পরাজিত বিজয়ী .(একজন দরিদ্র ঘরের ছেলে যখন ৫ কোটি টাকার মালিক হয়ে ওঠে)

 

সুশীল কুমারের জন্ম বিহারের চম্পারণ জেলার মোতিহারিতে। তার পরিবার ছিল খুবই দরিদ্র। পাঁচ ভাইয়ের সংসারে অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। মা-বাবা খুব কষ্টে সংসার চালাতেন। ছোটবেলা থেকেই সুশীল বুঝেছিলেন যে, পড়াশোনা ছাড়া এই দারিদ্র্য থেকে বের হওয়ার আর কোনো পথ নেই।

অভাব থাকলেও সুশীলের মধ্যে জানার প্রবল আগ্রহ ছিল। তিনি ছিলেন ইতিহাসের ছাত্র। তার পড়ার নেশা এতটাই ছিল যে, নতুন বই কেনার সামর্থ্য না থাকলেও তিনি পুরোনো খবরের কাগজ এবং অন্যের থেকে ধার করা বই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়তেন। তিনি ছিলেন একজন মনরেগা (MGNREGA) কর্মী এবং একজন খণ্ডকালীন কম্পিউটার অপারেটর। তার মাসিক বেতন ছিল মাত্র ৬,০০০ টাকা। এই অল্প আয়ে নিজের সংসার চালানো এবং নিজের ছোট স্বপ্নগুলোকে বাঁচিয়ে রাখা ছিল এক বড় চ্যালেঞ্জ।

সুশীল নিয়মিত অল ইন্ডিয়া রেডিওর কুইজ প্রোগ্রামগুলো শুনতেন। তিনি লক্ষ্য করেন যে, সেখানে করা অধিকাংশ প্রশ্নের উত্তরই তার জানা। সেখান থেকেই তার মনে আত্মবিশ্বাস জন্মায় যে, তিনি যদি সুযোগ পান তবে বড় কোনো প্ল্যাটফর্মে ভালো কিছু করতে পারবেন।

কেবিসিতে ডাক পাওয়ার পর মুম্বাই যাওয়ার মতো পর্যাপ্ত টাকাও তার কাছে ছিল না। প্রতিবেশীদের কাছ থেকে এবং পরিচিতদের থেকে কিছু টাকা ধার করে তিনি মুম্বাইয়ের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন। ছেঁড়া শার্ট আর পুরোনো স্যান্ডেল পরা সেই ছেলেটি যখন হট সিটে অমিতাভ বচ্চনের সামনে বসেন, তখন কেউ কল্পনাও করেনি যে কয়েক ঘণ্টা পর এই ছেলেটির নাম পুরো ভারত তথা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়বে।

সুশীল কুমার যখন সেটে ঢোকেন, তখন তার পরনে ছিল সাধারণ একটি চেক শার্ট। অমিতাভ বচ্চন যখন তার পরিচয় দিচ্ছিলেন, তখন জানা যায় সুশীল মাসে মাত্র ৬,০০০ টাকা বেতন পান। তার এই সাদাসিধা জীবন আর অগাধ জ্ঞান দেখে অমিতাভ বচ্চন নিজেও বেশ মুগ্ধ হয়েছিলেন। শুরুর দিকের প্রশ্নগুলো সুশীল খুব দ্রুত এবং আত্মবিশ্বাসের সাথে উত্তর দিচ্ছিলেন। ১ কোটি টাকার ঘরে পৌঁছাতে তার খুব একটা বেগ পেতে হয়নি। তার শান্ত ভঙ্গি আর প্রতিটি উত্তরের পেছনে লজিক দেখে দর্শকরা বারবার হাততালিতে ফেটে পড়ছিলেন। 

পুরো ভারত তখন টিভির সামনে রুদ্ধশ্বাসে তাকিয়ে। অমিতাভ বচ্চন ৫ কোটি টাকার জন্য প্রশ্নটি করলেন। প্রশ্নটি ছিল ইতিহাসের ওপর ভিত্তি করে:

"ঔপনিবেশিক আমলে ভারতের কোন রাজ্যে ব্রিটিশরা 'অর্ডার অফ দ্য স্টার অফ ইন্ডিয়া' খেতাবটি প্রথম প্রবর্তন করেছিল?"

সুশীল প্রশ্নটি শোনার পর কিছুক্ষণ ভাবলেন। তার কাছে তখন কোনো লাইফলাইন বাকি ছিল না। ভুল উত্তর দিলে তিনি অনেক টাকা হারিয়ে ফেলতেন। কিন্তু তার দীর্ঘদিনের পড়ার অভ্যাস তাকে সাহায্য করল। তিনি সঠিক উত্তরটি দিলেন।

সুশীল সঠিক উত্তর দেওয়ার সাথে সাথে অমিতাভ বচ্চন তার চিরচেনা গম্ভীর গলায় চিৎকার করে উঠলেন "৫ ক্রোর!" পুরো স্টুডিওতে তখন আতশবাজি আর করতালি। সুশীল কুমার যেন বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না কী ঘটে গেছে। তিনি সিট থেকে উঠে দাঁড়িয়ে দুই হাত জোড় করে সবাইকে নমস্কার করলেন।

টাকা জেতার পর অমিতাভ বচ্চন তাকে জড়িয়ে ধরেন। সুশীল তখন আবেগে ভাসছিলেন। তিনি বারবার বলছিলেন যে, এই টাকা দিয়ে তিনি তার বাবার ঋণ শোধ করবেন এবং নিজের পরিবারের জন্য একটি পাকা বাড়ি তৈরি করবেন। সেই মুহূর্তে সুশীল কুমারের চোখে যে জল ছিল, তা কেবল টাকার জন্য নয়, বরং অভাবের বিরুদ্ধে জয়ের জল।

সবশেষে যখন ৫ কোটি টাকার সেই বিশাল ডামি চেকটি তার হাতে তুলে দেওয়া হলো, তখন তিনি একজন জাতীয় নায়কে পরিণত হয়েছিলেন। বিহারের এক কুঁড়েঘর থেকে এসে মুম্বাইয়ের ঝলমলে আলোয় এই জয় যেন রূপকথার গল্পের মতো ছিল।

টাকা জেতার পর সুশীল কুমারের বাড়ির সামনে প্রতিদিন শত শত মানুষের লাইন লাগত। কেউ আসত চিকিৎসার জন্য, কেউ মেয়ের বিয়ের জন্য, আবার কেউ স্রেফ অভাবের কথা বলে। সুশীল কুমার আবেগপ্রবণ হয়ে কাউকে ফিরিয়ে দিতে পারতেন না। তিনি দুহাতে টাকা বিলাতে শুরু করেন। অনেক ক্ষেত্রে চেনা-অজানা মানুষ তাকে ঠকিয়ে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিয়েছিল। ব্যবসা সম্পর্কে কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকলেও তিনি কিছু পরিচিত মানুষের কথায় বিশ্বাস করে আবাসন (Real Estate) এবং অন্যান্য ব্যবসায় কয়েক কোটি টাকা বিনিয়োগ করেন। কিন্তু সঠিক পরিকল্পনার অভাবে সেই সব ব্যবসায় তিনি চরম লোকসানের মুখে পড়েন। তার অনেক টাকা মাঝপথেই আটকে যায়।

হঠাৎ পাওয়া খ্যাতি সুশীলের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। ২৪ ঘণ্টা মিডিয়া তাকে অনুসরণ করত। তিনি কোথায় যাচ্ছেন, কী খাচ্ছেন সবই খবরের শিরোনাম হতো। এই চাপের মুখে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং নিজেকে সমাজ থেকে গুটিয়ে নিতে শুরু করেন। এক পর্যায়ে তিনি মদ্যপানে আসক্ত হয়ে পড়েন, যা তার বিচারবুদ্ধিকে আরও লোপ করে দেয়। টাকা আসার পর সুশীলের পারিবারিক জীবনেও ফাটল ধরে। তার স্ত্রী এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে টাকার ভাগাভাগি এবং তার অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন নিয়ে প্রতিদিন ঝগড়া হতো। এক সময় পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, তার স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে যাওয়ার হুমকি দেন। সুশীল নিজেই স্বীকার করেছিলেন যে, সেই সময় তিনি প্রায় ডিভোর্সের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিলেন।

তিনি মোতিহারি ছেড়ে মুম্বাইয়ে গিয়ে থিতু হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। ভেবেছিলেন ফিল্মমেকার বা পরিচালক হবেন। সেখানে গিয়ে তিনি প্রচুর টাকা খরচ করেন কিন্তু শোবিজ জগতের কঠিন বাস্তবতায় তিনি খাপ খাওয়াতে পারেননি। মুম্বাইয়ের সেই ঝলমলে জীবন তার জমানো টাকার শেষ অংশটুকুও শুষে নেয়।

২০২০ সালের দিকে একটি ফেসবুক পোস্টে সুশীল কুমার নিজেই তার জীবনের এই অন্ধকার অধ্যায়টি শেয়ার করেন। তিনি জানান, কীভাবে তিনি "পাবলিক ফিগার" হওয়ার মোহে নিজের সব হারিয়েছেন। গণমাধ্যমে খবর আসে যে তিনি একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেছেন এবং দুধ বিক্রি করে সংসার চালাচ্ছেন।

আমরা যখন তার হারানো দিনগুলোর দিকে ফিরে তাকায়, তখন তার মনে হয় আমরা সবাই আসলে এক একজন সুশীল কুমার। আমাদের প্রত্যেকের মনেই একটা গোপন চাতক পাখি আছে, যে সারাক্ষণ আকাশপানে চেয়ে থাকে কবে এক পশলা 'জ্যাকপট'-এর বৃষ্টি হবে। আমরা কল্পনায় ছবি আঁকি রাস্তায় কুড়িয়ে পাওয়া এক বস্তা টাকা, লটারির সেই ম্যাজিক নম্বর, কিংবা মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা কোনো গুপ্তধন। আমরা ভাবি, হুট করে আসা এই টাকাই বুঝি আমাদের সব দুঃখ ঘুচিয়ে দেবে। 

কলাগাছ: এটি খুব দ্রুত বাড়ে, দেখতে বেশ সতেজ আর বিশাল মনে হয়। কিন্তু সামান্য এক কালবৈশাখী ঝড়ের ঝাপটাতেই তা মড়মড় করে ভেঙে পড়ে। কারণ তার ভেতরে কোনো শক্ত কাষ্ঠল কাঠামো নেই। সুনিল কুমার সেই ৫ কোটি টাকা ছিল ঠিক ওই কলাগাছের মতো দ্রুত এসেছিল, কিন্তু ঝড়ের ঝাপটা সইতে পারেনি। তালগাছ: অপরদিকে তালগাছ বাড়ে খুব ধীরলয়ে। ইঞ্চি ইঞ্চি করে প্রতিটি ধাপ সে শক্তপোক্ত করে গড়ে তোলে। ঝড়-তুফান এলেও সে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকে, কারণ তার প্রতিটি তন্তু সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ।

জ্যাকপটে জিতে মানুষ হয়তো কয়েক দিনের জন্য নিজেকে রাজা ভাবে, কিন্তু দিনশেষে সে আবার তার পুরোনো ধূলিময় অবস্থানেই ফিরে আসে। কারণ সে শিখরে ওঠার পথটা চেনে না, কেবল শিখরে পৌঁছে যাওয়াটা চেনে। তাই জীবনের সার্থকতা হুট করে ধনী হওয়াতে নয়, বরং ধাপে ধাপে আগানোতে। প্রতিটি ধাপের কষ্ট আর অভিজ্ঞতা মানুষকে ভেতর থেকে মজবুত করে। যে মানুষটা সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠে, সে জানে পা হড়কালে কোথায় ধরতে হয়। কিন্তু যে লিফটে করে ওপরে উঠে যায়, বিদ্যুৎ চলে গেলেই সে অন্ধকারে আটকা পড়ে। 

Comments

Popular posts from this blog

শেষ দৃশ্যপট (১ম অধ্যায় )

ফারাওয়ের অভিশাপ

মৃতের নিশ্বাস