শেষ দৃশ্যপট ( ৭ম অধ্যায়)

 (পর্ব ১৩)

দিনে দিনে মুক্তার মনচেতনা অদ্ভুতভাবে বিকশিত হতে থাকে। সংসারকে সেই কবে ছেড়ে দিয়ে সে আর দ্বিতীয় কোনো স্ত্রী গ্রহণ করেনি। নিজ গ্রামে ফিরে সে জঙ্গলের মধ্যে একটি ছোট কুড়ে ঘর তৈরি করে, সেখানেই ধ্যানের মাঝে লিপ্ত হয়।

লোকের মুখে মুক্তার কাহিনী নানা রূপ ধারণ করে। কেউ বলে সে পাগল হয়ে গেছে, আবার কেউ বলে সে মাঝে মাঝে জিনের রাজ্যে চলে যায়। ভয়ানক জঙ্গল এবং তার নিরিবিলি ধ্যানসঙ্গমের কারণে মানুষ সেখানে গিয়ে সাহস পায় না। তবু, কিছু লোকযারা ভুত, প্রেম বা শারীরিক অসুস্থতায় কষ্টে থাকেমুক্তার কাছে আসে তাবিজ বা ঔষধের জন্য। মুক্তা কারো সঙ্গে মিশতে চায় না,
কাউকে দেখেও না। সেখানেই একা থাকে, একা রান্না করে, একা খায়। তবু বিপদে পড়লে বা সত্যিকার সাহায্যের প্রয়োজন হলে কেবল সেই মানুষটির সঙ্গে কথা বলে। এই একাকিত্বের মাঝে মুক্তার জীবন নিজস্ব নিয়মে বয়ে চলে, যেন জঙ্গলের সঙ্গে মিলেমিশে এক ধরনের রহস্যময় শান্তি গড়ে ওঠে।


সাল ২০০০। তখনো সীমান্তর জন্ম হয়নি। মুক্তা তখন বক্সিগঞ্জ উপজেলার কালভাট সেতু নির্মাণের সরকারি কন্ট্রাকশনের কাজে অংশ নিত। তন্ত্রবিদ্যার কিছুটা জ্ঞান থাকলেও সংসারের জন্য সে মনে করত, গায়ে খেটেই পরিশ্রম করাই শ্রেয়।

একদিন মুক্তার সঙ্গে এক ছেলের আলাপ হয়। সে ছেলের মামা ছোটবেলায় হারিয়ে গিয়েছিল। ছেলে চুক্তি প্রস্তাব করলযদি মুক্তা তাকে ফেরত আনতে পারে, তবে সে হাজার টাকা দিবে। মুক্তা রাজি হলো। মামার হারানোর গল্প শুনে জানা গেল, ছেলেটির মামা যখন বছর বয়সী ছিল, ঢাকায় তার নানার কাছ থেকে সে হারিয়ে গিয়েছিল। মুক্তা সিদ্ধান্ত নিল, সংসারের টানাপোড়েন নিজ জীবনের ঝুঁকি সব একপাশে রেখে এই কাজটি করবে। কারণ, শুধু টাকা নয়, মানুষের হারানো সঙ্গী ফেরানোর দায়িত্বও তার মনে গভীরভাবে অনুভূত হয়েছিল।

ছেলেটার মামা তখন ২৫ বছর নিখোঁজ। কেউ জানত না, সে বেঁচে আছে নাকি মারা গেছে। সেই রাতেই মুক্তা তার তন্ত্রবিদ্যা কাজে লাগাতে শুরু করল। ছোটকাল থেকেই তার উপর জিনের আছর ছিল, আর সেই জিনের সাহায্যে মুক্তা তার মামার সন্ধান পেল।

৩৪ বছর পর, অবশেষে ছেলেটির মামা সেই বাড়িতে ফিরে এলো। জানা গেল, এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে সে বান্দারবানে এক পাহাড়ের কন্যার সঙ্গে বিয়ে করেছে এবং সেখানেই বসবাস করছে। সংসার গড়েছে, সন্তানও রয়েছে। তার বাবা-মায়ের মুখ মনে থাকলেও গ্রামের নাম ঠিকানা সে সম্পূর্ণ ভুলে গিয়েছিল।

এই ঘটনাপ্রবাহের পর মুক্তা কবিরাজ হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি পেল। তার তন্ত্রবিদ্যার ফলাফল ছড়িয়ে পড়তে শুরু করল দূর-দূরান্তে। মুক্তার নাম, দক্ষতাগল্প লোককথার মতো ছড়িয়ে যেতে লাগল।

(পর্ব ১৪)

সাল ২০১৭, সীমান্তর এসএসসি পরীক্ষা শেষ হলো। মোটামুটি ভালো রেজাল্ট অর্জন করেছে সে। ঠিক তখনই দাওয়াত আসে তার খালাতো ভাই আলমীর বিয়ের। বরযাত্রী হিসেবে তাকে ঢাকায় যেতে হবে। যাত্রাপথে বাসে সীমান্তর বমি চলে আসে। শেষ পর্যন্ত পুরো যাত্রা সে ঘুমের ঔষধ খেয়ে পার করে।

কনের বাড়ি পৌঁছে খাওয়া-দাওয়া শেষে, সীমান্ত ভাবি নিয়ে বাসেই ফিরে আসে নিজের খালার বাড়িতে। এটি তার জন্য প্রথম ঢাকা সফর, তবে সুউচ্চ দালান-নগরীর রূপ সে পর্যাপ্ত দেখার সুযোগ পায়নি। ঢাকার কোলাহল, চমক এবং বিশালতা তার চোখে সীমিত দৃশ্যেই সীমাবদ্ধ রইল।


Comments

Popular posts from this blog

শেষ দৃশ্যপট (১ম অধ্যায় )

ফারাওয়ের অভিশাপ

মৃতের নিশ্বাস