Supreme Being & Human
এর একমাত্র সহজ, সরল ও যৌক্তিক উত্তর হলো: Supreme Being (পরম সত্তা), ঈশ্বর (God), অথবা আল্লাহ (Allah)।
সৃষ্টির পূর্বে, কেবল তিনিই ছিলেন—একমাত্র, অদ্বিতীয়, এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ।
আমাদের মানুষের জন্য, 'কতকাল' বা 'কত সময় ধরে' এই প্রশ্নগুলো জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু এই প্রশ্নগুলো শুধুমাত্র কোনো বস্তু বা সৃষ্টির শুরু থেকে শেষ অবধি সময়কালকে বোঝানোর জন্য প্রযোজ্য।
কারণ হলো: পরম সত্তা বা রব (The Supreme Being) নিজেই সময়ের স্রষ্টা।
সময় হলো তাঁর সৃষ্ট একটি ধারণা; একটি ফ্রেমওয়ার্ক, যা তিনি এই মহাবিশ্বকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করতে সৃষ্টি করেছেন। তিনি শুরু করেছেন, তিনি শেষ করেছেন। সময়ের এই চাকা তাঁরই হাতে নির্মিত।
এই কারণেই আমরা, তাঁর সৃষ্টি হিসেবে, প্রতিটি কিছুর শুরু এবং শেষ সম্পর্কে জানতে পারি এবং জন্মগতভাবে জানতে চাই। কিন্তু যিনি সময়কে নির্মাণ করেছেন, তাঁর অস্তিত্বকে সেই নির্মিত সময়ের সীমা বা পরিমাপক দ্বারা মাপা যায় না। তাঁকে 'সময় দিয়ে মাপা'—এই ধারণাটি নিজেই স্ববিরোধী। যিনি সময়ের বাইরে, তিনিই এই মহাবিশ্ব এবং এর অন্তর্ভুক্ত প্রতিটি কিছুর অনাদি ও অনন্ত উৎস।
আমাদের অস্তিত্বের সন্ধানে, আমরা যখন সৃষ্টির উৎসের দিকে তাকাই, তখন বিজ্ঞান এবং ঐশীবাণী এক অভূতপূর্ব ঐক্যের সুরে কথা বলে।
এই মহাবিশ্বের জন্ম কীভাবে হলো?—এই প্রশ্নের জবাবে আধুনিক বিজ্ঞান হাজির করে বিগ ব্যাং তত্ত্ব (Big Bang Theory)। এই তত্ত্বের মূল কথা হলো: একসময় পুরো মহাবিশ্ব একটি একক বিন্দুতে (Singularity) একত্রিত ছিল। তারপর এক বিশাল বিস্ফোরণ বা মহাবিস্ফোরণের (Big Bang) মাধ্যমে চাঁদ, গ্রহ, নক্ষত্র, সূর্য, ব্ল্যাক হোল এবং গ্যালাক্সিগুলো—সব কিছুই সৃষ্টি হয়ে সম্প্রসারিত হতে শুরু করে।
এই বৈজ্ঞানিক ধারণাটির সূচনা করেন বেলজিয়ামের খ্রিস্টান পুরোহিত ও জ্যোতিঃপদার্থবিদ জর্জ লেমেত্র (Georges Lemaître) ১৯২৭ সালে। পরে এডউইন হাবল (Edwin Hubble) এবং জর্জ গ্যামো (George Gamow)-এর মতো বিজ্ঞানীরা পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার মাধ্যমে এটিকে আরও প্রতিষ্ঠা করেন।
কিন্তু এই ধারণাটি, যা বিজ্ঞান তুলে ধরেছে গত শতাব্দীর শুরুর দিকে, তার বহু শত বছর আগেই আল-কুরআন এই সৃষ্টির রহস্য উন্মোচন করেছে।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ তা'আলা ঘোষণা করছেন:
"অবলোকন করে না কি অবিশ্বাসীরা যে, আসমানসমূহ ও জমিন একসঙ্গে যুক্ত ছিল, পরে আমি উভয়কে পৃথক করে দিলাম; আর আমি পানি দ্বারা সমস্ত জীবন্ত বস্তুকে সৃষ্টি করলাম। তবুও কি তারা বিশ্বাস করবে না?"
— সূরা আল-আম্বিয়া (২১:৩০)
এই আয়াতের গভীরতা লক্ষ্যণীয়:
"আসমানসমূহ ও জমিন একসঙ্গে যুক্ত ছিল": এটি স্পষ্টতই সৃষ্টির শুরুতে মহাবিশ্বের একীভূত অবস্থা বা একক বিন্দু (Singularity) থাকার ধারণাকে ইঙ্গিত করে।
"আমি উভয়কে পৃথক করে দিলাম": এটি সেই বিশাল বিস্ফোরণ বা সম্প্রসারণের (Big Bang) প্রক্রিয়াটিকে বোঝায়, যা সৃষ্টিকে তার বর্তমান রূপ দিয়েছে।
এখানেই পরম সত্তার জ্ঞান ও প্রজ্ঞার এক অলৌকিক প্রমাণ নিহিত। যে সত্যকে মানুষ বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ, দূরবীক্ষণ যন্ত্র এবং জটিল গাণিতিক হিসাবের মাধ্যমে ১৯২৭ সালের পর আবিষ্কার করেছে, সেই সত্যই আল-কুরআন আজ থেকে প্রায় ১৪০০ থেকে ১৫০০ বছর আগে মানবজাতির সামনে তুলে ধরেছিল। এটি সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, বিজ্ঞান কোনো নতুন সত্য আবিষ্কার করে না, বরং সেই সর্বোচ্চ সত্তার সৃষ্টির অমোঘ নিয়মকেই পুনরায় নিশ্চিত করে।
অধ্যায় ২: পরম সত্তা এবং তাঁর রাজত্ব
মহাবিশ্বের বিশালতার পূর্বে, যখন কোনো স্থান ছিল না, কোনো সময় ছিল না, কেবল পরম সত্তা (Supreme Being) একাই ছিলেন। তাঁর অস্তিত্ব ছিল স্বয়ম্ভূ এবং চিরন্তন। সৃষ্টির সেই আদি মুহূর্তে, তাঁর অসীম ক্ষমতা কেবল একটি শব্দে প্রকাশিত হয়েছিল—"হও!" (Be!)। আর সেই আদেশেই অস্তিত্ব লাভ করলো তাঁর রাজত্বের প্রথম নিদর্শন—আরশ (The Throne)।
এই প্রসঙ্গে আল্লাহ্ তা'আলা নিজেই ঘোষণা করছেন:
“আল্লাহই সেই, যিনি সৃষ্টি করলেন আসমানসমূহ ও জমিনকে ছয় দিনে, অতঃপর তিনি আরশের উপর প্রতিষ্ঠিত হলেন।”
— (সূরা আল-আ’রাফ ৭:৫৪)
এই আরশ কেবল একটি স্থান নয়, এটি তাঁর সার্বভৌমত্বের প্রতীক, তাঁর ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু। পরম সত্তা তাঁর নিজস্ব মহিমা ও প্রজ্ঞা অনুযায়ী সেখানে অধিষ্ঠিত হলেন। এটি তাঁর রাজকীয় সিংহাসন, যা তাঁর অসীম ক্ষমতা এবং সৃষ্টির উপর তাঁর অবিচল কর্তৃত্বকে নির্দেশ করে।
তাঁর সেই অসীম জ্ঞান এবং পরিকল্পনার অংশ হিসেবে, তিনি কেবল এই দৃশ্যমান মহাবিশ্বই সৃষ্টি করেননি, বরং মানুষের জন্য দুটি চূড়ান্ত গন্তব্যও তৈরি করেছেন—জান্নাত (Paradise) এবং জাহান্নাম (Hell)। এই দুটি সৃষ্টির পেছনের সুগভীর রহস্য ও প্রজ্ঞা একমাত্র তিনিই জানেন। মানুষ হয়তো এর সম্পূর্ণ তাৎপর্য উপলব্ধি করতে পারে না, কিন্তু এটি তাঁর রাজত্বের ন্যায়বিচার এবং চূড়ান্ত হিসাবরক্ষার ধারণাকে প্রতিষ্ঠা করে।
এরই পাশাপাশি, তিনি সৃষ্টি করলেন এক বিশেষ ধরণের সেবক—ফেরেশতাকুল (Angels)। আল্লাহর রাসূল (সাঃ) বলেন:
“আল্লাহ ফেরেশতাদের সৃষ্টি করেছেন নূর (আলো) দ্বারা।”
— (সহীহ মুসলিম)
এই আলোকসত্ত্বারা (Entities of Light) তাঁর আদেশ পালনে সর্বদা নিয়োজিত। তারা রক্ত-মাংসের তৈরি সাধারণ প্রাণী নয়, বরং শুদ্ধ আলোকসত্ত্বা, যারা তাঁর প্রশংসা ও পবিত্রতা ঘোষণায় বিরতিহীনভাবে মগ্ন থাকে। তারা নিরন্তর সেই মহান পরম সত্তা (রব)-কে সেজদা করে। তাদের দায়িত্ব ও আনুগত্য সম্পর্কে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
“ফেরেশতারা আকাশ ও জমিনের মধ্যে যা কিছু আছে, সব আল্লাহর আদেশেই পরিচালনা করে, এবং তারা কখনো অবাধ্য হয় না।”
— (সূরা আন-নাহল ১৬:৫০)
তাদের অস্তিত্ব স্বয়ং তাঁর রাজত্বের মহিমান্বিত শৃঙ্খলার এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
পরম সত্তা (Supreme Being) তাঁর রাজত্বের বিশালতা প্রকাশের জন্য এই নশ্বর জগত, দুনিয়া বা পৃথিবী সৃষ্টি করলেন। সৃষ্টির প্রথম ধাপেই তিনি এমন সব প্রাণ তৈরি করলেন, যাদের অস্তিত্ব ছিল বিশাল ও মহৎ। আধুনিক বিজ্ঞান যাদের ডাইনোসর নামে চেনে।
ডাইনোসরদের বিলুপ্তির পরে, পরম সত্তা যখন পৃথিবীতে তাঁর পরবর্তী প্রজন্মকে স্থলাভিষিক্ত করার সিদ্ধান্ত নেন, তখন সেই বিষয়টি কুরআনে সূচিত হয়:
“যখন তোমার প্রতিপালক ফেরেশতাদের বললেন, ‘আমি পৃথিবীতে একজন খলিফা সৃষ্টি করতে যাচ্ছি,’ তখন তারা বলল, ‘আপনি কি সেখানে এমন কাউকে সৃষ্টি করবেন যে সেখানে অশান্তি সৃষ্টি করবে এবং রক্তপাত ঘটাবে?’”
— (সূরা আল-বাকারা ২:৩০)
ফেরেশতাদের এই প্রশ্নটি গভীরভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। তারা প্রশ্ন করেছিলেন কেন এমন সৃষ্টিকে পৃথিবীতে প্রেরণ করা হবে, যারা অশান্তি ও রক্তপাত ঘটাবে। এই জ্ঞান কেবল তখনই সম্ভব, যখন তারা দেখতেন যে মানুষের আগেও পৃথিবীতে এমন কিছু সৃষ্টি ছিল যারা এই কাজগুলো করেছে।
ইসলামী ব্যাখ্যাকারগণ (যেমন ইবন কাসির, তাবারি প্রমুখ) বলেন—ফেরেশতারা হয়তো জিন বা অন্যান্য প্রাচীন জীবদের দেখেছেন, যারা মানুষের আগেই পৃথিবীতে বসবাস করত এবং বিপর্যয় সৃষ্টি করত। এটি নিশ্চিত করে যে, মানুষ এই গ্রহের প্রথম বুদ্ধিমান বা কর্তৃত্বশীল সৃষ্টি ছিল না; বরং এই রাজত্বে আমাদের আসার আগেও জীবনের প্রবাহ ছিল।
পরম সত্তার রাজত্ব কেবল পৃথিবীর সীমানায় আবদ্ধ নয়। কুরআন আমাদের স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে, জীবন কেবল এই নীল গ্রহেই সীমাবদ্ধ নয়। আল্লাহ্ তা'আলা ঘোষণা করেন:
“তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে অন্যতম হলো — আসমানসমূহ ও জমিনের সৃষ্টি, এবং তিনি উভয়ের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছেন জীবজন্তু (দাব্বাহ)। আর তিনি চাইলে তাদের সবাইকে একত্র করতে সক্ষম।”
— (সূরা আশ-শূরা ৪২:২৯)
আরবি মূল শব্দ 'দাব্বাহ' (دَابَّة)-এর অর্থ হলো "চলমান প্রাণী" বা "জীবিত সত্তা"। কুরআনের এই আয়াত এবং অনুরূপ আরেকটি আয়াত, “আকাশ ও পৃথিবীতে যত জীব আছে, এবং যত ফেরেশতা আছে, তারা সবাই আল্লাহরই ইবাদত করে,”—এই দুটিই এই সত্যকে প্রতিষ্ঠা করে যে, আসমানসমূহেও জীবনের অস্তিত্ব থাকতে পারে, যা পরম সত্তার রাজত্বের অংশ।
বিজ্ঞান আজ এই ঐশী ইঙ্গিতকে আরও জোরালোভাবে সমর্থন করছে। মহাবিশ্বের প্রায় ২০০ বিলিয়ন ছায়াপথ এবং প্রতিটি ছায়াপথে লাখো কোটি তারা ও গ্রহের বিশালতা বিবেচনা করে বিজ্ঞানীরা এই ধারণাকে অযৌক্তিক মনে করেন যে, শুধুমাত্র পৃথিবীই জীবনের একমাত্র স্থান। NASA, ESA ও অন্যান্য সংস্থাগুলো মঙ্গল (Mars), ইউরোপা (Europa), এনসেলাডাস (Enceladus)-এর মতো গ্রহ ও উপগ্রহে জীবনের উপযোগী পানি, অক্সিজেন ও জৈব অণু (organic molecules) খুঁজে পেয়েছে।
কুরআন ও বিজ্ঞান—উভয়ের দৃষ্টিতেই, সর্বোচ্চ সত্তা “আসমান ও জমিনে জীবজন্তু ছড়িয়ে দিয়েছেন”। এটি আধুনিক 'এক্সট্রাটেরেস্ট্রিয়াল লাইফ' (Extraterrestrial Life) বা পৃথিবীর বাইরের জীবনের ধারণাকে শুধু সমর্থনই করে না, বরং তাঁর রাজত্বের সীমাহীন ক্ষমতা এবং সৃষ্টির প্রতিপালকের অসীম প্রজ্ঞাকে প্রমাণ করে।
পরম সত্তা (Supreme Being), তাঁর রাজত্বের অংশ হিসেবে, মানুষের পূর্বে এই পৃথিবীতে জিন জাতিকে সৃষ্টি করেন। যেমনটি কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে:
"আমি জিনকে সৃষ্টি করেছি আগুনের শিখা থেকে।"
— (সূরা আর-রহমান ৫৫:১৫)
অন্যান্য সৃষ্টির মতো, জিনদেরকেও তিনি তাঁর ইবাদত (উপাসনা) করার জন্য সৃষ্টি করেছিলেন। আল্লাহ্ তা'আলা ঘোষণা করেন:
"জিন ও মানুষকে আমি সৃষ্টি করেছি শুধু আমার ইবাদতের জন্য।"
— (সূরা আয-যারিয়াত ৫১:৫৬)
তবে ফেরেশতাদের থেকে ভিন্নভাবে, জিনদের স্বাধীন ইচ্ছা (Free Will) প্রদান করা হয়েছিল। শুরুতে তারা পরম সত্তার আনুগত্য করলেও, কালের প্রবাহে তাদের একটি বড় অংশ অবাধ্যতা ও অপরাধে লিপ্ত হতে শুরু করে। তারা পৃথিবীতে রক্তপাত ও অশান্তি সৃষ্টি করতে থাকে।
এই প্রেক্ষাপটটিই তাফসির ইবনে কাসীরে সূরা আল-বাকারা (২:৩০) আয়াতের ব্যাখ্যায় পাওয়া যায়:
“আদম (আঃ) সৃষ্টির আগে পৃথিবীতে জিনদের বসবাস ছিল। তারা রক্তপাত ও ফাসাদ করেছিল। তখন আল্লাহ ফেরেশতাদের মাধ্যমে তাদের দমন করেন।”
— (তাফসির ইবনে কাসীর)
এই অবাধ্যতা যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন পরম সত্তা তাঁর রাজত্বের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ব্যবস্থা নেন। তিনি তাঁর বিশ্বস্ত সৈনিক, ফেরেশতাদের নির্দেশ দেন। ফেরেশতারা আসমান থেকে নেমে এসে পৃথিবীতে লুকিয়ে থাকা অবাধ্য জিনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে, তাদের ধরে হত্যা করতে থাকে। তবে যে সকল জিন আত্মসমর্পণ করত এবং আনুগত্যের ওয়াদা করত, রব তাদের ক্ষমা করে দিতেন। এভাবে বাধ্য ও অবাধ্যতার এই সংঘাত চলতেই থাকে।
অবশেষে, যখন পরম রব সমস্ত অবাধ্য জিনদের সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করার আদেশ দিলেন, তখন ফেরেশতারা পৃথিবীতে নেমে এসে নিধনযজ্ঞ শুরু করল। সেই সময়কার জিনদের মধ্যে ইবলিশ নামক একটি শিশু ছিল। সে এতই ছোট ছিল যে ফেরেশতারা তাকে হত্যা করতে দ্বিধা বোধ করে এবং পরম সত্তার কাছে তাকে ক্ষমা করার জন্য আবেদন জানায়। দয়াময় রব ফেরেশতাদের সেই অনুরোধ রক্ষা করেন এবং ইবলিশকে আরশে তাঁর আশ্রয়ে থাকতে দেন
যে শিশু জিনটি পরম সত্তা (Supreme Being)-এর করুণায় আরশের আশ্রয় লাভ করেছিল, সেই ইবলিশের অবস্থান ছিল অত্যন্ত উচ্চ। তাফসীরকারগণ, যেমন ইবনে কাসীর (রহঃ) এবং তাবারী (রহঃ) সহ অনেক প্রাচীন ব্যাখ্যাতা এই বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করেন:
“ইবলিস ফেরেশতা ছিল না; বরং সে জিনদের মধ্যে একজন ছিল, যাকে আল্লাহ তার ইবাদতের জন্য ফেরেশতাদের স্তরে উন্নীত করেছিলেন।”
— (তাফসির ইবনে কাসীর, সূরা আল-কাহফ ৫০ আয়াতের ব্যাখ্যা)
ইবলিশ তার স্বাধীন ইচ্ছাশক্তিকে ব্যবহার করে আল্লাহর (Supreme Being-এর) প্রতি এতটাই নিবেদিত ছিল যে, সে আরশের আশ্রয়ে থাকা সত্ত্বেও, সে নিরলসভাবে ইবাদত করে চলত। কিছু বর্ণনায় এমনও বলা হয়েছে যে, সে এত বেশি ইবাদত করেছিল যে, পৃথিবীর প্রতিটি স্থানেই সে আল্লাহকে সেজদা করেছিল।
এই কঠোর ইবাদত এবং আনুগত্যের ফলস্বরূপ, ইবলিশকে এক অসাধারণ মর্যাদা দেওয়া হয়। সে কেবল আরশেই স্থান পায়নি, বরং ফেরেশতাদের মধ্যে প্রধান হিসেবে গণ্য হত। সে সাত আসমান পর্যন্ত ইবাদত করেছে এবং তার প্রজ্ঞা ও জ্ঞান ছিল সর্বোচ্চ।
ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, ইবলিশের এই ইবাদত তাকে এক বিশেষ অবস্থানে নিয়ে গিয়েছিল:
“সে পৃথিবীতে ইবাদত করত, পরে আল্লাহ তাকে আকাশে উঠিয়ে নেন, এবং সে সাত আসমান পর্যন্ত ইবাদত করে।”
— (তাফসির ইবনে কাসীর)
অধ্যায় ০৫ঃ আদম
পৃথিবীর প্রাচীন প্রজন্ম (ডাইনোসর ও জিন)-এর পর্ব শেষ হওয়ার পর, পরম সত্তা (Supreme Being) তাঁর রাজত্বের চূড়ান্ত প্রতিনিধি, মানুষকে সৃষ্টির সিদ্ধান্ত নিলেন। এই নতুন সৃষ্টি হবে পৃথিবীর খলিফা (প্রতিনিধি)।
মানুষ সৃষ্টির জন্য উপাদান সংগ্রহের প্রক্রিয়াটিও ছিল মহৎ ও তাৎপর্যপূর্ণ। পরম রব একে একে তাঁর প্রধান চার ফেরেশতা—জিবরাইল (আঃ), মিকাইল (আঃ), ইস্রাফিল (আঃ)-কে পৃথিবীতে প্রেরণ করলেন মাটি সংগ্রহের জন্য। কিন্তু পৃথিবী (মাটি) পরম সত্তার কাছে বিনম্রভাবে অনুরোধ করে কেঁদে ওঠে, যেন তাকে কেটে এমন কিছু সৃষ্টি করা না হয়, যা ভবিষ্যতে আবার তাকে কষ্ট দেবে। দয়ার্দ্র ফেরেশতারা মাটির এই করুণ আরজ শুনে ফিরে গেলেন, কিন্তু আল্লাহর আদেশ অমান্য করলেন না।
অবশেষে, পরম সত্তা আজরাঈল (আঃ)-কে পাঠালেন, যিনি আল্লাহর আদেশ পালনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলেন। তিনি কোনো অনুরোধে বিচলিত না হয়ে, পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নানা রঙের মাটি সংগ্রহ করলেন—লাল, কালো, সাদা, হলুদ—যা মানবজাতির বর্ণবৈচিত্র্যের প্রতীক।
এই সংগৃহীত মাটি দিয়ে পরম সত্তা আদম (আঃ)-এর দেহ কাঠামো তৈরি করলেন। আত্মা বা প্রাণ সঞ্চারিত হওয়ার আগে, ফেরেস্তাকুল এই অপূর্ব সৃষ্টিকে কৌতূহল নিয়ে দেখছিলেন। কিন্তু সবচেয়ে বেশি কৌতূহলী ও সন্দিহান ছিল ইবলিশ, যিনি তখন ফেরেশতাদের প্রধান ছিলেন। সে আদমের প্রাণহীন শরীরে প্রবেশ করে তার জটিল গঠন পরীক্ষা করল।
এরপর এলো পরম সত্তার রাজত্বের এক চূড়ান্ত মুহূর্ত। আল্লাহ্ তা'আলা আদমের শরীরে প্রাণ সঞ্চার করলেন। এরপর তিনি সমস্ত ফেরেশতাদের ডেকে আনলেন এবং ঘোষণা করলেন: "তোমরা আদমকে সেজদা করো।"
এই আদেশ ছিল আনুগত্যের এবং সৃষ্টির প্রতি স্রষ্টার পরিকল্পনার স্বীকৃতির পরীক্ষা। আল্লাহর হুকুমে সমস্ত ফেরেশতা বিনম্র চিত্তে মাথা নত করলেন। কিন্তু ইবলিশ, তার দীর্ঘদিনের ইবাদত এবং উচ্চ মর্যাদার অহংকারে অন্ধ হয়ে, সেজদা করতে অস্বীকার করল।
কুরআনে এই দৃশ্যটি এভাবে বর্ণিত হয়েছে:
“আর যখন আমি ফেরেশতাদের বলেছিলাম, তোমরা আদমকে সেজদা করো, তখন সবাই সেজদা করল — কিন্তু ইবলিস করল না। সে অস্বীকার করল, অহংকার করল, আর সে অবিশ্বাসীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল।”
— (সূরা আল-বাকারা ২:৩৪)
পরম সত্তা ইবলিশকে সরাসরি প্রশ্ন করলেন তার অস্বীকারের কারণ:
আল্লাহ বললেন, ‘তোমাকে সেজদা করতে কী বাধা দিল, যখন আমি আদেশ দিয়েছিলাম?’ ইবলিস বলল, ‘আমি তার চেয়ে উত্তম। আপনি আমাকে আগুন থেকে সৃষ্টি করেছেন, আর তাকে সৃষ্টি করেছেন মাটি থেকে।’”
— (সূরা আল-আ‘রাফ ৭:১১–১২)
এই অহংকার ছিল পরম সত্তার রাজত্বের প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ। কারণ অহংকার একমাত্র আল্লাহর জন্যই শোভা পায়। অন্য কোনো সৃষ্টির অহংকার তাঁর সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপের শামিল। এই চূড়ান্ত অবাধ্যতার জন্য আল্লাহ্ তা'আলা ইবলিশকে অভিশপ্ত শয়তান হিসেবে ঘোষণা করলেন এবং তাঁর রাজত্ব থেকে তাকে বিতাড়িত করলেন:
আল্লাহ বললেন: “তুমি এখান থেকে নেমে যাও। এখানে তোমার জন্য অহংকার করার স্থান নেই। বের হয়ে যাও, তুমি অবশ্যই অপমানিত ও তুচ্ছ।”
— (সূরা আল-আ‘রাফ ৭:১৩)
বিতাড়িত ইবলিশ তখন প্রতিশোধ এবং মানবজাতিকে পথভ্রষ্ট করার জন্য আল্লাহর কাছে কিয়ামতের দিন পর্যন্ত অবকাশ চাইল, যা তাঁকে দেওয়া হলো। ইবলিশ তখন দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করল:
“যেহেতু আপনি আমাকে পথভ্রষ্ট করেছেন, তাই আমি আপনার সরল পথে (মানুষের জন্য) তাদের জন্য ওত পেতে থাকব। আমি তাদের সামনে থেকে, পেছন থেকে, ডান দিক থেকে, আর বাম দিক থেকে আসব — আর আপনি তাদের অধিকাংশকে কৃতজ্ঞ পাবেন না।”
— (সূরা আল-আ‘রাফ ৭:১৬–১৭)
এভাবেই ইবলিশ তার উচ্চ মর্যাদা থেকে পতিত হয়ে মানবজাতির চিরশত্রু শয়তানে পরিণত হলো এবং পরম সত্তার রাজত্বের বিরুদ্ধে চিরন্তন বিদ্রোহের পথ বেছে নিল। এখন থেকে এই পৃথিবীতে সত্য ও মিথ্যার, আলো ও অন্ধকারের যুদ্ধ শুরু হলো, যার প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হলো মানবজাতি।
অধ্যায় ০৬ঃ ইবলিশের ধোকা
পরম সত্তা (Supreme Being) তাঁর রাজত্বের এই নতুন প্রতিনিধিদের জান্নাতে বসবাসের পূর্ণ স্বাধীনতা দিলেন। এই স্বাধীনতা ছিল এক চূড়ান্ত পরীক্ষার পটভূমি। আল্লাহ্ তা'আলা তাদের জান্নাতের সমস্ত ফল ও নিয়ামত ভোগ করার অনুমতি দিলেন, কিন্তু একটি নির্দিষ্ট গাছের কাছে যেতে বা তার ফল খেতে নিষেধ করলেন। এটি ছিল তাদের আনুগত্য ও সংযমের প্রথম পরীক্ষা।
আল্লাহ্ তা'আলা তাঁদের সতর্ক করে বলেন:
“আর আমরা আদমকে বললাম, ‘তুমি ও তোমার স্ত্রী জান্নাতে বাস করো এবং [এই] গাছটি আছে তার থেকে খাবার খাও না, নইলে তুমি অসৎ হয়ে যেও।’”
— (সূরা আল-বাকারা ২:৩৫)
আসলে, সেই গাছটি ছিল পরীক্ষার প্রতীক। এই নিষেধাজ্ঞা ছিল মূলত ইবলিশের প্রতারণা থেকে নিজেদের রক্ষা করার জন্য একটি সুরক্ষা প্রাচীর।
এদিকে, পরম সত্তার রাজত্ব থেকে অভিশপ্ত ও বিতাড়িত ইবলিশ তার প্রতিজ্ঞা অনুযায়ী মানবজাতিকে পথভ্রষ্ট করার জন্য ওত পেতে ছিল। সে জান্নাতে প্রবেশ করে আদম (আঃ) ও হাওয়া (আঃ)-কে প্ররোচিত করতে শুরু করল।
ইবলিশ তাদের কাছে শপথ নিয়ে বলল: "আমি তোমাদেরকে সেই চিরস্থায়ী জীবন দেই, যেখান থেকে তোমরা কখনও মরবে না।" এবং "আমি সত্যিই তোমাদেরকে সেই গাছের দিকে দেখাবো, যা আপনাদের হারিয়ে ফেলার কারণ হবে।” ইবলিশ তাদের উত্যক্ত করে বলল যে গাছ থেকে খেলে তারা অমর হয়ে যাবে বা জ্ঞানসম্পন্ন হবে। এই প্রতারণার বিষয়ে কুরআন সতর্ক করে:
“তুমি শয়তানের কথা শুনে না খাও; সে তোমাদের শত্রু। সে তোমাদেরকে জান্নাত থেকে তাড়িয়ে দেবে।”
— (সূরা আল-আ'রাফ ৭:২০)
কিন্তু ইবলিশের ছলনায় মুগ্ধ হয়ে, আদম (আঃ) ও হাওয়া (আঃ) সেই গাছ থেকে খেয়ে ফেললেন। এর ফলস্বরূপ, তারা তাদের প্রভুর আদেশ অমান্য করলেন:
“আদম তার প্রভুর প্রতি অবাধ্য হলেন, অতএব সে জান্নাত থেকে বিতাড়িত হল। … এবং তার প্রভু তাকে [ক্ষমার] কিছু নির্দেশ দিলেন।”
— (সূরা তা-হা ২০:১২১)
অবশেষে আল্লাহ আদম (আঃ) ও হাওয়া (আঃ)-কে ক্ষমা করলেন এবং তাদেরকে পৃথিবীতে পাঠালেন। এই ঘটনা মানুষের জন্য সচেতনতা ও সতর্কতার শিক্ষা।
“…তাদেরকে ক্ষমা করে দিলাম। নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (সুরা আল-বাকা/2:37)
আদম (আঃ) ও হাওয়া (আঃ)-এর ভুল ছিল তাঁদের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তির প্রথম ব্যবহার, যা তাঁদের মানবীয় দুর্বলতার প্রকাশ। তবে পরম সত্তা (Supreme Being), যিনি অসীম দয়াময় ও ক্ষমাশীল, তিনি মানব প্রকৃতির দুর্বলতাকে জানতেন। ভুল করার পর তাঁরা তাৎক্ষণিকভাবে অনুতপ্ত হলেন এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলেন।
আল্লাহ্ তা'আলা তাঁদের ক্ষমা করলেন, কিন্তু তাঁর রাজত্বের নিয়ম ছিল কঠোর—পৃথিবীই ছিল মানবজাতির মূল পরীক্ষার ক্ষেত্র। তাই তাঁদের ক্ষমা করা হলেও, জান্নাতের সুখ থেকে তাঁদের সাময়িকভাবে বিতাড়িত করা হলো। আল্লাহ্ তা'আলা তাঁদের পৃথিবীতে অবতরণের নির্দেশ দিলেন:
“আল্লাহ বললেন, ‘তোমরা উভয়ে (আদম ও হাওয়া) এখান থেকে নেমে যাও, তোমরা একে অপরের শত্রু। তোমাদের জন্য পৃথিবীতে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বসবাস ও জীবিকা থাকবে।”
— (সূরা আল-বাকারা ২:৩৬)
এই নির্দেশনার মাধ্যমেই মানবজাতির পৃথিবীতে জীবন শুরু হলো। আদম (আঃ) ও হাওয়া (আঃ) পৃথিবীর ভিন্ন ভিন্ন স্থানে অবতরণ করেন, যা তাঁদের জীবনের প্রথম পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত।
তাঁর দয়ালু রাজত্বের শেষ নির্দেশনায় পরম সত্তা মানবজাতিকে তাদের চিরশত্রু সম্পর্কে সতর্ক করে দিলেন:
“শয়তান তোমাদের জন্য শত্রু; অতএব তোমরা তাকে শত্রুরূপেই গ্রহণ করো।”
— (সূরা ফাতির ৩৫:৬)
ইবলিশ, এখন যার নাম শয়তান (Satan), সে তার অহংকারী বিদ্রোহের কারণে চিরকালের জন্য অভিশাপপ্রাপ্ত। তার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো মানবজাতিকে পরম সত্তার সরল পথ থেকে বিচ্যুত করা।
এভাবে, পরম সত্তার রাজত্বের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে মানবজাতি (Human) পৃথিবীতে এলো—একদিকে আল্লাহর সীমাহীন দয়া ও ক্ষমা নিয়ে, অন্যদিকে ইবলিশের চিরন্তন শত্রুতা এবং প্ররোচনা মোকাবিলা করার চ্যালেঞ্জ নিয়ে। তাঁদের এই পৃথিবীতে অবতরণ কোনো শাস্তি ছিল না, বরং এটি ছিল খলিফা (প্রতিনিধি) হিসেবে তাঁদের দায়িত্ব পালনের সূচনা। পৃথিবীতে তাঁদের জীবন হলো সেই যুদ্ধক্ষেত্র, যেখানে মানুষ স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি ব্যবহার করে তাঁর প্রভুর প্রতি অনুগত থাকে, নাকি শয়তানের অনুসারী হয়—তা নির্ধারণ করাই হলো মূল পরীক্ষা।
অধ্যায় ০৭ঃ মানুষ
জান্নাত থেকে পৃথিবীতে অবতরণের পর, আদম (আঃ) ও হাওয়া (আঃ) পরম সত্তার (Supreme Being-এর) করুণায় একে অপরের সাথে মিলিত হলেন। এই মিলন থেকেই পৃথিবীতে মানবজাতির বংশবৃদ্ধি শুরু হয়। যেহেতু তাঁরাই পৃথিবীর প্রথম মানব-মানবী ছিলেন, তাই বংশ রক্ষার প্রাথমিক প্রয়োজনে তাঁদের সন্তানদের মাঝে বিবাহ সম্পন্ন হয়েছিল—যা সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে আল্লাহর (Supreme Being-এর) নির্দেশিত পন্থা ছিল।
প্রথম মানব পরিবার তাদের স্রষ্টা, এক পরম সত্তারই উপাসনা করত। এই বিশুদ্ধ একেশ্বরবাদ বা তাওহীদ-এর উপরই মানবজাতির ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল।
তবে ইবলিশ, এখন যার নাম শয়তান, সে তার প্রতিজ্ঞা রক্ষায় সর্বদা তৎপর ছিল। তার বিদ্বেষপূর্ণ লক্ষ্য ছিল মানবজাতিকে স্রষ্টার সরল পথ থেকে বিচ্যুত করা। শয়তান তার প্ররোচনা দিয়ে ধীরে ধীরে মানব সমাজকে আল্লাহর কথা ভুলিয়ে দিতে শুরু করল।
এক পরম সত্তার ইবাদত ভুলে গিয়ে মানুষ বিভিন্ন দেব-দেবী, আগুন, আকাশ, পানি, সূর্য, নক্ষত্র—অর্থাৎ সৃষ্ট বস্তুর পূজা করতে শুরু করল। তারা ভুলে গেল যে এই সমস্ত কিছুই তাঁর রাজত্বের অধীনস্থ সৃষ্টি মাত্র।
পরম সত্তা (Supreme Being) তাঁর সৃষ্টির প্রতি অসীম দয়ালু। তিনি কখনোই মানুষকে অন্ধকারে ছেড়ে দেননি। যখনই মানবসমাজ বিভ্রান্ত হয়েছে এবং শয়তানের ধোঁকায় পথভ্রষ্ট হয়েছে, তখনই তিনি সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার জন্য মানুষের মধ্য থেকেই নবী (Prophet) বা পথপ্রদর্শক প্রেরণ করেছেন।
এই নবীগণ, যেমন নূহ (আঃ), ইব্রাহিম (আঃ), মূসা (আঃ), ঈসা (আঃ) এবং সর্বশেষ মুহাম্মদ (সাঃ)—তাঁরা নতুন করে মানুষকে এক আল্লাহর (Supreme Being-এর) পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। তাঁদের মাধ্যমে প্রেরিত হয়েছে ঐশী গ্রন্থ ও জীবনবিধান। মানুষ আবার নতুন করে আল্লাহকে চিনতে শুরু করেছে এবং তাঁর দেখানো পথে ফিরে এসেছে।
তবে মানব ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি বারবার ঘটেছে: কিছু সময় পর আবার শয়তানের ধোঁকায় পড়ে মানুষ সেই সরল পথ থেকে সরে গিয়েছে, সত্যকে অস্বীকার করেছে এবং নিজেদের খেয়ালখুশিমতো জীবন যাপন করেছে।
আদিম যুগ, মধ্য যুগ, এবং আধুনিক যুগ—এই পুরো সময়জুড়েই কত শত জাতি এসেছে এবং চলে গেছে। প্রতিটি জাতি ছিল সময়ের সাক্ষী; তাদের উত্থান এবং পতন ছিল মূলত তাদের নৈতিক নির্বাচন এবং স্রষ্টার প্রতি তাদের আনুগত্যের ফল।
আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্যটি কখনোই পরিবর্তন করেননি: তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন পরীক্ষার জন্য।
মানবজাতি তাদের বুদ্ধি এবং স্বাধীন ইচ্ছাশক্তির মাধ্যমে দিন দিন জ্ঞানী (Knowledgeable) হয়ে উঠল। তারা গড়ে তুলল সুবিশাল শহর, তৈরি করল জটিল প্রযুক্তি এবং একসময় মহাকাশেও পাড়ি জমাল। এই জ্ঞানের জোরে তারা মহাবিশ্বের বিশালতা, নক্ষত্রপুঞ্জ ও গ্যালাক্সির শৃঙ্খলা দেখতে পেল।
কিন্তু এই বিপুল জ্ঞানার্জনের এক বিপরীত ফল দেখা যেতে লাগল। মানুষ এই মহাবিশ্বের দিকে তাকিয়ে বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করতে লাগল, "এত কিছু কে বানিয়েছে?" অথচ, তারা ভুলে গেল যে এই সমস্ত কিছুর সৃষ্টিকর্তা এবং নিয়ন্ত্রক হলেন সেই মহান পরম সত্তা (Supreme Being)—যাঁর পরিচয় তাদের পূর্বপুরুষদের শেখানো হয়েছিল।
এই জ্ঞান এবং প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষের সময়ে এসে মানবজাতি এক গুরুতর পরীক্ষায় লিপ্ত হয়েছে। তারা নিজেদের ক্ষমতা এবং আবিষ্কারের গৌরবে এতটাই মত্ত হয়ে উঠেছে যে, তারা তাদের স্রষ্টার কথা ভুলতে শুরু করেছে।
এই পরিস্থিতিই ইঙ্গিত দেয় যে, শেষ সময়ে এসে মানুষ প্রযুক্তিতে এতটাই জ্ঞান অর্জন করবে যে, তারা অহংকারের বশে নিজেদেরই স্রষ্টা ভাবতে শুরু করবে। এই আত্ম-প্রতারণার ফলস্বরূপ, তারা আল্লাহর নির্দেশিত পথ থেকে সরে যাবে এবং পাপাচারে (Moral Degeneration) লিপ্ত হবে। তারা ভুলে যাবে যে, মানবীয় জ্ঞান যতই বিস্তৃত হোক না কেন, তা সেই পরম সত্তার জ্ঞানের একটি ক্ষুদ্র কণা মাত্র।
এই বৈষয়িক জ্ঞান, যা আসলে স্রষ্টারই দান, তা যখন মানুষের অহংকারের কারণ হয়, তখনই তারা তাদের খলিফা (প্রতিনিধি) হওয়ার দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত হয়। এটিই হলো বর্তমান যুগের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা—প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে স্রষ্টার নৈকট্য লাভ করা, নাকি সেই প্রযুক্তিকেই স্রষ্টা ও সৃষ্টির মাঝখানে দেওয়াল হিসেবে দাঁড় করানো।
ঠিক সেই মুহূর্তে কবরের সেই চূড়ান্ত পরীক্ষা শুরু হয়। পরম সত্তার নির্দেশিত দুজন ফেরেশতা (মুনকার ও নাকীর) এসে উপস্থিত হন এবং তিনটি মৌলিক প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেন:
১. তোমার রব কে? ২. তোমার দ্বীন (জীবন ব্যবস্থা) কী? ৩. তোমার রাসূল (পথপ্রদর্শক) কে?
এই প্রশ্নগুলো কেবল মুখস্থ বিদ্যার পরীক্ষা নয়; এটি ব্যক্তির দুনিয়াবী জীবনের কর্ম ও বিশ্বাসের প্রতিচ্ছবি।
যারা দুনিয়াতে আরাম-আয়েশ, শয়তানের প্ররোচনা এবং ভোগ-বিলাসে মগ্ন ছিল, যারা পরম রব, তাঁর রাসূল এবং পৃথিবীতে তাদের আগমনের মূল উদ্দেশ্য ভুলে গিয়েছিল, তারা এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে পারে না। তাদের স্মৃতিশক্তি তখন কাজ করে না—কারণ আল্লাহর আনুগত্য ভুলে যাওয়ার শাস্তি হিসেবে তারা উত্তর জানা সত্ত্বেও ভুলে যায়। তারা বুঝতে পারে না যে তারা কোন কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি।
তখন তাদের ওপর শুরু হয় কঠিন শাস্তি বা 'আযাবুল কবর' (Punishment of the Grave)। এটি পরম সত্তার সেই ঘোষণার বাস্তবায়ন, যেখানে তিনি বলেছিলেন যে যারা শয়তানের ধোঁকায় পড়ে তাঁকে ভুলে যাবে, তিনি তাদের কঠিন শাস্তির সম্মুখীন করবেন।
অন্যদিকে, যারা নেক কাজ করে, যারা পরম রবের দেখানো পথে চলে, এবং যারা দুনিয়ার জীবনে বিশ্বাস ও কর্মের মাধ্যমে এই প্রশ্নের উত্তরকে সত্য প্রমাণ করেছে—তারা নির্ভুলভাবে উত্তর দিতে সক্ষম হয়।
উত্তর দেওয়ার পর তাদের জন্য কবর এক শান্তির আলয়ে পরিণত হয়। তাদের জন্য কবর হয়ে যায় বিছানার মতো, এক ফুলের বিছানা। তারা পরম শান্তিতে কিয়ামত পর্যন্ত ঘুমিয়ে থাকে, চূড়ান্ত বিচারের জন্য অপেক্ষা করে।
এখানে উল্লেখ করা জরুরি যে, যার মরদেহ দাফন করা হয় না (যেমন—ডুবে যাওয়া, আগুনে পুড়ে যাওয়া বা ধ্বংস হয়ে যাওয়া), তাকেও তার অবস্থানস্থল থেকে একইভাবে বারযাখের প্রশ্ন ও নিয়ামতের সম্মুখীন করা হবে। কবরের পরীক্ষা হলো আসলে জীবনের পরীক্ষারই চূড়ান্ত ফলাফল।
কিয়ামতের সূচনা হবে এক মহাজাগতিক বিপর্যয় দিয়ে, যা মানবজাতির কল্পনার অতীত। পরম সত্তার নির্দেশেই এই মহাবিশ্বের সকল নিয়ম উল্টে যাবে:
পৃথিবীর গতিপথ পরিবর্তন: পৃথিবী তার স্বাভাবিক ঘূর্ণনপথের বিপরীত দিকে ঘুরতে শুরু করবে। এর ফলস্বরূপ, যে সূর্য সারাজীবন পূর্ব দিক থেকে উঠেছে, তা পশ্চিম দিক থেকে উদিত হবে। এটিই হবে কিয়ামতের অন্যতম প্রধান লক্ষণ, যা দেখে মানুষ বুঝতে পারবে যে সময় ফুরিয়ে এসেছে।
আকাশের বিভীষিকা: আকাশ তার চিরচেনা রূপ হারাবে। তা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে, তার রঙ পাল্টে যাবে এবং আগুনের মতো লাল বর্ণ ধারণ করবে। কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, আকাশ এমনভাবে ফেটে যাবে যেন তা গোলাপের মতো (সূরা আর-রহমান ৫৫:৩৭)।
মহাজাগতিক ধ্বংস: গ্রহ-নক্ষত্রগুলো তাদের কক্ষপথ থেকে বিচ্যুত হয়ে একে অপরের সাথে আছড়ে পড়বে বা পৃথিবীতে পতিত হবে। সূর্য, চাঁদ এবং তারা তাদের আলো হারাবে বা সম্পূর্ণরূপে অদৃশ্য হয়ে যাবে। মহাবিশ্বের যে সুশৃঙ্খল বিন্যাস আমরা দেখি, তা সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়বে।
মহাজাগতিক বিপর্যয়ের পাশাপাশি পৃথিবী নিজেও এক ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হবে:
ভূমিকম্প ও পর্বত বিলুপ্তি: পৃথিবী প্রচন্তভাবে কাঁপতে থাকবে। ভূমি ফেটে যাবে, এবং বিশাল পর্বতমালাগুলো তুলোর মতো উড়ে যাবে বা ধূলায় পরিণত হবে।
সমুদ্রের প্রলয়: সমুদ্রের পানি জ্বলে উঠবে অথবা উষ্ণ হয়ে সম্পূর্ণরূপে শুকিয়ে যাবে। কোনো কোনো বর্ণনায় আছে যে, সমুদ্রগুলো ফেটে গিয়ে আগুন নির্গত হবে।
সর্বত্র আগুন: পৃথিবীর পৃষ্ঠে ভয়াবহ আগুন ছড়িয়ে পড়বে, এবং ভূমি ফেটে গলিত লাভা ও অগ্নি নির্গত হবে।
এই দৃশ্য দেখে মানুষ চরম আতঙ্ক ও ভয়ে দিশেহারা হয়ে পড়বে। তারা বিভ্রান্তিতে দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে দৌড়াতে চেষ্টা করবে, কিন্তু কোনো আশ্রয় বা নিরাপদ স্থান খুঁজে পাবে না। কোনো কিছুই তাদের এই মহাপ্রলয় থেকে রক্ষা করতে পারবে না।
ই চূড়ান্ত ধ্বংসের পরই আসবে পুনরুত্থানের পালা। দ্বিতীয়বার শিঙ্গায় ফুঁক দেওয়ার সাথে সাথেই, কবরের মৃতদেহগুলো উঠে আসবে। শুধু কবরের নয়, পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে যে যে অবস্থায় আছে, সকল রুহ আবার তাদের দেহে ফিরে পাবে এবং জীবিতদের সামনে হাজির হবে।
কিয়ামত শুধু ধ্বংসের দিন নয়, এটি হলো মহাবিচারের দিন (Day of Judgment)। সেদিন সমস্ত মানবজাতিকে পরম সত্তার সামনে উপস্থিত করা হবে। প্রতিটি ব্যক্তি তার দুনিয়ার জীবনে কৃতকর্মের জন্য দায়ী হবে। মানুষের প্রতিটি ছোট-বড় পাপ-পুণ্যের হিসাব নেওয়া হবে। সেদিন কোনো সুপারিশকারী ছাড়া কেউ কারো সাহায্য করতে পারবে না, এবং কোনো অন্যায় করা হবে না।
মানবজাতির ইতিহাস, যা আদম (আঃ)-এর সৃষ্টি থেকে শুরু হয়েছিল, এবং ইবলিশের বিদ্রোহের চ্যালেঞ্জ নিয়ে পৃথিবীতে তাদের জীবন ছিল, তার চূড়ান্ত পরিণতি এই মহাবিচারের মধ্য দিয়েই সম্পন্ন হবে। সেদিনই নির্ধারিত হবে, কে চিরস্থায়ী জান্নাতের অধিকারী হবে আর কে জাহান্নামের ভয়াবহ শাস্তির মুখোমুখি হবে—এটিই পরম সত্তার রাজত্বের চূড়ান্ত ন্যায়বিচার।



.png)






Comments
Post a Comment