⭐ বনদেবী শিমা
লেখকঃ সীমান্ত সরকার
ক্যাম্পে এসে দেখি দুটো বড় গাছের সঙ্গে কাঠ আর লোহার পাত দিয়ে গড়া কয়েকটা ঘর মাটি থেকে প্রায় বারো ফুট উঁচুতে। এমন ছয় সাতটা ঘর দাঁড়িয়ে আছে। শুনলাম জোয়ারের সময় পুরো জায়গা নোনা পানিতে ডুবে যায় তাই এত উঁচুতে ঘর বানানো। এখানে নাকি পাকাপোক্ত স্থাপনা করা যায় না।
এসে প্রথমেই যা শুনলাম তা হলো এখানে বাঘের উপদ্রব বেশি আর নদীর ধারে হওয়ায় কুমিরের ভয় তো রয়েছেই।
সকালে জোয়ার আসায় সবাই গাছের উপরে ঝুলে থাকা ছোট কাঠের ক্যাম্প ঘরেই অবস্থান নিলাম। জোয়ার কমে গেলে রান্না বান্নার প্রস্তুতি শুরু হলো। বনে কাঠ খড়ির অভাব নেই। কিন্তু জোয়ারের পানিতে সব ভিজে যায় তাই রান্না করতে হয় সিলিন্ডারের গ্যাসেই। দুজন গার্ড রান্নায় থাকল আর আমি বাকি তিনজনকে নিয়ে বনের ভেতরে ঢুকলাম।
ন এত ঘন যে দিনের আলোতেও পথ চেনা কঠিন। কিছু জায়গায় টর্চ না জ্বালিয়ে সামনে এগোনো যায় না। আমি ভাবছি এমন অন্ধকারে যদি বাঘ হঠাৎ আক্রমণ করে তাহলে বাঁচার উপায় নেই। বাঘ অন্ধকারে সব দেখতে পায় আর আমরা পারব না। তবু এই অঞ্চল পাহারা দেওয়া জরুরি। যত চোরাচালানকারি আছে তারা এই গহিন অংশেই লুকিয়ে থাকে।
বাঘ এখানে আমার মৃত্যুর কারণ হতে পারে। তবু বাঘের বেঁচে থাকার জন্য আমাকেই পাহারা দিতে হবে। বুড়ো বয়সে পেনশনের আশায় জীবন বাজি রেখে এই ফরেস্ট গার্ডের চাকরিটা করে যাচ্ছি।
এরা মধু সংগ্রহ করে আর মাছ ধরে। সেই মধুর বিনিময় আমরা তাদের চাল ডাল আর তেল দেই। আবার সেই মধু আমরা স্থানীয় বাজারে এক পরিচিত লোকের মাধ্যমে বিক্রি করি।
একজন গার্ড গ্রামের মুরুব্বির হাতে এক প্যাকেট সিগারেট দিল আর পাশের ঘরের এক মহিলাকে দিল দুই বোতল সয়াবিন তেল। মুরুব্বি কাচের বোতলে ভরে দিলেন দুই বোতল মধু। তারপর চোখে পড়ল তাদের ঘরের পাশেই ছোট জমি কেটে ধান রোপণ করা হয়েছে। পুরো পাড়াটা গাছের ডাল কেটে বেড়া দেওয়া।
আমি জিজ্ঞেস করলাম এখানে ভয় করে না। মুরুব্বি শান্ত গলায় বললেন বনদেবী শিমা আমাদের রক্ষা করেন।
অনেক দেব দেবীর নাম শুনেছি তবে এ নতুন দেবীর নাম প্রথম শুনে আমি বেশ অবাক হলাম। বাংলার পুরোনো ইতিহাসে নাকি চাঁদ সওদাগর সুন্দরবনের পাশেই বাস করতেন। এই বনে একটি পুরোনো মন্দিরও আছে। তাই তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসে নানা দেবদেবীর প্রচলন থাকাটা স্বাভাবিক।
ক্যাম্পে ফিরে আসতেই দেখি এক গার্ড মাটিতে পড়ে আছে। তার সারা দেহে রক্ত লেগে আছে। দৌড়ে গিয়ে তাকে ধরতেই বুঝলাম সে ভয়াবহভাবে আহত। মুখের এক পাশ ছিঁড়ে গেছে যেন কেউ দাঁত দিয়ে কামড়ে ছিঁড়ে নিয়েছে।
আমি তড়িঘড়ি জিজ্ঞেস করলাম তোমার সঙ্গী কোথায়। গার্ড মুখে কোনো কথা বলতে পারল না। গলা দিয়ে শুধু অস্পষ্ট শব্দ বের হলো। ধীরে ধীরে সে হাত তুলে সামনের দিকে ইশারা করল। আঙুল কাঁপছে ভয় আর ব্যথায়।
তার ইশারার দিকেই তাকাতেই দেখি বাকি গার্ডরা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে। সবার চোখে আতঙ্ক। তারা প্রায় একস্বরেই বলল শিমা দেবী।
আমি হতবাক হয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে রইলাম। পরিস্থিতি বোঝার আগেই বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত শীতল অনুভূতি নেমে এলো।

Comments
Post a Comment