নদী
লেখকঃ সীমান্ত সরকার
( পর্ব ০১)
কেরোসিনে ভেজা সামিয়ানায় দিয়াশলাইয়ের কাঠিটা ছোঁয়ানোর সঙ্গে সঙ্গেই আগুন যেন ক্ষুধার্ত জন্তুর মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। কয়েক সেকেন্ডের জন্য পুরো বিয়েবাড়ি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। সবাই মাথা উঁচু করে তাকিয়ে দেখল, তাদের মাথার ওপর লাল আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছে।
তারপরই এক বিকট চিৎকার রাতটাকে কাঁপিয়ে দিল।
“আগুন! আগুন লাগছে রে! পানি আন! কেউ পানি ঢাল!”
মুহূর্তের মধ্যেই আনন্দের আসর পরিণত হলো মৃত্যুভয়ে ভরা এক দৌড়ঝাঁপে। যে যেদিকে পারছে ছুটছে। কারো গায়ের সঙ্গে কারো ধাক্কা লাগছে, কেউ পড়ে যাচ্ছে, কেউ চিৎকার করতে করতে নিজের মানুষকে খুঁজছে। কিন্তু আগুনের সামনে তখন আর কোনো সম্পর্কের মূল্য নেই। সবাই শুধু নিজের প্রাণটা বাঁচাতে ব্যস্ত।
মরিচ বাতির আগুন সামিয়ানার কাপড়ে ছড়িয়ে পড়তেই শিখাগুলো আরও ভয়ংকর হয়ে উঠল। আগুন যেন পুরো প্যান্ডেলটাকে গিলে খেতে চাইছে। ধোঁয়ায় চারপাশ অন্ধকার হয়ে গেছে। নিঃশ্বাস নেওয়াও কঠিন। এক দিকে মরিচ বাতি টিপ টিপ করে ঝলছে পাছে লাল আগুনের ছোয়া। যেন আগুন উৎসবে মেতেছে পুরো প্যান্ডেল।
বর আর কনে কিছুক্ষণ আগেও পাশাপাশি বসে কবুল বলেছিল, সারাজীবন একসঙ্গে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। অথচ বিপদ আসতেই সব প্রতিশ্রুতি আগুনের তাপে গলে গেল। নববধূ নদী তখন আতঙ্কে কাঁপছে। ভারী শাড়ি সামলে উঠে দাঁড়াতেও পারছে না। আর সেই সময় বর একবারও পিছনে না তাকিয়ে মানুষের ভিড় ঠেলে বাইরে বেরিয়ে গেল। নদী শুধু অসহায়ের মতো তাকিয়ে রইল তার চলে যাওয়ার দিকে।
প্যান্ডেলের এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিল শুভ। তার শার্টের একপাশে আগুনের দগদগে ছাপ। ছিঁড়ে ঝুলে থাকা বৈদ্যুতিক তার হাতে পেঁচানো। যেন পুরো আগুনের নরকটার মাঝেও ছেলেটার ভেতরে কোনো ভয় নেই। সে শান্তভাবে একটা সিগারেট ঠোঁটে চেপে ধরল। তারপর জ্বলতে থাকা তারের আগুনে সেটা হাতে পেচিয়ে নিলো, পুরো হাত সাদা আলো ঝলমল করতে থাকলো। তারের আগায় নীল আগুনে সিগারেট ধরালো।
গভীর একটা টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ল নাক দিয়ে।
তারপর ধীরে ধীরে রাস্তার দিকে হাঁটতে শুরু করল। দুই হাত দুই পাশে ছড়িয়ে দিল, মাথা তুলে তাকাল কালো আকাশের দিকে। চোখ দুটো বন্ধ। হাঁটছে যেন মাতাল কেউ, অথবা এমন একজন মানুষ যার ভেতরে বহুদিন ধরে জমে থাকা আগুন আজ বাইরে বের হওয়ার রাস্তা পেয়েছে।
চারপাশের মানুষ আতঙ্কে চিৎকার করছে, দৌড়াচ্ছে। কিন্তু কারও বুঝতে বাকি রইল না, এই আগুনের পেছনে একটাই নাম।
শুভ।
মাথার পেছনে হঠাৎই এক প্রচণ্ড আঘাত এসে লাগল। যেন পুরো মাথার ভেতরটা কেঁপে উঠল। শুভ এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়াল।
ধীরে ধীরে পেছন ফিরে তাকাতেই সে দেখল, নদীর ভাই সিরাজ আর কয়েকজন লোক হাতে বাঁশ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের চোখে আগুনের থেকেও বেশি আগুন রাগ, ক্ষোভ আর প্রতিশোধের তীব্রতা।শুভ কিছু বলার আগেই আরেকটা আঘাত এসে পড়ল। এবার শরীরটা কেমন ঝাঁকুনি খেয়ে উঠল। চারপাশের শব্দগুলো হঠাৎ দূরে সরে যেতে লাগল। আগুনের লেলিহান শিখা, মানুষের চিৎকার, দৌড়াদৌড়ি সবকিছু যেন ধীরে ধীরে অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তার চোখের সামনে অন্ধকার নেমে এলো। মাথা ঘুরে উঠল। শরীর আর তাকে ধরে রাখতে পারল না। চোখের সামনে সবকিছু অন্ধকার হয়ে গেল। শরীরটা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো সে। এরপর আর কিছু মনে রইলো না।
চোখ খুলতেই শুভ বুঝতে পারলো সে একটা জেলের সেলের ভেতরে পড়ে আছে। মাথাটা প্রচণ্ড ভার লাগছে। পাশে ছড়িয়ে আছে শুকিয়ে যাওয়া বমি, আর নিজের গা থেকেই ভেসে আসছে তীব্র মদের গন্ধ। পুরো শরীর জ্বালা করছে, বিশেষ করে মাথার পেছনের জায়গাটা। বাইরে পুলিশ স্টেশনের কোলাহল ভেসে আসছে। কোথাও কেউ জোরে কথা বলছে, কোথাও কম্পিউটারের কিবোর্ডে টুকটুক শব্দ উঠছে। হঠাৎ এক পুলিশ হেসে বলে উঠলো,
“স্যার, নবাবজাদার ঘুম ভাঙছে। কাল রাতে পুরো বিয়েবাড়িতে আগুন লাগিয়ে দিয়ে এখন আরামে ঘুমাচ্ছে!”
কথাটা শুনে শুভর বুকের ভেতরটা ধক করে উঠলো। ধীরে ধীরে আগের রাতের ঘটনাগুলো মনে পড়তে শুরু করলো। আগুন, চিৎকার, দৌড়াদৌড়ি তারপর অন্ধকার। সব মিলিয়ে বুঝতে আর বাকি রইলো না। নদীর পরিবারই তাকে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে।শুভ ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টানলো। মনে মনে তীব্র ঘৃণায় গালি দিলো,
“শালারা প্রেমিকাকে তুলে দিলো অন্যের হাতে, আর আমাকে তুলে দিলো পুলিশের হাতে।”
তার সেই মুচকি হাসিটা ইন্সপেক্টরের চোখ এড়ালো না। মুহূর্তেই লোকটা রেগে গিয়ে হাতে থাকা লাঠি দিয়ে শুভর পিঠে পরপর কয়েকটা আঘাত বসিয়ে দিলো।
“হাসিস কেন রে? খুব মজা লাগতেছে?”
বাংলাদেশের দণ্ডবিধি অনুযায়ী শুভর বিরুদ্ধে গুরুতর মামলা হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে কমপক্ষে দশ বছরের সাজা হতে পারে। থানার ভেতর সবাই তাকে এমনভাবে দেখছিল, যেন সে ভয়ংকর কোনো অপরাধী।
কিছুক্ষণ পর এক মধ্যবয়সী উকিল এসে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঠিক করলেন। শুভ বুঝতে পারলো, তার বাবাই তাকে জামিন করিয়েছেন। আজিজ চৌধুরী শহরের পরিচিত একজন ব্যবসায়ী। টাকার অভাব তার কোনোদিন ছিল না, প্রভাব-প্রতিপত্তিরও কমতি নেই। কিন্তু ছেলের জন্য এই প্রথম তাকে থানায় আসতে হলো। তবু তিনি শুভর দিকে একবারও তাকালেন না।চোখেমুখে ছিল অপমান আর ক্লান্তি। যেন এক রাতেই মানুষটা অনেকটা বুড়িয়ে গেছেন। ছেলের এমন কাণ্ডে আজ তার মাথা হেঁট হয়ে গেছে সমাজের কাছে।
সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে আজিজ চৌধুরী একাই গাড়িতে উঠে চলে গেলেন। শুভকে পর্যন্ত গাড়িতে উঠতে দিলেন না। অথচ তিনি জামিন না করালে এতক্ষণে পুলিশ তাকে কোর্টে চালান দিয়ে জেলে পাঠিয়ে দিতো।
থানার সামনে কিছুক্ষণ নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইলো শুভ। তারপর খালি পায়ে, ময়লা কাপড় গায়ে ধীরে ধীরে হাঁটা শুরু করলো বাড়ির দিকে। রাস্তার মানুষ কৌতূহলী চোখে তাকাচ্ছিল। কেউ চিনে ফেলছিল, কেউ ফিসফিস করে কথা বলছিল। কিন্তু সেদিকে তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। মাথার ভেতর শুধু একটা শূন্যতা।
মা মারা গিয়েছিলেন শুভ ছোট থাকতেই। ছেলেকে যেন সৎমায়ের অবহেলায় বড় হতে না হয়, সেই চিন্তায় আজিজ চৌধুরী আর দ্বিতীয় বিয়ে করেননি। নিজের ব্যস্ত জীবনের মাঝেও যতটা সম্ভব আদর-যত্ন দিয়ে মানুষ করেছেন তাকে। ভদ্র, শান্ত আর নম্র স্বভাবের ছেলে হিসেবেই সবাই চিনতো শুভকে। সেই ছেলেটাই কীভাবে এত বড় অপরাধ করে ফেললো, সেটা আজিজ চৌধুরী কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছিলেন না।
বাসায় ফিরেই শুভ সোজা বাথরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলো। কাঁপা হাতে শাওয়ারটা ছেড়ে দিতেই ঠান্ডা পানি ঝরতে শুরু করলো তার শরীরের ওপর। গা বেয়ে একের পর এক জলের ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছে, কিন্তু ভেতরের আগুনটাকে কিছুতেই নিভাতে পারছে না। মাথাটা এখনও ঝিমঝিম করছে। চোখ বন্ধ করতেই পুরোনো স্মৃতিগুলো একে একে ভেসে উঠতে লাগলো। নদীর হাসি, অভিমান, হাত ধরে হাঁটা সবকিছু যেন এখনও খুব কাছে
ই আছে। আবেগে ভরা মনটা কিছুতেই প্রিয় মানুষটার কথা ভুলতে পারছে না।
হঠাৎ শুভ দুহাত দিয়ে বাথরুমের দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়ালো। দুই হাত ছড়িয়ে বুকটা চেপে ধরলো দেয়ালের সঙ্গে, যেন কাউকে জড়িয়ে ধরার মরিয়া চেষ্টা করছে। শাওয়ারের পানি তখনও তার পিঠ বেয়ে ঝরে পড়ছে, ঠিক বৃষ্টির মতো। একসময় আর নিজেকে সামলাতে পারলো না সে। বুক ফেটে কান্না বেরিয়ে এলো। ডুকরে কেঁদে উঠলো শুভ। চোখের সামনে শুধু ভেসে উঠছে কিছু মধুর স্মৃতি, আর সেই স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা নির্মম আঘাত।
(পর্ব ০২)
সেই ছবির মানুষটার দিকেই অনেকক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে ছিল শুভ। তারপর থেকে মায়ের স্মৃতি বলতে ওই ছবিটাই তার কাছে সবকিছু।
ব্যবসার কাজে আজিজ চৌধুরী বেশিরভাগ সময় বাইরে থাকতেন। তাই শুভ বড় হয়েছে তার দাদী রাবেয়া বেগমের স্নেহ আর শাসনের ভেতর দিয়ে। বৃদ্ধা মহিলার পুরো পৃথিবীই যেন ছিল এই নাতিকে ঘিরে। ছোটবেলা থেকেই শুভ অন্যরকম ছিল। শান্ত, ভদ্র আর চুপচাপ স্বভাবের। অকারণে কারও সঙ্গে মিশতো না। বন্ধু বলতে তেমন কেউ ছিল না তার। উপন্যাস, সাহিত্য, কবিতা আর বিজ্ঞানের বই নিয়েই ছিল তার আলাদা একটা জগৎ।ক্লাসের অনেকেই তাকে মজা করে “বইয়ের পোকা” বলতো। কারণ টিফিন টাইম হোক কিংবা ক্লাসের ফাঁকা সময়, শুভকে সবসময় কোনো না কোনো বইয়ে ডুবে থাকতে দেখা যেত।
তবে ভদ্র আর নির্লিপ্ত এই ছেলেটার মনেও যে ভালোবাসা ছিল না, তা নয়। সে নিঃশব্দে ভালোবেসে ফেলেছিল ক্লাসের সবচেয়ে চঞ্চল মেয়েটাকে।
নদী।
নামের মতোই মেয়েটার উপস্থিতিতেও ছিল অদ্ভুত এক প্রবাহ। মুখভরা কোমল মায়া, চোখে অদ্ভুত উদারতা। তাকে দেখলে মনে হতো, পৃথিবীর সবচেয়ে রাগী মানুষটাও হয়তো সেই চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত হয়ে যাবে। কিন্তু চেহারার সঙ্গে স্বভাবের মিল ছিল না একদমই।নদী ছিল ভীষণ চঞ্চল। সারাক্ষণ হৈচৈ, দুষ্টুমি আর গল্পে মেতে থাকতো। পড়াশোনায় মনোযোগ ছিল খুবই কম। ক্লাসের এক বেঞ্চ থেকে আরেক বেঞ্চে ঘুরে বেড়ানো, বন্ধুদের সঙ্গে হেসে লুটোপুটি খাওয়া এসব নিয়েই তার দিন কেটে যেত।
ভালোবাসার নিজস্ব একটা স্রোত আছে। ঠিক নদীর পানির মতো। ধীরে ধীরে, অজান্তেই সেটা মানুষকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় অন্য এক জগতে। আর সেই স্রোতের নামই ছিল নদী। নদী আসার পর থেকেই শুভর জীবনটা বদলাতে শুরু করেছিল। বাপের অঢেল টাকা থাকলেও শুভর চলাফেরায় ছিল পুরোনো দিনের ছাপ। দাদী যেভাবে মানুষ করেছেন, সেভাবেই বড় হয়েছে সে। দামি ব্র্যান্ডের পোশাক গায়েও কেমন বেমানান লাগতো। কারণ পোশাক বাছাই থেকে শুরু করে সবকিছুই করতেন দাদী রাবেয়া বেগম। এমনকি চুল কাটাও।
দাদী ছিলেন পুরোনো বাংলা-হিন্দি সিনেমার ভীষণ ভক্ত, বিশেষ করে দিলীপ কুমারের। তাই শুভর চুলও কাটানো হতো সেই পুরোনো স্টাইলে। ক্লাসের ছেলেরা এটা নিয়ে হাসাহাসিও করতো মাঝে মাঝে। কিন্তু নদী যেন ধীরে ধীরে শুভকে নতুন একটা পৃথিবীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলো। তার পোশাকে পরিবর্তন এলো, চলাফেরায় আত্মবিশ্বাস বাড়লো। আগের সেই গুটিয়ে থাকা ছেলেটা ধীরে ধীরে নিজের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসতে লাগলো। যে শুভ কোনোদিন বাবার কাছে হাতখরচ চায়নি, প্রয়োজন হলে শুধু দাদীর কাছ থেকেই টাকা নিয়েছে, সেই শুভ এখন প্রায়ই বাবার কাছ থেকে টাকা নিতে শুরু করলো।আজিজ চৌধুরী ভেবেছিলেন, ছেলে বড় হচ্ছে, খরচও বাড়ছে। তাই তিনি বিষয়টা নিয়ে বেশি ভাবেননি। বুঝতেও পারেননি, শুভ কোথায় আর কীভাবে এত টাকা খরচ করছে। নদীর বন্ধুরাই একসময় শুভর বন্ধু হয়ে গেল। যদিও তাদের অনেকেই শুভর টাকার কারণেই কাছে ঘেঁষতো, তবু শুভ সেটা বুঝেও না বোঝার ভান করতো।
আর নদী?
সে সত্যিই শুভকে ভালোবাসতে শুরু করেছিল।
অন্তত শুভ তাই বিশ্বাস করতো।
ভালোবাসা সত্যিই সুন্দর। ঠিক নদীর জলের মতো শান্ত, গভীর, আবার কখনও ভীষণ উচ্ছ্বসিত।
খুব ভোরে, যখন চারপাশে কুয়াশার আস্তরণ পড়ে ছিল, শুভ একটা রিকশা নিয়ে অপেক্ষা করছিল নদীদের বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে। বুকের ভেতর অকারণ উত্তেজনা, হাত-পা ঠান্ডায় জমে গেলেও কপালে হালকা ঘাম। কিছুক্ষণ পর চাদরে মুখ ঢেকে নদী এসে দাঁড়ালো তার সামনে। চারপাশে একবার তাকিয়ে দ্রুত রিকশায় উঠে বসল। শুভর বুকের ধুকপুকানি যেন আরও বেড়ে গেল। রিকশা ধীরে ধীরে ফাঁকা রাস্তা পেরিয়ে ব্রিজের কাছে এসে থামলো। দুজন নেমে নদীর ধারে হাঁটতে শুরু করলো। ভোরের ঠান্ডা বাতাসে নদীর পানি কাঁপছিল হালকা ঢেউয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ নদী শুভর হাতটা ধরলো। নরম, ঠান্ডা সেই স্পর্শে শুভর পুরো শরীর কেঁপে উঠলো। এই শীতের ভোরেও তার হাতের তালু ঘামে ভিজে গেল।
নদী সেটা টের পেয়েই মুচকি হেসে বললো,
“কি ব্যাপার? এই প্রথম কোনো মেয়ের হাত ধরলে নাকি?”
শুভ মাথা নিচু করে ফেললো। ঠোঁটের কোণে লাজুক একটা হাসি ফুটে উঠলো। কিছু না বলেও সেই হাসিতেই উত্তর দিয়ে দিলো সে। নদী তখন শুভর মুখের দিকে তাকিয়ে হো হো করে হেসে উঠলো। সেই হাসির শব্দে যেন ভোরের নিস্তব্ধতাও মিষ্টি হয়ে উঠলো।
ঘাটে বাঁধা ছোট্ট ডিঙি নৌকাটায় গিয়ে পাশাপাশি বসলো দুজন। নদীর পানি তখন ধীরে ধীরে নৌকার গায়ে আছড়ে পড়ছে। চারপাশে ভোরের নরম আলো, দূরে কোথাও নাম না জানা পাখির ডাক।
নদী হঠাৎ শুভর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“আচ্ছা শুভ, তুমি সাঁতার জানো?”
শুভ মাথা নেড়ে শান্ত গলায় বললো,
“না, জানি না।”
নদী চোখ বড় বড় করে বললো,
“তাহলে নৌকা ডুবে গেলে কি করবে?”
শুভ একদৃষ্টিতে নদীর দিকে তাকিয়ে হেসে বললো,
“তুমি তো আছো, আমাকে বাঁচাবে।”
নদী সঙ্গে সঙ্গে মুখ বাঁকিয়ে বললো,
“আমিও তো সাঁতার জানি না।”
শুভ ভান করে গম্ভীর হয়ে বললো,
“তাহলে থাক, নৌকায় ওঠার দরকার নেই।”
নদী হেসে ফেললো।
“কেন? ডুবে গেলে প্রেমিকার হাত ধরেই ডুবে যাবে।”
কথাটা শুনে শুভ কিছুক্ষণ চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইলো। মায়াভরা মুখটা যেন ভোরের আলোয় আরও সুন্দর লাগছিল।








Comments
Post a Comment