Nawab (নবাব)
লেখকঃ সীমান্ত সরকার
আঠারো শতকের শুরুর দিক। দিল্লির মুঘল সিংহাসন তখন প্রদীপের শেষ শিখার মতো কাঁপছে। দূর পারস্য থেকে ভাগ্যের সন্ধানে হিন্দুস্তানে পাড়ি জমিয়েছেন এক তুর্কি বংশোদ্ভূত যুবক মির্জা মুহম্মদ আলী। সঙ্গে তার বৃদ্ধ পিতা মির্জা মুহম্মদ এবং বড় ভাই হাজি আহমদ। দিল্লিতে তখন ক্ষমতার চরম অস্থিরতা, তাই দুই ভাই সিদ্ধান্ত নিলেন তারা পূর্বের সমৃদ্ধ প্রদেশ 'সুবে বাংলা'র দিকে যাত্রা করবেন।
বাংলার আবহাওয়া তখন বর্ষাস্নাত, চারিদিকে সবুজের সমারোহ আর গঙ্গার বুকে পাল তোলা নৌকার মেলা। বাংলার তৎকালীন সুবাদার মুর্শিদকুলি খাঁর জামাতা শুজাউদ্দিন খাঁ তখন ওড়িশার দায়িত্বে। মির্জা মুহম্মদ আলী তার তীক্ষ্ণ বুদ্ধি আর অসামান্য রণকৌশল দিয়ে দ্রুতই শুজাউদ্দিনের প্রিয়পাত্র হয়ে উঠলেন।
১৭২৭ সালে মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর বাংলার মসনদ নিয়ে শুরু হলো টানাপোড়েন। শুজাউদ্দিন খাঁ যখন বাংলার নবাব হলেন, মির্জা মুহম্মদ আলীকে দেওয়া হলো 'আলীবর্দী খাঁ' উপাধি এবং বিহারের শাসনভার। বিহারের রাজধানী আজিমাবাদে (বর্তমান পাটনা) বসে আলীবর্দী কেবল শাসনই করলেন না, গড়ে তুললেন এক অপরাজেয় সেনাবাহিনী। কিন্তু পর্দার আড়ালে ষড়যন্ত্রের বিষবৃক্ষ ততদিনে বড় হতে শুরু করেছে। ১৭৩৯ সালে শুজাউদ্দিনের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র সরফরাজ খাঁ নবাব হলেন। তিনি ছিলেন কিছুটা অদূরদর্শী এবং আমোদপ্রিয়। আলীবর্দী খাঁ বুঝতে পারলেন, এই অরাজকতায় বাংলা বিদেশি শক্তির গ্রাসে চলে যাবে।
১৭৪০ সালের এপ্রিল মাস। গিরিয়ার প্রান্তরে যুদ্ধের দামামা বেজে উঠল। একদিকে নবাব সরফরাজ খাঁ’র বিশাল কিন্তু বিশৃঙ্খল বাহিনী, অন্যদিকে আলীবর্দী খাঁ’র সুশৃঙ্খল সৈন্যদল। লড়াই হলো রক্তক্ষয়ী। দিনশেষে ভাগ্যের দেবী আলীবর্দী খাঁ’র কপালে রাজতিলক এঁকে দিলেন। সরফরাজ খাঁ যুদ্ধে নিহত হলেন, আর আলীবর্দী খাঁ হলেন বাংলার নতুন ভাগ্যবিধাতা।
নবাব আলীবর্দী খাঁ মসনদে বসলেও তাঁর মনে এক গভীর হাহাকার ছিল। তাঁর কোনো পুত্রসন্তান ছিল না, ছিল তিন কন্যা ঘসেটি, ময়মুনা ও আমেনা। তাঁর কোনো পুত্রসন্তান ছিল না, তাই বংশের ধারা বজায় রাখতে তিনি তাঁর বড় ভাই হাজি আহমদের তিন ছেলের সঙ্গেই নিজের তিন মেয়ের বিয়ে দেন।
বড় মেয়ে ঘসেটি বেগম: তাঁর বিয়ে হয় আপন চাচাতো ভাই নওয়াজিশ মুহম্মদ খাঁ-র সাথে। নওয়াজিশ ছিলেন অত্যন্ত বিত্তশালী এবং ঢাকার নায়েব এ নাজিম (গভর্নর)। এই দম্পতি ঢাকা থেকে পুরো পূর্ববঙ্গ শাসন করতেন এবং তাঁদের হাতেই ছিল রাজ্যের সিংহভাগ ধন সম্পদ।
মেজ মেয়ে ময়মুনা বেগম: তাঁর বিয়ে হয় দ্বিতীয় চাচাতো ভাই সাঈদ আহমদ খাঁ-র সাথে। সাঈদ আহমদ ছিলেন বীর যোদ্ধা এবং পূর্ণিয়ার শাসনকর্তা। সামরিক শক্তিতে এই পরিবারটি ছিল অনেক বেশি সংহত।
ছোট মেয়ে আমেনা বেগম: তাঁর বিয়ে হয় ছোট চাচাতো ভাই জৈনউদ্দিন আহমদ-এর সাথে। জৈনউদ্দিন ছিলেন আলীবর্দী খাঁ-র সবচেয়ে বিশ্বস্ত এবং যোগ্য সেনাপতি। তাঁকে বিহারের পাটনার শাসনভার দেওয়া হয়েছিল।
১৭৩৩ সাল। আকাশে তখন মেঘের ঘনঘটা, গঙ্গার বুকে আছড়ে পড়ছে চঞ্চল ঢেউ। আজিমাবাদের প্রাসাদে এক থমথমে অথচ উত্তেজনাময় পরিবেশ। নবাব আলীবর্দী খাঁ তখন বিহারের নায়েব নাজিম হিসেবে নিজের অবস্থান শক্ত করতে লড়াই করে যাচ্ছেন। ক্ষমতার মসৃণ পথে চলাই তখন ছিল দায়, চারদিকে শত্রু আর ষড়যন্ত্রের জাল। ঠিক সেই ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময়েই প্রাসাদের অন্দরমহল থেকে ভেসে এলো এক নবজাতকের কান্না। আলীবর্দী খাঁ’র ছোট মেয়ে আমেনা বেগমের কোল আলো করে জন্ম নিল এক পুত্রসন্তান। সংবাদটি যখন বৃদ্ধ আলীবর্দীর কানে পৌঁছালো, তিনি তখন রাজ্যের এক জটিল রাজনৈতিক সমীকরণ মেলাতে ব্যস্ত। কিন্তু নাতির জন্মের খবর শোনামাত্রই তাঁর চোখের কোণে এক অদ্ভুত দ্যুতি খেলে গেল। তিনি হন্তদন্ত হয়ে অন্দরমহলে ছুটে গেলেন।
কোমল আলোয় উদ্ভাসিত কক্ষের মাঝে আমেনা বেগমের কোলে শুয়ে থাকা শিশুটির মুখ দেখামাত্রই আলীবর্দী খাঁ থমকে দাঁড়ালেন। তাঁর মনে হলো, এই শিশুটির চোখের ভেতরে যেন এক অপার্থিব তেজ লুকিয়ে আছে। তিনি পরম মমতায় শিশুটিকে কোলে তুলে নিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তেই বাইরে থেকে সংবাদবাহক এক অভাবনীয় খবর নিয়ে এলো দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা এক বড় রাজনৈতিক সাফল্যে আলীবর্দী খাঁ জয়ী হয়েছেন এবং তাঁর ক্ষমতা সুসংহত হয়েছে।
বৃদ্ধ নবাবের আর বুঝতে বাকি রইল না। তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে স্রষ্টাকে ধন্যবাদ জানালেন। পরিবারের অন্য সদস্যরা যখন উৎসবে মাতোয়ারা, আলীবর্দী তখন চুপিচুপি শিশুটির কানে কানে বললেন "তুই তো কেবল আমার নাতি নোস, তুই আমার সৌভাগ্যের রাজপুত্র।" তিনি অত্যন্ত আদরে নাতির নাম রাখলেন মির্জা মুহম্মদ।
আজিমাবাদের প্রাসাদের অলিন্দ থেকে মুর্শিদাবাদের কেল্লা সিরাজের শৈশব কেটেছে তলোয়ারের ঝনঝনানি আর রাজকীয় আদব-কায়দার মাঝে। অন্য রাজপুত্ররা যখন খেলাধুলায় মত্ত থাকতো, তখন দশ বছর বয়সী সিরাজকে দেখা যেত আলীবর্দী খাঁ’র দরবারে গম্ভীর মুখে বসে থাকতে। নানা আলীবর্দী খাঁ বিশ্বাস করতেন, বাংলার মাটিকে বুঝতে হলে যুদ্ধের ময়দান আর মানুষের মন দুটোই চিনতে হবে।
সিরাজের পড়াশোনার জন্য নামী সব আলেম ও পারস্যের পণ্ডিতদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বইয়ের পাতার চেয়ে সিরাজকে বেশি টানতো অস্ত্রাগারের তীক্ষ্ণ তলোয়ার আর ঘোড়াশালের তেজী আরবীয় ঘোড়া। আলীবর্দী খাঁ নিজেই তাকে হাতে-কলমে রণকৌশল শেখাতেন। বর্গি (মারাঠা) দমন অভিযানে অনেকবারই তিনি কিশোর সিরাজকে সাথে নিয়ে যেতেন। যুদ্ধের তাবুতে ম্যাপের ওপর আঙুল বুলিয়ে আলীবর্দী শেখাতেন "সিরাজ, শত্রু যখন সামনে থাকে তখন সাহস লাগে, কিন্তু শত্রু যখন ভেতরে থাকে তখন লাগে প্রজ্ঞা।"
সিরাজ যত বড় হচ্ছিলেন, প্রাসাদের ভেতরে তাঁর প্রতি ঘৃণা আর ষড়যন্ত্র ততটাই ঘনীভূত হচ্ছিল। ঘসেটি বেগম আর শওকত জঙ্গরা আড়ালে তাকে 'নবাবের চোখের মণি' বলে উপহাস করতেন। কিন্তু সিরাজ ছিলেন নির্ভীক। তাঁর এই তেজ আর কিছুটা জেদি স্বভাব অনেক সময় বড়দের মনে ভয়ের সৃষ্টি করত।
নবাব আলীবর্দী খাঁ তখন বার্ধক্যে উপনীত। তাঁর শরীর ভেঙে পড়ছে, কিন্তু চিন্তা একটাই তাঁর পর এই বাংলার দায়িত্ব কে নেবে? একদিন মুর্শিদাবাদের ভরা দরবারে তিনি এক নাটকীয় সিদ্ধান্ত নিলেন। রাজপরিবারের বড় বড় আমলা, সেনাপতি মীর জাফর এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা তখন উপস্থিত। বৃদ্ধ নবাব সবার সামনে সিরাজের হাত ধরলেন। তারপর গম্ভীর কণ্ঠে ঘোষণা করলেন:
''আজ থেকে মির্জা মুহম্মদ (সিরাজউদ্দৌলা) কেবল আমার নাতি নয়, সে আমার পবিত্র আমানত। আমার অবর্তমানে এই বাংলার মসনদ আর মানুষের ভার আমি তার হাতেই সপে দিলাম। সে-ই হবে বাংলার পরবর্তী নবাব।"
পুরো দরবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল। মীর জাফরের চোখ দুটি সরু হয়ে এলো, আর ঘসেটি বেগমের হৃদয়ে ঈর্ষার আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল। ১৯ বছর বয়সী তরুণ সিরাজ তখন শান্ত চোখে সামনের দিকে তাকিয়ে। তাঁর সামনে তখন এক বিশাল সাম্রাজ্য, আর পেছনে অগণিত বিষাক্ত তলোয়ার। আলীবর্দী খাঁ সিরাজের মাথায় হাত রেখে মৃদু স্বরে বললেন, "মনে রাখিস সিরাজ, এই সিংহাসনটি ফুলের নয়, এটি আগুনের।"
১০ই এপ্রিল, ১৭৫৬। বাংলার ইতিহাসের এক বর্ণাঢ্য অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। আলীবর্দী খাঁ শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলেন। নবাবের মৃত্যু সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথেই প্রাসাদ ষড়যন্ত্র বিস্ফোরিত হলো। বড় খালা ঘসেটি বেগম তাঁর বিশাল ধন-সম্পদ নিয়ে মতিঝিল প্রাসাদে অবস্থান নিলেন। তিনি ঘোষণা করলেন, সিরাজকে তিনি নবাব হিসেবে মানেন না। তাঁর সাথে যোগ দিলেন প্রধান সেনাপতি মীর জাফর এবং দেওয়ান রাজবল্লভ। অন্যদিকে পূর্ণিয়া থেকে সিরাজের ভাই শওকত জং বিদ্রোহের প্রস্তুতি নিতে শুরু করলেন।
পুরো মুর্শিদাবাদ তখন দুই ভাগে বিভক্ত। একদল চাইছে তরুণ সিরাজকে ক্ষমতা থেকে সরাতে, আর সিরাজের হাতে তখন কেবল অল্প কিছু বিশ্বস্ত অনুচর। সিরাজ বুঝতে পারলেন, এখন নরম হলে চলবে না। তিনি ক্ষিপ্র গতিতে মতিঝিল প্রাসাদ ঘেরাও করলেন এবং ঘসেটি বেগমকে নজরবন্দি করে তাঁর সমস্ত সম্পদ বাজেয়াপ্ত করলেন। এই কঠোর পদক্ষেপ দেখে ষড়যন্ত্রকারীরা সাময়িকভাবে দমে গেল।
সেদিন মুর্শিদাবাদের 'মনসুরগঞ্জ' প্রাসাদে এক রাজকীয় পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। বয়সে তরুণ হলেও সিরাজের চোখেমুখে তখন এক প্রৌঢ় গাম্ভীর্য। হাজার হাজার মানুষের সামনে, রুপোলি রঙের সেই ঐতিহাসিক মাসনাদ বা সিংহাসনে বসলেন ২৩ বছর বয়সী মির্জা মুহম্মদ সিরাজউদ্দৌলা।
কামান গর্জনের মাধ্যমে নতুন নবাবের অভিষেক ঘোষিত হলো। মীর জাফর তলোয়ার ছুঁয়ে সিরাজের আনুগত্যের শপথ নিলেন, যদিও তাঁর অন্তরে তখন বিষ। সিরাজ যখন সিংহাসনে বসলেন, তাঁর মাথায় রাজমুকুট আর হাতে দাদামশাইয়ের দেওয়া সেই তলোয়ার। দরবারে তখন জয়ধ্বনি উঠছে "নবাব সিরাজউদ্দৌলা জিন্দাবাদ!"
মুর্শিদাবাদের মসনদে তখন তেইশ বছরের এক যুবকের দৃপ্ত পদচারণা, যার চোখের দৃষ্টিতে ছিল বাংলার স্বাধীনতা রক্ষার অদম্য নেশা। নবাব সিরাজউদ্দৌলা যখন শাসনভার গ্রহণ করেন, তখন উত্তর ভারতের হিমালয় থেকে শুরু করে দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের নীল জলরাশি এবং পশ্চিমে বিহারের আজিমাবাদ পর্যন্ত ছিল তাঁর সাম্রাজ্যের সীমানা। তাঁর অধীনে ছিল প্রায় পঞ্চাশ হাজার দুর্ধর্ষ পদাতিক বাহিনী আর আঠারো হাজার তেজী অশ্বারোহী সৈন্য, যারা যেকোনো মুহূর্তে দেশের জন্য প্রাণ দিতে প্রস্তুত ছিল।
তিনি বাংলার সাধারণ মানুষের কাছে ছিলেন অত্যন্ত সহজলভ্য একজন শাসক, যিনি প্রায়ই ছদ্মবেশে প্রজাদের অভাব-অভিযোগ শুনতে তাঁদের কুটিরে পৌঁছে যেতেন। বাংলার হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতিকে তিনি রাজপ্রাসাদের প্রধান শক্তিতে পরিণত করেছিলেন, যার প্রমাণ ছিল তাঁর অতি বিশ্বস্ত সেনাপতি মোহনলালের মতো দক্ষ কর্মকর্তারা। কিন্তু সিংহাসনের চারপাশের বাতাস তখন বিদেশি বণিকদের কুটিল ষড়যন্ত্র আর মীর জাফরের মতো বিশ্বাসঘাতকদের গোপন দীর্ঘশ্বাসে বিষাক্ত হয়ে উঠছিল।
সিরাজ জানতেন ইংরেজরা কেবল ব্যবসার আড়ালে এ দেশের মাটিকে দখল করতে চায়, তাই তিনি শক্ত হাতে ব্রিটিশদের দম্ভ চূর্ণ করার শপথ নিয়েছিলেন। তাঁর এই প্রজাহিতৈষী শাসনকাল ছিল এক ঝড়ের আগের শান্ত পরিবেশের মতো, যেখানে একদিকে ছিল দেশের প্রতি অগাধ ভালোবাসা আর অন্যদিকে ছিল আসন্ন যুদ্ধের এক ভয়াবহ সংকেত।
ভারতবর্ষের রাজন্যবর্গের মধ্যে একতা ছিল না। ইংরেজরা এই সুযোগটিকেই সবচেয়ে বড় অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করত। তারা এক রাজ্যের রাজার বিরুদ্ধে অন্য রাজ্যের রাজাকে উসকে দিত এবং সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিত। বিনিময়ে তারা দাবি করত চড়া সুদে ঋণ অথবা বাণিজ্যের একচেটিয়া অধিকার। এভাবে তারা ভারতীয়দের নিজেদের রক্ত দিয়েই ভারতের মাটি দখল করার পথ প্রশস্ত করেছিল।
ইংরেজরা যখন বাংলার রাজস্ব আদায়ের ক্ষমতা (দেওয়ানি) পেল, তখন তারা এক অদ্ভুত 'শয়তানি' চাল চালল। শাসনের দায়িত্ব থাকল দেশি নবাবের হাতে, কিন্তু টাকা আদায়ের চাবিকাঠি চলে গেল কোম্পানির হাতে। ফলে নবাবের হাতে ক্ষমতা থাকল কিন্তু অর্থ ছিল না, আর ইংরেজদের হাতে অর্থ থাকল কিন্তু প্রজাদের প্রতি কোনো দায়বদ্ধতা ছিল না। এই শোষণের ফলেই বাংলার বুকে নেমে এসেছিল ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের মতো ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ।
ইংরেজরা এ দেশে রেলপথ, টেলিগ্রাফ এবং ডাকবিভাগ চালু করেছিল। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে এটি ভারতবর্ষের মানুষের উপকারের জন্য, কিন্তু এর পেছনের আসল উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন। বিশাল এই দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে দ্রুত সৈন্য পাঠানো এবং কাঁচামাল লুটে বন্দরে পৌঁছে দেওয়ার জন্যই তারা এই যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল। অর্থাৎ, আধুনিকতা ছিল তাদের শোষণের গতি বাড়ানোর এক উন্নত মাধ্যম।
লর্ড মেকলে যখন এ দেশে ইংরেজি শিক্ষা প্রবর্তন করেন, তাঁর উদ্দেশ্য ছিল এমন এক শ্রেণী তৈরি করা যারা 'রক্তে ও বর্ণে ভারতীয় কিন্তু রুচি ও চিন্তায় ইংরেজ'। তারা চেয়েছিল হাজার হাজার করণিক বা কেরানি তৈরি করতে, যারা ব্রিটিশ শাসনের চাকা সচল রাখবে। এতে আধুনিক শিক্ষার আলো এলেও ভারতবর্ষের নিজস্ব সংস্কৃতি ও শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংসের মুখে পড়েছিল।ইংরেজরা 'চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত' নামের এক আইন চালু করে, যা ছিল কৃষকদের জন্য এক কালনাগিনী। তারা একদল নতুন জমিদার শ্রেণী তৈরি করল যারা ছিল ব্রিটিশদের পরম অনুগত। এই জমিদাররা কৃষকদের ওপর চড়া খাজনা চাপাত, আর সেই অর্থের সিংহভাগ চলে যেত কোম্পানির পকেটে। যারা খাজনা দিতে পারত না, তাদের পৈত্রিক জমি থেকে উচ্ছেদ করা হতো অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে।
নবাব আলীবর্দী খাঁ-র মৃত্যুর পর সিরাজ যখন মসনদে বসেন, তখন প্রথা অনুযায়ী ফরাসি, ওলন্দাজ এবং অন্য বণিকরা উপঢৌকন নিয়ে নতুন নবাবকে অভিনন্দন জানাতে এলেও ইংরেজরা তা করেনি। এটি ছিল বাংলার নবাবের সার্বভৌমত্বের প্রতি এক চরম অপমান। সিরাজ বুঝতে পেরেছিলেন, ইংরেজরা তাঁকে বৈধ শাসক হিসেবে স্বীকার করতে চাইছে না।মোঘল সম্রাটের দেওয়া 'দস্তক' বা বাণিজ্যিক ছাড়পত্র কেবল কোম্পানির ব্যবসার জন্য ছিল। কিন্তু ইংরেজ কর্মচারীরা ব্যক্তিগত বাণিজ্যেও এই দস্তক ব্যবহার করে কর ফাঁকি দিচ্ছিল। এতে বাংলার রাজকোষে ব্যাপক ঘাটতি দেখা দেয়। সিরাজ যখন তাদের ন্যায্য কর দিতে বললেন, ইংরেজরা তা ঔদ্ধত্যের সাথে প্রত্যাখ্যান করল। এটি ছিল নবাবের অর্থনৈতিক শাসনের ওপর বড় আঘাত।সিরাজের বিনা অনুমতিতে ইংরেজরা কলকাতায় তাদের 'ফোর্ট উইলিয়াম' দুর্গের সংস্কার এবং সামরিক শক্তি বাড়াতে শুরু করে। নবাব তাদের স্পষ্ট নির্দেশ দেন দুর্গ নির্মাণ বন্ধ করতে। ফরাসিরা নবাবের আদেশ মেনে নিলেও ইংরেজরা তা সরাসরি অগ্রাহ্য করে। তারা সাফ জানিয়ে দেয় যে, তারা তাদের আত্মরক্ষার জন্য দুর্গ গড়বেই। এই অবাধ্যতা সিরাজের মতো একজন তেজস্বী নবাবের পক্ষে মেনে নেওয়া অসম্ভব ছিল।
দ্বন্দ্বের আগুনে ঘি ঢালল ইংরেজদের আরেকটি দুঃসাহস। নবাবের অবাধ্য সেনাপতি এবং রাজস্ব আত্মসাতকারী রাজবল্লভের পুত্র কৃষ্ণদাস নবাবের ভয়ে প্রচুর ধন-সম্পদ নিয়ে কলকাতায় ইংরেজদের কাছে আশ্রয় নেন। সিরাজ তাঁকে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানালেও ইংরেজ গভর্নর ড্রেক তাঁকে ফেরত দিতে অস্বীকার করেন। এর ফলে সিরাজের কাছে এটি পরিষ্কার হয়ে যায় যে, ইংরেজরা কেবল বণিক নয়, তারা বাংলার সিংহাসনের শত্রুদের দোসর।
সিরাজউদ্দৌলার প্রধান সেনাপতি মীর জাফর ছিলেন আলীবর্দী খাঁ-র ভগ্নিপতি। তাঁর দীর্ঘদিনের লালসা ছিল বাংলার মসনদ। তিনি মনে করতেন, সিরাজের মতো এক তরুণের অধীনে কাজ করা তাঁর জন্য অপমানের। ইংরেজদের কুটিল চাণক্য লর্ড ক্লাইভ মীর জাফরের এই দুর্বলতাটি ধরে ফেললেন। তিনি মীর জাফরকে টোপ দিলেন যদি তিনি যুদ্ধে ইংরেজদের সহায়তা করেন, তবে সিরাজের পর তাঁকেই বাংলার নবাব করা হবে। মীর জাফর সেই টোপ গিলে ফেললেন এবং নিজের দেশের চেয়ে সিংহাসনের মোহকে বড় করে দেখলেন।
কেবল সামরিক শক্তি নয়, ইংরেজদের দরকার ছিল অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সমর্থন। বাংলার সবচেয়ে ধনী বণিক 'জগৎ শেঠ' এবং প্রভাবশালী দেওয়ান 'রাজবল্লভ' সিরাজের কঠোর শাসনে নিজেদের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হতে দেখছিলেন। তাঁরা ইংরেজদের সাথে এক গোপন বৈঠকে বসলেন। ইংরেজরা তাঁদের বোঝাতে সক্ষম হলো যে, সিরাজ থাকলে ব্যবসা এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তি কোনোটিই নিরাপদ নয়। এভাবে পুঁজি আর প্রশাসন ষড়যন্ত্রের সাথে একাত্ম হয়ে গেল।
পলাশীর যুদ্ধের ঠিক আগে লর্ড ক্লাইভ আর মীর জাফরের মধ্যে এক ঐতিহাসিক কিন্তু কলঙ্কিত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ইংরেজদের পক্ষ থেকে উইলিয়াম ওয়াটস ছদ্মবেশে মীর জাফরের প্রাসাদে গিয়ে সেই চুক্তিতে স্বাক্ষর নেন।
২৩শে জুন সকাল। পলাশীর আম্রকাননে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দুটি অসম শক্তি। একপক্ষে নবাব সিরাজউদ্দৌলার বিশাল বাহিনী প্রায় ৫০,০০০ সৈন্য, অগুণিত হাতি আর ফরাসি গোলন্দাজদের শক্তিশালী কামান। অন্যপক্ষে রবার্ট ক্লাইভের ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মাত্র ৩,০০০ সৈন্য আর কয়েকটি ছোট কামান। শক্তির বিচারে নবাবের জয় ছিল সুনিশ্চিত। সিরাজের দুই বিশ্বস্ত সেনাপতি মীর মদন ও মোহনলাল যুদ্ধের ময়দানে জানপ্রাণ লড়তে প্রস্তুত। কিন্তু নবাবের বিশাল বাহিনীর বড় একটি অংশ ছিল মীর জাফরের অধীনে, যারা মূর্তির মতো স্থির দাঁড়িয়ে ছিল।সকাল ৮টার দিকে যুদ্ধ শুরু হয়। মীর মদন আর মোহনলালের গোলন্দাজ বাহিনীর তোড়ে ইংরেজরা কোণঠাসা হয়ে পড়ে। ক্লাইভ ভয় পেয়ে তাঁর সৈন্যদের আমবাগানের আড়ালে লুকিয়ে ফেলেন। কিন্তু দুপুরের দিকে হঠাৎ আকাশ কালো করে প্রচণ্ড বৃষ্টি নামে। নবাবের সৈন্যদের বারুদ খোলা থাকায় ভিজে অকেজো হয়ে যায়, অথচ ইংরেজরা ত্রিপল ব্যবহার করে তাদের বারুদ শুকনো রাখতে সক্ষম হয়। বৃষ্টি থামার পর মীর মদন যখন আক্রমণ চালাতে গেলেন, তখন ইংরেজদের শুকনো বারুদের গোলার আঘাতে তিনি শহীদ হন। এই একটি মৃত্যু যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
মীর মদনের মৃত্যুর খবর শুনে নবাব সিরাজউদ্দৌলা বিচলিত হয়ে পড়েন। তিনি মীর জাফরকে ডেকে পাঠান এবং দোহাই দিয়ে বলেন বাংলার সম্মান রক্ষা করতে। মীর জাফর কোরআন ছুঁয়ে শপথ করার ভান করলেও নবাবকে পরামর্শ দেন সেদিনের মতো যুদ্ধ বন্ধ রাখতে। সিরাজ যখন তাঁর সৈন্যদের পিছু হটার নির্দেশ দিলেন, মীর জাফর তখনই গোপন সংকেত পাঠান ক্লাইভকে। পিছু হটতে থাকা নবাবের অপ্রস্তুত বাহিনীর ওপর ইংরেজরা অতর্কিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে জয় পরাজয়ে রূপ নেয়।
সিরাজ বুঝতে পারলেন তিনি নিজ ঘরেই সবচেয়ে বেশি একা। যুদ্ধের ময়দানে যখন বিশৃঙ্খলা শুরু হলো, তিনি দ্রুত উটের পিঠে চড়ে মুর্শিদাবাদের দিকে রওনা হন নতুন করে সৈন্য সংগ্রহের আশায়। কিন্তু দুর্ভাগ্য তাঁর পিছু ছাড়েনি। মুর্শিদাবাদে গিয়ে তিনি দেখলেন কেউই তাঁর পাশে নেই। সেখান থেকে নৌকাযোগে পালানোর সময় রাজমহলের কাছে তিনি ধরা পড়েন। মীর জাফরের পুত্র মিরনের আদেশে মোহাম্মদী বেগ নামের এক ঘাতকের তলোয়ারের আঘাতে তরুণ নবাবের জীবনপ্রদীপ নিভে যায়।
পলাশীর আম্রকাননের সেই সূর্যের সাথে সাথে বাংলার স্বাধীনতার সূর্যও অস্তমিত হলো। জয়ী ক্লাইভ আর বিশ্বাসঘাতক মীর জাফর মুর্শিদাবাদে প্রবেশ করেন। মীর জাফরকে নবাবের নামমাত্র মসনদে বসানো হলো, কিন্তু আসল চাবিকাঠি চলে গেল ইংরেজদের পকেটে। বাংলার মানুষ সেদিন দূর থেকে দাঁড়িয়ে এই প্রহসন দেখছিল, কিন্তু কেউ এগিয়ে আসেনি। এভাবেই এক মির্জা মুহম্মদ সিরাজউদ্দৌলার পতনের মধ্য দিয়ে শুরু হলো ভারতবর্ষের দুইশ বছরের দাসত্বের অন্ধকার রাত।









Comments
Post a Comment