কালান্তর (Across the Eras)

 সিজন ঃ ০১

দৃশ্য ১ (মুভির সূচনা)

  • লোকেশন: কালো পর্দা (Black Screen) থেকে ধীরে ধীরে অ্যানিমেশনে রূপান্তর।

  • আবহাওয়া/পরিবেশ: গভীর, প্রাচীন এবং জাদুকরী এক আবহ। শুরুতে ব্যাকগ্রাউন্ডে একটা শঙ্খধ্বনি অথবা প্রাচীন বৌদ্ধ মঠের ঘণ্টার শব্দ ($BGM:$\ একটু ধীরগতির, গম্ভীর বাঁশি ও একতারার ফিউশন) শোনা যাবে।

  • ভিজুয়াল (অ্যানিমেশন): স্ক্রিনে কালির আঁচড়ে প্রাচীন বাংলার ম্যাপ, সবুজ শস্যক্ষেত, ময়নামতির লাল মাটির পাহাড় এবং রাজকীয় মন্দিরের চূড়া ভেসে উঠছে। জাহাজের পাল উড়িয়ে বাঙালি বণিকরা সমুদ্র পাড়ি দিচ্ছে।

[ব্যাকগ্রাউন্ড ভয়েস-ওভার (Voice-over)]

"সময়... মহাকালের এক অন্তহীন স্রোত। আজ থেকে প্রায় বারোশ বছর আগের কথা। 

খ্রিস্টীয় সপ্তম শতক। সমতটের এই পুণ্যভূমিতে তখন রাজত্ব করছেন রাজা গোবিন্দ চন্দ্র। বাংলার ইতিহাসে সে এক সোনালী অধ্যায় এক খাঁটি স্বর্ণযুগ!

ময়নামতির লাল মাটির বুক চিরে তখন সোনা ফলাত বাংলার কৃষকেরা। তাঁতিদের হাতের নিপুণ ছোঁয়ায় বোনা মসলিন আর রেশমি পোশাকের খ্যাতি তখন বিশ্বজোড়া। বাংলার ব্যবসা-বাণিজ্যের সুবাস কেবল ভারতবর্ষের রাজপ্রাসাদগুলোতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, দূর পারস্য সাগর পাড়ি দিয়ে তৎকালীন সুদূর ইউরোপের আনাচে-কানাচেও প্রতিধ্বনিত হতো এই বাংলার নাম।

ধন-ধান্যে, শিল্পে আর গৌরবে দীপ্তমান এই বাংলা যেমন ছিল বীরের, তেমনই ছিল রূপকথার। কিন্তু এই জাঁকজমক আর রাজকীয় ঐশ্বর্যের আড়ালে... এই মাটিতেই জন্ম নিয়েছিল এমন এক গল্প, যা কোনো ইতিহাসের পাতায় লেখা হয়নি।

মহাকালের ডায়েরি থেকে আজ আমরা ফিরে যাবো সেই সহস্র বছর আগের ময়নামতিতে... যেখানে ক্ষমতার দম্ভকে হার মানিয়েছিল এক অবিনশ্বর প্রেম।"

ভিজুয়াল ট্রানজিশন (Visual Transition): অ্যানিমেশনটি ধীরে ধীরে জীবন্ত (Live-action) রূপে রূপান্তর হবে। স্ক্রিনে ভেসে উঠবে সোনালী রোদে ঝলমল করা প্রাচীন ময়নামতি মন্দির  দৃশ্য। কড়া রোদের মাঝে পাখির কিচিরমিচির শব্দ শোনা যাবে। 


দৃশ্য ২

  • লোকেশন: ময়নামতির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া এক শান্ত নদী (যেমন: গোমতী নদী)। নদীর পাড় ঘেঁষে মাইলের পর মাইল বিস্তৃত কাশফুলের জঙ্গল এবং ছনের তৈরি একটি ছোট্ট কুঁড়েঘর।

  • সময়: বিকেল (সূর্য ডোবার আগের সোনালী আলো)।

  • আবহাওয়া/পরিবেশ: আকাশে হালকা সাদা মেঘের আনাগোনা। নদীর পাড়ে মৃদু বাতাস বইছে, যার কারণে ছন ও কাশফুলের জঙ্গল দুলছে। ব্যাকগ্রাউন্ডে নদীর পানির ছলছল শব্দ এবং দূরে কোনো রাখালের বাঁশির সুর ($BGM:$\ খুবই শান্ত, মাটির গন্ধমাখা একতারা বা বাঁশির সুর)।

  • ক্যামেরা (ড্রোন শট): শটটি শুরু হবে নদীর ওপর থেকে। ক্যামেরা নদীর শান্ত জলরাশি এবং বিস্তীর্ণ ছনের জঙ্গল পার হয়ে ধীরে ধীরে নিচে নেমে আসবে। কাশফুলের ঝোপের আড়াল থেকে উন্মোচিত হবে সেই একাকী ছনের কুঁড়েঘরটি।

[দৃশ্যপট বর্ণনা]

কুঁড়েঘরের ছোট্ট বারান্দায় বসে আছেন এক বৃদ্ধ বাবা। তাঁর পরনে একটি ছোট মলিন ধুতি, কাঁধে জড়িয়ে রেখেছেন একটা পুরোনো, কিছুটা ময়লা চাদর। তিনি আপন মনে বাঁশের তৈরি নলে তৈরি দেশীয় হুকায় টান দিচ্ছেন। হুকার ভেতরের পানির 'গড়গড়' শব্দ চারপাশের নিস্তব্ধতাকে ভেঙে দিচ্ছে।


ঘরের ঠিক পাশেই ছনের ছাউনি দেওয়া ছোট একটা উন্মুক্ত রান্নাঘর। সেখানে মাটির উনুনে জ্বলছে কাঠ-কুটোর আগুন। উনুনের ওপর বসানো মাটির হাঁড়ি থেকে ভাতের গরম ফ্যান বাষ্প হয়ে উড়ছে। উনুনের পাশে বসে আছে এক অপরূপা রূপসী রমণী (মেয়েটি)। তৎকালীন গ্রামীণ প্রথানুযায়ী তার গায়ে জড়িয়ে আছে কেবল এক খণ্ড মোটা সুতি কাপড় (একপ্যাঁচে পরা শাড়ি), কোনো ব্লাউজ বা সেমিজ নেই। আগুনের আভায় তার গায়ের শ্যামলা রঙটি আরও উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। সে একটি কাঠের কাঠি দিয়ে হাঁড়ির ভাত চেক করছে।

দৃশ্য ৩ 

  • পরিবেশ: নদীর পাড়ে কুঁড়েঘর। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে। উনুনের আগুনের লালচে আলো শ্যামার মুখে। বৃদ্ধ বাবা হুক্কায় লম্বা একটা টান দিয়ে নাক-মুখ দিয়ে ধোঁয়া ছাড়লেন।

[আদিম সংলাপ ও দৃশ্য]

(বৃদ্ধ বাবা হুক্কার নলটা হাত থেকে নামিয়ে একটু কেশে শ্যামার দিকে তাকালেন)

বৃদ্ধ বাবা: "শ্যামা, রাজকুলের সেপাইহঁককের সনে কথা কহিলোঁ। মেলা কাকুতি-মিনতি করবার পর উহারা বলিল মহলে কাম জুটাইয়া দিবে। দুইখান ইলশাহ মাছের লাগি উহারা রাজি হইল। এই সেপাইগুলা রৌপ্য-পুরাণ (রুপার মুদ্রা) না পাইলে কাণ পাতে না। তয় মা, মুই আর বাঁচিবোঁ কত দিন? তোর মা তো মৈল মেলা দিন আগে। মোরও বয়স হইল। মহলে গিয়া কাম কর মা, মোর হাত আর বৈঠা বাহিতে পারে না, চরণেও বল নাই।"

[আধুনিক বাংলা সাবটাইটেল]: "শ্যামা, রাজমহলের সেপাইদের সাথে কথা বলেছি। অনেক অনুরোধ করার পর তারা বলেছে কাজ জুটিয়ে দেবে মহলে। দুইটা ইলিশ মাছের বিনিময়ে তারা রাজি হয়েছে। এই সেপাইরা রুপার মুদ্রা না পেলে কথা শোনে না। তয় মা, আমি আর বাঁচব কতদিন? তোর মা মরে গেছে মেলাদিন আগে। আমারও বয়স হয়েছে। মহলে গিয়ে কাজ কর, আমার পক্ষে আর নৌকা চালানো সম্ভব না, পায়েও বল নেই।"

(শ্যামা কোনো উত্তর না দিয়ে চুপচাপ ভাতের মাটির হাঁড়ির ঢাকনাটা সরাল। গরম ভাপ উঠতেই মুখ দিয়ে ফুউউ করে বাষ্পটা উড়িয়ে দিল। মেয়েকে চুপ থাকতে দেখে বৃদ্ধ বাবা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ঘরের ভেতর চলে গেলেন।)

(শ্যামা বটি নিয়ে লাউ কাটতে বসল। লাউটা মাঝখান দিয়ে দুই ভাগ করতেই দূর থেকে বাতাসের টানে একটা চেনা বাঁশির সুর ভেসে আসতে লাগল। শ্যামা চমকে উঠে হাতের বটি রেখে দৌড়ে গেল নদীর ধারের কাশ বনে।)

(সে দেখল মাথায় লম্বা চুল, কাঁধে গামছা আর পরনে ছোট ধুতি পরা ইন্দ্র বাঁশি বাজাতে বাজাতে আসছে। শ্যামা হাঁপাতে হাঁপাতে তার সামনে দাঁড়াল। ইন্দ্র বাঁশি থামিয়ে তার কাপড়ের পুঁটলি থেকে একটা সুন্দর লালচে চাদর বের করে শ্যামার দিকে বাড়িয়ে দিল।)

ইন্দ্র: "শ্যামা, হট্ট (হাট) থাইক্কা তোর লাগি এই চাদরখান আনিছোঁ।"

[আধুনিক বাংলা সাবটাইটেল]: "শ্যামা, গঞ্জ (হাট) থেকে তোর জন্য এই চাদরটা এনেছি।"

শ্যামা: (চাদরটা না ছুঁয়ে ভয়ে ভয়ে) "ইন্দ্র, মুই এই ছাঁদন (চাদর) লইয়া ঘরে গেলে বাপে শুধাইবে কে দিল? তখন কি কহিবোঁ?"

[আধুনিক বাংলা সাবটাইটেল]: "ইন্দ্র, আমি এই চাদর নিয়ে ঘরে গেলে বাবা জিজ্ঞেস করবে কে দিয়েছে? তখন কী বলব?"

ইন্দ্র: (হেসে) "তোর বাপের কহিবি বাটে (রাস্তায়) পইড়া পাইছোঁ!"

[আধুনিক ভাষা সাবটাইটেল]: "তোর বাপরে বলবি রাস্তায় পড়ে পেয়েছি!"

শ্যামা: "এহ! বাপ মোর এত বোকা নহে। কেহ এমন সোন্দর চাদর বাটে ফেলাইয়া যাইবে, ইহা বাপ পাতিয়াইবে (বিশ্বাস করবে) না।"

[আধুনিক বাংলা সাবটাইটেল]: "এহ! বাবা এত বোকা না। কেউ এমন সুন্দর চাদর রাস্তায় ফেলে চলে যাবে, এটা বাবা বিশ্বাস করবে না।"

(ইন্দ্র আলতো করে হাসল। তারপর চাদরটা শ্যামার দুই কাঁধে জড়িয়ে দিল। তার চোখের দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলল)

ইন্দ্র: "আর কেত দিন সবুর কর শ্যামা। মুই সেপাইয়ের কামখান পাইলেই তোরে মোর কুটিরে তুলিয়া লইয়া জাবোঁ।"

[আধুনিক বাংলা সাবটাইটেল]: "আর কিছুদিন অপেক্ষা কর শ্যামা। আমি সেপাইয়ের কাজটা পেয়ে গেলেই তোকে নিজের ঘরে তুলে নিয়ে যাব।"

(ইন্দ্র আবার ঠোঁটে বাঁশি ছোঁয়াল। সুর তুলতে তুলতে সে নদীর পাড় ধরে হেঁটে চলে গেল। শ্যামা চাদরটা গায়ে জড়িয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল।)

দৃশ্য ৪

  • লোকেশন: ময়নামতি রাজপ্রাসাদের অন্দরমহল (রাজকীয় শয়নকক্ষ)।

  • সময়: গভীর রাত।

  • আবহাওয়া/পরিবেশ: বাইরে নিঝুম অন্ধকার, ঝিঁঝিঁ পোকার তীব্র ডাক শোনা যাচ্ছে। ঘরের দেয়ালে বিশাল দুটি মশালে আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছে, যার ফলে ঘরের পাথুরে দেয়ালে আলো-ছায়ার এক রহস্যময় খেলা তৈরি হয়েছে। ঘরের ভেতর ভেষজ ওষুধের কড়া গন্ধ।

  • দৃশ্যপট: খোদাই করা কাঠের বিশাল রাজকীয় বিছানায় অসুস্থ রাজা গোবিন্দ চন্দ্র শুয়ে আছেন। তাঁর শরীর দুর্বল, কপালে চিন্তার ভাঁজ। বিছানার পাশে বসে আছেন রানী ময়নামতি। তিনি একটি পাত্র থেকে সুতি কাপড় ভিজিয়ে পরম যত্নে রাজার কপালে জলপট্টি (প্রলেপ) দিচ্ছেন।

[আদিম সংলাপ ও দৃশ্য]

(রাজা গোবিন্দ চন্দ্র কষ্টের সাথে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তাঁর চোখ আগুনের মশালটার দিকে নিবদ্ধ। তিনি রানীকে উদ্দেশ্য করে ভারী ও দুর্বল গলায় বললেন—)

রাজা গোবিন্দ চন্দ্র: "রানী, মুই মোর পুত্ত (পুত্র) মহীপালরে লইয়া বড়ই চিন্তিত আছোঁ। যেমতে চারিভিত থাইক্কা হিন্দু রাজাগণ মোর পিছে লাগিছইন মোর রাজ্য কাড়িবার লাগি! এই ছাওয়াল যদি এই খামখেয়ালিপনা না ছাড়িয়া রাজ্য চালনে মন না দেয়, তবে মোর এই সমতট রাজ্য ছারখার হইয়া যাইবে।"

[আধুনিক বাংলা সাবটাইটেল]: "রানী, আমি আমার পুত্র মহীপালকে নিয়ে বড়ই চিন্তায় আছি। যেভাবে চারপাশ থেকে হিন্দু রাজারা আমার পেছনে লেগেছে আমার রাজ্য কেড়ে নেওয়ার জন্য! এই ছেলে যদি এই খামখেয়ালিপনা না ছেড়ে রাজ্য পরিচালনায় মন না দেয়, তবে আমার এই সমতট রাজ্য ধ্বংস হয়ে যাবে।"

(রানী কাপড়ের প্রলেপটি আলতো করে রাজার কপালে চেপে ধরলেন। তাঁর মুখে মাতৃত্ব ও আশঙ্কার ছাপ স্পষ্ট।)

রানী ময়নামতি: "মহারাজ, আপনার সন্তান এবে জোয়ান (যুবক) হইয়াছে, তাহারে বিবাহ দেও। সে যেমতে রাজ্যের কুমারী কন্যাগণের রূপ ভোগ করিয়া বেড়াইতেছে, কখনে যে রাজ্যের পজা (প্রজা) একজোট হইয়া বিদ্রোহ করিবে, কে জানে!"

[আধুনিক বাংলা সাবটাইটেল]: "মহারাজ, আপনার সন্তান এখন যুবক হয়েছে, তাকে বিয়ে দিন। সে যেভাবে রাজ্যের কুমারী মেয়েদের রূপ ভোগ করে বেড়াচ্ছে, কখন যে রাজ্যের প্রজারা একজোট হয়ে বিদ্রোহ করবে, কে জানে!"

(রাজা গোবিন্দ চন্দ্র হঠাত্‍ রেগে গিয়ে বিছানা থেকে সামান্য মাথা তুললেন। অসুস্থ শরীর সত্ত্বেও তাঁর চোখে রাজার দম্ভ ফুটে উঠল।)

রাজা গোবিন্দ চন্দ্র: "পজাহঁককের এত বড় সাধ্য হইবে না! মোর পুত্তের পানে চোখ মেলিলে সব কটারে শূলে চড়াইবোঁ! তয় রানী, মুই অন্য এক সংকটে আকুল আছোঁ। পুত্ত মোর যেমতে ধম্মজ্ঞান-হীন (ধর্মজ্ঞানহীন) হইয়া পড়িছে! পুরোহিতগণ কহিলোঁ সে বুদ্ধদেবরে মানিতে চাহে না, মহাবিহারেও যায় না। এই রাজ্য হিন্দু আর বুদ্ধ দুই মিলি বাস করে। আমহেদের দুর্বল পাইলে হিন্দু রাজাগণ মাথা চাড়া দিয়া বসিবে।"

[আধুনিক বাংলা সাবটাইটেল]: "প্রজাদের এত বড় সাহস হবে না! আমার পুত্রের দিকে চোখ তুলে তাকালে সব কটাকে শূলে চড়াব! তবে রানী, আমি অন্য এক সংকটে ব্যাকুল আছি। পুত্র আমার যেভাবে ধর্মজ্ঞানহীন হয়ে পড়ছে! পুরোহিতরা বলল সে বুদ্ধদেবকে মানতে চায় না, মহাবিহারেও যায় না। এই রাজ্যে হিন্দু আর বৌদ্ধ দুই মিলে বসবাস করে। আমাদের দুর্বল পেলে হিন্দু রাজারা মাথা চাড়া দিয়ে বসবে।"

(রানী চিন্তিত মুখে রাজার কপালে আবার হাত রাখলেন। মণ্ডপের মশালটা হঠাৎ বাতাসে একটু কেঁপে উঠল, যেন রাজ্যের আসন্ন কোনো বিপদের ইঙ্গিত দিচ্ছে।)

দৃশ্য ৫

  • লোকেশন: ময়নামতির একটি গ্রামীণ কাঁচা রাস্তা এবং বড় দীঘির ঘাট।

  • সময়: ভরদুপুর, কড়া রোদ।

  • আবহাওয়া/পরিবেশ: রোদের তীব্রতা অনেক। রাস্তার দুই পাশে সারিবদ্ধ খেজুর গাছ। মাটির তৈরি ছোট ছোট ঘর, উপরে ছনের চাল। প্রতিটা ঘরের দরজা বাঁশের বেতি (চটা) দিয়ে বোনা। চারপাশে বাতাসে ধুলো উড়ছে।

  • দৃশ্যপট: দূর থেকে ঘোড়ার খুরের প্রচণ্ড শব্দ এবং ধুলোর ঝড় উড়িয়ে ছুটে আসছে রাজপুত্র মহীপাল। কিশোর বয়স, কিন্তু শরীরে যুবকের অবয়ব। ঠোঁটের ওপরে সামান্য গোঁফের রেখা, মাথায় লম্বা চুল বাতাসে উড়ছে। সে ইচ্ছে করেই গ্রামের শান্ত রাস্তায় ঘোড়া নিয়ে পাগলের মতো এদিক-ওদিক ছুটছে। লোকজন একবার ভয়ে রাস্তায় আছাড় খাচ্ছে, তো পরক্ষণেই দৌড়ে বাঁশের দরজার আড়ালে পালাচ্ছে। মহীপাল তাদের এই অসহায়ত্ব দেখে দুষ্টুমির ছলে হাসছে। একবার রাস্তা পার হয়ে যাচ্ছে, আবার ঘোড়া ঘুরিয়ে ফিরে আসছে।

[চরিত্রের মুভমেন্ট ও সংলাপ]

(গ্রামের রাস্তা দাপিয়ে মহীপাল তার ঘোড়া নিয়ে গিয়ে থামল মস্ত এক দীঘির পাড়ে। দীঘির চারপাশ বড় বড় গাছে ঘেরা। মহীপাল ঘোড়া থেকে নেমে একটি গাছের কাণ্ডের সাথে লাগামটা বাঁধল। সাথে সাথে রাজপ্রাসাদ থেকে তার পিছু পিছু আসা সমবয়সী দুই তরুণ সেপাই হাঁপাতে হাঁপাতে ঘোড়া থেকে নেমে মহীপালের কাছে এসে দাঁড়াল।)

১ম সেপাই: (হাঁপাতে হাঁপাতে, প্রশংসার সুরে) "রাজকুমার! আমহেদের মাঝে কোহীও আপনার মতন এত চটজলদি ঘোটক (ঘোড়া) ছুটাইতে পারে না। আমহে হেরে গেইছোঁ রাজপুত্র!"

[আধুনিক বাংলা সাবটাইটেল]: "রাজকুমার! আমাদের মধ্যে কেউই আপনার মতো এত দ্রুত ঘোড়া ছুটাতে পারে না। আমরা হেরে গেছি রাজপুত্র!"

(মহীপাল কোনো উত্তর না দিয়ে অহংকারের হাসি হাসল। সে দীঘির ঘাটের দিকে এগোতেই দেখল—গ্রামের একদল যুবতী মেয়ে দীঘির ঘাটে গোসল করছে। মহীপালকে হঠাৎ ঘাটে আসতে দেখে মেয়েরা লজ্জায় ও ভয়ে তটস্থ হয়ে পড়ল। তারা নিজেদের শরীর আড়াল করতে তড়িঘড়ি করে গলা অবধি পানির নিচে ডুব দিল, যাতে পানির ওপর শুধু তাদের মুখটুকু দেখা যায়।)

(মহীপাল ঘাটের বাঁধানো সিঁড়িতে পা ঝুলিয়ে বসল। মেয়েদের এই কাণ্ড দেখে তার চোখে শয়তানি বুদ্ধি খেলে গেল। সে পেছনে থাকা দুই সেপাইকে হুকুম দিল )

মহীপাল: "ওরে! মোর লাগি সুগন্ধি কলিকা সাজা ঝটপট! ধূমপানের ইচ্ছা জাইগাছে মনে।"

[আধুনিক বাংলা সাবটাইটেল]: "ওরে! আমার জন্য সুগন্ধি তামাকের কলিকা সাজা ঝটপট! ধূমপানের ইচ্ছা জেগেছে মনে।"

(সেপাই দুজন তড়িঘড়ি করে মাটির রাজকীয় কলিকায় সুগন্ধি ভেষজ পাতা ও আগুন দিয়ে মহীপালের হাতে বাড়িয়ে দিল। মহীপাল কলিকায় লম্বা টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ল। মেয়েদের গলা পর্যন্ত পানির নিচে ডুবে থাকার দৃশ্য দেখে সে আর চেপে রাখতে পারল না, হো হো করে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল।)

(কলিকা অর্ধেক শেষ হতেই মহীপাল হঠাৎ বিড়ালের মতো নিঃশব্দে উঠে দাঁড়াল। ঘাটের সিঁড়িতে মেয়েদের রাখা শাড়ি ও কাপড়ের স্তূপ ছিল। সে এক ঝটকায় সব কটি কাপড় লুফে নিল এবং চোখের পলকে দৌড়ে গিয়ে নিজের ঘোড়ার পিঠে চেপে বসল।)

মহীপাল: (ঘোড়া ছোটানোর মুহূর্তে মেয়েদের দিকে তাকিয়ে জোরে হেসে) "জলপরীহঁককের আজ জলেই বাস হউক!"

[আধুনিক বাংলা সাবটাইটেল]: "জলপরীদের আজ জলেই বাস হোক!"

(মহীপাল ঘোড়া ছুটিয়ে ধুলো উড়িয়ে চোখের আড়ালে চলে গেল। দুই সেপাইও তার পিছু নিল।)

(দীঘির মাঝখানে থাকা যুবতী মেয়েরা চরম বিপাকে পড়ল। রোদ চড়চড় করছে, অথচ তীরে কোনো কাপড় নেই। তারা দুই হাত দিয়ে নিজেদের বুক ও শরীর আড়াল করে ডুবন্ত অবস্থা থেকেই কান্নাকাটি আর চিৎকার করতে করতে ঘাটের দিকে আসতে লাগল এবং মরিয়া হয়ে নিজেদের কাপড় খুঁজতে লাগল।)



Comments

Popular posts from this blog

শেষ দৃশ্যপট (১ম অধ্যায় )

ফারাওয়ের অভিশাপ

মৃতের নিশ্বাস