নদী

 লেখকঃ সীমান্ত সরকার


( পর্ব ০১)

কেরোসিনে ভেজা সামিয়ানায় দিয়াশলাইয়ের কাঠিটা ছোঁয়ানোর সঙ্গে সঙ্গেই আগুন যেন ক্ষুধার্ত জন্তুর মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। কয়েক সেকেন্ডের জন্য পুরো বিয়েবাড়ি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। সবাই মাথা উঁচু করে তাকিয়ে দেখল, তাদের মাথার ওপর লাল আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছে।

তারপরই এক বিকট চিৎকার রাতটাকে কাঁপিয়ে দিল।

“আগুন! আগুন লাগছে রে! পানি আন! কেউ পানি ঢাল!”

মুহূর্তের মধ্যেই আনন্দের আসর পরিণত হলো মৃত্যুভয়ে ভরা এক দৌড়ঝাঁপে। যে যেদিকে পারছে ছুটছে। কারো গায়ের সঙ্গে কারো ধাক্কা লাগছে, কেউ পড়ে যাচ্ছে, কেউ চিৎকার করতে করতে নিজের মানুষকে খুঁজছে। কিন্তু আগুনের সামনে তখন আর কোনো সম্পর্কের মূল্য নেই। সবাই শুধু নিজের প্রাণটা বাঁচাতে ব্যস্ত।

মরিচ বাতির আগুন সামিয়ানার কাপড়ে ছড়িয়ে পড়তেই শিখাগুলো আরও ভয়ংকর হয়ে উঠল। আগুন যেন পুরো প্যান্ডেলটাকে গিলে খেতে চাইছে। ধোঁয়ায় চারপাশ অন্ধকার হয়ে গেছে। নিঃশ্বাস নেওয়াও কঠিন। এক দিকে মরিচ বাতি টিপ টিপ করে ঝলছে পাছে লাল আগুনের ছোয়া। যেন আগুন উৎসবে মেতেছে পুরো প্যান্ডেল। 

বর আর কনে কিছুক্ষণ আগেও পাশাপাশি বসে কবুল বলেছিল, সারাজীবন একসঙ্গে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। অথচ বিপদ আসতেই সব প্রতিশ্রুতি আগুনের তাপে গলে গেল। নববধূ নদী তখন আতঙ্কে কাঁপছে। ভারী শাড়ি সামলে উঠে দাঁড়াতেও পারছে না। আর সেই সময় বর একবারও পিছনে না তাকিয়ে মানুষের ভিড় ঠেলে বাইরে বেরিয়ে গেল। নদী শুধু অসহায়ের মতো তাকিয়ে রইল তার চলে যাওয়ার দিকে।

প্যান্ডেলের এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিল শুভ। তার শার্টের একপাশে আগুনের দগদগে ছাপ। ছিঁড়ে ঝুলে থাকা বৈদ্যুতিক তার হাতে পেঁচানো। যেন পুরো আগুনের নরকটার মাঝেও ছেলেটার ভেতরে কোনো ভয় নেই। সে শান্তভাবে একটা সিগারেট ঠোঁটে চেপে ধরল। তারপর জ্বলতে থাকা তারের আগুনে সেটা হাতে পেচিয়ে নিলো, পুরো হাত সাদা আলো ঝলমল করতে থাকলো। তারের আগায় নীল আগুনে সিগারেট ধরালো।

গভীর একটা টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ল নাক দিয়ে।

তারপর ধীরে ধীরে রাস্তার দিকে হাঁটতে শুরু করল। দুই হাত দুই পাশে ছড়িয়ে দিল, মাথা তুলে তাকাল কালো আকাশের দিকে। চোখ দুটো বন্ধ। হাঁটছে যেন মাতাল কেউ, অথবা এমন একজন মানুষ যার ভেতরে বহুদিন ধরে জমে থাকা আগুন আজ বাইরে বের হওয়ার রাস্তা পেয়েছে।

চারপাশের মানুষ আতঙ্কে চিৎকার করছে, দৌড়াচ্ছে। কিন্তু কারও বুঝতে বাকি রইল না, এই আগুনের পেছনে একটাই নাম।

শুভ।

মাথার পেছনে হঠাৎই এক প্রচণ্ড আঘাত এসে লাগল। যেন পুরো মাথার ভেতরটা কেঁপে উঠল। শুভ এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়াল।

ধীরে ধীরে পেছন ফিরে তাকাতেই সে দেখল, নদীর ভাই সিরাজ আর কয়েকজন লোক হাতে বাঁশ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের চোখে আগুনের থেকেও বেশি আগুন রাগ, ক্ষোভ আর প্রতিশোধের তীব্রতা।শুভ কিছু বলার আগেই আরেকটা আঘাত এসে পড়ল। এবার শরীরটা কেমন ঝাঁকুনি খেয়ে উঠল। চারপাশের শব্দগুলো হঠাৎ দূরে সরে যেতে লাগল। আগুনের লেলিহান শিখা, মানুষের চিৎকার, দৌড়াদৌড়ি সবকিছু যেন ধীরে ধীরে অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তার চোখের সামনে অন্ধকার নেমে এলো। মাথা ঘুরে উঠল। শরীর আর তাকে ধরে রাখতে পারল না।  চোখের সামনে সবকিছু অন্ধকার হয়ে গেল। শরীরটা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো সে। এরপর আর কিছু মনে রইলো না।


চোখ খুলতেই শুভ বুঝতে পারলো সে একটা জেলের সেলের ভেতরে পড়ে আছে। মাথাটা প্রচণ্ড ভার লাগছে। পাশে ছড়িয়ে আছে শুকিয়ে যাওয়া বমি, আর নিজের গা থেকেই ভেসে আসছে তীব্র মদের গন্ধ। পুরো শরীর জ্বালা করছে, বিশেষ করে মাথার পেছনের জায়গাটা। বাইরে পুলিশ স্টেশনের কোলাহল ভেসে আসছে। কোথাও কেউ জোরে কথা বলছে, কোথাও কম্পিউটারের কিবোর্ডে টুকটুক শব্দ উঠছে। হঠাৎ এক পুলিশ হেসে বলে উঠলো,

“স্যার, নবাবজাদার ঘুম ভাঙছে। কাল রাতে পুরো বিয়েবাড়িতে আগুন লাগিয়ে দিয়ে এখন আরামে ঘুমাচ্ছে!”

কথাটা শুনে শুভর বুকের ভেতরটা ধক করে উঠলো। ধীরে ধীরে আগের রাতের ঘটনাগুলো মনে পড়তে শুরু করলো। আগুন, চিৎকার, দৌড়াদৌড়ি তারপর অন্ধকার। সব মিলিয়ে বুঝতে আর বাকি রইলো না। নদীর পরিবারই তাকে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে।শুভ ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টানলো। মনে মনে তীব্র ঘৃণায় গালি দিলো,

“শালারা প্রেমিকাকে তুলে দিলো অন্যের হাতে, আর আমাকে তুলে দিলো পুলিশের হাতে।”

তার সেই মুচকি হাসিটা ইন্সপেক্টরের চোখ এড়ালো না। মুহূর্তেই লোকটা রেগে গিয়ে হাতে থাকা লাঠি দিয়ে শুভর পিঠে পরপর কয়েকটা আঘাত বসিয়ে দিলো।

“হাসিস কেন রে? খুব মজা লাগতেছে?”

বাংলাদেশের দণ্ডবিধি অনুযায়ী শুভর বিরুদ্ধে গুরুতর মামলা হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে কমপক্ষে দশ বছরের সাজা হতে পারে। থানার ভেতর সবাই তাকে এমনভাবে দেখছিল, যেন সে ভয়ংকর কোনো অপরাধী।

কিছুক্ষণ পর এক মধ্যবয়সী উকিল এসে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঠিক করলেন। শুভ বুঝতে পারলো, তার বাবাই তাকে জামিন করিয়েছেন। আজিজ চৌধুরী শহরের পরিচিত একজন ব্যবসায়ী। টাকার অভাব তার কোনোদিন ছিল না, প্রভাব-প্রতিপত্তিরও কমতি নেই। কিন্তু ছেলের জন্য এই প্রথম তাকে থানায় আসতে হলো। তবু তিনি শুভর দিকে একবারও তাকালেন না।চোখেমুখে ছিল অপমান আর ক্লান্তি। যেন এক রাতেই মানুষটা অনেকটা বুড়িয়ে গেছেন। ছেলের এমন কাণ্ডে আজ তার মাথা হেঁট হয়ে গেছে সমাজের কাছে।

সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে আজিজ চৌধুরী একাই গাড়িতে উঠে চলে গেলেন। শুভকে পর্যন্ত গাড়িতে উঠতে দিলেন না। অথচ তিনি জামিন না করালে এতক্ষণে পুলিশ তাকে কোর্টে চালান দিয়ে জেলে পাঠিয়ে দিতো।

থানার সামনে কিছুক্ষণ নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইলো শুভ। তারপর খালি পায়ে, ময়লা কাপড় গায়ে ধীরে ধীরে হাঁটা শুরু করলো বাড়ির দিকে। রাস্তার মানুষ কৌতূহলী চোখে তাকাচ্ছিল। কেউ চিনে ফেলছিল, কেউ ফিসফিস করে কথা বলছিল। কিন্তু সেদিকে তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। মাথার ভেতর শুধু একটা শূন্যতা। 

মা মারা গিয়েছিলেন শুভ ছোট থাকতেই। ছেলেকে যেন সৎমায়ের অবহেলায় বড় হতে না হয়, সেই চিন্তায় আজিজ চৌধুরী আর দ্বিতীয় বিয়ে করেননি। নিজের ব্যস্ত জীবনের মাঝেও যতটা সম্ভব আদর-যত্ন দিয়ে মানুষ করেছেন তাকে। ভদ্র, শান্ত আর নম্র স্বভাবের ছেলে হিসেবেই সবাই চিনতো শুভকে। সেই ছেলেটাই কীভাবে এত বড় অপরাধ করে ফেললো, সেটা আজিজ চৌধুরী কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছিলেন না।

বাসায় ফিরেই শুভ সোজা বাথরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলো। কাঁপা হাতে শাওয়ারটা ছেড়ে দিতেই ঠান্ডা পানি ঝরতে শুরু করলো তার শরীরের ওপর। গা বেয়ে একের পর এক জলের ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছে, কিন্তু ভেতরের আগুনটাকে কিছুতেই নিভাতে পারছে না। মাথাটা এখনও ঝিমঝিম করছে। চোখ বন্ধ করতেই পুরোনো স্মৃতিগুলো একে একে ভেসে উঠতে লাগলো। নদীর হাসি, অভিমান, হাত ধরে হাঁটা সবকিছু যেন এখনও খুব কাছে
ই আছে। আবেগে ভরা মনটা কিছুতেই প্রিয় মানুষটার কথা ভুলতে পারছে না।

হঠাৎ শুভ দুহাত দিয়ে বাথরুমের দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়ালো। দুই হাত ছড়িয়ে বুকটা চেপে ধরলো দেয়ালের সঙ্গে, যেন কাউকে জড়িয়ে ধরার মরিয়া চেষ্টা করছে। শাওয়ারের পানি তখনও তার পিঠ বেয়ে ঝরে পড়ছে, ঠিক বৃষ্টির মতো। একসময় আর নিজেকে সামলাতে পারলো না সে। বুক ফেটে কান্না বেরিয়ে এলো। ডুকরে কেঁদে উঠলো শুভ। চোখের সামনে শুধু ভেসে উঠছে কিছু মধুর স্মৃতি, আর সেই স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা নির্মম আঘাত।

(পর্ব ০২)

মা হারানোর কষ্টটা শুভ খুব ছোটবেলাতেই পেয়েছিল। এতটাই ছোট ছিল যে, মায়ের মুখটাও ঠিকমতো মনে নেই তার। ঘরের দেয়ালে টাঙানো পুরোনো সাদা-কালো একটা ছবি দেখিয়েই একদিন বাবা বলেছিলেন,
“ইনিই তোমার মা।”

সেই ছবির মানুষটার দিকেই অনেকক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে ছিল শুভ। তারপর থেকে মায়ের স্মৃতি বলতে ওই ছবিটাই তার কাছে সবকিছু।

ব্যবসার কাজে আজিজ চৌধুরী বেশিরভাগ সময় বাইরে থাকতেন। তাই শুভ বড় হয়েছে তার দাদী রাবেয়া বেগমের স্নেহ আর শাসনের ভেতর দিয়ে। বৃদ্ধা মহিলার পুরো পৃথিবীই যেন ছিল এই নাতিকে ঘিরে। ছোটবেলা থেকেই শুভ অন্যরকম ছিল। শান্ত, ভদ্র আর চুপচাপ স্বভাবের। অকারণে কারও সঙ্গে মিশতো না। বন্ধু বলতে তেমন কেউ ছিল না তার। উপন্যাস, সাহিত্য, কবিতা আর বিজ্ঞানের বই নিয়েই ছিল তার আলাদা একটা জগৎ।ক্লাসের অনেকেই তাকে মজা করে “বইয়ের পোকা” বলতো। কারণ টিফিন টাইম হোক কিংবা ক্লাসের ফাঁকা সময়, শুভকে সবসময় কোনো না কোনো বইয়ে ডুবে থাকতে দেখা যেত।

তবে ভদ্র আর নির্লিপ্ত এই ছেলেটার মনেও যে ভালোবাসা ছিল না, তা নয়। সে নিঃশব্দে ভালোবেসে ফেলেছিল ক্লাসের সবচেয়ে চঞ্চল মেয়েটাকে।

নদী।

নামের মতোই মেয়েটার উপস্থিতিতেও ছিল অদ্ভুত এক প্রবাহ। মুখভরা কোমল মায়া, চোখে অদ্ভুত উদারতা। তাকে দেখলে মনে হতো, পৃথিবীর সবচেয়ে রাগী মানুষটাও হয়তো সেই চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত হয়ে যাবে। কিন্তু চেহারার সঙ্গে স্বভাবের মিল ছিল না একদমই।নদী ছিল ভীষণ চঞ্চল। সারাক্ষণ হৈচৈ, দুষ্টুমি আর গল্পে মেতে থাকতো। পড়াশোনায় মনোযোগ ছিল খুবই কম। ক্লাসের এক বেঞ্চ থেকে আরেক বেঞ্চে ঘুরে বেড়ানো, বন্ধুদের সঙ্গে হেসে লুটোপুটি খাওয়া এসব নিয়েই তার দিন কেটে যেত।


ভালোবাসার নিজস্ব একটা স্রোত আছে। ঠিক নদীর পানির মতো। ধীরে ধীরে, অজান্তেই সেটা মানুষকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় অন্য এক জগতে। আর সেই স্রোতের নামই ছিল নদী। নদী আসার পর থেকেই শুভর জীবনটা বদলাতে শুরু করেছিল। বাপের অঢেল টাকা থাকলেও শুভর চলাফেরায় ছিল পুরোনো দিনের ছাপ। দাদী যেভাবে মানুষ করেছেন, সেভাবেই বড় হয়েছে সে। দামি ব্র্যান্ডের পোশাক গায়েও কেমন বেমানান লাগতো। কারণ পোশাক বাছাই থেকে শুরু করে সবকিছুই করতেন দাদী রাবেয়া বেগম। এমনকি চুল কাটাও।

দাদী ছিলেন পুরোনো বাংলা-হিন্দি সিনেমার ভীষণ ভক্ত, বিশেষ করে দিলীপ কুমারের। তাই শুভর চুলও কাটানো হতো সেই পুরোনো স্টাইলে। ক্লাসের ছেলেরা এটা নিয়ে হাসাহাসিও করতো মাঝে মাঝে। কিন্তু নদী যেন ধীরে ধীরে শুভকে নতুন একটা পৃথিবীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলো। তার পোশাকে পরিবর্তন এলো, চলাফেরায় আত্মবিশ্বাস বাড়লো। আগের সেই গুটিয়ে থাকা ছেলেটা ধীরে ধীরে নিজের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসতে লাগলো। যে শুভ কোনোদিন বাবার কাছে হাতখরচ চায়নি, প্রয়োজন হলে শুধু দাদীর কাছ থেকেই টাকা নিয়েছে, সেই শুভ এখন প্রায়ই বাবার কাছ থেকে টাকা নিতে শুরু করলো।আজিজ চৌধুরী ভেবেছিলেন, ছেলে বড় হচ্ছে, খরচও বাড়ছে। তাই তিনি বিষয়টা নিয়ে বেশি ভাবেননি। বুঝতেও পারেননি, শুভ কোথায় আর কীভাবে এত টাকা খরচ করছে। নদীর বন্ধুরাই একসময় শুভর বন্ধু হয়ে গেল। যদিও তাদের অনেকেই শুভর টাকার কারণেই কাছে ঘেঁষতো, তবু শুভ সেটা বুঝেও না বোঝার ভান করতো।

আর নদী?

সে সত্যিই শুভকে ভালোবাসতে শুরু করেছিল।

অন্তত শুভ তাই বিশ্বাস করতো।

ভালোবাসা সত্যিই সুন্দর। ঠিক নদীর জলের মতো শান্ত, গভীর, আবার কখনও ভীষণ উচ্ছ্বসিত।

খুব ভোরে, যখন চারপাশে কুয়াশার আস্তরণ পড়ে ছিল, শুভ একটা রিকশা নিয়ে অপেক্ষা করছিল নদীদের বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে। বুকের ভেতর অকারণ উত্তেজনা, হাত-পা ঠান্ডায় জমে গেলেও কপালে হালকা ঘাম। কিছুক্ষণ পর চাদরে মুখ ঢেকে নদী এসে দাঁড়ালো তার সামনে। চারপাশে একবার তাকিয়ে দ্রুত রিকশায় উঠে বসল। শুভর বুকের ধুকপুকানি যেন আরও বেড়ে গেল। রিকশা ধীরে ধীরে ফাঁকা রাস্তা পেরিয়ে ব্রিজের কাছে এসে থামলো। দুজন নেমে নদীর ধারে হাঁটতে শুরু করলো। ভোরের ঠান্ডা বাতাসে নদীর পানি কাঁপছিল হালকা ঢেউয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ নদী শুভর হাতটা ধরলো। নরম, ঠান্ডা সেই স্পর্শে শুভর পুরো শরীর কেঁপে উঠলো। এই শীতের ভোরেও তার হাতের তালু ঘামে ভিজে গেল।

নদী সেটা টের পেয়েই মুচকি হেসে বললো,
“কি ব্যাপার? এই প্রথম কোনো মেয়ের হাত ধরলে নাকি?”

শুভ মাথা নিচু করে ফেললো। ঠোঁটের কোণে লাজুক একটা হাসি ফুটে উঠলো। কিছু না বলেও সেই হাসিতেই উত্তর দিয়ে দিলো সে। নদী তখন শুভর মুখের দিকে তাকিয়ে হো হো করে হেসে উঠলো। সেই হাসির শব্দে যেন ভোরের নিস্তব্ধতাও মিষ্টি হয়ে উঠলো। 

ঘাটে বাঁধা ছোট্ট ডিঙি নৌকাটায় গিয়ে পাশাপাশি বসলো দুজন। নদীর পানি তখন ধীরে ধীরে নৌকার গায়ে আছড়ে পড়ছে। চারপাশে ভোরের নরম আলো, দূরে কোথাও নাম না জানা পাখির ডাক।

নদী হঠাৎ শুভর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“আচ্ছা শুভ, তুমি সাঁতার জানো?”

শুভ মাথা নেড়ে শান্ত গলায় বললো,

“না, জানি না।”

নদী চোখ বড় বড় করে বললো,
“তাহলে নৌকা ডুবে গেলে কি করবে?”

শুভ একদৃষ্টিতে নদীর দিকে তাকিয়ে হেসে বললো,
“তুমি তো আছো, আমাকে বাঁচাবে।”

নদী সঙ্গে সঙ্গে মুখ বাঁকিয়ে বললো,
“আমিও তো সাঁতার জানি না।”

শুভ ভান করে গম্ভীর হয়ে বললো,
“তাহলে থাক, নৌকায় ওঠার দরকার নেই।”

নদী হেসে ফেললো।
“কেন? ডুবে গেলে প্রেমিকার হাত ধরেই ডুবে যাবে।”

কথাটা শুনে শুভ কিছুক্ষণ চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইলো। মায়াভরা মুখটা যেন ভোরের আলোয় আরও সুন্দর লাগছিল।

রাত গভীর হতে থাকলো। বাইরে ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ছে। ঘরের ভেতর আধো অন্ধকারে শুভর নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠছিল। চোখ দুটো বন্ধ, কিন্তু ঘুম আসছিল না। বুকের ভেতর অদ্ভুত এক শূন্যতা তাকে কুরে কুরে খাচ্ছিল।

গোসল শেষ করে শুভ দেখলো দাদি খাবার টেবিলে বসে আছে। মুখে চিন্তার ভাঁজ, চোখে জ্বল। শুভর মুখের দিকে তাকিয়ে দাদি হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো,

 “বাছা রে, তুই কি হয়ে গেলি! তোর ঘরে বাক্সের পর বাক্স সিগারেট। গা থেকে মদের গন্ধ পাই। বোতলগুলো পড়ে আছে খাটের নিচে। আমার আদরের নাতিটাকে মেয়েটা ধ্বংস করে দিলো রে...…”

ভাতের প্লেট টা নিয়ে শুভ ডাইনিং টেবিল থেকে রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলো।

খাওয়া শেষ করে সিগারেট ধরালো, তারপর হাতে সেলাইনের পাইপ পেঁচিয়ে ঢুকিয়ে দিলো সিরিঞ্জ। তারপর বিছানায় হেলান দিয়ে ধপাস করে শুয়ে পড়লো।

(পর্ব ০৩)


বাবার ক্রেডিট কার্ডের পাসওয়ার্ড শুভর জানা ছিলো না। তবে সে অনুমান করেছিলো, তার বাবা অবশ্যই তার জন্ম তারিখ দিয়েই সব পাসওয়ার্ড সেট করে।

সে নদীকে নিয়ে শপিং করতে বের হয়। নদী বায়না করেছিলো ঈদের শপিং করে দিতে। প্রায় ৪৫ হাজার টাকার একাই শপিং করে নেয় নদী। আর একটা কমদামি পাঞ্জাবি উপহার করলো শুভকে। শুভ সেটা দাম দিয়ে নয়, বরং প্রিয় মানুষের কাছ থেকে পাওয়া দামি উপহার হিসেবেই গ্রহণ করলো। পাঞ্জাবিটা অবশ্য সুন্দর ছিলো। ঈদের নামাজটা শুভ সেই পাঞ্জাবি পরেই করলো।

নদীর ফোনটার ডিসপ্লে নষ্ট হয়ে গিয়েছে শুনে শুভ নতুন আইফোন কিনে দিলো। নদী তাকে বারণ করলো খরচ না করতে। তবে নদীর এই কথায় শুভ ভেবে নিলো নদী লোভী না।তবে প্রতিনিয়ত নদী তার নানান অসুবিধার কথা বলতো, শুভর কাছে মুখ খুলে টাকা চাইতো না। শুভই জোর করে তাকে নানান ভাবে সাহায্য করতো।

লোভ সবসময় সরাসরি প্রকাশ পায় না যে ‘আমার এটা লাগবে, ওটা লাগবে’। অনেক সময় নিজের পরিস্থিতি বারবার অন্যের সামনে তুলে ধরাও এক ধরনের লোভ হতে পারে। কারণ সে জানে, তার কষ্টের কথা শুনলেই সে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবে।

ঈদের দ্বিতীয় দিন নদী আর শুভর দেখা হলো। তারা সারাদিন একসাথে ঘুরে বেড়ালো, হাসি-আড্ডায় সময় কাটালো। বিকেলের দিকে তারা একটি রেস্টুরেন্টে খাওয়া শেষ করে যখন সন্ধ্যার দিকে বিদায় নিলো, শুভ রিকশায় উঠে বাড়ির পথে রওনা দিলো।

কিছুদূর যাওয়ার পর হঠাৎ শুভর মনে হলো, নদীকে ঈদের সালামি দেওয়া হয়নি। এই ভাবনায় সে রিকশা ঘুরিয়ে আবার আগের জায়গায় ফিরে এলো।

কিন্তু সেখানে পৌঁছে সে যা দেখলো, তাতে সে কিছুটা থমকে গেলো। নদী একটি ছেলের মোটরবাইকে বসে কোথাও চলে যাচ্ছে। নদী শুভকে দেখেনি, কিন্তু শুভ স্পষ্টই নদীকে দেখলো। ছেলেটি নদীর পরিবারের কেউ নয় এটা শুভর জানা ছিল। তবে সে নিজেকে বোঝালো, হয়তো সে কোনো আত্মীয় বা পরিচিতই হবে। এই ভেবে নিজের মনকে শান্ত করে শুভ ধীরে ধীরে বাড়ির পথে ফিরে গেলো।

২০ বছর পর ফুফাতো ভাই বিদেশ থেকে ফিরছে, বাড়িতে সাজ সাজ রব। ফুফার বিশেষ অনুরোধে শুভকে যেতেই হলো। শুভ এমনিতে লোকসমাগম এড়িয়ে চলে, নিজের বই আর চশমার জগতেই তার স্বাচ্ছন্দ্য। কিন্তু পারিবারিক সম্পর্ক বলে কথা, তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও শহরের নামী এক কনভেনশন সেন্টারে শুভ উপস্থিত হলো।

রিসিপশনে শুভকে সবাই বেশ গুরুত্ব দিয়ে গ্রহণ করে নিলো। শহরের অন্যতম ধনী পরিবারের ছেলে হিসেবে শুভকে নিয়ে আত্মীয়দের মধ্যে কানাকানিও কম ছিল না। কিন্তু শুভর মন পড়ে ছিল তার প্রেমিকা নদীর কাছে। মোবাইলটা হাতে নিয়ে সে ভাবছিল নদীকে একটা মেসেজ দিবে কি না।

ঠিক তখনই আসর জুড়ে এক চাঞ্চল্য শুরু হলো। কনে আসছে। শুভ কৌতূহল নিয়ে তাকালো। মেকআপের ভারী প্রলেপে মোড়ানো কনেকে দেখে শুভর বুকটা একবার ধক করে উঠল। এই হাঁটার ভঙ্গি, এই অবয়ব সবই যে তার অতি পরিচিত। পরক্ষণেই সে নিজের মনকে সান্ত্বনা দিল, ‘নদী এখানে আসবে কেন? তার তো বাড়িতে থাকার কথা।’

সন্দেহ দূর করতে শুভ পাশে বসা একজনকে নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল, “ভাইয়া, মেয়েটির নাম কী?” উত্তর এল, “নাম নদী, বেশ গুণী মেয়ে।”

শুভর পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে গেল। ভালো করে খেয়াল করে দেখল, প্যান্ডেলের এক কোণায় তাদের কলেজের সব বন্ধুরা বসে হাসাহাসি করছে। যে মানুষটাকে সে সবটুকু দিয়ে বিশ্বাস করেছিল, আজ সেই মানুষটিই তার ফুফাতো ভাইয়ের বাগদত্তা। শুভ আর এক মুহূর্ত সেখানে থাকতে পারল না। দ্রুত পায়ে হলঘর থেকে বেরিয়ে এল।

বাইরে তখন ঝুম বৃষ্টি। বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা যেন শুভর তপ্ত হৃদয়ে তীরের মতো বিঁধছে। বৃষ্টির সাথে মিশে তার চোখের জল গাল বেয়ে পড়ছে। হঠাৎ পাশে এসে দাঁড়াল কনা নদীর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বান্ধবী।কনা শুভর দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলল, “শুভ, বৃষ্টিতে ভিজে লাভ নেই। নদী এমনই। তুই আসলে গভীরতা না জেনেই নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিস। ওর বয়ফ্রেন্ডের অভাব নেই রে।

শুভ চশমাটা মুছে শূন্য দৃষ্টিতে কনার দিকে তাকালো। কনা আবার বলতে শুরু করল, “তোর মতো একটা সহজ-সরল চশমিশ ছেলেকে সে যে কেন ভালোবেসেছিল জানি না। আসলে তোর টাকা আর হাতখরচ জোগানোর ক্ষমতাটাই ওর কাছে আসল ছিল। ভালোবাসাটা ছিল শুধু একটা নিখুঁত অভিনয়।

বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে কনার কথাগুলো শুভর কানে বাজতে লাগল। যে আংটি বদল নিয়ে বাড়ির সবাই উৎসব করছে, সেই আংটিটা আসলে শুভর বিশ্বাসের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিয়েছে। শুভ বুঝতে পারল, কিছু নদী শান্ত মনে হলেও তাদের তলে লুকানো থাকে ভয়ঙ্কর চোরাবালি।


পরদিন সকালে শুভ অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নিয়ে নদীকে ফোন করল। সে শুধু জানতে চেয়েছিল, কেন নদী তার সাথে এমন একটা নিষ্ঠুর খেলা খেলল। কিন্তু নদীর কণ্ঠে কোনো অনুশোচনা ছিল না, বরং ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে এল এক অবজ্ঞার হাসি। নদী খুব নির্লিপ্তভাবে বলল, “প্রেমই তো করেছি, এতে এত আবেগপ্রবণ হওয়ার কী আছে? এই যুগে প্রেম হয় একজনের সাথে, আর বিয়ে হয় সামর্থ্যবান অন্য একজনের সাথে।” শুভ বারবার তাদের কাটানো সময়ের দোহাই দিল, অনুরোধ করল অন্তত একবার সবটা ভেবে দেখতে, কিন্তু নদী কোনো কথাই কানে তুলল না। উল্টো সে শুভকে সব জায়গা থেকে ব্লক করে দিল। 

নদী জানত না যে শুভ আসলে তার হবু বরের আত্মীয় হবে। যখন সে জানতে পারল শুভ তার হবু বরের মামাতো ভাই, তখন তার মনে সামান্য আফসোস হলো তবে সেটা ভালোবাসার জন্য নয়। তার আফসোস হলো এই ভেবে যে, শুভর কাছ থেকে হাতখরচ হিসেবে আর টাকা হাতিয়ে নেওয়া এখন আর সম্ভব হবে না। তার ওপর এই পরিচয় জানাজানি হলে তার স্বপ্নের বিয়েটা ভেঙে যাওয়ার ভয়ও ছিল। নদীর মূল লক্ষ্য ছিল শুভর ফুফাতো ভাইকে বিয়ে করা, কারণ সে আমেরিকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করে। নদী স্বপ্ন দেখেছিল একে বিয়ে করে আরাম-আয়েশে বিদেশের মাটিতে জীবন কাটাবে।

এদিকে শুভ যেন নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলেছে। সে প্রতিদিন নানা উপায়ে নদীকে বোঝানোর চেষ্টা করতে লাগল যে তাকে সে কতটা গভীরভাবে ভালোবাসে। শুভর এই আকুতি নদীর কাছে ছিল কেবল এক বিরক্তিকর উপদ্রব। নদী শুভকে পুরোপুরি এড়িয়ে চলতে শুরু করল, যেন তাদের মধ্যে কোনোদিন কোনো সম্পর্কই ছিল না। শুভর ধনী পরিচয় বা তার নিখাদ ভালোবাসা কোনো কিছুই নদীর উচ্চাকাঙ্ক্ষার সামনে টেকেনি।


কলেজের শেষ পরীক্ষাটা শেষ হওয়ার পর চারপাশটা যখন ক্রমশ ফাঁকা হয়ে আসছিল, শুভর বুকের ভেতরটা তখন হাহাকার করে উঠছিল। ক্লাসের নীরবতা যেন তার একাকীত্বকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছিল। সবার সামনেই একসময় নিজেকে ধরে রাখতে পারল না শুভ; নদীর পা ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ল সে। তার আকুতি ছিল একটাই নদী যেন তাকে ছেড়ে না যায়। সে নদীকে কথা দিয়েছিল, তার জন্য পৃথিবীর সব সুখ এনে দেবে। কিন্তু নদীর চোখে তখন ভালোবাসার বদলে কেবল বিরক্তি আর অবজ্ঞা।

নদী পরিষ্কার জানিয়ে দিল, তার পরিবার অন্য এক ছেলেকে পছন্দ করেছে এবং সে পরিবারের অবাধ্য হতে পারবে না। ক্লাসের বাকি বন্ধুদের কাছে শুভ হাসির পাত্রে পরিণত হলেও নদী তাকে এড়িয়ে চলতে শুরু করল এক চরম উদাসীনতায়।

কোনো উপায় না পেয়ে শুভ তার ফুপাতো ভাইয়ের কাছে মনের সব কথা খুলে বলল। সে ভেবেছিল বড় ভাই হিসেবে তিনি হয়তো কোনো পথ দেখাবেন। কিন্তু ভাই শুভর আবেগটাকে কেবল 'ছেলেমানুষি' বলে উড়িয়ে দিলেন। আসলে পর্দার আড়ালে অন্য এক সত্য লুকিয়ে ছিল নদী অসম্ভব সুন্দরী একটি মেয়ে, আর শুভর সেই ফুপাতো ভাই কোনোভাবেই এই মেয়েকে নিজের জীবন থেকে হাতছাড়া করতে রাজি ছিলেন না। শুভর অসহায়ত্ব তার কাছে ছিল নিতান্তই তুচ্ছ।

শুভর এই চরম মানসিক বিপর্যয়ের সুযোগ নিল তাদেরই সহপাঠী রাসেল। ক্লাসে রাসেল মাদকসেবী হিসেবে পরিচিত হলেও, এই কঠিন সময়ে সে-ই শুভর পাশে এসে দাঁড়াল। যেখানে অন্য সবাই শুভকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছিল, সেখানে রাসেল তাকে গুরুত্ব দিতে শুরু করল। সে শুভর প্রতিটি কথা মন দিয়ে শুনত, তাকে সান্ত্বনা দিত। শুভ ধীরে ধীরে রাসেলকে নিজের সবচেয়ে কাছের বন্ধু ভাবতে শুরু করল। রাতের অন্ধকারে যখন কান্নায় শুভর দম বন্ধ হয়ে আসত, সে রাসেলকে কল দিয়ে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদত। রাসেলও পরম মমতায় তাকে আগলে রাখার অভিনয় করে যেত। শুভ বুঝতেও পারেনি, তার এই চরম দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তাকে কোন অন্ধকার জগতের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে রাসেল।

হতাশার চরম মুহূর্তে মানুষ যখন নিজেকে হারিয়ে ফেলে, তখন ভুল পথগুলোই সবচেয়ে সহজ মনে হয়। নদীর বিচ্ছেদ এবং ফুপাতো ভাইয়ের উদাসীনতা শুভকে মানসিকভাবে পঙ্গু করে দিয়েছিল। এই সুযোগটাই কাজে লাগাল রাসেল। শুরুতে সান্ত্বনা দিলেও ধীরে ধীরে সে শুভর হাতে তুলে দিল বিষাক্ত ধোঁয়া আর নেশার সরঞ্জাম। শুভর কাছে মনে হলো, নেশার ঘোরে থাকলেই কেবল নদীর অবজ্ঞা আর জীবনের এই অসহ্য যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

এক সময়ের মেধাবী শান্ত ছেলেটা এখন রাতভর রাসেলের আস্তানায় পড়ে থাকে। মাঝরাতে যখন নেশার ঘোর কিছুটা কাটে, সে শিশুর মতো ফুপিয়ে কাঁদে। তার রুমজুড়ে এখন সিগারেটের অবশিষ্টাংশ আর মদের বোতলের ছড়াছড়ি। যতক্ষণ নেশায় ডুবে থাকে নদীকে ভুলে থাকে, নেশা কেটে গেলেই আবার সব মাথা চাড়া দিয়ে উঠে। তাই নেশাকেই সে অতি আপন করে নিয়েছে। 

শুভর বাবা নিজের একমাত্র সন্তানের এই করুণ পরিণতি দেখে দিশেহারা হয়ে পড়লেন। তিনি শহর ও সমাজের একজন প্রভাবশালী মানুষ হওয়া সত্ত্বেও নিজের ঘরেই অসহায় হয়ে পড়লেন। শুভকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরাতে এবং তার একাকীত্ব কাটাতে তিনি শেষ চেষ্টা হিসেবে নদীর বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব পাঠালেন। 

নদীর পরিবার সাধারণ হলেও শুভর বাবার মতো একজন ধনাঢ্য মানুষের পক্ষ থেকে প্রস্তাব আসায় তারা প্রথমে বেশ অবাক এবং খুশি হয়েছিল। কিন্তু সেই আনন্দ স্থায়ী হলো না। চারদিকে রটে গেছে শুভর বর্তমান অবস্থার কথা সে এখন নেশায় আসক্ত, দিনের বেশির ভাগ সময় মাদকসেবীদের সাথে কাটায়।

নদীর বাবা-মা সরাসরি প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে বললেন:

"টাকা-পয়সা বা আভিজাত্য দিয়ে তো আর জীবন চলে না। আমরা আমাদের মেয়েকে কোনো মাদকাসক্ত ছেলের হাতে তুলে দিতে পারি না।"

নদী নিজেও এখন শুভকে দেখে ঘৃণা আর করুণা মেশানো দৃষ্টিতে তাকায়। সে একবারও ভাবল না, এই ছেলেটার ধ্বংসের শুরুটা হয়েছিল তাকে হারানোর ভয় থেকেই। শুভ যে নদীর জন্য দুনিয়ার সব সুখ এনে দিতে চেয়েছিল, আজ সেই নদীর কারণেই সে দুনিয়ার সব অন্ধকার নিজের সঙ্গী করে নিয়েছে।

একদিকে পারিবারিক সম্মান ধুলোয় মিশছে, অন্যদিকে শুভ ক্রমেই তলিয়ে যাচ্ছে মৃত্যুর মুখে। সে জানলও না, যে ফুপাতো ভাইয়ের কাছে সে আশ্রয় চেয়েছিল, সেই ভাই-ই এখন তার ধ্বংসের নীরব দর্শক হয়ে নিজের স্বার্থ সিদ্ধি করছে। রাসেল আর মাদকের মায়াজালে আটকা পড়ে শুভ এখন এক জীবন্ত লাশ, যার কান্নার শব্দ শোনার মতো কেউ আর অবশিষ্ট নেই।

বাবার মুখে নদীর পরিবারের প্রত্যাখ্যানের কথা শুনে শুভর পায়ের নিচ থেকে যেন মাটি সরে গেল। নেশার ঘোর তখন কিছুটা কেটেছে, কিন্তু হৃদয়ের ক্ষতটা দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল। উন্মাদের মতো ঘর থেকে বেরিয়ে সে দৌড়ে গেল নদীদের বাড়ির দিকে। সমাজের সম্মান, বাবার আভিজাত্য সবকিছু তুচ্ছ করে সে নদীর বাবার পা জড়িয়ে ধরল।

গলা ফাটিয়ে কাঁদতে কাঁদতে শুভ বলতে লাগল, "চাচা, আমি কথা দিচ্ছি আমি সব ছেড়ে দেব। আমি আর নেশা করব না। শুধু একবার নদীকে আমার হতে দিন। নদী ছাড়া আমি বাঁচব না চাচা, আমাকে নদীকে দিন!"

শুভর এই অবস্থা দেখে তার নদীর বাবা অপমানে আর ক্ষোভে পাথর হয়ে গেলেন। তিনি চিৎকার করে বললেন, "এই মাতালটাকে এখান থেকে বের করে দাও! 

নদীর বাবাও কোনো মায়া দেখালেন না। নদীর বড় ভাই এসে শুভর শার্টের কলার চেপে ধরল এবং একরকম টেনে-হিঁচড়ে তাকে সদর দরজার বাইরে নিয়ে গেল। গেটের ওপাশে ছিটকে পড়েও শুভ থামল না। সে দরজায় করাঘাত করতে করতে চিৎকার করে ডাকতে লাগল:

নদী! একবার বাইরে আসো নদী! তোমার বাবাকে বোঝাও, আমি তোমাকে কতটা ভালোবাসি। আমি সব অন্ধকার পথ ছেড়ে দেব নদী, শুধু তুমি আমার পাশে থাকো। নদী, প্লিজ...

ভেতর থেকে কোনো সাড়া এল না। জানালার ওপাশে হয়তো নদী দাঁড়িয়ে ছিল, কিন্তু তার চোখে তখন ভালোবাসার চেয়ে ঘৃণা আর বিরক্তিই ছিল বেশি। সে ভাবল, যে ছেলে নিজের যত্ন নিতে পারে না, নেশায় ডুবে থাকে, সে তাকে কীভাবে সুখী করবে?

চারপাশের মানুষ ভিড় জমিয়ে শুভর এই করুণ দশা দেখছিল। কেউ সমবেদনা দেখাল না, বরং বিদ্রূপের হাসিতে ভরে উঠল চারপাশ। শুভর আহাজারি রাতের নিস্তব্ধতা চিরে দিচ্ছিল, কিন্তু সেই আর্তনাদ শোনার মতো কোনো হৃদয় সেখানে ছিল না।

সবাই যখন তাকে ত্যাগ করল, তখন দূর থেকে রাসেলের ছায়াটা আবার দৃশ্যমান হলো। সে এগিয়ে এসে শুভর কাঁধে হাত রাখল। শুভ যখন দেখল তার ভালোবাসার শেষ আশ্রয়টুকুও বন্ধ হয়ে গেছে, তখন সে আবার সেই ধ্বংসাত্মক বন্ধুত্বের বুকেই মাথা রাখল। পৃথিবী যাকে ফিরিয়ে দেয়, নেশার জগত তাকে দুহাত বাড়িয়ে গ্রহণ করে।

(পর্ব ০৪)


নদীর বিয়ের লগ্ন ঘনিয়ে এসেছে। কাল তার শুভ বিবাহ, কিন্তু শুভর জীবনে নেমে এসেছে নিকষ কালো অন্ধকার। শুভর ফুপাতো ভাই সচেতনভাবেই শুভর পরিবারকে নিমন্ত্রণ জানায়নি। অবশ্য দাওয়াত দিলেও শুভর বাবা নিজের মান সম্মান আর শুভর বর্তমান অবস্থার কথা চিন্তা করে সেখানে যেতেন না。 সমাজ এখন শুভকে ‘নষ্ট ছেলে’ হিসেবে চেনে, তাকে নিয়ে সবার মনে এক অজানা আতঙ্ক কখন সে উন্মত্ত হয়ে কোনো অঘটন ঘটিয়ে বসে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
গভীর রাতে, যখন চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে এল, শুভ একটি চাদর গায়ে জড়িয়ে অতি সাবধানে নদীর বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়াল বাড়ির সবাই তখন গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান শেষ করে গভীর ঘুমে মগ্ন এই সুযোগেরই অপেক্ষা করছিল শুভ। তার হাতে ছিল কেরোসিনের ক্যান। কোনো প্রকার শব্দ না করে সে পুরো বিয়ের প্যান্ডেল, শামিয়ানা আর সাজসজ্জার প্রতিটি কোণে কেরোসিন ছিটিয়ে দিল,সে নিশ্চিত করল যেন কোনো অংশই বাদ না পড়ে। শুভর এই পরিকল্পনায় ছিল এক ঠান্ডা মাথার কূটচাল। সে জানত যে সরাসরি আগুন দিলে ধরা পড়ার সম্ভাবনা বেশি, তাই সে এমনভাবে কেরোসিন ছিটিয়ে রাখল যেন তা কাপড়ের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে যায়। পরের দিন কড়া রোদের তাপে কেরোসিন শুকিয়ে তার তীব্র গন্ধ অনেকটাই কমে গেল।
দিনের আলোয় যখন মেহমানরা আসতে শুরু করল, কেউ কেউ হয়তো নাকে অদ্ভুত এক গন্ধ পাচ্ছিল। কিন্তু সাজানো প্যান্ডেলের জাঁকজমকের ভিড়ে কেউ কল্পনাও করতে পারেনি যে, তাদের মাথার ওপরের পুরো শামিয়ানাটি আসলে কেরোসিনে ভেজানো এক মরণফাঁদ। সবাই আনন্দে মত্ত, অথচ শুভর সাজানো এই ধ্বংসযজ্ঞ কেবল একটি আগুনের স্ফুলিঙ্গের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে।

ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে শুভ দেখল সেই ফ্রেমযেখানে খোদাই করা 'নদীর বিবাহ ফয়সালের সাথে'। দুজনের হাসিমুখের ছবিটা যেন তাকে উপহাস করছে। মাতাল চোখে সে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ, তারপর ঘৃণায় প্যান্টের চেইন খুলে প্রস্রাব করে দিল সেই আভিজাত্যের ফ্রেমে। মেয়েরা লজ্জায় মুখ লুকিয়ে ভেতরে পালালো, কিন্তু শুভর হাতের উদ্যত পিস্তল দেখে কারো সাহস হলো না টু শব্দটি করার।
বুক পকেট থেকে কেরোসিনে ভেজা দিয়াশলাই বের করে সে কাঠি জ্বালল। নিমিষেই ক্ষুধার্ত পশুর মতো আগুন গ্রাস করে নিল ডেকোরেশনের সামিয়ানা। কয়েক মুহূর্তের স্তব্ধতা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল বিকট চিৎকারে "আগুন! আগুন লাগছে! পালাও!"
আনন্দের আসর মুহূর্তেই মৃত্যুপুরী। প্যান্ডেলের মরিচ বাতিগুলো তখনো টিপ টিপ করে জ্বলছে, যেন আগুনের এই ধ্বংসলীলায় তারাও উৎসব পালন করছে। ধোঁয়ায় অন্ধকার হয়ে আসা চারপাশটা তখন কেবল বাঁচার লড়াই।
প্যান্ডেলের এক কোণে জ্বলন্ত নরকের মাঝে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে ছিল শুভ। তার শার্টের একপাশ আগুনের তাপে কুঁচকে গেছে। হাতে পেঁচানো ছিঁড়ে ঝুলে থাকা বৈদ্যুতিক তার, সেখান থেকে ঠিকরে বেরোচ্ছে নীল স্ফুলিঙ্গ। কোনো ভয় নেই, কোনো তাড়াহুড়ো নেই। অতি শান্ত ভঙ্গিতে সে ঠোঁটে একটা সিগারেট চেপে ধরল। তারপর হাতের সেই জ্বলন্ত তারের নীল শিখায় সিগারেটটা ধরিয়ে নিল। হাতটা তার সাদা আলোয় ঝলমল করে উঠল এক মুহূর্তের জন্য।

নাক দিয়ে গভীর এক টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ল শুভ। চারপাশের হাহাকার আর আগুনের গর্জন যেন তাকে আর ছুঁতে পারছে না। সে ধীরপায়ে রাস্তার দিকে হাঁটতে শুরু করল। দুই হাত দুই পাশে ছড়িয়ে দিয়ে মাতাল পায়ে মাথাটা তুলল কালো আকাশের দিকে। চোখ দুটো বন্ধ।

ভেতরের যে আগুনটা সে এতদিন বয়ে বেড়িয়েছে, আজ বাইরে ছড়িয়ে দিয়ে সে যেন এক অদ্ভুত মুক্তি খুঁজে পেল। পুরো আকাশটাকে সাক্ষী রেখে শুভ হাঁটছে, পেছনে তখনো পুড়ছে তার সব না পাওয়া স্মৃতির ছাই।



Comments

Popular posts from this blog

শেষ দৃশ্যপট (১ম অধ্যায় )

ফারাওয়ের অভিশাপ

মৃতের নিশ্বাস