রানীগঞ্জ (লেখকঃ সীমান্ত সরকার)

 

জামালপুর জেলা শহরটি ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে অবস্থিত। ব্রিটিশ আমলে নদীপথ ছিল বাণিজ্যের প্রধান মাধ্যম। রানীগঞ্জ এলাকাটি তখন থেকেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র বা ‘গঞ্জ’ হিসেবে পরিচিত ছিল। ধারণা করা হয়, এই বাণিজ্যিক গুরুত্বের কারণেই এখানে শ্রমিক, ব্যবসায়ী এবং দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানুষের যাতায়াত বাড়লে ধীরে ধীরে এই বসতি গড়ে ওঠে। এটি জামালপুর শহরের ঠিক মাঝখানে অবস্থিত। একপাশে ব্রহ্মপুত্র নদ এবং অন্যপাশে শহরের প্রধান বাণিজ্যিক এলাকা। এর গঠনশৈলী এবং সরু গলিগুলো পুরনো আমলের নগরায়নের সাক্ষ্য দেয়। শুরুতে এটি ছোট পরিসরে থাকলেও সময়ের সাথে সাথে এটি উত্তরবঙ্গের অন্যতম বড় যৌনপল্লী হিসেবে পরিচিতি পায়।

তৎকালীন সময়ে নদীকেন্দ্রিক ব্যবসার প্রসারের সাথে সাথে বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে এ ধরনের এলাকার সৃষ্টি হতো। বিশেষ করে মহাজন, জোতদার এবং ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের অনুগত ব্যবসায়ীদের আনাগোনার ফলে এই পল্লীটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেতে শুরু করে। একে অনেক সময় 'শহরের ভেতর আরেক শহর' হিসেবেও বর্ণনা করা হয়। 

জামালপুরের রানীগঞ্জসহ এই উপমহাদেশের পুরনো পতিতা পল্লীগুলোতে মেয়েদের আসার প্রক্রিয়াটি ছিল মূলত ঐতিহাসিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক শোষণের একটি করুণ চিত্র। শুরুর দিকে মেয়েরা প্রধানত চারটি উপায়ে এই পল্লীতে আসতেন:

১. নদীকেন্দ্রিক বাণিজ্য ও অভিবাসন

ব্রিটিশ আমলে জামালপুর ছিল ব্রহ্মপুত্র নদকেন্দ্রিক একটি বড় বাণিজ্যিক কেন্দ্র। ঘাটে মালবাহী বড় নৌকা ও স্টিমার ভিড়ত। এসব নৌকার মাঝি, মাল্লা এবং ব্যবসায়ীদের বিনোদনের জন্য দূর-দূরান্ত থেকে অনেককে নিয়ে আসা হতো। অনেক ক্ষেত্রে অভাবগ্রস্ত পরিবারের মেয়েরা কাজের সন্ধানে এসে এখানে আটকা পড়তেন।

২. জমিদারী প্রথা ও নায়েব-কাচারি কালচার

তৎকালীন জমিদার ও জোতদারদের প্রমোদ ভ্রমণের একটি অংশ ছিল বাইজি বা নর্তকীদের আসর। অনেক সময় প্রভাবশালী মহাজনরা অভাবী কৃষকের পরিবার থেকে দেনার দায়ে বা প্রলোভন দেখিয়ে মেয়েদের তুলে নিয়ে আসতেন। পরবর্তীতে সেই মেয়েরা আর মূল সমাজে ফিরতে পারতেন না এবং এই নির্দিষ্ট এলাকায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হতেন।

৩. সামাজিক বিচ্যুতি ও ‘একঘরে’ প্রথা

তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজে কোনো নারী বিধবা হলে বা সামাজিক কোনো নিয়মের ব্যত্যয় ঘটালে তাকে পরিবার থেকে বিচ্যুত বা 'একঘরে' করে দেওয়া হতো। মাথা গোঁজার ঠাঁই না পেয়ে এবং সমাজিক গঞ্জনা থেকে বাঁচতে অনেকে এসব এলাকায় এসে আশ্রয় নিতেন। একবার কেউ এই গণ্ডিতে ঢুকে পড়লে তখনকার সামাজিক কাঠামোয় তার ফেরার পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে যেত।

৪. পাচার ও প্রলোভন

এটি ছিল সবচেয়ে অন্ধকার দিক। মেলা, হাট বা গ্রাম থেকে সুন্দরী মেয়েদের ভালো কাজের প্রলোভন দেখিয়ে অপহরণ বা কৌশলে নিয়ে আসা হতো। বিশেষ করে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকেও অনেককে এখানে পাচার করে আনা হতো বলে ঐতিহাসিক বিভিন্ন তথ্যে পাওয়া যায়।

গ্রাহক ধরে রাখার কৌশল ও ‘নতুনত্ব’

রানীগঞ্জ বা এই ধরনের পুরনো পতিতা পল্লীগুলোতে ব্যবসার মূল ভিত্তি ছিল নিয়মিত গ্রাহক। যখন কোনো নারী একটি নির্দিষ্ট পল্লীতে দীর্ঘ সময় ধরে থাকতেন, তখন স্থানীয় নিয়মিত গ্রাহকদের কাছে তার প্রতি আকর্ষণ কমে যেত। এই একঘেয়েমি কাটাতে এবং ব্যবসা সচল রাখতে পল্লীর সর্দারনী বা মালিকরা এক ধরনের অভ্যন্তরীণ বিনিময় প্রথা গড়ে তুলেছিল।

পল্লী পরিবর্তন: এক এলাকার মেয়েকে অন্য এলাকার (যেমন: জামালপুর থেকে ময়মনসিংহ বা টাঙ্গাইল) কোনো পল্লীতে পাঠিয়ে দেওয়া হতো। এর বিনিময়ে সেখান থেকে অন্য কাউকে নিয়ে আসা হতো।

নতুনত্বের ভ্রম: গ্রাহকদের কাছে এই আগন্তুক নারীদের ‘নতুন’ হিসেবে উপস্থাপন করা হতো। এতে করে ওই অঞ্চলের গ্রাহকরা পুনরায় উৎসাহিত হতো এবং পল্লীর আয় বৃদ্ধি পেত।

শৃঙ্খল ও নিয়ন্ত্রণ: এই বদল প্রথার আরেকটি অন্ধকার দিক ছিল মেয়েদের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা। কোনো নারী যদি স্থানীয়ভাবে কারও সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতেন বা পালানোর চেষ্টা করতেন, তবে তাকে দ্রুত অন্য দূরবর্তী কোনো পল্লীতে পাঠিয়ে দেওয়া হতো যাতে তিনি একা হয়ে পড়েন।

জামালপুরের রানীগঞ্জের মতো পুরনো পতিতালয়গুলোতে নারীদের জীবন ছিল এক ধরনের 

অদৃশ্য দেয়ালের ভেতরে বন্দি জীবন। তাদের প্রতিদিনের রুটিন, সামাজিক অবস্থান এবং বেঁচে থাকার লড়াই ছিল অত্যন্ত কঠোর এবং অমানবিক। এই জীবনযাত্রার প্রধান দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

১. সর্দারনী বা মালিকের নিয়ন্ত্রণ

পতিতালয়ে ঢোকার পর একজন মেয়ের কোনো স্বাধীন সত্তা থাকত না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাকে কোনো 'সর্দারনী' বা 'বাড়িওয়ালি'র অধীনে থাকতে হতো। থাকা-খাওয়া এবং আশ্রয়ের বিনিময়ে আয়ের সিংহভাগই নিয়ে নিত মালিকপক্ষ। ফলে হাড়ভাঙা খাটুনির পরও তাদের হাতে খুব সামান্য টাকাই অবশিষ্ট থাকত।

২. প্রতিদিনের রুটিন ও স্বাস্থ্যঝুঁকি

তাদের দিন শুরু হতো অনেক দেরিতে, কারণ গভীর রাত পর্যন্ত তাদের কাজ করতে হতো। শারীরিক অসুস্থতা বা অনিচ্ছা সত্ত্বেও গ্রাহকের চাহিদা মেটাতে তারা বাধ্য থাকতেন। চিকিৎসার সুযোগ ছিল অত্যন্ত সীমিত, যার ফলে বিভিন্ন সংক্রামক ব্যাধি ও দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য সমস্যায় তাদের ভুগতে হতো।

৩. পরিচয় সংকট ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা

পল্লীর ভেতরে তাদের একটি ছদ্মনাম দেওয়া হতো, যা তাদের আসল পরিচয়কে মুছে ফেলত। বাইরের মূল সমাজের সাথে তাদের যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন থাকত। হাটে-বাজারে বা কেনাকাটার জন্য বের হলেও সমাজের মানুষের বাঁকা দৃষ্টি এবং লাঞ্ছনা তাদের নিত্যসঙ্গী ছিল।

৪. সন্তান লালন-পালনের চ্যালেঞ্জ

যেসব নারীর সন্তান থাকত, তাদের জীবন ছিল আরও বেশি যন্ত্রণাদায়ক। দিনের বেলা সন্তানদের সাথে সময় কাটালেও রাতের বেলা তাদের আলাদা রাখা হতো। অনেক শিশু এই পরিবেশেই বেড়ে উঠত, ফলে তারা শিক্ষার আলো বা সুস্থ সামাজিক পরিবেশ থেকে বঞ্চিত হতো। অনেকের ক্ষেত্রে বড় হয়েও এই পেশা থেকে বের হওয়া কঠিন হয়ে পড়ত।

৫. বৃদ্ধ বয়সের অসহায়ত্ব

যখন একজন নারীর বয়স বেড়ে যেত এবং গ্রাহকদের কাছে তার চাহিদা কমত, তখন তার জীবন সবচেয়ে বেশি দুর্বিষহ হয়ে উঠত। তখন তাকে পল্লীর ভেতরেই রান্নাবান্না, ঘর পরিষ্কার বা সর্দারনীর সহযোগী হিসেবে কাজ করে কোনোমতে টিকে থাকতে হতো। অনেকের ক্ষেত্রে শেষ জীবনে মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকুও থাকত না।

জামালপুরের রানীগঞ্জ বা দৌলতদিয়ার মতো পতিতা পল্লীগুলো আজও টিকে থাকার পেছনে বেশ কিছু গভীর কারণ রয়েছে। সমাজ ও সরকার কেন পুরোপুরি সফল হতে পারছে না, তার মূল কারণগুলো নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:

১. আইনি জটিলতা ও দ্বিমুখী অবস্থান

বাংলাদেশের সংবিধানে পতিতাবৃত্তিকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে এবং পাচার রোধে কঠোর আইন আছে। তবে, ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সের কোনো নারী যদি স্বেচ্ছায় এই পেশায় থাকার হলফনামা (Affidavit) দেন, তবে তাকে উচ্ছেদ করা আইনত জটিল হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে এটি তাদের "ব্যক্তিগত পছন্দ" হিসেবে আইনি ঢাল পায়, যা উচ্ছেদ প্রক্রিয়াকে থমকে দেয়।

২. পুনর্বাসনের অভাব

সরকার বা বিভিন্ন সংস্থা মাঝেমধ্যে উচ্ছেদ অভিযান চালায়, কিন্তু সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো পুনর্বাসন। এই পল্লীগুলোতে হাজার হাজার মানুষ বংশপরম্পরায় বসবাস করছে। তাদের যদি হঠাৎ সরিয়ে দেওয়া হয়, তবে তাদের থাকার জায়গা বা বিকল্প আয়ের উৎস নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান না থাকলে তারা আবারও একই পথে ফিরে যেতে বাধ্য হয়।

৩. সামাজিক কলঙ্ক (Social Stigma)

আমাদের সমাজ এখনো এই নারীদের সহজভাবে গ্রহণ করতে প্রস্তুত নয়। কোনো নারী যদি এই জীবন ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চান, তবে সমাজ তাকে ঘর ভাড়া দিতে চায় না বা সম্মানজনক কাজ দিতে দ্বিধা বোধ করে। এই সামাজিক বিচ্ছিন্নতা তাদের বাধ্য করে অন্ধকার গলিতেই থেকে যেতে।

৪. শক্তিশালী সিন্ডিকেট ও রাজনৈতিক প্রভাব

পতিতালয়গুলো থেকে অনেক সময় একটি বিশাল অংকের অবৈধ অর্থ লেনদেন হয়। স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, বাড়িওয়ালা এবং একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট এখান থেকে নিয়মিত মাসোহারা পায়। এই অর্থনৈতিক স্বার্থের কারণে অনেক সময় উচ্ছেদ বা সংস্কারের উদ্যোগগুলো আলোর মুখ দেখে না।

৫. চাহিদার বাস্তবতা

যতক্ষণ পর্যন্ত সমাজে এই পরিষেবার একটি গোপন 'চাহিদা' থাকবে, ততক্ষণ এটি কোনো না কোনোভাবে টিকে থাকবে। প্রযুক্তির এই যুগে এখন অনেক ক্ষেত্রে এটি শারীরিক পল্লীর বাইরে অনলাইনে বা গোপনে ছড়িয়ে পড়ছে, যা নিয়ন্ত্রণ করা আরও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।


Comments

Popular posts from this blog

শেষ দৃশ্যপট (১ম অধ্যায় )

ফারাওয়ের অভিশাপ

মৃতের নিশ্বাস