পুনর্জন্ম

 

মৌ-এর ভেজা চুলের পানির ছিটায় আমার ঘুমটা ভেঙে গেল। প্রতিদিন সকালে মা যখন ঠাকুর ঘরে জোরে জোরে ঘণ্টা বাজিয়ে পূজা করেন, তখনো আমার ঘুম ভাঙে না। কিন্তু আজ আমার নতুবা স্ত্রীর চুলের সেই হালকা পানির ছিটায় ঘুমটা একদম পাতলা হয়ে গেল। চোখ মেলে চারপাশে অনেক ফুল দেখে মনে পড়ল কালই তো আমি বিয়ে করে মৌকে ঘরে এনেছি। মৌ মেয়েটা সত্যিই অনেক সুন্দর। ফর্সা মুখে কপালে লম্বা করে দেওয়া লাল সিঁদুর; ওকে দেখতে ঠিক দুর্গা প্রতিমার মতো লাগছে। মনে মনে ভাবলাম, মন্দিরের বেদী থেকে যদি আসল মূর্তি সরিয়ে মৌকে লাল শাড়ি আর হাতে একটা ত্রিশূল দিয়ে বসিয়ে দেওয়া যায়, তবে ওকে পুরো দেবীর মতো মানাবে।

সকালের নাস্তাটা সেরে আমি অফিসের দিকে রওনা হলাম। আমি তন্ময় চৌধুরী, ভূমি অফিসে উপ-সহকারী সেটেলমেন্ট অফিসার হিসেবে কর্মরত। আজ আমাদের গন্তব্য জঙ্গলের ভেতরে নতুন খুঁজে পাওয়া একটা পুরনো পোড়া বাড়ি। ধারণা করা হচ্ছে, বাড়িটি কোনো এক আমলের জমিদারের ছিল। আদালত থেকে নির্দেশ এসেছে বাড়িটি এবং এর জমি সরকারি খতিয়ানে নথিভুক্ত করার, যাতে কেউ এটা অবৈধভাবে দখল করতে না পারে।

চারিদিকে ঘন জঙ্গল, তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল এক পোড়া বাড়ি। গ্রামের কিছু দিনমজুর দিয়ে বাড়িটা পরিষ্কার করার কাজ চলছে। আমরা কৌতূহল নিয়ে বাড়ির ভেতরের ঘরগুলোতে ঢুকলাম। আমাদের সাথে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ থেকে রহিমা নামের একজন কর্মকর্তা এসেছেন। তারা বাড়িটি থেকে শত বছরের পুরনো থালা-বাসন ও নানা প্রত্নবস্তু সংগ্রহ করছেন জাদুঘরে রাখার জন্য।

আমিও কৌতূহল সামলাতে না পেরে এদিক-ওদিক জিনিসপত্র হাতড়াতে লাগলাম। হঠাৎ একটা কোণে আধপোড়া একটা কাগজ পেলাম চামড়ার ব্যাগে মোড়ানো, যা অদ্ভুতভাবে মানুষের চুল দিয়ে বাঁধা ছিল। হাত দিতেই পুরনো সেই চুলগুলো ছিঁড়ে গেল। রহিমা পাশ থেকে দেখে বললেন, "স্যার, এই ঘরের জিনিসগুলো বড়জোর ৩০০ বছরের পুরনো হবে। কিন্তু আপনি যেটা ধরেছেন, সেটার বয়স অনেক বেশি। ধারণা করছি এটা ৭০০-৮০০ বছর আগের।"

আমি অবাক হয়ে বললাম, "৩০০ বছরের পুরনো ঘরে ৮০০ বছরের পুরনো জিনিস এলো কীভাবে?" রহিমা বুঝিয়ে বললেন, "স্যার, এটা সাধারণ কাগজ নয়। এটা আসলে ছাগলের চামড়া আর পাটকাঠির এক বিশেষ মিশ্রণ। ৮০০ বছর আগে রাজা-বাদশারা বা অভিজাতরা এই চামড়াতে চিঠি লিখতেন। ৩০০ বছর আগে তো সাধারণ কাগজ প্রায় চলেই এসেছিল।" 

আমার কেন জানি ওই বস্তুটার প্রতি প্রচণ্ড মায়া জন্মে গেল। আমি রহিমাকে অনুরোধ করলাম ওটা আমাকে দিয়ে দিতে। রহিমা একটু ইতস্তত করে বললেন, "সরকারি নিয়ম অনুযায়ী এটা দেওয়া ঠিক নয়, তবে আপনার সাথে খাতির আছে বলে দিচ্ছি। এটা কাঁসা-পিতলের মতো দামী কিছু না হলেও অনেক পুরনো ইতিহাস। দয়া করে কাউকে জানাবেন না।" আমি তাকে কথা দিলাম যে এটা গোপন থাকবে। 

চিঠিটা সাবধানে ব্যাগে ভরে বাসায় ফিরলাম। রাতে যখন মৌ গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, তখন আমি পা টিপে টিপে বারান্দায় এসে বসলাম। ল্যাম্পের আলোয় সেই পুরনো চামড়ার কাগজটা খুললাম। হ্যাঁ, লেখাগুলো বাংলা অক্ষরেই, কিন্তু ভাষাটা অনেক প্রাচীন আর রহস্যময়। ৮০০ বছর আগের সেই চিঠির ভাষা ছিল ঠিক এই রকম: 

হে কান্ত , হাঁউ সামন্ত-দুহিতা হইঅঁ তোহোর কুড়িয়া ঘরে নিজেকে সঁপিঅঁ দিলোঁ। কুল ত্যজিঅঁ তোহোরে বরিঅঁ লৈলোঁ। আজি চারি মাস ভইলা, তুহ্মে ঘরে ন আইলা। সেই কবে বণিঅ-সনে বাণিজ্য-নাও বাহিঅঁ গেলা, হাঁউ পথ চাহিঅঁ আছোঁ। জানোঁ না তুহ্মে ফিরিবা কি না। তুহ্মোর বাটে চাহিঅঁ এই কুড়িয়া ঘরে যুগ-যুগান্তর কাটাইতে চাই। ভগবানের পায় নিজেকে সঁপিঅঁ দিলোঁ। হে স্বামী, তুহ্মে না আইলে হাঁউ ঘর ত্যজিঅঁ ন জাইবোঁ। যদি মরিঅঁ জাই, মোর পচা কঙ্কালের পাশে পড়িঅঁ থাকউ এই লিপি। হাঁউ বড়ই বেয়াধিগ্রস্ত, হে স্বামী। মরিবার আগে তুহ্মোর দরশ চাই

পড়তে পারলেন বুঝতে পারলেন না তাই তো, আমি তো পড়তেই পারিনি, বাংলায় লেখা ছিলো তবে অন্য ভাবে। গুগল ট্রান্সলেট থেকে এমন উচ্চারণ পরতে পেরেছি। কিন্তু এর মানে বুঝছিলাম না। আবার গুগলের সহায়তা নেই, মানে দাঁড়ায় এই যে,

হে আমার প্রিয় স্বামী,

আমি জমিদারের কন্যা হয়েও তোমার এই ভাঙা কুঁড়েঘরে নিজেকে সঁপে দিয়েছি। নিজের বংশ আর আভিজাত্য ত্যাগ করে তোমাকেই জীবনসঙ্গী হিসেবে বরণ করে নিয়েছি। আজ চার মাস হয়ে গেল, তুমি ঘরে ফেরোনি। সেই কবে সওদাগরের সাথে বাণিজ্যের তরী বেয়ে চলে গেলে, আমি আজও তোমার পথ চেয়ে বসে আছি। জানি না তুমি আদৌ ফিরবে কি না। তবুও তোমার প্রতীক্ষায় এই কুঁড়েঘরেই আমি যুগ যুগ কাটিয়ে দিতে চাই। নিজেকে ভগবানের চরণে সপে দিলাম। হে স্বামী, তুমি ফিরে না আসা পর্যন্ত আমি তোমার এই ঘর ছেড়ে কোথাও যাব না। যদি আমার মৃত্যুও হয়, তবে আমার পচা কঙ্কালের পাশে যেন পড়ে থাকে এই শেষ চিঠিটি। আমি ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছি। মৃত্যুর আগে শুধু একবার তোমার দেখা পেতে চাই।

চিঠিটা পড়ার পর মনটা এক অদ্ভুত বিষণ্ণতায় ভরে গেল। শব্দগুলো খুব সাধারণ হলেও এর পেছনের হাহাকার আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়ে গেল। একজন জমিদারের মেয়ে আভিজাত্য ছেড়ে এক দরিদ্র যুবকের কুঁড়েঘরে এসে ঘর বেঁধেছে ঠিক যেন সিনেমার গল্পের মতো। কিন্তু হাজার বছর আগের সেই অলিখিত প্রেমের পরিণতি কী হয়েছিল? মেয়েটি কি শেষ পর্যন্ত তার স্বামীর দেখা পেয়েছিল? নাকি কোনো এক না-বলা বিরহের অতলে হারিয়ে গিয়েছিল সেই প্রেম? সেই প্রাচীন রহস্যের উত্তর আজ আর কারোরই জানা নেই।

বাইরে তখন রূপালি চাঁদ উঠেছে। জানালার পর্দা ঠেলে হালকা মৃদু বাতাস আর চাঁদের স্নিগ্ধ আলো সরাসরি ঘরে ঢুকে পড়েছে। সেই জোছনায় মৌ-এর মুখটা যেন আরও মায়াবী হয়ে উঠেছে। আমার স্ত্রী গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। ঠিক এই মুহূর্তেই দোতলার রাজু ব্যাপারি তার বাঁশিতে সুর তুলল। লোকটা মাঝে মাঝেই মাঝরাতে খুব সুন্দর করে বাঁশি বাজায়। নিস্তব্ধ রাতে সেই সুর যেন হৃদয়ে গিয়ে লাগে।

আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ, আর ঘরের ভেতর চাঁদের মতো সুন্দর আমার বউ। আমি সাবধানে সেই প্রাচীন চিঠিটা কাঠের বাক্সে রেখে দিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লাম। স্ত্রীকে আলতো করে জড়িয়ে ধরতেই সে যেন ঘুমের ঘোরেই আমায় চিনে নিল। অবচেতন মনেই পেছন ফিরে সে আমাকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরল।

মৌ-এর উষ্ণ নিশ্বাসে আর সেই বাঁশির সুরে আমার চোখের পাতা ভারী হয়ে এল। আমার মনে হলো, ৮০০ বছর আগের সেই জমিদার কন্যা হয়তো এভাবেই কোনো এক জন্মে তার স্বামীর ফেরার অপেক্ষা করেছিল। আজ কি তবে সেই দীর্ঘ অপেক্ষার শেষ হলো? হাজার বছর আগের সেই অপূর্ণ তৃষ্ণা কি আজকের এই মিলনে শান্ত হলো?

সব প্রশ্নের উত্তর একপাশে সরিয়ে রেখে আমি শান্তির ঘুমে মগ্ন হলাম। মৌ-কে আগলে ধরে আমার মনে হলো এটাই আমাদের পুনর্জন্ম।

Comments

Popular posts from this blog

শেষ দৃশ্যপট (১ম অধ্যায় )

ফারাওয়ের অভিশাপ

মৃতের নিশ্বাস