সন্ধি বিচ্ছেদ

 লেখক ঃ তন্ময় চৌধুরী


পরিবারের সম্মান আর বাবা-মায়ের মুখের হাসির কথা ভেবেই সারাহ বিয়েতে অমত করেনি। বিয়ের উৎসবটা বেশ ধুমধাম করেই হলো। জীবনের নতুন এই বাঁকটা সারাহর কাছে প্রথম প্রথম স্বপ্নের মতোই মনে হচ্ছিল। বাসর ঘরের সেই লাজুক মুহূর্ত থেকে শুরু করে নতুন সংসারের খুঁটিনাটি সবকিছুর মধ্যেই ছিল গভীর ভালোবাসা আর রোমান্সের ছোঁয়া। দায়িত্ব আর অধিকারের মাঝে সারাহর দিনগুলো কাটছিল এক অদ্ভুত ঘোরে।

ছেলের পরিবার থাকে রাজধানী ঢাকার এক ঘিঞ্জি এলাকায়। এমন জনবহুল আর আকাশছোঁয়া দালানের ভিড়ে থাকার অভিজ্ঞতা সারাহর আগে কখনো ছিল না। সারাদিন চার দেয়ালের মাঝে নিজেকে মাঝেমধ্যে বড় একা লাগে তার। কিন্তু সেই একাকিত্ব ধূসর হওয়ার আগেই সন্ধ্যা নামে। কলিংবেলের শব্দে যখন দরজায় তার স্বামী এসে দাঁড়ায়, সারাহর সমস্ত ক্লান্তি যেন নিমেষেই উধাও হয়ে যায়। ছুটির দিনগুলো সারাহর কাছে সবচাইতে প্রিয়। হাজবেন্ডের হাত ধরে ঢাকার ব্যস্ত রাজপথ কিংবা কোনো নিরিবিলি ক্যাফেতে সময় কাটানো এই মুহূর্তগুলো যেন তার মনে এক চিলতে প্রশান্তির বাতাস বয়ে নিয়ে আসে।

শ্বশুর-শাশুড়ি মানুষ হিসেবে বেশ মার্জিত। তারা সারাহকে পুত্রবধূর চেয়ে মেয়ের নজরেই বেশি দেখেন। তবে সংসার মানেই তো মাঝেমধ্যে কিছু মেঘ-রোদ্দুরের খেলা। শ্বশুরবাড়ির লোকেদের দুই-একটা তিতো কথা বা খোঁচা মাঝেমধ্যে সারাহর কানে বিঁধলেও সে সেটাকে খুব একটা পাত্তা দেয় না। কারণ, দিন শেষে তার স্বামীর অফুরন্ত ভালোবাসা তার মনের সব ক্ষত মুহূর্তেই সারিয়ে দেয়। সারাহ নিজেকে ভাগ্যবতী মনে করে। 



বিয়ের কয়েক মাস যেতে না যেতেই সারাহর কোল জুড়ে নতুন প্রাণের আগমনের বার্তা আসে। দুই পরিবারে খুশির বন্যা বয়ে যায়। কিন্তু এই আনন্দ সারাহর নিজের জীবনে এক নিঃশব্দ একাকিত্বের সূচনা করে। যখন গর্ভধারণের চতুর্থ মাস পার হলো, সারাহ লক্ষ্য করল তার স্বামী ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে। একই বিছানায় পাশাপাশি শুয়ে থাকলেও মাঝখানের দূরত্বটা যেন কয়েক মাইলের। গর্ভাবস্থার শারীরিক পরিবর্তনের কারণে আগের সেই উদ্দাম রোমান্স কমে আসায়, তার স্বামী যেন স্ত্রীর সঙ্গ পেতে অনীহা বোধ করতে শুরু করল। দেহের সেই চেনা স্বাদ না পেয়ে সে হয়ে পড়ল বিমুখ। শুরু হলো দূরত্বের প্রথম ধাপ-প্রথমে দেহের, আর তারপর মনের। সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর সাময়িকভাবে বাড়িতে আনন্দ ফিরল ঠিকই, কিন্তু সারাহ আর তার স্বামীর মাঝে জমে থাকা বরফ পুরোপুরি গলল না। নিয়ম মেনে সন্তান জন্মের ৪২ দিন পর যখন তারা আবার কাছাকাছি আসার চেষ্টা করল, তখনই ঘটল ছন্দপতন। মাঝপথে সন্তানের কান্না সব আয়োজন লণ্ডভণ্ড করে দিল।

সময়ের সাথে সাথে সারাহ নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু মাতৃত্বের চাপ, নির্ঘুম রাত আর সন্তানের দেখাশোনা করতে গিয়ে তার শরীরের সেই জৌলুস কমতে শুরু করল। আয়নার সামনে দাঁড়ালে সারাহ নিজেই নিজের ক্লান্ত চোখ আর ফ্যাকাসে হয়ে যাওয়া রূপ দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। অন্যদিকে, তার স্বামীর চোখে সারাহ এখন আর সেই নতুন কনে নয়, বরং একজন সাধারণ গৃহবধূ। একঘেয়েমি তাদের সম্পর্কে বিষ ঢেলে দিল। একদিন এক তুচ্ছ ঝগড়াকে কেন্দ্র করে সম্পর্কের সুতোটা ছিঁড়ে গেল। বিচ্ছেদ হয়তো কাগজে-কলমে হলো না, কিন্তু তাদের বিছানা আলাদা হয়ে গেল। একই ছাদের নিচে থেকেও তারা এখন দুইজন অচেনা মানুষ। সেই চার দেয়ালের মাঝেই সারাহ হন্যে হয়ে তার স্বামীর পুরনো ভালোবাসা খুঁজে বেড়ায়, কিন্তু যা পায় তা হলো তীব্র অবহেলা। এখন ভালোবাসার জায়গায় জায়গা করে নিয়েছে মারধর আর অকথ্য গালিগালাজ। শুধু সন্তানের মুখের দিকে চেয়ে এক জীবন্ত লাশের মতো সারাহ এই সংসার টেনে নিয়ে যাচ্ছে।

অন্ধকার যখন ঘনীভূত হয়, মানুষ তখন এক চিলতে আলোর জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। সারাহর জীবনেও ঠিক তেমনই হলো। দিনের পর দিন লাঞ্ছনা আর অবহেলার বিষবাষ্পে যখন তার দম বন্ধ হয়ে আসছিল, তখনই ইন্টারনেটের নীল পর্দায় পরিচয় হলো সীমান্ত নামে এক যুবকের সাথে। সীমান্তের জীবনটাও যেন এক ভাঙাচোরা গল্পের খসড়া। স্ত্রীর সাথে বিচ্ছেদ হয়েছে অনেক আগে, বাবা-মা নেই। ঘরে আছে ছোট্ট একটা মেয়ে শিশু। মাতৃহীন সেই সন্তানকে আগলে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা আর সীমান্তের একাকী জীবনের গল্প শুনে সারাহর বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল। নিজের অজান্তেই তার মনে মায়া জন্মালো। আর সেই মায়ার হাত ধরেই শুরু হলো বন্ধুত্ব।

সারাহর বাস্তব জীবনে যখন স্বামীর গালিগালাজ আর অবজ্ঞার ঝড় বয়ে যায়, ঠিক তখনই সীমান্তের মেসেজ কিংবা ফোনের ওপারের কণ্ঠস্বর তাকে পরম মমতা দেয়। যে কথাগুলো ঘরে বলতে গিয়ে সে বারবার হোঁচট খেয়েছে, সেই কথাগুলোই সীমান্তের কাছে অনায়াসে বলতে পারে সে। ধীরে ধীরে এই বন্ধুত্ব রূপ নিল এক গভীর অনুরাগে—সমাজ যাকে নাম দেয় 'নিষিদ্ধ প্রেম'। সারাহ নিজেও জানে, পরপুরুষের এই ভালোবাসা সমাজে অপরাধ, ধর্মেও নিষিদ্ধ। কিন্তু তার ক্ষুধার্ত মনের কাছে এই বিচার-বুদ্ধি যেন হার মানতে বাধ্য হয়। যে ভালোবাসা সে নিজের ঘরের চার দেয়ালের মাঝে খুঁজে মরেছে, যা সে পাওয়ার অধিকার রাখত, তা যখন সেখান থেকে না এসে বাইরের এক অচেনা মানুষের কাছ থেকে আসতে শুরু করল, তখন সে নিজেকে ফেরাবে কী করে?

লোকে হয়তো বলবে এটা চরিত্রহীনতা, কিন্তু সারাহর মনে হয় ভালোবাসা ছাড়া মানুষ তো এক চলন্ত লাশের মতো। যার দেহ আছে কিন্তু প্রাণ নেই। সীমান্ত যেন তাকে সেই মৃতপ্রায় জীবন থেকে টেনে বের করে আবার একটুখানি বাঁচার স্বাদ দিচ্ছে। এক অদ্ভুত দোটানায় পড়ে গেল সারাহ  একদিকে সন্তানের ভবিষ্যৎ আর সামাজিক দায়বদ্ধতা, অন্যদিকে সীমান্তের দেওয়া সেই মায়াভরা হৃদয়ের হাতছানি।


সমাজের চোখে বিচার করা খুব সহজ, কিন্তু কারও ভেতরের হাহাকার বোঝা ততটাই কঠিন। সমাজ প্রেমের বৈধতা দেয় না, কিন্তু সারাহ যে ঘরের ভেতর ভালোবাসার অধিকারটুকু হারিয়েছে, সেই বিচারটুকু করার প্রয়োজনও বোধ করে না সমাজ। এই সমাজ কেবল সাজা দিতে জানে, অধিকার ফিরিয়ে দিতে জানে না। নিন্দা করতে জানে, কিন্তু কারো টিকে থাকার লড়াইকে প্রশংসা করতে জানে না।  সারাহর মনের ভেতরেও এক বিশাল যুদ্ধ চলে। ধর্ম বলে, স্বামী ছাড়া অন্য কারও সাথে অনুরাগ নিষিদ্ধ, হারাম। কিন্তু সেই ধর্মই তো স্ত্রীকে ভালোবাসা, তাকে সম্মান দেওয়াকে সুন্নাত হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে তার স্বামী কি সেই নিয়ম মেনেছে? ভালোবাসা আর সম্মান ছাড়া কি আসলেই একটা জীবন পার করা যায়?

আজকের যুগে শুধু 'দুটি ডাল-ভাতের' জন্য কেউ কারও সংসার করে না। পেটের খিদে মেটানোর সামর্থ্য সবারই কমবেশি আছে, কিন্তু মনের যে খিদে, তার কী হবে? ভালোবাসা ছাড়া মানুষ তো কেবল একটি যন্ত্র। সেই ভালোবাসা যখন ঘরের আপন মানুষের কাছ থেকে চিরতরে হারিয়ে যায়, তখন যদি বাইরের কোনো মানুষ মরুভূমিতে এক চিলতে বৃষ্টির মতো মায়া নিয়ে আসে, তবে তাকে ফিরিয়ে দেওয়ার সাধ্য কার?  

সারাহর কাছে এখন আর সমাজ বা ধর্মের দোহাই বড় নয়। তার কাছে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে তার অস্তিত্বের সংকট। সে বুঝেছে, ভালোবাসা আসলে কোনো সীমানা মানে না, কোনো ধর্ম মানে না। নিষিদ্ধ হোক কিংবা সমাজের সংজ্ঞার বাইরে ভালোবাসা তো ভালোবাসাই। প্রাণের স্পন্দন যেখানে খুঁজে পাওয়া যায়, মন সেখানেই ভিড়তে চায়। যে শূন্যতা নিয়ে সে বেঁচে ছিল, সীমান্ত যেন সেখানে এক পরম পূর্ণতা।

হাজারো দ্বিধা আর সামাজিক ভয়কে একপাশে সরিয়ে রেখে একদিন তারা দেখা করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিলো। সারাহর বাসার খুব কাছেই সীমান্তের এক বোন সমতুল্য বান্ধবীর বাসা। পার্কে বা খোলা জায়গায় যাওয়াটা সারাহর জন্য ছিল ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণ; কেউ দেখে ফেললে তার দায় সমাজ নেবে না, উল্টো কলঙ্কের তিলক এঁকে দেবে। তাই বান্ধবীর সেই ছোট্ট বাসাটাই হয়ে উঠল তাদের মিলনের নিরাপদ আশ্রয়।

দেখা হতেই সীমান্ত একগুচ্ছ তাজা ফুলের তোড়া সারাহর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে তাকে স্বাগত জানালো। সারাহর বুক তখন ভয়ে আর উত্তেজনায় ঢিপঢিপ করছিল। চার দেয়ালের সেই শান্ত ঘরে দুজনে পাশাপাশি বসল। হঠাৎ সীমান্ত পরম মমতায় সারাহকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে জড়িয়ে ধরল। দীর্ঘদিনের একাকীত্ব, অপমান আর তৃষ্ণার্ত হৃদয়ের সবটুকু হাহাকার নিয়ে সারাহ সীমান্তের বুকে মুখ লুকিয়ে অঝোরে কাঁদতে শুরু করল। কতদিন পর যে কারো বুকে সে একটু নিরাপদ আশ্রয় আর ভালোবাসার ওম পেলো, তা সে নিজেও জানে না। 

এরপর থেকে মাঝেমধ্যেই চলতে লাগল তাদের এই লুকোচুরি দেখা। সময়ের সাথে সাথে তাদের প্রেম আরও গভীর হলো। এদিকে সারাহর ঘরের চিত্রটা হয়ে উঠল নারকীয়। তার স্বামী এখন কারণে-অকারণে তার ওপর পশুর মতো চড়াও হয়, গায়ে হাত তোলে। সারাহ বুঝতে পারে, এই নিষ্ঠুরতা কোনো ভুল নয়, বরং সুপরিকল্পিত। তার স্বামী চায় সারাহ যেন অতিষ্ঠ হয়ে নিজেই এই বাড়ি ছেড়ে চলে যায়, যাতে সে তার শূন্য জায়গায় নতুন কোনো নারীকে নিয়ে আসতে পারে।

একদিন সেই চিরচেনা ছোট্ট কামরায় সীমান্ত সারাহর দুটো হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিল। সারাহর চোখের দিকে তাকিয়ে এক বুক আকুতি নিয়ে বলে উঠল, “Will you marry me? এই যন্ত্রণার জীবন থেকে কি আমার হাত ধরে বেরিয়ে আসবে?”

সারাহর চোখের সামনে তখন তার ভেঙে যাওয়া সংসার, সন্তানের মুখ আর আগামীর অনিশ্চয়তা—সবকিছু যেন এক নিমেষে ঝাপসা হয়ে গেল। সে সীমান্তের বুকে আছড়ে পড়ে আর্তনাদ করে উঠল। তার কণ্ঠস্বরে ছিল মুক্তির এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা। সে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে শুধু একটাই কথা বারবার বলতে লাগল—

“প্লিজ, আমাকে এখান থেকে নিয়ে যাও।”





Comments

Popular posts from this blog

শেষ দৃশ্যপট (১ম অধ্যায় )

ফারাওয়ের অভিশাপ

মৃতের নিশ্বাস