কুয়াশা-০২

লেখকঃ সীমান্ত সরকার

ছেলেবেলা থেকেই ভূতের ভয় শব্দটা আমার অভিধানে নেই। সমবয়সী ছেলেমেয়েরা যখন অন্ধকারে নিজের ছায়া দেখে আঁতকে উঠত, আমার কাছে তখন সেসব রীতিমতো প্রহসন মনে হতো। ভয় না পাওয়ার কারণটা বোধহয় আমার বেড়ে ওঠার পরিবেশের মধ্যেই মিশে ছিল।

আমার মা তাঁর বাবার সম্পত্তির সামান্য একটা অংশ পেয়েছিলেন গ্রামের মূল বসতির একদম শেষ প্রান্তে। জায়গাটা ছিল লোকালয় থেকে বেশ দূরে, ঘন জঙ্গলে ঘেরা। সেখানে আকাশছোঁয়া বাঁশঝাড়, বিশালাকার পুরনো তেঁতুল গাছ আর বুনো লতাপাতার রাজত্ব ছিল। জঙ্গল সাফ করে যখন আমাদের ঘরটা তোলা হলো, তখনও চারপাশে অন্ধকারের বুক চিরে অদ্ভুত সব শব্দ ভেসে আসত। সেই নির্জনতা আর ছমছমে পরিবেশের কোলেই আমার শৈশব কেটেছে। প্রকৃতির সেই আদিম অন্ধকার আর বুনো নিস্তব্ধতার সাথে আমার বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল অনেক আগেই। তাই তথাকথিত 'ভুতুড়ে' পরিবেশ এখন আর আমার মনে কোনো কাঁপুনি ধরায় না, বরং এক অদ্ভুত প্রশান্তি দেয়।

ঘটনাটার শুরু যখন আমি দশম শ্রেণিতে পড়ি। আমাদের স্কুলের পাশের গ্রামেই বন্ধু আকাশের বাড়ি। তার ছোট বোনের জন্মদিন উপলক্ষে আমরা চারজন দাওয়াত পেয়েছিলাম আমি, মেঘনা, রুনা আর লাঞ্জু। বিকেলেই স্কুল থেকে ফিরে সবাই তৈরি হয়ে নিলাম। তারপর স্কুলের মাঠে জড়ো হয়ে চার বন্ধু মিলে রওয়ানা দিলাম আকাশের বাড়ির দিকে।

সেখানে পৌঁছে হৈ-হুল্লোড় আর বক্স বাজিয়ে নাচানাচিতে সময়টা বেশ ভালোই কাটছিল। সন্ধ্যায় কেক কাটার কথা থাকলেও গল্পের তোড়ে সময়জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম আমরা। কেক কাটতে কাটতে ঘড়ির কাঁটা রাত ১২টা ছুঁয়ে ফেলল। এর মধ্যে মেঘনার মা চিন্তিত হয়ে ফোন করলেন। আমি তাঁকে পুরো পরিস্থিতি বুঝিয়ে বললাম এবং আশ্বস্ত করলাম যে আমিই ওকে বাড়িতে পৌঁছে দেব।

অনুষ্ঠান শেষে আকাশকে বললাম, তোর আর লাঞ্জুর বাসা তো একই দিকে। তুই বরং আমাদের সাথে স্কুলের মোড় পর্যন্ত আয়। আমি মেঘনাকে ওর বাসায় নামিয়ে দিয়ে রুনাকে নিয়ে নিজের এলাকায় চলে যাব। (আমি আর রুনা একই এলাকার বাসিন্দা)। 

এত রাতে এই বাড়তি সতর্কতার একটা বিশেষ কারণ ছিল। আমাদের গন্তব্যে পৌঁছাতে হলে একটা বিশেষ পথ পার হতে হয়, যা শুনলেই সাধারণ মানুষের বুক কেঁপে ওঠে। সেই রাস্তার শুরুতেই পড়ে পৌরসভার বিশাল গোরস্থান। তার গা ঘেঁষেই চলে গেছে এক নির্জন রেললাইন যেখানে প্রায়ই ভয়াবহ সব দুর্ঘটনা ঘটে। এরপরই সেই অভিশপ্ত 'ফতি গোরস্থান' বা বধ্যভূমি। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এখানে অগণিত মানুষকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে গুলি করে মেরেছিল, যার কোনো সঠিক হিসাব আজও মেলেনি। সেই জনমানবহীন বধ্যভূমিতে দুটো ছোট পাকা ঘর আছে। এলাকার মানুষ এগুলোকে 'ডোম ঘর' নামেই চেনে। রেল লাইনের দুর্ঘটনায় কাটা পড়া লাশ কিংবা খুন হওয়া মৃতদেহগুলো ময়নাতদন্তের জন্য এখানেই আনা হয়। একটা ঘরে চলে কাটা-ছেঁড়া, আর পাশের ঘরটি পুলিশ বা ডাক্তারদের বসার জন্য। ডোম ঘর দুটোর আশেপাশে কোনো ঘরবাড়ি নেই, আছে শুধু আদিম নিস্তব্ধতা। ছোটবেলায় শুনেছি, সেখানে নাকি লাশ খেকো শেয়ালদের রাজত্ব। গভীর রাতে এখনো নাকি গোরস্থানের নতুন কবর খুঁড়ে তাদের লাশ খাওয়ার বীভৎস দৃশ্য দেখা যায়। সেই মৃত্যুপুরীর পাশ দিয়েই আমাদের চারজনকে আজ ফিরতে হবে।

আমরা যখন হাঁটতে শুরু করলাম, রাস্তা তখন শ্মশানের মতো নিস্তব্ধ। আমাদের এলাকায় একটা কথা প্রচলিত আছে যে, মাগরিবের আজানের পর এই রাস্তায় অতি প্রয়োজন ছাড়া কেউ পা বাড়ায় না। বধ্যভূমির কাছাকাছি আসতেই আকাশ আর লাঞ্জু আমাকে ও দুই মেয়ে বান্ধবীকে ভয় দেখানোর জন্য নানারকম আজগুবি ভূতের গল্প ফাঁদতে শুরু করল। গভীর রাতের নিস্তব্ধতায় সেই বানোয়াট গল্পগুলো মেঘনা আর রুনাকে বেশ কাবু করে ফেলল। বারবার ওরা বলছিল, তোরা থামবি? উফ, কী ভয়টাই না লাগছে! কিন্তু ওদের থামার কোনো লক্ষণ নেই। এক পর্যায়ে বিরক্ত হয়ে আমি চিৎকার করে বলে উঠলাম, রাখ তোদের এসব ফালতু ভূতের আলাপ! আমি এসবে একদম বিশ্বাস করি না।

আমার এই দম্ভোক্তি শুনে লাঞ্জু চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিল। ১০০০ টাকার বাজি যদি আমি একা ওই দূরের লাশ কাটা ঘরে গিয়ে পাঁচ মিনিট বসে থাকতে পারি। আমার সাহস আর জেদ দেখে বাজির দর কমতে কমতে এক পর্যায়ে মাত্র ১৫ টাকার এক বোতল স্প্রাইট এ এসে ঠেকল। আমি বুক ফুলিয়ে সেই বাজিতেই রাজি হয়ে গেলাম। 

অন্ধকার চিরে রাস্তা ছেড়ে আমি এগিয়ে চললাম সেই অভিশপ্ত বধ্যভূমির দিকে। পকেটে থাকা বাটন ফোনের টর্চটা জ্বালিয়ে কোনোমতে পথ দেখে আমি লাশ কাটা ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। আসল ঘরটা সবসময় তালাবদ্ধ থাকে, তাই আমি পাশের ছোট রুমটাতে গিয়ে বসলাম যেখানে সাধারণত পুলিশ বা ডাক্তাররা বসে। ঘরের মেঝে যতবারই পরিষ্কার করা হোক না কেন, রক্ত আর পচা মাংসের একটা গা গোলানো আঁশটে গন্ধ সেখানে সারাক্ষণ লেগে থাকে। আমি ভাঙা জানালার ধারে হেলান দিয়ে বসলাম। ফোনের প্লে-লিস্ট থেকে অরিজিৎ সিং-এর 'হাম তেরে বিন' গানটি চালিয়ে আকাশের দিকে তাকালাম। প্রায় চার মিনিট ছত্রিশ সেকেন্ডের সেই গানটি যখন শেষ হলো, আমি ধীরপায়ে আবার রাস্তার দিকে ফিরলাম।

দেখলাম বাকি চারজন রাস্তার এক কোণে জড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, সবার মুখে চিন্তার ভাঁজ। আমি কাছে আসতেই বুক ফুলিয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে বললাম, কই? ভূতে তো আমার কিছুই করতে পারল না! মেঘনা আর রুনা বড় বড় চোখ করে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, "শিমু, তোর সত্যিই অনেক সাহস আছে রে!" (ওরা আমাকে ভালোবেসে শিমু বলে ডাকে, যদিও আমার নাম সীমান্ত)। আকাশ আর লাঞ্জু পুরো চুপ মেরে গেল। বাজিতে জেতার আনন্দ আর সাহসের বড়াই নিয়ে ওদের দুজনকে বিদায় দিয়ে আমি রুনার সাথে নিজের বাড়ি ফিরলাম। তারপর গভীর তৃপ্তি নিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম।

চারিদিকে ঘন কুয়াশার চাদর, তার মাঝে আকাশছোঁয়া সারি সারি মেহগনি গাছ। আমি পথ হারিয়ে দিগ্বিদিক ছোটাছুটি করছি। যতদূর চোখ যায় শুধু কুয়াশা আর কুয়াশা, কোথাও লোকালয়ের কোনো চিহ্ন নেই। অদ্ভুত বিষয় হলো, চারপাশে কোনো দেয়াল নেই, অথচ আমার মনে হচ্ছে আমি এক অদৃশ্য খাঁচায় বন্দি হয়ে আছি। যেদিকেই যাই, মনে হয় ঘুরেফিরে ঠিক আগের জায়গাতেই ফিরে আসছি। নির্জন সেই মেহগনি বনের নিস্তব্ধতা ছিঁড়ে হঠাৎ অনেক দূর থেকে একটা সরু কন্ঠের আওয়াজ ভেসে এল।

কোনো এক তরুণীর গলা। আমি শব্দের উৎস লক্ষ্য করে দৌড়াতে শুরু করলাম। যত কাছে যাচ্ছি, আওয়াজটা তত স্পষ্ট আর বীভৎস হয়ে কানে বাজছে। কেউ একজন গগনবিদারী চিৎকার দিয়ে বলছে  আমি আত্মহত্যা করিনি, আমাকে খুন করা হয়েছে!  কথাটা বারবার প্রতিধ্বনিত হচ্ছে পুরো বনে। আমি পাগলের মতো এদিক-ওদিক ছুটছি, কিন্তু কাউকে দেখতে পাচ্ছি না। সেই আর্তনাদ থামার কোনো লক্ষণ নেই। ঠিক সেই মুহূর্তে ধপ করে আমার ঘুমটা ভেঙে গেল।

জেগে দেখি আমি নিজের বিছানায়, গা বেয়ে দরদর করে ঘাম ঝরছে। আমি জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিচ্ছি। আশ্চর্যের বিষয় হলো, জেগে থাকার পরেও কানে সেই ক্ষীণ কণ্ঠস্বরটা তখনো বাজছে  আমি আত্মহত্যা করিনি, আমাকে খুন করা হয়েছে। আস্তে আস্তে শব্দটা বাতাসের সাথে মিশে গেল। অজানা এক আতঙ্কে আমার বুকটা কেঁপে উঠল। চিরকাল সাহসী বলে পরিচিত আমি, আজ মাঝরাতে নিজের বিছানা ছেড়ে মায়ের ঘরে গিয়ে আশ্রয় নিলাম। মাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়লাম। আমার হাতের স্পর্শ পেয়ে মা হয়তো ঘুমের ঘোরেই বুঝলেন আমি কোনো বাজে স্বপ্ন দেখেছি, তাই তিনিও আমাকে পরম মমতায় জড়িয়ে ধরলেন।

পরদিন স্কুলে গিয়ে গতরাতের জন্মদিনের আনন্দ আর হুল্লোড়ের গল্প সবার মুখে মুখে ফিরছিল। ঠিক এমন সময় আকাশ একটা খবর দিল যা শুনে আমার শরীরের রক্ত হিম হয়ে গেল। আকাশ জানাল, গতকাল দুপুরেই একটা লাশ এসেছিল সেই বধ্যভূমিতে। এক তরুণী গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। কাল রাতে আমি যে ঘরটিতে বসে বাজিতে জেতার আনন্দ উদ্‌যাপন করছিলাম, তার ঠিক পাশের বদ্ধ ঘরটাতেই গতকাল সেই মেয়েটির ময়নাতদন্ত হয়েছে।

আকাশের কথা শুনে মনে হলো আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে। গতরাতের সেই দুঃস্বপ্ন আর সেই আর্তনাদের মানে তখন স্পষ্ট হতে শুরু করল। আমি সবাইকে আমার স্বপ্নের কথা বললাম। কিন্তু সবাই সেটাকে স্রেফ কাকতালীয় আর আমার মনের ভুল বলে হোহো করে হেসে উড়িয়ে দিল। কিন্তু আমার মনের ভেতর প্রশ্নটা পাথরের মতো গেঁথে রইল।

সবাই বলছে ওটা আত্মহত্যা ছিল, কিন্তু স্বপ্নে সেই ছটফট করতে থাকা মেয়েটি আমাকে বারবার কেন বলে গেল যে তাকে খুন করা হয়েছে? সেই রহস্যের কিনারা আজও আমি করতে পারিনি। মাঝেমধ্যে ভাবি, সেই তারিখটা বের করে যদি মেয়েটির পরিবারের কাছে গিয়ে আমার স্বপ্নের কথাগুলো বলতে পারতাম! হয়তো তাদের বোঝাতে পারতাম যে আপনাদের মেয়ে বিচার চায়। কিন্তু পরক্ষণেই থমকে যাই। শুধু একটা স্বপ্নের দোহাই দিয়ে এই বাস্তব পৃথিবীতে কয়জন মানুষ বিশ্বাস করবে? আমার কাছে কি কোনো প্রমাণ আছে? নাকি সেই অতৃপ্ত আত্মাটি চিরকাল ওই ময়নাতদন্তের ঘরের নোনা দেয়ালে তার খুনের বিচার চেয়ে আর্তনাদ করে যাবে?

Comments

Popular posts from this blog

শেষ দৃশ্যপট (১ম অধ্যায় )

ফারাওয়ের অভিশাপ

মৃতের নিশ্বাস