বাইক

 লেখকঃ তন্ময় চৌধুরী

গ্রাহকের হাতে বাইকের চাবিটা তুলে দিতেই বুকের ভেতর হঠাৎ অনেক স্মৃতি ভিড় করে এলো। এই দুই চাকার বাহনটাকে ঘিরে কত সময় যে কেটে গেছে! কত পথ ঘুরেছি আমরা একসাথে। কতবার পুলিশের সাইরেন শুনে রাস্তা বদলে পালিয়েছি, সেসব দিনের কথা যেন চোখের সামনে ভেসে উঠল। 
কলেজে পড়ার সময়ই বাইকটা কিনেছিলাম। তখন মনে হয়েছিল, বাইক থাকলে প্রেম করাটা বুঝি সহজ হয়ে যাবে। কিন্তু প্রেম তো আমার জীবনে আর আসেইনি। তবে তাই বলে আমার বাইকের পেছনে কোনো মেয়ে ওঠেনি এমনটা নয়। অনেক মেয়েই উঠেছে, তবে তারা কেউই আমার জন্য নয়। তারা ছিল আমার বন্ধুদের প্রেমিকা। বন্ধুদের প্রেমের গল্পে আমার বাইকটাই ছিল একমাত্র ভরসা।

বাইকটা কিনেছিলাম মায়ের গয়না চুরি করে বিক্রি করে। মা পরে জানতে পেরে আমাকে বেশ মারধরই করেছিল। তবুও আশ্চর্যের ব্যাপার, বাইকটার প্রতি মায়ের এক অদ্ভুত মায়া ছিল। যত্ন করে রেখেই দিত। হিসাব করলে দেখা যাবে আমার চাইতে আমার বাইক আমার বন্ধুরাই বেশী চালিয়েছে। প্রতিবার এক্সিডেন্ট করলে আমি নিজেই নিজ খরচে বাইক সারাতাম। 
এখন আমি চাকরি করি। যেখানে ব্যাচেলর হিসেবে থাকি, সেখানে বাইক রাখার কোনো জায়গা নেই। বাড়িতে আসাও হয় খুব কম মাসে একবার, কখনো দু’মাসে একবার। ফলে বাইকটা আর চালানোই হয় না। অনেক ভেবে শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিলাম বিক্রি করে দেব।

যেই ভাবা, সেই কাজ।

কিন্তু গ্রাহকের হাতে চাবিটা তুলে দেওয়ার মুহূর্তেই মনে হলো, যেন খুব কাছের কাউকে হারিয়ে ফেললাম।

খন আমার প্রায় সব বন্ধুরই নিজের বাইক আছে। সময় বদলেছে, মানুষ বড় হয়েছে, প্রয়োজনও বেড়েছে। কেউ কেউ তো আবার চার চাকার গাড়িও কিনে ফেলেছে।

ঈদ আসতেই হঠাৎ করে বাইকের প্রয়োজনটা খুব বেশি করে অনুভব করলাম। আগে ঈদের ছুটিতে কত ঘুরতাম! সকাল থেকে রাত কোনো ঠিকানা থাকত না, শুধু রাস্তা আর বন্ধুদের সঙ্গ। কিন্তু এবার বাইকও নেই, যেন ঈদটাও একটু মলিন মলিন লাগছে।  সারাদিন বিছানায় শুয়েই কাটালাম। ঘুম, অলসতা আর পুরোনো স্মৃতির ভেতর ডুবে ছিলাম। রাতে হঠাৎ পিয়াসের কথা মনে পড়ল। কারণ, আমার যখন বাইক ছিল, বন্ধুদের মধ্যে পিয়াসই সেটা সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করেছে। 

ফোন দিলাম তাকে।

“দোস্ত, কাল বিকেলে তোর বাইকটা একটু দিবি? একটু ঘুরবো।”

পিয়াস একটু থেমে বলল,
“সরি বন্ধু, কাল বাইকটা দেওয়া যাবে না। বাবা নাকি কোথাও যাবে, বাইকটা উনিই নেবে।”

ফোন কেটে গেল।

পরদিন বিকেলে রাস্তার ধারে একটা চায়ের দোকানে বসে চা খাচ্ছিলাম। হঠাৎ দূর থেকে একটা বাইকের শব্দ কানে এলো। মাথা তুলে তাকাতেই দেখি পিয়াস, তার বাইকের পেছনে আরেক বন্ধুকে নিয়ে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে।

রাতে পাড়ার ক্লাবে সবাই মিলে কেরাম খেলে। সেদিনও সেখানে গেলাম। গিয়ে দেখি পিয়াসসহ আমাদের পুরো বন্ধুর দলটাই বসে আছে। সবাইয়ের সামনে দাঁড়িয়ে আমি পিয়াসকে বললাম, দোস্ত, আমার বাইকটা আমি যতটা চালাইছি, তুই তার চার পাঁচ গুণ বেশি চালাইছিস। কতবার ভেঙেছিস, আমি নিজের টাকায় ঠিক করেছি। কখনো তোকে একটা টাকাও জরিমানা চাইনি। আর আজ আমি একদিনের জন্য বাইক চাইলাম তুই দিলি না!”

আমার কথাগুলো শুনে অন্য বন্ধুরাও পিয়াসের ওপর একটু ক্ষেপে গেল। কেউ কেউ তাকে বকাঝকাও করতে লাগল। 

হঠাৎ করে একজন বন্ধু তার বাইকের চাবিটা খুলে কেরাম বোর্ডের ওপর রেখে বলল,
“নে দোস্ত, আমারটা নিয়ে যা।

তারপর আরেকজন, তারপর আরেকজন এক এক করে সবাই নিজেদের বাইক কিংবা গাড়ির চাবি কেরাম বোর্ডের ওপর রেখে দিল।

“তুই আমারটা নিয়ে যা।”
“না না, আমারটা নে।”
“গাড়িটা নে, সমস্যা নেই।

সবার এমন আগ্রহ দেখে সত্যি সত্যিই আমার মনটা ভরে গেল। মনে হলো, বন্ধুত্ব এখনও বেঁচে আছে।  শেষ পর্যন্ত একজন বন্ধুর বাইকের চাবিটা হাতে নিলাম।

সে হেসে বলল,

“দোস্ত, ঠিক আছে… তবে ট্যাংকি ফুল করে দিস।”

আমি একটু অবাক হয়ে তার দিকে তাকালাম।
বললাম,
“দোস্ত, তেল–টেল ভরতে পারব না। এমনি চালাতে দিলে দে, না দিলে দরকার নাই।”

সে আমার হাত থেকে চাবিটা আবার নিয়ে নিল। তারপর শান্ত গলায় বলল,

“ট্যাংকি ফুল করলে তবেই বাইকটা নিস।”

আমি কিছু না বলে চাবিটা তাকে ফিরিয়ে দিলাম। ভাবলাম অন্য কারোটা নেব। কিন্তু আশ্চর্য হয়ে দেখলাম, অন্য বন্ধুদের দিকে হাত বাড়াতেই তারা প্রায় একই কথা বলল,

“ট্যাংকি ফুল করলে নিস।”
“হ্যাঁ দোস্ত, তেল ভরে দিস।”
“ট্যাংকি ফুল করলে সমস্যা নাই।”

এক মুহূর্তে মনে হলো, কেরাম বোর্ডের ওপর রাখা সেই চাবিগুলো আর বন্ধুত্বের চাবি নয় ওগুলো যেন শুধু শর্তের তালা। ক্লাবের ভেতর তখনও হাসি–ঠাট্টা চলছে, কিন্তু আমার কাছে হঠাৎ করেই সবকিছু খুব নীরব আর ফাঁকা লাগতে শুরু করল।

Comments

Popular posts from this blog

শেষ দৃশ্যপট (১ম অধ্যায় )

ফারাওয়ের অভিশাপ

মৃতের নিশ্বাস