সীমান্ত (এক প্রেম কথা)

 

আজ অবনীর বিয়ে। বিকেলের আকাশটা আজ অন্যদিনের চেয়ে একটু বেশিই লাল, যেন কারো বুকের রক্তক্ষরণ সেখানে গিয়ে মিশেছে। নিজের ঘরটিতে বসে ছটফট করছে ঈশান, কোনোভাবেই নিজের মনকে শান্ত করতে পারছে না সে। দীর্ঘ চার বছরের প্রেম, কিন্তু এক অদ্ভুত স্পর্শহীন ভালোবাসা। তাদের প্রেমের সাক্ষী কেবল ওই নিথর কাঁটাতার আর ওপারের মৃদু বাতাস। 

ঈশান মাঝেমধ্যে ভাবে, অবনী যদি বাংলাদেশের ভেতরে কোথাও থাকত, তবে হয়তো এতক্ষণে বুক ফুলিয়ে ওর হাত ধরে নিজের বাড়ি নিয়ে আসত। কিন্তু ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! অবনী থাকে কাঁটাতারের ওপারে ভারতে। সে হিন্দু পরিবারের মেয়ে, আর ঈশান এপারে মুসলিম। দুটি ভিন্ন ধর্ম, ভিন্ন দেশ আর মাঝখানে ওই তীক্ষ্ণ কাঁটাতারের বেড়া। এই দেয়াল টপকানো যে শুধু তাদের পরিবারের অসম্মতি নয়, বরং দুই দেশের আইনের বিরুদ্ধাচরণ।

অসহায় ঈশান যখন আর সইতে পারল না, তখন বন্ধুদের কাছে গিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল। ওর কান্নায় বাতাসের ভারী হয়ে উঠল। বন্ধুদের মন গলে গেল ঈশানের এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা দেখে। কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকার পর ঈশানের সবচেয়ে কাছের বন্ধুটি উঠে দাঁড়াল। সবার চোখেমুখে তখন দৃঢ় প্রতিজ্ঞা। সিদ্ধান্ত হলো আজ রাতে যা হওয়ার হবে। অন্ধকার যখন গাঢ় হবে, যখন পাহারাদারদের চোখ একটু ঝাপসা হবে, তখনই তারা বর্ডার টপকে ওপার থেকে অবনীকে নিয়ে আসবে। মৃত্যু কিংবা কারাবাস কোনো ভয়ই আজ ঈশানের প্রেমের সামনে টিকতে পারছে না। অবনীর সিঁথিতে অন্য কারো সিঁদুর ওঠার আগেই, কাঁটাতারের ইতিহাস বদলাতে আজ প্রস্তুত একদল যুবক।

অবনীর বিয়ের আর মাত্র তিন দিন বাকি। অথচ ঠিক এই মুহূর্তেই ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। সীমান্তে বইছে যুদ্ধের মতো এক চাপা উত্তেজনা। ওপারে ভারতের বিএসএফ পাহাড় বাড়িয়েছে কয়েকগুণ; হাতে তাদের উদ্যত রাইফেল। এপারে বাংলাদেশের বিজিবিও সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায়। এমনকি বর্ডারের কাছের ধানের জমিগুলোতেও কৃষকদের যেতে বাধা দিচ্ছে বিজিবি, কারণ ওপার থেকে কখন যে তপ্ত বুলেট ছুটে আসে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। বিএসএফ-এর টহল বাহিনীর কাছে সম্পর্কের চেয়ে সীমানার দাগ অনেক বড়। কোনো কারণ ছাড়াই সাধারণ কৃষকের বুকে গুলি চালাতে তাদের হাত কাঁপে না। এমন এক অশান্ত পরিবেশে অবনীকে ওপার থেকে নিয়ে আসা এখন আর কেবল সাহসের ব্যাপার নয়, এটি সরাসরি মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার সমান।





Comments

Popular posts from this blog

শেষ দৃশ্যপট (১ম অধ্যায় )

ফারাওয়ের অভিশাপ

মৃতের নিশ্বাস