প্রেম কুমার
লেখকঃ সীমান্ত সরকার
এসএসসি পরীক্ষা শেষ হয়েছে মাত্র। রেজাল্ট প্রকাশ হতে এখনো দেড়-দুই মাস বাকি। এরপর কলেজে ভর্তি হতে আরও দুই-তিন মাস সময় লেগে যাবে। মাঝের এই দীর্ঘ ফাঁকাটা ভীষণ অলস ও নির্জীব মনে হতো। তাই ঘরে বসে আড্ডায় দিন কাটানোর বদলে বড়ভাইয়ের কম্পিউটারের দোকানে বসা শুরু করলাম। টুকটাক কম্পিউটার সারানো, সফটওয়্যার দেওয়া এসব কাজ আগেই শিখে ছিলাম। ভাই বিকেলে দোকানে আসে, আর আমি সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত দোকান সামলে রাখি।তখন স্কুল জীবনটাকে খুব মিস করতাম। স্কুল ছুটির পর সবাই যখন দল বেঁধে দোকানের সামনে দিয়ে যেত তখন আমি কম্পিউটারে হিন্দি গান ছেড়ে ভলিউম বাড়িয়ে দিতাম। যখন মেয়েদের গ্রুপ যেত গানের ভলিউম আরো বেশি করে দিতাম। এটা আমার একটা অভ্যাস ছিল বলা যায়। আবার সবাই চলে গেলে গান বন্ধ করে অল্প সাউন্ড দিয়ে মুভি দেখতাম। যতক্ষণ না আরেকটা কাস্টমার আসত ততক্ষণ মুভি চলত।
একটা মেয়েকে আমার ভীষণ ভালো লাগত। সে তখন নতুন ক্লাস টেনে পড়ছে আমাদের এক ব্যাচ জুনিয়র। প্রতিদিন স্কুল ছুটির সময় দোকানের সামনে দিয়ে যাওয়ার মুহূর্তেই মেয়েটা আমার দিকে তাকিয়ে একটুকরো মুচকি হাসি ছুড়ে দিত। সেই হাসিতে কী এক অদ্ভুত টান ছিল! আমিও তার দিকেই তাকিয়ে লাজুক ভঙ্গিতে হাসি ফিরিয়ে দিতাম।
আরও মজার বিষয় হলো প্রায় দশ মিনিট পর আবারও সে আমার দোকানের সামনে দিয়ে যেত। পরে বুঝলাম, মেয়েটা আমাকে এতটাই পছন্দ করত যে প্রথমবার যাওয়ার পরই পেছনের বিকল্প রাস্তা দিয়ে ঘুরে এসে আবার আমার দোকানের সামনে দিয়ে হাঁটত, শুধু আমাকে আরেকবার দেখার জন্য। প্রতিবারই সে মুচকি হাসত, আর আমার বুকের ভেতরটা কেমন যেন হালকা কাঁপিয়ে যেত। তার নাম জানার কৌতূহল দিনদিন বাড়ছিল।
একদিন হঠাৎই মেয়েটা দোকানে ঢুকল জন্মনিবন্ধনের ফটোকপি করতে। কাগজটা মেশিনে দিতে গিয়েই নামটা চোখে পড়ল মল্লিকা। আহা, নামটাও ঠিক ওর মতোই মিষ্টি! সেদিন তার সঙ্গে ভালোভাবেই কথা হলো। আমি ইচ্ছে করেই কাজটা খুব ধীরে করছিলাম, যেন আরও কিছুক্ষণ কথা বলার সুযোগ পাই।
এরপর থেকে নানান অজুহাতে মল্লিকা দোকানে আসত কখনো ছবি তুলতে, কখনো ফটোকপি করতে, কখনো তার বাটন ফোনে বাংলা অ্যালবামের গান ভরতে। আর সেই অজুহাতেই আমাদের দেখা হতো, কথা হতো, দুজনের ভেতর আলতো এক টান তৈরি হতো।
একদিন অনেক সাহস সঞ্চয় করে তাকে মনের কথা বলে ফেললাম। কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই সে লাজুক এক মুচকি হাসি দিয়ে আমার প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেল। তারপর নিঃশব্দ হাওয়ার মতো দোকান থেকে বেরিয়ে গেল আর আমি বসে রইলাম, বুকের ভেতর আনন্দে ঢেউ তুলতে থাকা এক নতুন ভালোবাসার শুরু নিয়ে।

Comments
Post a Comment