তিতুমীর
এক রাতে উঠোনে বসে বাবা মীর হাসান আলীর কাছে তিতু শুনছিলেন তাঁদের বংশের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। তিতু হঠাৎ প্রশ্ন করলেন, "আব্বাজান, আমাদের এই উর্বর জমিতে আজ কেন হাহাকার? কেন আমাদের মানুষগুলো সাহেবদের ভয়ে তটস্থ থাকে?"
বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, "সময় বদলাচ্ছে রে নিসার। লড়াইয়ের দিন আসছে।"
তিতুমীর সেদিন কিছু বলেননি, কিন্তু তাঁর মুঠো শক্ত হয়ে এসেছিল। চাঁদপুরের সেই শান্ত নিসার আলী এভাবেই ধীরে ধীরে হৃদয়ে আগ্নেয়গিরি পুষতে শুরু করলেন। শৈশবের সেই চঞ্চল তিতুই যে একদিন বাংলার কৃষকদের কাণ্ডারি হয়ে উঠবেন, তার বীজ বোনা হয়ে গিয়েছিল ওই ছোটবেলাতেই।
চাঁদপুরের সেই ছোট্ট তিতু এখন দীর্ঘদেহী এক যুবক। চওড়া কাঁধ, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আর ইস্পাতকঠিন কবজি নিসার আলীকে দেখলে যে কেউ সমীহ করত। তাঁর শারীরিক গঠন ছিল দেখার মতো। গ্রামের আখড়ায় কুস্তি লড়তে নামলে বড় বড় কুস্তিগিররাও তাঁর প্যাঁচের সামনে টিকতে পারত না। কিন্তু এই দৈহিক শক্তির আড়ালে নিসার আলীর মনে দানা বাঁধছিল এক গভীর অস্থিরতা। তিনি দেখছিলেন, তাঁর চারপাশের চেনা পৃথিবীটা ক্রমেই বদলে যাচ্ছে।
বাংলার উর্বর মাটি তখন নীলকর সাহেবদের বুটের তলায় পিষ্ট। সোনালি ধানের বদলে জোর করে নীল চাষ করানো হচ্ছে। কৃষকদের হাহাকার নিসার আলীর কানে তীরের মতো বিঁধত। তিনি বুঝতে পারলেন, কেবল লাঠি খেলে বা কুস্তি লড়ে এই বিশাল শক্তির মোকাবিলা করা সম্ভব নয়; এর জন্য চাই জ্ঞান এবং আত্মিক শক্তি।
১৮২২ সাল। জীবনের এক নতুন দিশা পেতে নিসার আলী পাড়ি জমালেন পবিত্র মক্কার উদ্দেশ্যে। হজ পালন করতে যাওয়া সেই যাত্রাটিই ছিল তাঁর জীবনের মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা। সেখানেই তাঁর সাথে দেখা হলো সমসাময়িক ভারতের প্রখ্যাত ধর্মসংস্কারক ও বিপ্লবী নেতা সৈয়দ আহমদ বেরলভীর।
মক্কার সেই মরুর হাওয়ায় বসে নিসার আলী দিনের পর দিন আলোচনা করলেন বেরলভীর সাথে। তিনি শুনলেন কীভাবে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙতে হয়, কীভাবে মানুষের অধিকার আদায়ে নিজেকে উৎসর্গ করতে হয়। বেরলভী তাঁকে বললেন, "নিসার, ধর্ম কেবল তসবিহ গোনা নয়, ধর্ম হলো অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো। তোমার বাংলা আজ শোষিত, সেখানে গিয়ে মজলুমের পাশে দাঁড়াও।
মক্কায় কাটানো সেই দিনগুলো তিতুমীরের ভেতরে থাকা আগ্নেয়গিরিকে সুশৃঙ্খল এক শক্তিতে রূপান্তর করল। তিনি যখন ১৮২৭ সালে বাংলায় ফিরে এলেন, তিনি আর কেবল সেই চাঁদপুরের 'নিসার আলী' ছিলেন না তিনি তখন এক নতুন সংকল্পে উজ্জীবিত 'তিতুমীর'।
বাংলায় ফিরে তিনি অবাক হয়ে দেখলেন, পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়েছে। স্থানীয় জমিদাররা ব্রিটিশদের তুষ্ট করতে কৃষকদের ওপর অদ্ভুত সব কর চাপাচ্ছে। কেউ দাড়ি রাখলে কর দিতে হবে, কেউ মসজিদ সংস্কার করলে জরিমানা দিতে হবে। তিতুমীর আর চুপ করে থাকতে পারলেন না।
তিনি গ্রামে গ্রামে ঘুরতে শুরু করলেন। হাতে কোনো দামি তলোয়ার নেই, নেই কোনো আগ্নেয়াস্ত্র। সাধারণ কৃষকদের সাথে বসে তিনি কথা বললেন। চব্বিশ পরগনা ও নদীয়া জেলার সহজ-সরল মানুষগুলো তিতুমীরের তেজোদীপ্ত কথা শুনে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখল। তিতুমীর তাঁদের বোঝালেন, "ভয় পেয়ো না। খোদা ছাড়া আর কাউকে ভয় পাওয়ার নাম ইমান নয়।"
হাজার হাজার কৃষক তাঁদের লাঙল ফেলে তিতুমীরের পতাকাতলে জড়ো হতে শুরু করল। জমিদাররা প্রমাদ গুনল। তারা ভাবল, সাধারণ এক লাঠিয়াল কীইবা করতে পারবে! তারা জানত না, এই তিতুমীর মক্কা থেকে শুধু হজ করে ফেরেননি, তিনি এক বিপ্লবের মন্ত্র নিয়ে ফিরেছেন।
এক সন্ধ্যায় চব্বিশ পরগনার এক মেঠো পথে তিতুমীরকে ঘিরে ধরল জমিদারের কিছু পেয়াদা। তারা তিতুমীরকে শাসিয়ে গেল, যেন তিনি মানুষের মাথা না চিবোন। তিতুমীর শান্ত কিন্তু বজ্রকণ্ঠে বললেন, মাথা চিবোনোর অভ্যাস আমার নেই, তবে মাথা নত করার শিক্ষা আমার ধর্ম দেয়নি। জমিদারকে গিয়ে বলো, অন্যায্য কর এই বাংলার মানুষ আর দেবে না।
এই ঘোষণাটিই ছিল যুদ্ধের প্রথম দামামা। গ্রামের আকাশ-বাতাস তখন এক নতুন স্লোগানে মুখরিত হতে শুরু করেছে। কৃষকদের সেই শান্ত চোখে তখন ফুটে উঠেছে তিতুমীরের শিখিয়ে দেওয়া প্রতিরোধের ভাষা।
১৮২৭ সালে মক্কা থেকে ফেরার পর তিতুমীর আর শান্ত হয়ে বসে থাকতে পারলেন না। তিনি দেখলেন, চব্বিশ পরগনা আর নদীয়ার আকাশে তখন শোষণের তপ্ত নিশ্বাস। নীলকর সাহেব আর দেশীয় জমিদার কৃষ্ণদেব রায়ের মতো শাসকরা কৃষকদের ওপর ‘দাড়ি রাখার কর’ পর্যন্ত চাপিয়ে দিয়েছে। তিতুমীর গ্রামে গ্রামে ঘুরে ঘোষণা করলেন— "ভয় কেবল আল্লাহর জন্য, কোনো মরণশীল মানুষের জন্য নয়।"
হাজার হাজার কৃষক লাঙল ফেলে তিতুমীরের পতাকাতলে জড়ো হলো। জমিদারদের পেয়াদারা যখন তিতুমীরকে শাসাতে এল, তিনি বজ্রকণ্ঠে জবাব দিলেন, "অন্যায্য কর এই বাংলার মাটি আর দেবে না।" শুরু হলো সরাসরি সংঘাত। জমিদারদের লাঠিয়াল বাহিনীকে পরাজিত করে তিতুমীর প্রমাণ করলেন, একতা থাকলে সাধারণ মানুষও অপরাজেয়।
কিন্তু তিতুমীর জানতেন, আসল শত্রু ব্রিটিশ রাজশক্তি। তাদের কামানের গোলার সামনে লাঠি আর বল্লম কতক্ষণ টিকবে? তাই তিনি চব্বিশ পরগনার নারিকেলবাড়িয়ায় এক অদ্ভুত ও ঐতিহাসিক পরিকল্পনা করলেন। কোনো ইট-পাথর নয়, সাধারণ মানুষের হাতের বাঁশ দিয়েই তৈরি হলো এক বিশাল দুর্গ যা ইতিহাসে 'বাঁশের কেল্লা' নামে অমর হয়ে আছে। সাধারণ কৃষকরা রাতারাতি সেই কেল্লা গড়ে তুলল, যা হয়ে উঠল বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের প্রথম প্রতীক।
১৮৩১ সালের ১৯ নভেম্বর। ভোরবেলা। ব্রিটিশ সেনাপতি লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক বিশাল এক বাহিনী আর আধুনিক কামান নিয়ে নারিকেলবাড়িয়া ঘিরে ফেললেন। তিতুমীরের হাতে কোনো কামান ছিল না, ছিল কেবল অদম্য সাহস আর কয়েক হাজার ভক্তের প্রাণপণ আত্মত্যাগ। কামানের গোলা যখন বাঁশের কেল্লার গায়ে আছড়ে পড়তে লাগল, তখন তিতুমীর তাঁর সঙ্গীদের উদ্দেশে বললেন,ভাইসব, ভয় নেই! দেশ আর ধর্মের জন্য শহাদাত বরণ করার চেয়ে বড় গৌরব আর নেই।
অসম লড়াই শুরু হলো। বাঁশের কেল্লা কামানের গোলার আঘাতে ধসে পড়ছে, চারদিকে আগুনের লেলিহান শিখা। কিন্তু তিতুমীরের লাঠিয়ালরা পিছু হঠেনি। তারা বল্লম আর তীর দিয়েই ব্রিটিশদের আধুনিক বাহিনীকে রুখে দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করল। যুদ্ধের এক পর্যায়ে কামানের গোলার আঘাতে বীর তিতুমীর গুরুতর আহত হলেন। তাঁর রক্তে ভিজে গেল বাংলার মাটি।
১৮৩১ সালের সেই সকালেই তিতুমীর এবং তাঁর ভাগ্নে গোলাম মাসুমসহ অসংখ্য বীর সেনানী শাহাদাত বরণ করলেন। বাঁশের কেল্লা মাটিতে মিশে গেল ঠিকই, কিন্তু তিতুমীর যে প্রতিরোধের আগুন জ্বেলে দিয়েছিলেন, তা আর নেভেনি। তাঁর সেই আত্মত্যাগই পরবর্তীকালে সিপাহী বিদ্রোহ এবং ভারতের স্বাধীনতা যুদ্ধের মূল প্রেরণা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
বাংলার আকাশ-বাতাস আজও যেন সেই তিতুর ডাক শুনতে পায় বাঁশের কেল্লা ভাঙতে পারো, কিন্তু আমাদের লড়াই করার জেদ ভাঙতে পারবে না।

Comments
Post a Comment