘুরিতে সে মেঘনা আর রুকসানার সঙ্গে বেশি যেত।
সীমান্ত, রকিবুল, মেঘনা, রুকসানা এবং রুনা—এই পাঁচজন মিলে স্কুল ছুটির পর বা স্কুল ফাকি দিয়ে নদী-ঘাট, গ্রামের পথ ও বনের লুকানো জায়গায় ঘুরতে যেত। কৈশোরের উচ্ছল মন, জগতকে জানার তীব্র আগ্রহ তাদের একসাথে রাখতো। সেদিন সবাই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, স্কুল জীবন শেষ হলেও, কলেজ জীবন শুরু হলেও কেউ কাউকে ভুলবে না। এই বন্ধুত্বের প্রতিশ্রুতি কেবল কলেজ জীবন পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিলো না; তারা অঙ্গীকার করেছিল, বিয়ের পরও একে অপরকে ভুলবে না। নিয়মিত খোঁজ-খবর রাখবে, একে অপরের পাশে থাকবে।
(পর্ব ১২)
মেয়েদের সঙ্গে কিছুক্ষণ আড্ডা দিতে দিতে সীমান্তর লজ্জার ভাব ধীরে ধীরে হ্রাস পেতে থাকে। মনে মনে সে সিদ্ধান্ত নেয়—আজই রঞ্জিতাকে তার দীর্ঘদিনের অনুভূতি প্রকাশ করবে। এতদিন ধরে হৃদয়ে লুকিয়ে রাখা প্রেমের কথা আজ আর গোপন রাখার নয়। স্কুলের দিন দ্রুত কেটে যাচ্ছে, সবার আলাদা হয়ে যাওয়া সময় আসছে; কে কোথায় যাবে, কেউ জানে না। তাই এই মুহূর্তটাকে হাতছাড়া করলে হয়তো আর কখনো সুযোগ হবে না—এ ভাবনায় সীমান্তর হৃদয় দোলা খায়।
এক দুপুরের সময়, স্কুলের ফাকা একটি কক্ষে—যেখানে ছাত্রছাত্রীরা সাধারণত অবসর সময়ে আড্ডা দেয়—সীমান্ত দেখল রঞ্জিতা শান্তভাবে একটি ব্যাঞ্চে বসে আছে। দমবন্ধ করা সাহস জোগাতে জোগাতে সে রঞ্জিতার কাছে এগিয়ে গিয়ে মৃদু কণ্ঠে বলল, “রঞ্জিতা, তোমার সঙ্গে একটা কথা আছে।”
রঞ্জিতা তার কৌতূহল প্রকাশ করে জিজ্ঞাসা করল, “কি কথা?”
সীমান্ত শ্বাস ফেলে উত্তর দিল, “একটা ছেলে… তোমাকে অনেক পছন্দ করে।”
রঞ্জিতার চোখে হালকা রাগের ছাপ ফুটে উঠল। সে জিজ্ঞেস করল, “কে?”
সীমান্তর মন অবশ হয়ে গেল। ভীতির ছায়া তাকে ঘিরে ধরল। হঠাৎ মনে হলো—এই কথা বলার কারণে হয়তো রঞ্জিতা রাগান্বিত হয়ে গালে চড় বসিয়ে দেবে, অথবা বিষয়টি হেড স্যারের কাছে পৌঁছে যাবে। তার হৃদয় দ্রুত ধুকপুক করতে লাগল, আর হাতকেই যেন সব সময়ের মতো ভারী হয়ে গেছে।
ভয়ে
সীমান্ত ঝটপট
বলে
ফেলল—“রুদ্র।” তার মনে
হয়েছিল,
রঞ্জিতা তো
রুদ্রকে চেনে
না,
তাই
এভাবে
নাম
বলে
ভয়
কমানো
যাবে।
কিন্তু
অবাক
হওয়ার
বিষয়,
রঞ্জিতা রুদ্র
সম্পর্কে জানে।
একদিন
কোচিং-এর ম্যাডাম রুদ্রের প্রশংসা করেছিল—ছেলেটি যেমন মেধাবী,
তেমনই
মনোহর।
রঞ্জিতার মনে
সেই
প্রশংসার বীজ
থেকে
ধীরে
ধীরে
একটা
ভাব
গড়ে
উঠেছিল।
রঞ্জিতা হেসে
সীমান্তকে বলল,
“দোস্ত,
রুদ্রের সঙ্গে
কথা
বলাই
দিস
আমাকে।”
সীমান্তর হৃদয়
ভেঙে
গেল।
ভয়ে
যে
নাম
বলে
ফেলেছে,
সেই
নামের
প্রতি
রঞ্জিতার আগ্রহ
দেখে
অবাক
হয়ে
গেল
সে।
তবে
এটি
তার
জন্য
এক
নতুন
অনুভূতি—রঞ্জিতা তাকে
‘দোস্ত’
বলে
সম্মোধন করেছে।
জাকে
সে
এত
ভালোবাসে, সেই
রঞ্জিতা তাকে
বন্ধু
হিসেবে
দেখছে।
সীমান্ত, বন্ধুর খুশি দেখতে পেরে, রুদ্রকে রাজি করায়। রুদ্র জানে না, রঞ্জিতার পেছনে সীমান্তর মন কতটা ব্যথিত। তবে সীমান্তর বন্ধুত্বের খাটিরে, রুদ্র আপাতত রঞ্জিতার সঙ্গে ‘টাইম পাস’ করতে রাজি হয়।
সীমান্ত চিন্তা করে, পরবর্তীতে রুদ্র
নিজের
মতো
করে
রঞ্জিতার সঙ্গে
ব্রেকাপ করে
দেবে।
কিন্তু
তার
উদ্দেশ্য একটাই—রঞ্জিতার কাছে তার নিজের
জায়গা
করে
নেওয়া,
ওকে
সান্তনা দেওয়া,
যেন
রঞ্জিতা বুঝতে
পারে
যে
তার
পাশে
যে
সত্যিকারের বন্ধু
আছে,
সে
সীমান্ত।
ছোট,
অবুজ
হৃদয়।
এই
বয়সে
এমন
চিন্তাধারা স্বাভাবিকই বলা
যায়।
বন্ধুত্ব, প্রেম,
সান্তনা—সবই
তখন
নতুন
অভিজ্ঞতা, আর
সীমান্ত তা
একরকমের ন্যায্য কৌশলে
পরিচালনা করতে
চাইছে।
ঈদের দিন। সীমান্ত প্রথমবারের মতো নতুন জামা–প্যান্ট আর জুতা পরে ঘুরতে বের হয়। গত সাত–আট বছর ধরে ঈদে নতুন জামার সুযোগ হয়নি তার। এই প্রথম তার ভাই বাপ্পি ইদের আনন্দে সীমান্তকে নতুন জামা–জুতা কিনে দিয়েছে, যদিও নিজের জন্য কিছু কেনেনি।
রাস্তার মোড়ে হঠাৎ রঞ্জিতার সঙ্গে দেখা হয়। রঞ্জিতা তখন হলুদ রঙের সুন্দর একটি থ্রী-পিস পড়ে আছে। দূর থেকেই তার চেহারা সীমান্তকে বেশ আকর্ষণীয় মনে হয়। কাছে আসতেই দু’জনের মধ্যে স্বাভাবিকভাবে আলাপচারিতা শুরু হয়। নাম্বার বিনিময় হয়, এবং সীমান্তকে দেখে রঞ্জিতার মনে একটি বায়না জন্ম নেয় — যে যেভাবেই হোক, রুদ্রের সঙ্গে কথা বলিয়ে দেবেই।
সেদিনের ঈদের আনন্দের সঙ্গে সীমান্তর মনে এক অদ্ভুত রঙ জাগে—শৈশবের দারিদ্র্য, সংগ্রামের ক্লান্তি যেন মুহূর্তের জন্য সব ভুলে যায়। রঞ্জিতার সঙ্গে এই ছোট্ট আলাপই তার ঈদকে আরও স্মরণীয় করে তোলে।
.jpg)

Comments
Post a Comment