মহাপ্লাবন
লেখকঃ সীমান্ত সরকার
আকাশের রঙ তখন কালচে বেগুনি। গত কয়েকদিন ধরে চেনা সূর্যটার দেখা মেলেনি। মেঘের দল যেন একে অপরের ওপর ভেঙে পড়ছে, আর সেই গর্জনে কেঁপে উঠছে ধরিত্রীর বুক। চারিদিকের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে এক আসন্ন প্রলয়ের গন্ধে। মানুষ ভুলে গেছে ধর্মের পথ, পৃথিবী ভরে গেছে পাপে। আর তাই, সৃষ্টিকে নতুন করে ধুয়ে-মুছে সাফ করতে ধেয়ে আসছে এক মহাজাগতিক জলপ্রলয়।
মাটি থেকে বহু দূরে, এক শান্ত নদীর তীরে তখন অঞ্জলি ভরে তর্পণ করছিলেন কৃতমালা নদীর ধার্মিক রাজা সত্যব্রত যিনি পরবর্তীতে 'মনু' নামে পরিচিত হন।
তিনি যখনই নদী থেকে এক আঁজলা জল তুললেন, দেখলেন তাঁর হাতের তালুর জলে ভেসে বেড়াচ্ছে ছোট্ট একটি মাছ। অতি সাধারণ, কিন্তু তার চোখ দুটোতে যেন এক অদ্ভুত মায়াবী দ্যুতি। রাজা মনু যখনই মাছটিকে আবার নদীতে ছেড়ে দিতে গেলেন, তখনই অলৌকিক কাণ্ড ঘটল। ছোট্ট মাছটি মানুষের ভাষায় মিনতি করে বলে উঠল, "হে রাজন! আমাকে এই গভীর নদীতে ফেলে দেবেন না। এখানে বড় বড় জলচর প্রাণীরা আমাকে খেয়ে ফেলবে। আমাকে রক্ষা করুন।"
দয়াশীল মনু বিস্মিত হলেও মাছটিকে ফেলে দিলেন না। তিনি নিজের কমণ্ডলুর (জলের পাত্র) ভেতরে মাছটিকে নিয়ে রাজপ্রাসাদে ফিরে এলেন।
কিন্তু পরদিন সকালে কমণ্ডলুর দিকে তাকাতেই রাজার চোখ ছানাবড়া! সেই ছোট্ট মাছটি এক রাতেই এত বড় হয়ে গেছে যে কমণ্ডলুর ভেতর তার নড়াচড়া করার জায়গা নেই। মাছটি বলল, "রাজন, এই পাত্র আমার জন্য বড্ড ছোট। আমাকে একটু বড় জায়গা দিন।"
মনু তাকে নিয়ে ছেড়ে দিলেন রাজপ্রাসাদের একটি বড় মাটির জাড় বা মটকায়। কিন্তু অবাক কাণ্ড! কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মাছটি সেই মটকাও ছাড়িয়ে বিশালাকার ধারণ করল। এরপর তাকে নিয়ে যাওয়া হলো প্রাসাদের বড় পুষ্করিণীতে বা পুকুরে। সেখানেও একই অবস্থা মাছটির শরীর বাড়তেই লাগল। বাধ্য হয়ে মনু তাকে নিয়ে গেলেন দেশের সবচেয়ে বড় হ্রদে। কিন্তু হ্রদের জলও সেই দানবীয় মাছের জন্য কম পড়ে গেল।
অবশেষে রাজা মনু বুঝতে পারলেন, এটি কোনো সাধারণ জলচর প্রাণী নয়। তিনি স্বয়ং সেই বিশালাকার মাছটিকে সমুদ্রের মোহনায় নিয়ে ছেড়ে দিলেন। ততক্ষণে মাছটির শরীর মাইলের পর মাইল জুড়ে বিস্তৃত হয়েছে, আর তার গায়ের সোনালী আঁশ থেকে ঠিকরে বেরোচ্ছে কোটি সূর্যের আলো।
মাছটির এই রূপ দেখে মনু হাত জোড় করে নতজানু হলেন। তিনি বললেন, "প্রভু, আপনি কে? কেন এই লীলা করছেন?"
তখন সেই বিশাল মৎস্য রূপী ভগবান বিষ্ণুর কণ্ঠস্বর সমুদ্রের গর্জনের মতো ধ্বনিত হলো, "হে সত্যব্রত, আজ থেকে ঠিক সাতদিন পর এই পৃথিবী এক মহাপ্লাবনে ডুবে যাবে। সৃষ্টির সমস্ত পাপী ও অধর্মিরা সেই জলে বিলীন হয়ে যাবে। কিন্তু সৃষ্টিকে তো একদম শেষ হতে দেওয়া যায় না। তাই আমি তোমাকে বেছে নিয়েছি।"
বিষ্ণু আদেশ দিলেন, "তুমি একটি বিশাল ও মজবুত তরণী (নৌকা) তৈরি করো। সেই নৌকায় তুমি পৃথিবীর সমস্ত ঔষধি উদ্ভিদ, উদ্ভিদের বীজ এবং প্রতিটি জীবজন্তুর এক একটি জোড়া তুলে নেবে। আর তোমার সাথে থাকবেন পরম জ্ঞানী সপ্তর্ষি (সাতজন মহান ঋষি)। যখন প্রলয়ের জল চারপাশ ভাসিয়ে দেবে, আমি আবার আসব।"
দেখতে দেখতে সেই ভয়ংকর সপ্তম দিনটি চলে এলো। আকাশ ভেঙে নামল অবিশ্রান্ত ধারা, আর সমুদ্রের তলা ফেঁটে জল উঠে আসতে লাগল। চোখের পলকে ঘরবাড়ি, পাহাড়-পর্বত সব জলের নিচে তলিয়ে গেল। চারদিকে শুধু অথৈ জল আর উত্তাল তরঙ্গ।
রাজা মনু তাঁর তৈরি বিশাল নৌকায় সব বীজ, পশুপাখি এবং সপ্তর্ষিদের নিয়ে ভাসলেন। প্রলয়ের সেই ভয়াল অন্ধকারে নৌকাটি যখন বিশালাকার ঢেউয়ের তোড়ে প্রায় ডুবে যাওয়ার উপক্রম, ঠিক তখনই জলের বুক চিরে আবির্ভূত হলেন সেই জ্যোতির্ময় মৎস্য অবতার! তবে এবার তাঁর মাথায় দেখা গেল একটি বিশাল শিং।
ভগবান বিষ্ণুর নির্দেশে রাজা মনু মহাজাগতিক বাসুকি নাগকে দড়ির মতো ব্যবহার করে নৌকার সামনের অংশটি মৎস্যের সেই শিংয়ের সাথে শক্ত করে বেঁধে দিলেন।
শুরু হলো এক অবিশ্বাস্য যাত্রা। চারিদিকে যখন প্রলয়ের তাণ্ডব, মৃত্যুর হাহাকার তখন সেই আদিম ও অন্ধকার সমুদ্রের বুক চিরে অবলীলায় পথ কেটে এগিয়ে চলল ঈশ্বরের সেই সোনালী তরণী। মৎস্য অবতারের টানে নৌকাটি সমস্ত ঢেউকে পরাস্ত করে ভাসতে লাগল। নৌকার ভেতরে সপ্তর্ষিরা তখন একমনে জপ করছিলেন সৃষ্টির পুনর্জন্মের পবিত্র স্তোত্র। ঈশ্বরের ছত্রছায়ায় হিংস্র বাঘ আর নিরীহ হরিণ তখন পাশাপাশি বসে দেখছিল এক নতুন পৃথিবীর স্বপ্ন।
দীর্ঘকাল ধরে সেই প্রলয়ের সমুদ্রে ভেসে থাকার পর, একসময় মেঘ কেটে গেল। শান্ত হয়ে এলো পৃথিবীর জলরাশি। মৎস্য অবতার সেই নৌকাটিকে নিরাপদে নিয়ে এলেন হিমালয়ের সর্বোচ্চ শৃঙ্গের কাছে, যা জলের ওপর জেগে ছিল। সেখানে নৌকাটি নোঙর করা হলো।
ভগবান বিষ্ণু তাঁর মৎস্য রূপ ত্যাগ করে মনুকে আশীর্বাদ করে বললেন, "এখন থেকে তুমিই হলে এই নতুন যুগের প্রথম মানুষ 'মনু'। এই বীজ আর জীবদের দিয়ে আবার নতুন করে পৃথিবী সাজাও।"
এটি সনাতন (হিন্দু) ধর্মের অন্যতম এক পরম তাৎপর্যপূর্ণ ও অলৌকিক অধ্যায়। হাজার বছর ধরে লোকমুখে প্রচলিত এই আখ্যানটি যেমন রূপকথার মতো সুন্দর, তেমনই গভীর এর অন্তর্নিহিত দর্শন, যা হিন্দু ধর্মগ্রন্থগুলোতে অত্যন্ত বিশাল ও মর্যাদাপূর্ণ স্থান জুড়ে রয়েছে।
তবে সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, ইতিহাসের কালচক্র পেরিয়ে এই কাহিনীর সাথে হুবহু মিলে যায় অন্য এক সুদূর প্রান্তের ইতিহাস। ইসলাম, ইহুদি এবং খ্রিস্টধর্মে বর্ণিত হযরত নূহ (আঃ) বা নোয়াহ নামক এক মহান নবীর ঐতিহাসিক ঘটনার সাথে এই কাহিনীর রয়েছে এক অবিশ্বাস্য ও অলৌকিক সাদৃশ্য। দুটি ভিন্ন সংস্কৃতি, ভিন্ন পটভূমি অথচ সৃষ্টির বিনাশ আর পুনর্জন্মের এই চিরন্তন বার্তা যেন একই সুতোয় গাঁথা।"
সে এক অন্ধকার সময়। আদি পিতা আদমের পর পৃথিবীতে মানুষের সংখ্যা যেমন বেড়েছিল, তেমনই বেড়েছিল তাদের অবাধ্যতা আর পাপাচার। মানুষ মূর্তি পূজায় মগ্ন হয়ে ভুলে গিয়েছিল এক ঈশ্বরের পথ, চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল অন্যায়, জুলুম আর অহংকার। ঠিক সেই কলুষিত সময়ে মানুষকে সত্যের পথে ডাকতে প্রেরিত হলেন আল্লাহর এক পরম নিষ্ঠাবান নবী হযরত নূহ (আঃ)।
নূহ (আঃ) বছরের পর বছর, প্রায় সাড়ে নয়শত বছর ধরে তাঁর জাতিকে মূর্তিপূজা ছেড়ে এক আল্লাহর ইবাদত করার আহ্বান জানালেন। কিন্তু মুষ্টিমেয় কিছু দরিদ্র ও দুর্বল মানুষ ছাড়া জালেম ও ধনী শাসকেরা তাঁর কথা শুনল না। উল্টো তারা নবীকে উপহাস করল, পাগল বলল এবং পাথর ছুঁড়ে মারার হুমকি দিল। এমনকি নূহের নিজের স্ত্রী ও এক ছেলেও কাফেরদের দলে যোগ দিল।
অবশেষে যখন পাপাচারের সীমা ছাড়িয়ে গেল, তখন আল্লাহর পক্ষ থেকে চূড়ান্ত ফায়সালা এলো। নূহ (আঃ) আল্লাহর দরবারে হাত তুলে দোয়া করলেন, "হে আমার পালনকর্তা! আপনি এই পৃথিবীতে কোনো অবাধ্য কাফেরকে অবশিষ্ট রাখবেন না।"
আল্লাহ তাঁর দোয়া কবুল করলেন এবং এক অলৌকিক নির্দেশ দিলেন: "তুমি আমার তত্ত্বাবধানে ও আমার ওহী অনুযায়ী একটি বিশাল কিশতি (জাহাজ) তৈরি করো।"
মরুভূমির মতো শুকনো পাথুরে এলাকায় নূহ (আঃ) যখন কাঠ কেটে বিশাল তিনতলা এক জাহাজ বানানো শুরু করলেন, তখন পথচারী কাফেররা হেসে কুটিপাটি হতো। তারা বলত, "কী হে নূহ! নবুয়ত ছেড়ে এখন ছুতোর মিস্ত্রি হলে নাকি? তা এই শুকনো মাটিতে জাহাজ কীভাবে চালাবে?" নূহ (আঃ) শান্তভাবে জবাব দিতেন, "আজ তোমরা আমাদের উপহাস করছ, কিন্তু শীঘ্রই এমন একদিন আসবে যখন আমরা তোমাদের উপহাস করব।"
ধীরে ধীরে সেই বিশালাকার কিশতি তৈরি সম্পন্ন হলো। আল্লাহ আদেশ দিলেন, "যখন আমার নির্দেশ আসবে এবং মাটির চুলা থেকে পানি উথলে উঠবে, তখন তুমি প্রত্যেক জীবজন্তুর এক একটি জোড়া (একটি পুরুষ ও একটি নারী) জাহাজে তুলে নেবে। আর তোমার পরিবারসহ যারা ঈমান এনেছে, তাদের জাহাজে তুলবে।"
অবশেষে সেই ভয়ংকর দিনটি এলো। হঠাৎ করেই মরুভূমির তপ্ত চুলা ভেদ করে ফিনকি দিয়ে পানি বের হতে লাগল। আকাশ কালো মেঘে ঢেকে গেল এবং মেঘ চিরে নামল এমন বৃষ্টি, যা পৃথিবী আগে কখনো দেখেনি। একই সাথে মাটির নিচ থেকেও প্রলয়ঙ্কারী জলোচ্ছ্বাস শুরু হলো।
নূহ (আঃ) আল্লাহর হুকুমে জোড়ায় জোড়ায় পশু-পাখি সিংহ থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র পিঁপড়ে পর্যন্ত সব জাহাজের নিরাপদ প্রকোষ্ঠে সারিবদ্ধভাবে তুলে নিলেন। এরপর তাঁর সাথে থাকা মাত্র ৮০ জনের মতো বিশ্বাসী মানুষ জাহাজে আরোহণ করলেন। সবার শেষে আল্লাহর নামে জাহাজের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হলো।
চোখের পলকে চারিদিক পানিতে ভেসে গেল। বড় বড় অট্টালিকা, পাহাড়-পর্বত সব তলিয়ে যেতে লাগল। কিশতিটি তখন উত্তাল তরঙ্গের বুকে ভেসে উঠল। চারদিকের ঢেউগুলো একেকটি বিশাল পাহাড়ের মতো ধেয়ে আসছিল, কিন্তু আল্লাহর ফেরেস্তাদের পাহাড়ায় সেই কাঠের তৈরি জাহাজটি নিরাপদে এগিয়ে চলল।
জাহাজ যখন চলতে শুরু করেছে, তখন নূহ (আঃ) দেখতে পেলেন তাঁর এক ছেলে (কানআন) প্রাণভয়ে একটি পাহাড়ের দিকে ছুটে যাচ্ছে। নূহ (আঃ) চিৎকার করে ডাকলেন, "বাবা আমার! আমাদের সাথে জাহাজে উঠে এসো, কাফেরদের দলে থেকো না!" ছেলেটি অহংকার করে বলল, "আমি এখনই ওই উচুঁ পাহাড়ে আশ্রয় নেব, ওটাই আমাকে পানি থেকে বাঁচাবে।" নূহ (আঃ) ব্যথিত হৃদয়ে বললেন, "আজ আল্লাহর হুকুম থেকে বাঁচানোর মতো কেউ নেই।" মুহূর্তের মধ্যে একটি বিশাল ঢেউ এসে ছেলেটিকে নূহের চোখের সামনেই তলিয়ে নিয়ে গেল।
দীর্ঘ চল্লিশ দিন ধরে সেই ভয়ংকর প্লাবন চলল। পৃথিবীর সমস্ত পাপাচার আর অবাধ্য মানুষ সেই প্রলয়ের জলে চিরতরে বিলীন হয়ে গেল। ধুয়ে-মুছে সাফ হয়ে গেল চেনা পৃথিবী।
অবশেষে আল্লাহর নির্দেশ এলো: "হে পৃথিবী! তুমি তোমার পানি গিলে নাও। আর হে আকাশ! তুমি শান্ত হও।"
ধীরে ধীরে বৃষ্টি থামল, মাটি সমস্ত পানি চুষে নিল। দীর্ঘ যাত্রা শেষে নূহ (আঃ)-এর সেই বিশ্বাসের তরণী নিরাপদে ‘জুদি’ নামক একটি পর্বতের গায়ে এসে নোঙর ফেলল। জাহাজ থেকে একে একে নেমে এলো মানুষ আর পশু-পাখির দল। এক পবিত্র, পাপমুক্ত ও শান্ত পৃথিবীতে নূহ (আঃ)-এর হাত ধরে মানুষের এক নতুন বংশধারা শুরু হলো। এই কারণেই হযরত নূহ (আঃ)-কে মানবজাতির ‘দ্বিতীয় আদম’ বলা হয়।
ইতিহাসবিদ, নৃতত্ত্ববিদ (Anthropologists) এবং তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের গবেষকেরা বিশ্বজুড়ে প্রচলিত এই মহাপ্লাবনের আখ্যানগুলোকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিশ্লেষণ করেছেন। দুটি ভিন্ন অঞ্চলের ভিন্ন ধর্মের কাহিনীর মধ্যে এই অবিশ্বাস্য মিলকে তাঁরা মূলত তিনটি প্রধান দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করেন:
১. সাধারণ ঐতিহাসিক সত্য (A Common Historical Event)
অনেক ইতিহাসবিদের মতে, হাজার হাজার বছর আগে পৃথিবীতে সত্যি সত্যিই এমন কোনো প্রলয়ঙ্কারী বন্যা বা ভূপ্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটেছিল, যা তৎকালীন মানব সভ্যতার একটি বড় অংশকে ধ্বংস করে দিয়েছিল।
মেসোপটেমিয়ার বন্যা: ভূতাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা গেছে, খ্রিস্টপূর্ব ৫০০০ থেকে ৩০০০ অব্দের মধ্যে প্রাচীন মেসোপটেমিয়া (বর্তমান ইরাক ও তার আশেপাশের অঞ্চল) এবং কৃষ্ণ সাগর (Black Sea) এলাকায় বরফ গলে যাওয়া বা প্রকাণ্ড জলোচ্ছ্বাসের কারণে এক ভয়াবহ আঞ্চলিক বন্যা হয়েছিল।
স্মৃতির উত্তরাধিকার: সেই সময়ের বেঁচে যাওয়া মানুষেরা এই ভয়াবহ ট্র্যাজেডিকে বংশানুক্রমে মুখে মুখে টিকিয়ে রেখেছিল। পরবর্তীতে মানুষ যখন পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে (যেমন ভারতে এবং মধ্যপ্রাচ্যে) ছড়িয়ে পড়ে, তখন তারা তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ধর্মীয় বিশ্বাসের আদলে এই একই সত্য ঘটনাকে লিপিবদ্ধ করে।
২. গিলগামেশের মহাকাব্য ও প্রাচীনতম উৎস (The Epic of Gilgamesh)
তুলনামূলক সাহিত্যের ইতিহাসবিদেরা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র আবিষ্কার করেছেন। নূহের কিশতি বা মৎস্য অবতারের কাহিনী গ্রন্থাকারে রূপ নেওয়ারও বহু আগে, প্রাচীন মেসোপটেমিয়ায় (সুমেরীয় সভ্যতায়) "গিলগামেশের মহাকাব্য" (Epic of Gilgamesh) নামক একটি বিশ্ববিখ্যাত মহাকাব্য মাটির ফলকে লেখা হয়েছিল।
সেখানে 'উতনাপিশতিম' (Utnapishtim) নামক এক চরিত্রের কথা বলা হয়েছে, যাকে দেবতারা এক মহাপ্লাবনের হাত থেকে সৃষ্টির বীজ রক্ষা করতে একটি বিশাল জাহাজ বানানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন।
ইতিহাসবিদদের মতে, এই প্রাচীন সুমেরীয় ও ব্যাবিলনীয় আখ্যানটিই কালক্রমে একদিকে হিব্রু ও আব্রাহামিক ঐতিহ্যে (নূহের কাহিনী) এবং অন্যদিকে সিন্ধু উপত্যকা ও বৈদিক সভ্যতার মাধ্যমে ভারতীয় উপমহাদেশে (মনু ও মৎস্য অবতারের কাহিনী) প্রবেশ করেছে।
ইতিহাসবিদদের কাছে এটি কেবল দুটি ধর্মের কাকতালীয় মিল নয়; বরং এটি প্রমাণ করে যে প্রাচীনকালে মানবজাতি ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন থাকলেও তাদের আদি ইতিহাস, ভয়, এবং বেঁচে থাকার লড়াইয়ের গল্পগুলো এক ও অভিন্ন ছিল। ধর্মগ্রন্থগুলো একে অলৌকিক আত্মিক বার্তা হিসেবে উপস্থাপন করেছে, আর ইতিহাস একে দেখিয়েছে প্রাচীন মানব সভ্যতার এক গভীরতমShared Memory বা যৌথ স্মৃতি হিসেবে।
আমার এবং আমার মতো অনেকেরই দৃঢ় বিশ্বাস ইতিহাসের কোনো এক সময়ে এই মহাপ্লাবনের ঘটনাটি সত্যিই ঘটেছিল। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো, পৃথিবীর প্রধান চারটি ধর্মের পবিত্র গ্রন্থেই এই আখ্যানের স্পষ্ট উপস্থিতি রয়েছে।
গ্রন্থভেদে ভাষার ভিন্নতা থাকলেও মূল চরিত্র ও ঘটনার সত্যতা কিন্তু এক। ইহুদি ও খ্রিস্টধর্মের পবিত্র গ্রন্থ তোরাত (তাওরাত) ও বাইবেলে যাঁকে ‘নোয়াহ’ বলে সম্বোধন করা হয়েছে, ইসলাম ধর্মের পবিত্র আল-কোরআনে তিনিই হলেন আল্লাহর নবী ‘হযরত নূহ (আঃ)’। আবার সমান্তরালভাবে, সনাতন বা হিন্দু ধর্মে এই একই পরম ব্যক্তিত্বকে আমরা জানতে পারি প্রথম মানুষ রাজা ‘মনু’ হিসেবে। নাম বা স্থানভেদে উপস্থাপন হয়তো ভিন্ন, কিন্তু ঘটনার মূল সুরটি হুবহু এক।
আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, আদিম সেই প্রাচীন যুগে আজকের মতো তাৎক্ষণিকভাবে কোনো ঘটনা লিখে রাখার বা নথিভুক্ত করার আধুনিক ব্যবস্থা ছিল না। ফলে, এই প্রলয়ঙ্কারী ঘটনার স্মৃতি বহু শতাব্দী ধরে মানুষের লোকমুখে, এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে মৌখিকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। দীর্ঘ কালপরিক্রমায় বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ যখন এই কাহিনী বর্ণনা করেছে, তখন স্বাভাবিকভাবেই তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি, রূপক ও ভাষার রঙ মিশে গল্পে কিছুটা ভিন্নতা বা ‘রস-কস’ তৈরি হয়েছে।
কিন্তু সবচেয়ে অলৌকিক এবং অকাট্য বিষয় হলো ঐশ্বরিক বাণী বা ওহীর আগমন। সৃষ্টিকর্তা আজ থেকে প্রায় ৩,০০০ বছর আগে তাওরাতে (তোরাহ) এই সত্য ঘটনাটি মানবজাতিকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন। তারও বহু বছর পর, আজ থেকে প্রায় ১,৪০০ বছর আগে পবিত্র কোরআনের মাধ্যমে শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর কাছে আবারও এই মহাপ্লাবনের ইতিহাস অবতীর্ণ করেন।
যুগ ও দূরত্বের এত ব্যবধান থাকা সত্ত্বেও পবিত্র গ্রন্থগুলোর এই অভিন্ন সাক্ষ্য প্রমাণ করে যে, মহাপ্লাবনের এই ইতিহাস কোনোভাবেই ‘আজগুবি’ বা ‘কাকতালীয়’ কোনো গল্প হতে পারে না। এটি মানব ইতিহাসের এক মহাসত্য, যা সৃষ্টিকর্তা যুগে যুগে মানুষকে সতর্ক ও পথপ্রদর্শন করতে বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।"

Comments
Post a Comment