বাংলার সমস্ত ভুতের ইতিহাস
পেত্নী
লেখকঃ সীমান্ত সরকার
বাংলা লোককথা, লোকবিশ্বাস ও পুরাণ জুড়ে জড়িয়ে আছে নানা প্রকার ভূতের গল্প। এই অশরীরী সত্ত্বাগুলির মধ্যে অন্যতম পরিচিত এবং উল্লেখযোগ্য হলো পেত্নী। পেত্নী হলো বাংলা লোককথার এক প্রকার নারী ভূত বা অশরীরী আত্মা। এটি শুধু একটি ভীতিকর চরিত্র নয়, বরং সমাজের চাপা পড়া অতৃপ্ত বাসনা এবং অপূর্ণ ইচ্ছার প্রতীক। পেত্নী' শব্দটি এসেছে সংস্কৃত শব্দ 'প্রেতিনী' থেকে। প্রেতিনীর পুরুষবাচক শব্দ হলো 'প্রেত'। পেত্নী সাধারণত সেইসব মহিলাদের অতৃপ্ত আত্মা, যারা জীবিত অবস্থায় কোনো তীব্র ইচ্ছা অপূর্ণ রেখে, অপ্রত্যাশিতভাবে বা অপঘাতে মারা গেছেন। বিশেষত, যে নারীরা অবিবাহিত অবস্থায়, সন্তান প্রসবের পূর্বে বা পরে, অথবা অকালমৃত্যুর শিকার হন, তাদের আত্মা অতৃপ্ত বাসনা নিয়ে পেত্নী রূপে ঘুরে বেড়ায় বলে বিশ্বাস করা হয়।লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, পেত্নীর রূপ বহুক্ষেত্রে বীভৎস এবং অস্বাভাবিক হয়। তার পাগুলো সাধারণত পেছনের দিকে ঘোরানো থাকে। প্রায়শই তাকে সাদা শাড়ি পরিহিত অবস্থায় বা এলোমেলো বেশে দেখা যায়। অনেক কাহিনিতে পেত্নীকে অত্যন্ত লম্বা, রোগা এবং শুকনো চেহারার বর্ণনা করা হয়েছে।
পেত্নীর প্রিয় স্থান হলো নির্জন পুকুর পাড়, শ্মশান, গভীর জঙ্গল বা পরিত্যক্ত বাড়ি। পেত্নী প্রায়শই শিকারকে আকর্ষণ করার জন্য রূপ পরিবর্তন করে বা মিষ্টি কণ্ঠে ডাকে। তবে একবার ধরা পড়লে তার আসল ভয়ানক রূপ প্রকাশ পায়। পেত্নী সাধারণত জীবিত মানুষের ক্ষতি করে না, তবে তার লক্ষ্য থাকে নিজের অতৃপ্ত বাসনা পূরণ করা বা অন্যকে তার অপূর্ণ ইচ্ছার অংশীদার করা।
বাংলা লোককথায় পেত্নী নিয়ে অসংখ্য গল্প প্রচলিত,
০১. রাতের অন্ধকারে পথের পথিককে ভয় দেখানো।
০২. পুরুষদের প্রলুব্ধ করে গভীর জঙ্গলে বা জলাশয়ে নিয়ে যাওয়া।
০৩. বিশেষ কোনো বস্তুর প্রতি আকর্ষণ (যেমন: চুরি হওয়া গয়না বা পছন্দের খাবার)।
সাংস্কৃতিক তাৎপর্য: কেন পেত্নী এত গুরুত্বপূর্ণ?
পেত্নী কেবল একটি ভীতিকর চরিত্র নয়, এটি সমাজে নারীদের অপূর্ণতা ও বঞ্চনার প্রতীক হিসেবেও দেখা যায়। যেসব নারী সমাজে যথাযথ সম্মান বা স্থান পায়নি, তাদের আত্মা পেত্নী হয়ে ফিরে আসে। পেত্নীর কাহিনিগুলি বিশেষত শিশুদের এবং রাতে একা ভ্রমণকারীদের জন্য একটি সতর্কীকরণমূলক বার্তা বহন করে। বাংলা সাহিত্য, সিনেমা এবং সিরিয়ালে পেত্নীর চরিত্রটি বারবার ব্যবহৃত হয়েছে, যা এর জনপ্রিয়তা এবং সাংস্কৃতিক প্রভাবের প্রমাণ দেয়।
শাঁকচুন্নি
শাঁকচুন্নি হলো বাংলা লোককথা এবং দক্ষিণ এশিয়ার ফোকলোরে বর্ণিত এক বিশেষ প্রকার নারী ভূত। এটি সেই সব মহিলার অতৃপ্ত আত্মা, যারা বিবাহিত অবস্থায় বা সধবা অবস্থায় মারা গেছেন। শাঁকচুন্নি' শব্দটি এসেছে সংস্কৃত শব্দ 'শঙ্খচূর্ণী' বা 'শঙ্খচূড়নী' থেকে। এখানে 'শঙ্খ' (শাঁখা) শব্দটি এর বৈশিষ্ট্যের মূল চাবিকাঠি। বিশ্বাস করা হয় যে, যে বিবাহিত নারী জীবিত অবস্থায় অতৃপ্ত বাসনা, দাম্পত্য জীবনের অপূর্ণতা, অথবা কোনো আকস্মিক ও অস্বাভাবিক মৃত্যু (যেমন আত্মহত্যা বা দুর্ঘটনা) নিয়ে মারা যান, তার আত্মাই শাঁকচুন্নি রূপে পৃথিবীতে ফিরে আসে। শাঁকচুন্নিকে প্রায়শই সাদা শাড়ি পরিহিত অবস্থায় দেখা যায়। এই সাদা শাড়ি কখনও কখনও লাল পাড়ের সঙ্গে দেখা যায়, যা বাঙালি সধবা নারীর চিরাচরিত পোশাকের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ, অথচ ভূত হওয়ায় এটি বিধবার বেশকেও ইঙ্গিত করে। তার হাতের শাঁখা (শঙ্খের চুড়ি) তার প্রধানতম বৈশিষ্ট্য। শাঁখা বাঙালি বিবাহিত হিন্দু মহিলাদের প্রতীক। শাঁখার মৃদু বা তীক্ষ্ণ শব্দ তার উপস্থিতির জানান দেয়। শাঁকচুন্নির প্রিয় স্থান হলো শেওড়া গাছ, পুরোনো বট বা অশ্বত্থ গাছ, নির্জন বাঁশবাগান এবং জলাশয়ের কাছাকাছি স্থান। শেওড়া গাছকে অনেক লোককথায় ভূতের আশ্রয়স্থল বলে মনে করা হয়।
শাঁকচুন্নি সাধারণত সুন্দর ও স্বাভাবিক নারী রূপে আবির্ভূত হয়। তবে তার আসল রূপ হয় ভয়ানক। লোককথা অনুযায়ী, তার পায়ের পাতা পেছনের দিকে ঘোরানো থাকতে পারে, যদিও শাঁকচুন্নিকে প্রায়শই পেত্নীর মতো লম্বা বা বীভৎস না দেখিয়ে বরং ছলনাময়ী রূপে দেখানো হয়।
শাঁকচুন্নির মূল লক্ষ্য হলো ধনী, সুখী বা সদ্য বিবাহিত মহিলাদের ওপর ভর করা বা আক্রমণ করা। কারণ: সে নিজে যে বিবাহিত জীবনের সুখ, স্বামী ও সংসার উপভোগ করতে পারেনি, সেই সুখ সে জীবিত নারীর জীবন দখল করে পেতে চায়। তার প্রধান উদ্দেশ্য হলো সধবা মহিলার জীবন গ্রহণ করে দাম্পত্য জীবনের প্রতিটা মুহূর্ত উপভোগ করা। সে পথচারী পুরুষদের প্রলুব্ধ করতে পারে বা গৃহস্থ নারীদের বন্ধুত্বপূর্ণ রূপে কাছে আসতে পারে। কিন্তু তার অন্তরের আকাঙ্ক্ষা হলো সেই সধবা নারীর প্রতীকী জীবন ছিনিয়ে নেওয়া
শাঁকচুন্নি চরিত্রটি গ্রামীণ সমাজে নারীদের অপূর্ণ বাসনা এবং স্বাভাবিক জীবনযাপনের আকাঙ্ক্ষার একটি প্রতীক। বিবাহিত জীবনে অপূর্ণতা বা অকালমৃত্যুর শিকার নারীদের আত্মা যে মুক্তি পায় না, এই বিশ্বাস তার মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়।
লোককথায় শাঁকচুন্নির গল্পগুলি নারীদের প্রতি এবং নির্জন পথে পথিকের প্রতি এক সতর্কতা হিসেবে কাজ করে। বিশেষত, বিবাহিত নারীদের তাদের প্রতীকী চিহ্ন (শাঁখা-সিঁদুর) রক্ষা করার গুরুত্বকেও পরোক্ষভাবে তুলে ধরে। পেত্নী হলো সাধারণত অবিবাহিত বা সন্তানহীনা নারীর অতৃপ্ত আত্মা, যাদের প্রধান লক্ষ্য দুষ্টুমি বা প্রতিশোধ। অন্যদিকে, শাঁকচুন্নি হলো সধবা নারীর আত্মা, যার মূল আকাঙ্ক্ষা হলো পুনরায় বিবাহিত জীবন যাপন করা।
ডাইনি
বাংলার লোককথা এবং গ্রামীণ ফোকলোরের অন্যতম ভয়ঙ্কর চরিত্র হলো ডাইনি (Daini) বা ডাকিনী । পেত্নী বা শাঁকচুন্নির মতো মৃত বা অশরীরী আত্মা না হয়েও, ডাইনিকে সাধারণত এমন এক নারী হিসেবে গণ্য করা হয়, যিনি জীবিত অবস্থায় কালো জাদু (Black Magic) বা ডাকিনীবিদ্যা চর্চা করে অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা অর্জন করেছেন। ডাইনি চরিত্রটি কেবল ভীতির জন্ম দেয় না, বরং সমাজের গভীরতম কুসংস্কার ও অবিশ্বাসের প্রতীক।
ডাইনি' শব্দটি এসেছে সংস্কৃত 'ডাকিনী' শব্দ থেকে। পৌরাণিক দিক থেকে 'ডাকিনী' শব্দটি দেবী কালীর অনুচর, সহকারী বা এক প্রকার পিশাচ-নারীকে বোঝাত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে, এই শব্দটি লোককথায় খারাপ কাজ করা বা কালো জাদু চর্চা করা নারীদের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হতে থাকে।
মধ্যযুগে ইউরোপে যেমন 'উইচ হান্ট' (Witch Hunt) ছিল, তেমনই ভারতীয় উপমহাদেশেও ডাইনি সন্দেহে নারীদের উপর অত্যাচারের বহু ঘটনা ঘটেছিল। সমাজের দুর্বল, বয়স্ক বা বিধবা নারীরা প্রায়শই এই সন্দেহের শিকার হতেন।
লোককথায় ডাইনিরা সাধারণত বৃদ্ধা বা বয়স্ক নারীর বেশে সমাজে মিশে থাকে। তারা প্রায়শই দরিদ্র বা সমাজের একঘরে সদস্য হয়ে থাকে। তাদের চেহারায় প্রায়শই কিছু অস্বাভাবিকতা দেখা যায় তীক্ষ্ণ বা লালচে চোখ, লম্বা নখ এবং এলোমেলো চুল। অনেক সময় তারা নোংরা বা পুরোনো শাড়ি পরিহিত থাকে। ডাইনিরা সহজে ধরা দেয় না। তবে লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, তাদের শরীরের কিছু অংশে জন্মদাগ বা অস্বাভাবিক চিহ্ন থাকতে পারে, যা তাদের ডাকিনীবিদ্যার পরিচয় দেয়। অনেক সময় তাদের কাছে জাদুর কাঠি, বিভিন্ন প্রকার ভেষজ, খুলি বা হাড় থাকে, যা তাদের জাদুকরী ক্রিয়াকলাপের সরঞ্জাম।
ডাইনিরা পশুপাখি, বিশেষত পেঁচা, বিড়াল বা কুকুরের রূপ ধারণ করে মানুষের ক্ষতি করতে পারে বা নজর রাখতে পারে। তারা তন্ত্রমন্ত্রের সাহায্যে কোনো ব্যক্তিকে বশীকরণ করতে পারে বা কোনো পরিবারের উপর অভিশাপ দিয়ে রোগ-শোক ও ধ্বংস নামিয়ে আনতে পারে। ডাইনিদের প্রধান লক্ষ্য হলো শিশু ও গর্ভবতী মহিলা। বিশ্বাস করা হয় যে, তারা শিশুদের শরীরের রক্ত বা প্রাণশক্তি শোষণ করে নিজেদের ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। লোককথায় প্রচলিত, ডাইনিরা গভীর রাতে মানুষের নাম ধরে মিষ্টি কণ্ঠে ডেকে ব্যক্তিকে ঘর থেকে বের করে আনে। এই ডাককে 'নিশি' বলে এবং এতে সাড়া দিলে সেই ব্যক্তি বা তার পরিবারের ঘোর বিপদ অনিবার্য। জাদুকরী ক্ষমতাবলে তারা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে দ্রুত যেতে পারে।
ডাইনি চরিত্রটি গ্রামীণ সমাজে গভীর ভয় ও কুসংস্কার তৈরি করে। কোনো গ্রামে হঠাৎ রোগ বা ফসলের ক্ষতি হলে প্রায়শই কোনো দুর্বল নারীকে ডাইনি সন্দেহে দায়ী করা হয়। ঐতিহাসিকভাবে, ডাইনি অপবাদ সমাজে নারীর প্রতি বৈষম্য ও অত্যাচার এর একটি অন্যতম কারণ ছিল। যে নারী স্বাধীনচেতা বা প্রচলিত সামাজিক রীতির বাইরে চলতেন, তাদের উপর এই অপবাদ দেওয়া হতো। ডাইনি চরিত্রটি বাংলা সাহিত্য, নাটক ও চলচ্চিত্রে বারে বারে উঠে এসেছে, যা এর স্থায়ী সাংস্কৃতিক প্রভাবের প্রমাণ।
দেও ভূত হলো দৈত্য-দানব শ্রেণির প্রেতাত্মা, যা বাংলাদেশের এবং তৎসংলগ্ন অঞ্চলের (যেমন পশ্চিমবঙ্গ, আসাম) লোককথা ও রূপকথায় বহুল প্রচলিত। এরা সাধারণত অশুভ শক্তি এবং বিশাল আকার ও বলিষ্ঠতার প্রতীক। দেও-এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর বিশাল আকার। এরা সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেক বেশি লম্বা, এমনকি গাছের সমান বা তার চেয়েও উঁচু হতে পারে। এদের দেখে শক্তিশালী ও দানবীয় বলে মনে হয়।
লোককথা অনুযায়ী, এদের শরীর হয় পেশিবহুল এবং অত্যন্ত শক্তিশালী। এরা সহজে গাছ উপড়ে ফেলতে বা বড় পাথর সরাতে পারে। দেও ভূত সাধারণত গভীর জঙ্গল, নির্জন পাহাড়, পুরনো বা ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবন, অথবা বিশাল কোনো জলাশয়ের ধারে বাস করে বলে মনে করা হয়। তারা মানুষের বসতি থেকে দূরে থাকতেই পছন্দ করে।
এদের গায়ের রঙ সাধারণত কালো, গাঢ় ধূসর বা কালচে নীল হতে পারে। অনেক সময় এদের জ্বলন্ত লাল চোখ এবং লম্বা ধারালো নখ ও দাঁত থাকার কথাও শোনা যায়। দেও ভূত খুবই অনিষ্টকারী এবং হিংস্র প্রকৃতির হতে পারে। এদের প্রধান কাজ হলো:
রাতের বেলা বা নির্জন স্থানে মানুষকে ভয় দেখানো।
যাত্রী বা পথিকের পথ ভুলিয়ে দেওয়া এবং বিপদে ফেলা।
বিভিন্ন ধরনের অলৌকিক শব্দ (যেমন- গর্জন, গাছের ডাল ভাঙার শব্দ) তৈরি করে ভীতি সৃষ্টি করা।
কিছু কিছু গল্পে এদের মানুষের মাংস বা রক্ত খাওয়ার প্রবণতাও দেখা যায়, যদিও এটি দানবীয় পিশাচের বৈশিষ্ট্য হিসেবেও পরিচিত।




Comments
Post a Comment