বাংলার গালী
আমাদের দৈনন্দিন আড্ডায় আমরা অনেক শব্দ ব্যবহার করি যার পেছনের ইতিহাস আমরা জানি না। তেমনই একটি শব্দ হলো মা_গি'। বর্তমানে এটি অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ গালি হিসেবে ব্যবহৃত হলেও, ইতিহাসের পাতায় এর রূপ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
ভাষাতাত্ত্বিকদের মতে, এই শব্দটি মূলত সংস্কৃত 'মাতৃকা' শব্দ থেকে বিবর্তিত হয়ে প্রাকৃত ভাষায় 'মাঅ' এবং পরবর্তীতে বাংলায় 'মাগী' রূপ নেয়। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে এই শব্দের অর্থ ছিল অত্যন্ত সাধারণ।
আদি অর্থ: সাধারণ অর্থে 'নারী', মেয়মানুষ'বা স্ত্রীলোক।
সাহিত্যে প্রয়োগ: প্রাচীন পুঁথি বা মঙ্গলকাব্যগুলোতে বয়স্ক নারীদের শ্রদ্ধাভরে বা সাধারণভাবে বোঝাতে এই শব্দ ব্যবহার করা হতো। এমনকি মা কেও অনেক সময় আঞ্চলিক টানে এই মূল থেকে আসা শব্দে সম্বোধন করার নজির আছে।
ভাষাবিজ্ঞানে একটি বিষয় আছে যাকে বলা হয় অর্থাবকর্ষ। অর্থাৎ সময়ের সাথে সাথে কোনো ভালো শব্দের অর্থ খারাপ হয়ে যাওয়া। এক সময় নিম্নবর্গের মানুষেরা নিজেদের মধ্যে নারীদের সম্বোধন করতে এই শব্দ ব্যবহার করতে শুরু করে। ধীরে ধীরে শিক্ষিত বা তথাকথিত উচ্চবর্গের সমাজে শব্দটি তুচ্ছার্থে বা অবজ্ঞার শব্দ হিসেবে পরিচিতি পায়।
বর্তমানে এই শব্দটি তার আদি সম্মান বা সাধারণ অর্থ হারিয়ে ফেলেছে। এখন এটি মূলত চরিত্রহীনতা বা যৌনকর্মীদের ইঙ্গিত করে একটি চরম নোংরা গালি (Slang) হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ভদ্র সমাজে বা স্বাভাবিক সংলাপে এই শব্দ উচ্চারণ করা এখন চরম অসভ্যতা এবং নারীর প্রতি চরম অবমাননার শামিল।
ন_টি শব্দের আদি ও অন্তঃ
এই শব্দটির মূল উৎস হলো সংস্কৃত শব্দ নট। যিনি নাচেন বা অভিনয় করেন (Actor/Dancer)। নট শব্দের স্ত্রীলিঙ্গ হলো 'নটী'। অর্থাৎ প্রাচীনকালে যারা নাচ, গান বা অভিনয়ের মাধ্যমে শিল্পকলা প্রদর্শন করতেন, তাদের সম্মানভরে নটী বলা হতো। প্রাচীন ভারতের রাজদরবার বা মন্দিরে যারা নৃত্য পরিবেশন করতেন, তাদের সামাজিক মর্যাদা ছিল অনেক। কালিদাসের কাব্য থেকে শুরু করে মধ্যযুগের বৈষ্ণব পদাবলীতেও নটী শব্দটির ব্যবহার পাওয়া যায় অত্যন্ত শৈল্পিক ও ইতিবাচক অর্থে।
মধ্যযুগের শেষের দিকে এবং ব্রিটিশ আমলে যখন রাজদরবার বা দেবদাসী প্রথা বিলুপ্ত হতে শুরু করে, তখন অনেক শিল্পী জীবনধারণের জন্য অন্য পেশা বেছে নিতে বাধ্য হন। অনেকে দেহ ব্যবসার সাথে জড়িয়ে পড়ে। একটা সময় সমাজে নাচ-গান বা অভিনয়ের সাথে জড়িত নারীদের ভুলভাবে যৌনকর্মীদের সমার্থক মনে করা শুরু হয়। ফলে 'নটী' শব্দটি তার শিল্পগুণ হারিয়ে ফেলেন।
বর্তমানে এটি মূলত চরিত্রহীন নারী বা যৌনকর্মীদের ইঙ্গিত করতে ব্যবহৃত হয়। ঝগড়া বা কাউকে অপদস্থ করার সময় সমাজ এই শব্দটি বিষাক্ত তীরের মতো ব্যবহার করে। অথচ এর পেছনে লুকিয়ে আছে একজন হারিয়ে যাওয়া নারী শিল্পীর ইতিহাস।
খা_নকি শব্দের উৎস ও ইতিহাসঃ
ভাষাবিদদের মতে, এই শব্দটি এসেছে ফারসি শব্দ খানকাহ (Khanqah) থেকে। এটি মূলত সুফি সাধক বা আধ্যাত্মিক গুরুদের আস্তানা বা ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্রকে বোঝায়। কোনো কোনো ভাষাতাত্ত্বিকের মতে, আদি বাংলায় এটি 'খান' (ঘর) এবং কি (ছোট) যোগে ছোট ঘরের বা অন্তঃপুরের নারীদের বোঝাতে ব্যবহার করা হতো। অর্থাৎ, যারা ঘরের ভেতরে থাকেন বা পরিবারের সদস্য।
ব্রিটিশ আমলে যখন অনেক সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তন আসে, তখন সামাজিক বিশৃঙ্খলার কারণে এক শ্রেণির নারীদের অবজ্ঞার চোখে দেখা শুরু হয়। শব্দটি কালক্রমে তার আক্ষরিক অর্থ হারিয়ে কেবল একটি নির্দিষ্ট পেশার নারীদের (যৌনকর্মী) ইঙ্গিত করতে ব্যবহৃত হতে থাকে। বাংলা ভাষায় একে বলা হয় শব্দের অবনতি।
বর্তমানে এটি একটি অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ এবং অশ্রাব্য গালি। এখন এটি কেবল কাউকে চরমভাবে অপমান বা কটু কথা বলার জন্য ব্যবহৃত হয়। এই শব্দটি ব্যবহারের মাধ্যমে কেবল একজন নারীকে নয়, বরং পুরো ভাষা ও সংস্কৃতিকে কলুষিত করা হয়।
চু_তমা_রানী শব্দের গঠন ও ইতিহাসঃ
এটি সংস্কৃত 'চ্যুতি' শব্দ থেকে বিবর্তিত হয়ে প্রাকৃত ও দেশি ভাষার মাধ্যমে বাংলায় এসেছে। আদি অর্থে এটি কোনো কিছুর 'স্খলন' বা 'বিচ্যুতি' বোঝালেও, লোকজ ভাষায় এটি নারীর বিশেষ একটি অঙ্গকে নির্দেশ করতে শুরু করে। এটি বাংলা 'মারা' (ক্রিয়া) থেকে এসেছে, যার আভিধানিক অর্থ প্রহার করা বা শেষ করা হলেও, গালি হিসেবে এটি যৌন মিলন বা শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের একটি অত্যন্ত নোংরা ও কুরুচিপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করে।
গ্রামীণ বা নিম্নবর্গের মানুষের মধ্যে ঝগড়ার সময় চরম পর্যায়ের ঘৃণা বা অপমান প্রকাশের জন্য এই শব্দটি তৈরি হয়েছে। বাংলা ভাষায় যে গালিগুলোকে 'চরম অকথ্য' মনে করা হয়, এটি তার মধ্যে একটি। ভদ্র সমাজ, সাহিত্য (ব্যতিক্রমী বাস্তবতা ছাড়া) বা গণমাধ্যমে এই শব্দটির ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।(বাস্তব কথা হচ্ছে এটা শুরু থেকে এখন অবধি আসলেই গালী)।
বা__ইনচোদ শব্দের উৎস ও ইতিহাসঃ
এটি ফারসি বা হিন্দি 'বহিন' (Behen) শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ হলো 'বোন'। বাংলায় আঞ্চলিক টানে এটি 'বাইন' বা 'ভাইন' হিসেবে উচ্চারিত হয়। এটি একটি অত্যন্ত অশ্লীল ক্রিয়াপদ, যা শারীরিক সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয়। এটি মূলত হিন্দি বা উর্দু 'চোদনা' শব্দ থেকে এসেছে। শব্দটির আক্ষরিক অর্থ অত্যন্ত ভয়াবহ এবং কুরুচিপূর্ণ, যা মূলত নিজের বোনের সাথে অনৈতিক শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনকারীকে বোঝায়। জার ব্যাপার হলো, অনেকে এই শব্দটির আক্ষরিক অর্থ না জেনেই কেবল ঝগড়ার সময় রাগের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে এটি ব্যবহার করে। হিন্দি বা উর্দুতে এটি 'Behenchod' হিসেবে ব্যবহৃত হয়, যা বাংলায় বিবর্তিত হয়ে 'বাইনচোদ' রূপ নিয়েছে।

Comments
Post a Comment